ক্যাটেগরিঃ ব্লগ

আমার মা মারা গেছেন কয়েক মাস আগে। মৃত্যুকালে উনার বয়স হয়েছিল পঁচাত্তর বছর। পঁচাত্তর বছর বয়সী এক নারী সাধারণতঃ খুব ধর্মভীরু হয়ে থাকেন, হিন্দু নারী প্রতিনিয়ত ‘গুরুর নাম’ জপ করেন, মুসলিম নারী পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়েন এবং তসবীহ জপেন। কিন্তু আমার মা মৃত্যুর আগ পর্যন্ত এর কোনটাই করেন নি। এমনকি কোন গুরুর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন নি। মায়ের সমবয়সী মহিলারা মাঝে মাঝেই ঠারেঠোরে মা’কে বিদ্রূপ করতেন, মা কেন পূজো আর্চ্চা নিয়ে ভাবতেন না, ইহকাল-পরকাল নিয়ে ভাবতেন না, সে বিষয়েও কৌতূহল দেখাতেন। মাসী-পিসী সম্পর্কীয়ারা মাঝে মাঝে হয়তো আমাকে উকিল ধরতেন, মা’কে বুঝিয়ে বলার জন্য।

মায়ের বয়সী ‘মাসী-পিসীদের প্রশ্নবানে জর্জড়িত হয়ে এক সময় মা’কে জিজ্ঞেস করেছিলাম,

” মা, সব মাসী পিসীদের দেখি নিয়মিত পূজো আচ্চা করেন, তোমাকে কেন কখনও দেখিনা, একটুক্ষণের জন্য আসন বিছিয়ে বসে একমনে ঠাকুরের নাম নিতে”!

মা বলেছিলেন, ” ধর্ম হচ্ছে যার যার বিশ্বাসে। আমার ধর্ম আমাকে শিখিয়েছে, সদা সত্য কথা বলিবে, ন্যায়ের পথে চলিবে, অন্যের উপকার করতে পারলে ভালো, কিন্তু কোনভাবেই অপকার না করতে, চুরী না করতে, কারো ভালো দেখে ঈর্ষা না করতে। পিতা-মাতা সহ সকল গুরুস্থাণীয়দের সম্মান করতে, স্নেহভাজনদের প্রতি স্নেহশীল হতে, বন্ধুর প্রতি ভালোবাসা, সহকর্মীর প্রতি সহযোগীতার হাত বাড়িয়ে দিতে। আর্তের সেবা করতে, দেশের মান বজায় রাখতে। আমি আপ্রাণ চেষ্টা করেছি আমার নিজ ধর্ম পালন করে যেতে। জানিনা কতটুকু পেরেছি।

বললাম, তোমার কোন শত্রু নেই?

মায়ের জবাব ছিল, হয়তো আছে। তবে মাথা ঘামাই না তাদের কথা ভেবে। কারো যদি আমার বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ থাকে, আমার সামনে এসে বলতে হবে, যুদ্ধ হয় সমানে সমানে। যুদ্ধ হয় সামনা সামনি। আড়ালে থেকে যারা টীকা টিপ্পনী কাটে, তারা কাপুরুষ। কাপুরুষতাকে আমি ঘৃণা করি। কাপুরুষরা পেছন থেকে ছুরী হানে, তারা ঘুম থেকে উঠে গঙ্গা স্নানে যায়, গঙ্গায় ডুব দিয়ে মনে করে পাপ স্খালন হয়ে গেছে। মনের আনন্দে নতুন করে পাপ করা শুরু করে।

-মা, গঙ্গা স্নান করলে কী সত্যি সত্যিই পাপ ধুয়ে মুছে যায়?

-কে জানে! হয়ত যায়, নাহলে লাখ লাখ মানুষ নিত্যদিন গংগাস্নান করতো না! তবে যারা পাপ করে, তাদেরই গংগাস্নানের দরকার হয়।

-মা, তোমার কথা মানলাম, কিন্তু সমাজে বাস করতে গেলে সমাজের অন্য সবার সাথে তাল মিলিয়ে চলার একটা ব্যাপারও তো আছে! (মনে মনে আমিও কিছুটা ভয় পেতাম ধর্মীয় আচার পালনের প্রতি মায়ের এমন নিস্পৃহতা বা নির্লিপ্ততা দেখে। ভাবতাম, তবে কী আমার মা আসলেই একজন নাস্তিক? তাই বা কী করে হয়, যে মানুষটিকে কখনও পবিত্র ‘গীতা’ পাঠ করতে দেখিনি, সেই মানুষটি তো ঠিকই গড়গড় করে গীতার শ্লোক, মহাভারত, রামায়ণের গল্প করে যেতেন, এমনকি স্কুলের সহকর্মী ধর্মীয় শিক্ষকদের কাছ থেকে বাইবেল, কোরাণও শিখে আসতেন”।

-হা হা হা! শোন, সবাই যদি পূণ্য করে তো পাপ করার লোকও তো লাগবে। সবাই যদি স্বর্গে যায় নরকে যাবে কে? আমিই না হয় নরকে যাব।

