ক্যাটেগরিঃ ব্লগ

 

অনলাইন সংবাদ থেকে যখন জানতে পেরেছি, সংসদে যুদ্ধাপরাধী ও মানবতাবিরোধী অপরাধ বিচার আইন সংশোধন করা হয়েছে, যখন জানতে পেরেছি, ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলের অপরাধকেও বিচারের আওতায় আনা হয়েছে, মনে মনে আমাদের প্রধান মন্ত্রীকে একশত বার সালাম করেছি। সাথে সাথে মনের পর্দায় ভেসে উঠেছে, ‘৮৩ সালের এক বিকেলের ছবি। যে বিকেলে বর্তমান প্রধান মন্ত্রী শেখ হাসিনা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় বিলুপ্ত ‘ছাত্রলীগ’ আয়োজিত সভায় ‘সভানেত্রী’ হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন। জাতির পিতার কন্যাকে খুব কাছে থেকে এক নজর দেখার জন্য কেমিস্ট্রি ল্যাবে না গিয়ে ‘প্রান্তিকের’ পাশের স্বল্প পরিসরে আয়োজিত সমাবেশে উপস্থিত হয়েছিলাম।

মনে পড়ে, সভা আয়োজনে কোন জাঁকজমক ছিল না, কোন প্রচার ছিল না, সাধারণ সাদামাটাভাবেই অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল। জাঁকজমক করার সামর্থ্যও ছিল না তৎকালীন ছাত্রলীগের সদস্যদের, কারণ, তখন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগ ছিল ‘সংখ্যালঘু’, সংখ্যালঘু হওয়ার কারণেই তাদের প্রচার বা প্রসার, কোনটাই ঠিকভাবে হয়ে উঠেনি। আর সেই ‘সংখ্যালঘু’ ছাত্রদের নেত্রী ছিলেন পিতা-মাতা, ভাই হারাণো ‘এতিম, বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা। অতি সাধারণ লাল পাড় সাদা জমিন ঢাকাই তাঁতের শাড়ী পড়ে এসেছিলেন তিনি, মুখে হাসি লেগেই ছিল, মাথা থেকে লম্বা চুলের বিনুনী কোমড় ছাড়িয়ে হাঁটু ছুঁয়েছিল, সাধারণ বেঞ্চ জোড়া দিয়ে যে ডায়াস তৈরী করা হয়েছিল, সেখানে দাঁড়িয়ে উনি বক্তৃতা করেছিলেন। স্বাধীন দেশের রূপকার, বীর বাঙালী জাতির পিতার ‘এতিম কন্যা’টিকে দেখামাত্র তরুণ হৃদয়ে কান্না উথলে উঠেছিল। দূর্বা ঘাসের উপর বসে দুই হাঁটুর উপর মাথা রেখে অনেকক্ষণ কেঁদেছি। দেশের সংখ্যালঘিষ্ঠ সম্প্রদায়ের একজন আমি, তৎকালীন সরকারের কৃপায় কপালে জুটেছে ,’সংখ্যালঘু’ নামের কালো টীকা, ফলে হৃদয়ে ছিল অসহায় বোবা কান্না, নেত্রী শেখ হাসিনাকে দেখামাত্র বুক মুচড়ে উঠেছিল। উনাকে দেখার সাধ ছিল, দেখেই চলে এসেছিলাম। কাছাকাছি যাওয়ার সুযোগ থাকার পরেও কাছাকাছি যাইনি।

এত বছর বাদে আজ মনে হচ্ছে, যদি সেদিনের সেই দুঃখী কিন্তু সদা হাস্যমুখ মানুষটির কাছে আরেকটিবার যাওয়ার সুযোগ পেতাম, একটি কথাই শতবার বলতাম ” মাননীয় প্রধান মন্ত্রী, সেদিনের আপনার সাথে আজকের আপনার আকাশ আর পাতাল তফাৎ। সেদিন আপনি ছিলেন শুধুই দুঃখী, এতিম, সংখ্যালঘু, আর আজ আপনি নিজের যোগ্যতাবলে জনপ্রিয়তা, ক্ষমতা, ভালোবাসার উচ্চশিখরে আছেন। আপনাকে এ অবস্থানে দেখে আজকেও আমার কান্না পাচ্ছে, তবে এই কান্না আনন্দের, ভরসার, বিজয়ের। আপনি দেশের সকল দন্ডমুন্ডের কর্তা, আপনি দেশপ্রেমিক, আপনি জাতির পিতার কন্যা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় সদা ভাস্বর। আপনার মাধ্যমেই আজ জাতির কপালে লেগে থাকা ‘বিষফোঁড়া’ উৎপাটনের সকল আয়োজন সম্পন্ন করা হয়েছে। আপনার মাধ্যমেই মহান সংসদে যুদ্ধাপরাধী বিচারের বিল পাশ হয়েছে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হলে দেশ এক গহীন বেদনার বালুচর থেকে মুক্তি পাবে।

মাননীয় প্রধান মন্ত্রী, সেদিন আপনার কাছাকাছি যাওয়ার সুযোগ ছিল, এখন আর তা নেই। সেদিন আপনার আর আমার মাঝে একটি জায়গায় মিল ছিল, আপনিও ছিলেন ‘সংখ্যালঘু’, আমিও ছিলাম ‘সংখ্যালঘু’। আজকের অবস্থানে আসতে আপনাকে অনেক সংগ্রাম করতে হয়েছে, অনেক ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে, আজ আপনি বিজয়ী, আজ আর আপনি ‘সংখ্যালঘু’ নন কিন্তু আমার কপাল থেকে ‘সংখ্যালঘু’ নামের টিকা মুছে যায় নি। আমরাও নিরন্তর সংগ্রাম করে চলেছি, আমাদের সন্তানেরা সংগ্রাম করছে, তবুও কপাল থেকে ‘সংখ্যালঘু’ নামক কলঙ্ক টীকা মুছতে পারিনি। এর একটাই কারণ, ‘সংখ্যালঘু’ নামের কলঙ্ক টীকা রাষ্ট্রীয়ভাবে আমাদের কপালে সেঁটে দেয়া হয়েছে, তাই টীকা মোচনও রাষ্ট্রীয়ভাবেই করতে হবে।

আপনি জাতির প্রধান, সারাদেশ, সকল তরুণ আপনার পাশে এসে জড়ো হয়েছে, এই তো সময়, দেশের সংবিধান থেকে সামপ্রদায়িক রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করুন, আমাদেরকে সংখ্যালঘু হওয়ার গ্লানি থেকে মুক্ত করুন। আমরা আর দশজন সাধারণ নাগরিকের মত বাঁচতে চাই, স্বাধীনভাবে দেশে বসবাস করতে চাই। আপনি একটি দেশের প্রধান, দেশের প্রতিটি নাগরিকের জান-মাল, মান-ইজ্জত, ধর্ম- ধর্মাচার রক্ষার গুরু দায়িত্ব কাঁধে নিয়েই আপনি দেশ পরিচালনায় নেমেছেন। দেশের প্রতিটি নাগরিক তার জন্মগত অধিকার নিয়ে যেন বসবাস করতে পারে, তা দেখভাল করার গুরুদায়িত্বও আপনার কাঁধেই বর্তেছে। আপনি একজন আলোকিত মানুষ, আপনি একজন দেশপ্রেমিক, আপনার রাজত্বে একটি নাগরিকের প্রতিও রাষ্ট্রীয়ভাবে কোন অনিয়ম থাকা উচিত নয়। একজন সুশাসক, একজন দেশপ্রধানের দৃষ্টিতে প্রতিটি নাগরিকের সমান অধিকার থাকার কথা। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি, আমার দেশে, আমার বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয়ভাবে দেশের সংবিধান থেকে ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ বাতিল করে, শুধুমাত্র ধর্মীয় গোষ্ঠীর সংখ্যা বিচার করে দেশকে ইসলামিক রাষ্ট্র ঘোষণা করে দেশের সংখ্যালঘিষ্ঠ নাগরিকের কপালে ‘সংখ্যালঘু’ টীকা লাগিয়ে দেয়া হয়েছে। ফলে, এক মায়ের সন্তান হয়েও আমরা আজ দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক হয়ে গেছি। অনুগ্রহ করে আমাদের কপাল থেকে এই ‘রাষ্ট্রীয় কলঙ্ক টিকা’ মুছে দিন।