*** আমার মায়ের মত এমন জ্ঞাণী, পড়ুয়া মা আমি খুব কম দেখেছি। আমার মায়ের ট্রাঙ্কে ছিল সাধারণ তাঁতের শাড়ী, আর বুকসেলফ ভর্তি ছিল স্বদেশী আন্দোলনের বই, মাস্টার দা, প্রীতিলতা, অগ্নিগর্ভ চট্টগ্রাম’সহ রবীন্দ্র, নজরুল, সৈয়দ মুজতবা আলীর লেখা বই! বিভূতিভূষণ, মানিক বন্দোপাধ্যায় এর লেখা বই! মুক্তিযুদ্ধের সময় আমার মা নিজের ভান্ডারের চাল, ডাল থেকে শুরু করে যা কিছু হাতের কাছে পেয়েছিলেন, সবার মাঝে বিলিয়ে দিয়েছিলেন। শিক্ষক মানুষটির সহকর্মীদের মাঝে কী যে গ্রহণযোগ্যতা ছিল, সব ধর্মের প্রতি ছিল উনার শ্রদ্ধাবোধ। উনি কখনও ‘অতি ধার্মিক’ বা ‘বক ধার্মিক’ দের পছন্দ করতেন না। নিজেকে উনি ‘নাস্তিক’ হিসেবেই পরিচয় দিতেন। নির্ভীক, সৎ, নির্লোভ, অসাম্প্রদায়িক এই মহীয়সী নারীর মৃত্যুর পরে দেখা গেছে, আমার ‘নাস্তিক’ মা কত বেশী ধর্মের কাজ করে গেছিলেন! কত গরীব দুঃখীরা যে এসে উঠোনে শুয়ে পড়ে কেঁদেছে, দেখে হতবাক হয়েছি।

*** সতীর্থ ব্লগার রাজীব হায়দারের করুণ মৃত্যুতে আমার সমস্ত চিন্তা চেতনা এলোমেলো হয়ে গেছে। আহ! ভাবতে পারছি না, যে যোদ্ধা কলম চালিয়ে যুদ্ধ করছিল, কাউকে শারীরিক আক্রমণ করার মত নীচতা দেখায় নি, যে ছিল নির্ভীক, নির্দ্বিধায় যে অন্ধকার রাতে পায়ে হেঁটে বাড়ী ফিরছিল, নিরস্ত্র এই কলম যোদ্ধাকে অমন নিষ্ঠুরভাবে কী করে ‘ওরা’ মারতে পারলো? মানুষ কী করে অমন নিষ্ঠুর হতে পারে! হত্যা প্রক্রিয়ারও তো একটা মানবিক দিক থাকে, কতটা অমানবিক, কতটা পশু, কতটা কাপুরুষ হলে তবেই কেউ এভাবে মনের আক্রোশ মিটিয়ে নিরস্ত্র, একাকী চলা কাউকে হত্যা করতে পারে! এরাই আবার ধর্মের বড়াই করে! তবে কী ‘ধার্মিক’ মাত্রেই কাপুরুষ, নাকি ‘কাপুরুষ’ মাত্রেই ‘বকধার্মিক’? একজন নিরস্ত্র তরুণ খুন হয়েছে, এমন সচিত্র সংবাদ পাওয়ার সাথে সাথে বুকে ধাক্কা লাগার কথা, আমাদের বুকে ধাক্কা লেগেছে। কিন্তু তারপরেও কিছু কিছু ‘ধার্মিক’এর মনে লেগেছে পৈশাচিক আনন্দের উচ্ছ্বাস! তারা সাথে সাথে ” কুত্তা নাস্তিক’, ” বেটা নাস্তিকের উচিত শিক্ষা হইছে” স্ট্যাটাস দিতে শুরু করেছে। আমি নিজেও অবাক হয়ে গেছি, দুই দিন আগেও আমার এই ফেসবুক বন্ধুদেরকে ভালো জানতাম, কিন্তু রাজীবের মৃত্যুতে মানুষের চরিত্রের কত দিক উন্মুক্ত হয়ে গেলো! ধর্ম কী এমন হতে শেখায়? ব্লগার রাজীব যদি ‘নাস্তিক’ হয়েও থাকে, তার ‘নাস্তিকতা তো কারো উপর চাপিয়ে দিতে চায় নি! তার ধর্ম বিশ্বাস তার কাছেই ছিল। সে লড়েছে ন্যায়ের পক্ষে, সে লড়েছে দেশের মঙ্গলের স্বার্থে, সে তো তার লড়াইয়ের মধ্যে ধর্ম-অধর্মকে টেনে আনে নি। সে তো কোথাও বলে নি, তোমরা কেউ ধর্মীয় আচার পালন কর না! তারপরেও কেন এমন পেছন থেকে তাকে আক্রমণ করা হলো? এই কী ধর্মের শিক্ষা? তাহলে তো এই সমস্ত গুটিকয়েক ভীরু, কাপুরুষ ‘আস্তিক’, এই সমস্ত ‘ধার্মিক’ দের চেয়ে স্বচ্ছবুদ্ধির, সুবিবেচক, পরোপকারী, মেধাবী ‘নাস্তিক’ই অনেক ভাল!

থুঃ থুঃ থুঃ দেই এই ধরণের সকল ‘কাপুরুষে’র গায়ে!