একমাত্র আপনিই পারবেন এই মহান কাজটুকু করতে, আগে পিছে আর কেউ পারবে না। আপনি দেশের প্রধান, আপনিই দেশের মা-বাপ, এর আগে যারা দেশের শাসনদন্ড হাতে নিয়েছিল, তাদের চোখে আমরা ছিলাম ‘পরগাছা’। তাই আমাদের জন্মগত অধিকার তারা কেড়ে নিয়েছিল। আপনি আমাদের স্নেহময়ী মা, আপনি আমাদের স্নেহময়ী বোন! আমাদের মত দূর্বল মানুষগুলোর প্রতি আপনার সমদৃষ্টি হানুন, রাষ্ট্রীয়ভাবে আমাদেরকে কোন ক্রমিক নাম্বার ব্যতীতই শুধু নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দিন। যে কোন উগ্রপন্থী ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে নিজের সুনাম অক্ষুন্ন রাখুন। নানাজনে নানান কথা বলে। অনেকেই আপনাকে সুবিধাবাদী বলে, আপনাকে অতীতের দুই একটি ভুল রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের জন্য গাল-মন্দ করে, আমি বুকে হাত দিয়ে বলতে পারি, যে কেউ আপনার বিষয়ে এই ধরণের কথা বলে, আমি অন্তরে জ্বালা টের পাই। ভেতরে ভেতরে ফুঁসে উঠি আপনাকে নিয়ে অমন বিদ্রূপাত্মক কথা শুনে। আপনি জাতির পিতার কন্যা, বাংলাদেশের প্রতিটি নাগরিক রাষ্ট্রীয়ভাবে সেই একই পিতার সন্তান। যারা মানে না পিতাকে, তাদের কথা আলাদা, কিন্তু যারা পিতাকে মেনেছি, পিতাকে জেনেছি, সেই সন্তানেরা কেন দেশের নাগরিক হিসেবে সমান অধিকার পাব না! কেন আপনার শাসনামলে রাষ্ট্রীয় প্রচারযন্ত্রে ভিন্নমতের রাজনীতিবিদেরা বিভিন্ন টকশো তে গিয়ে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে কটাক্ষ করে কথা বলবে, কেন রাষ্ট্রের বিভিন্ন পর্যায়ে ‘সংখ্যালঘু’ দের জন্য অলিখিত আইন থাকবে, কেন একজন ‘সংখ্যালঘু’ প্রচন্ড মেধাবী হওয়া সত্বেও শুধুমাত্র নামের কারণে মেধা প্রতিযোগীতার রেস থেকে ছিটকে পড়বে! আমি অবশ্যই বিশ্বাস করি, এ সমস্ত অনিয়ম, অভিযোগের কথা আপনার কান পর্যন্ত পৌঁছে না, তাই আপনি ‘সংখ্যালঘু’র বেদনার কথা জানেন না।

মাননীয় প্রধান মন্ত্রী, এ এক লজ্জার কথা, এ এক বেদনার কথা। একটি দেশে জন্মে, শুধুমাত্র রাষ্ট্রীয়ভাবে ‘বৈমাত্রেয়সুলভ’ আচরণ পেয়ে কতশত মেধাবী তরুণ-তরুণী অভিমানে মাতৃভূমি ছেড়ে পৃথিবীর নানা প্রান্তে যাযাবরের মত ঘুরছে, তাদের কোন ঠিকানা নেই, তাদের কোন দেশ নেই, নিজেদের মেধা অন্য দেশের উন্নয়নে বিক্রী করে দিচ্ছে! বিক্রী করে দিচ্ছে কথাটিই প্রযোজ্য, কারণ পরবাসের সরকার পয়সা দিয়েই তাদের মেধা কিনে নিচ্ছে! দেশমায়ের কাছ থেকে বিমাতাসুলভ আচরণ পেয়ে তারা মনের দুঃখে বৈদেশে পড়ে আছে, পরবাসে দেশমাতৃকার জন্য চোখের জলে ভাসে! বুকে প্রচন্ড অভিমান নিয়ে অন্য দেশের নাগরিকত্ব গ্রহণ করে ঠিকই, কিন্তু মনে-প্রাণে নাগরিক হতে পারে না। রক্তের টান, মাটির টান পিছু টেনে ধরে।

মাননীয় প্রধান মন্ত্রী, আপনি আমাদেরকে বাঁচান। আপনি অনেক সয়েছেন, অনেক ক্ষয়েছেন, বাংলাদেশের ইতিহাসে বঙ্গবন্ধুর পাশাপাশি আপনার নামও স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের প্রতিটি নাগরিককে সমান অধিকার নিয়ে বেঁচে থাকার আইন করেছিলেন, সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতা রেখেছিলেন, ব্যক্তি জীবনে উনি ছিলেন একজন প্রকৃত মুসলমান, উনি জন্মেছেন একটি ধর্মভীরু সম্ভ্রান্ত মুসলমান পরিবারে। উনি ছিলেন প্রকৃত ধার্মিক, তাই সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান জনগনের একজন হয়েও অন্য ধর্মাবলম্বীদেরকে রাষ্ট্রীয়ভাবে সমান অধিকার দিয়েছিলেন। যারা বঙ্গবন্ধুর এই অসামান্য মহানুভবতা মেনে নিতে পারে নি, তারাই ‘কাপুরুষের’ মত পেছনের দরজা দিয়ে ঢুকে উনাকে হত্যা করেছে। তারাই কলমের এক খোঁচায় সংবিধান থেকে ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ কেটে দিয়ে আমার প্রিয়জন্মভূমির কপালে কলঙ্ক লেপে দিয়েছে। তারাই দেশের জনগণকে ‘সংখ্যাগুরু’ আর ‘সংখ্যালঘু’ নামে দুই ভাগ করে দিয়েছে।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, ব্যক্তিজীবনে আপনি একটি পুত্র ও একটি কন্যা সন্তানের জননী। আমাদের সংস্কৃতিতে পুত্রের মা ভাগ্যবতী, এই বিশ্বাস বহু যুগ ধরে প্রচলিত। আপনি নিজেও জানেন সামাজিক এই বৈষম্যনীতির খুঁটিনাটি বিষয়গুলো সম্পর্কে। আমার ‘পুত্র’ সন্তান নেই বলে সমাজে আমাকে ‘ আহারে! একটা ছেলে নেই’ চোখে দেখা হয়, আমি অবশ্য বুঝতে পারি না, পুত্র থাকলে আমার মাতৃত্বে ভিন্ন কোন মাত্রা যোগ হতো কিনা! যার পুত্র ও কন্যা দুইই আছে, একমাত্র সেই বুঝতে পারবে, পুত্র আর কন্যাতে কী তফাৎ, আদৌ কোন তফাৎ আছে কিনা! সৌভাগ্যক্রমে আপনি পুত্র এবং কন্যার জননী হয়েছেন, আপনি বুঝতে পারছেন নিশ্চয়ই, মায়ের কাছে পুত্র বা কন্যার অবস্থানগত কোন পার্থক্য আছে কিনা। আচ্ছা, পুত্র জয় আর কন্যা পুতুলের মধ্যে কাকে বেশী ভালোবাসেন? কে বেশী মেধাবী, কে বেশী বিত্তশালী, কার পেশীর জোর বেশী, এগুলো দিয়ে কী আপনি সন্তানকে বিচার করেন? আপনাকে কে বেশী ভালোবাসে? পুত্র জয় নাকি কন্যা পুতুল? আপনাকে যখন জেলে রাখা হয়েছিল, কে বেশী আপনার জন্য কেঁদেছিল? পুত্র জয় নাকি কন্যা পুতুল? আমি জানি, আপনি দুই সন্তানের ভালোবাসায় কোন বিভাজন রেখা টানতে পারবেন না। আপনি মা, মায়ের চোখে সব সন্তান সমান।

এবার নিজেকে দেশমাতার সাথে তুলনা করুন, মাগো, আমরা সংখ্যায় কম হতে পারি, তবুও তো আমরা তোমার সন্তান। সংখ্যা কম বলে আমাদেরকে তোমার স্নেহসুধা থেকে বঞ্চিত করে রাখবে? মায়ের চোখে তো সব সন্তানই সমান। কন্যাও যা, পুত্রও তাই। প্রাক্তন শাসকদের মধ্যে কেউ ছিল শুধুই পুত্র সন্তানের জনক, কেউ বা ছিল নিঃসন্তান, তাই কলমের এক খোঁচায় তারা সংবিধান থেকে আমাদের প্রথম শ্রেণীর নাগরিক অধিকার বাদ দিয়ে দিয়েছে। কিন্তু আমরাতো তোমার কাছে জন্মের ঋণে আটকা পড়েছি। কেউ দেশে বসেই বৈষম্যমূলক আচরণের শিকার হচ্ছি, কেউ পরবাসে বসে তোমার স্নেহসুধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছি। মাগো, আমাদের কপাল থেকে ‘সংখ্যালঘু’র টীকা মুছে দাও, সন্তান কষ্টে থাকলে মায়ের ভাগ্যে সুখ থাকে না। মায়ের সুখ না দেখলে সন্তান ভালো থাকে না। আমরা কেউই ভালো নেই, আমার বাংলা মা ভালো নেই, আমরাও ভালো নেই। দেশের কিছু দুষ্টচক্রের হাতে আমার দেশ আজ বন্দী। তোমার বুকে বসে তোমার কিছু ‘কুসন্তান’ বিভিন্ন সভা সমাবেশে, বিভিন্ন মিডিয়ায় অনবরতঃ ‘সংখ্যালঘু’দের নাম তুলে গালি-গালাজ করে। টিভিতে বিভিন্ন চ্যানেলে প্রচারিত ‘টকশো’ গুলোতে কিছু চিহ্নিত সাম্প্রদায়িক ব্যক্তিত্ব এসে অযথা ‘সংখ্যালঘু’ সম্প্রদায়ের গায়ে ‘ভারতের’ তকমা লাগায়! আমাদের পূর্ব পুরুষের জন্ম এই দেশের মাটিতে, আমাদের জন্ম এই দেশের মাটিতে, তবে কেন আমাদেরকে উঠতে বসতে ‘অন্যদেশ ভারতের দালাল’ বলা হবে? আমরা তো ভারতের নাগরিক নই, ভারত যদি অন্যায় আচরণ করে, তার দায় কেন আমাদের উপর বর্তাবে? আমরা তো ভারতের নাগরিক নই, আমরা জন্মসূত্রে বাংলাদেশের নাগরিক। তারপরেও অনবরতঃ চলতে থাকা এইসব অনাচার, অপপ্রচার, কুৎসা, অন্যায় যেহেতু রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃতি পেয়েছে, তাই বাংলাদেশের সংখ্যালঘিষ্ঠ জনগণ ভয় পেতে পেতে একেবারে শামুকের মত গুটিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছে, সংখ্যালঘিষ্ঠ জনগণ নিজেদেরকে ‘ সংখ্যালঘু’ হিসেবে মেনে নিতে বাধ্য হয়েছে। যা একটি দেশের জন্য, একটি জাতির জন্য বেদনাদায়ক। একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের কাছে প্রতিটি নাগরিকের সমান অধিকার, সমান দায়বদ্ধতা থাকা উচিত। এবং আমাদের মধ্যে তা পুরো মাত্রায় আছে। প্রবাসে বসে আমরা নিজেদেরকে ‘বাংলাদেশী’ হিসেবেই পরিচয় দেই। দিতেই হয়, মায়ের পরিচয় না দেয়ার মত ‘কুসন্তান’ আমরা নই।

বাংলাদেশের জন্মলগ্নেই প্রতিটি নাগরিকের সম অধিকার সুনিশ্চিত করা হয়েছিল, বাংলাদেশের জন্মলগ্নে আমাদের প্রজন্ম ছিল নিতান্তই শিশু। কিন্তু ঐ শিশু বয়সেই পেয়েছিলাম স্বাধীনতার সুখ, যদিও সুখ ছিল স্বল্প সময়ের জন্য। একদল কাপুরুষের হাতে জাতির পিতাকে সপরিবারে প্রাণ দিতে হয়, অসাম্প্রদায়িক সোনার বাংলার ভবিষ্যত ধূলিসাৎ হয়ে যায়! ‘৭৫ এর আগে পর্যন্ত বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের সাথে আমরা সংখ্যালঘুরা ভালই ছিলাম, আমাদের একটাই পরিচয় ছিল, আমরা বাঙালী। ভাই-ভাই, বোন-বোন পাশাপাশি বড় হচ্ছিলাম। ঝগড়া করতাম, আবার হাতের খাবার ভাগাভাগি করে খেতাম। এখনও আমরা আগের মত থাকতে চাই। পাশাপাশি বসবাস করে বন্ধুর কাছ থেকে, ভাইয়ের কাছ থেকে ‘গালি’ শুনতে রাজী আছি, কিন্তু রাষ্ট্রীয়ভাবে গালিগালাজ শুনতে রাজী নই।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, দেশ আজ জেগেছে। তারুণ্য জেগেছে। এই তারুণ্য মেধাবী, এই তারুণ্য সাহসী, এই তারুণ্য অসাম্প্রদায়িক, এই তারুণ্য মুক্তিযুদ্ধ না দেখেও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উজ্জ্বল, ওরা মুক্তিকামী, ওরা দাসত্বের শৃংখল ভাঙ্গতে চায়, ওদেরকে একটু সাহায্য করুন। বঙ্গবন্ধুর পরে একমাত্র আপনার হাতেই দেশের ভবিষ্যত নিরাপদ, আপনি ছাত্রজীবনে অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির সাথে যুক্ত ছিলেন। আপনি মুক্তিযুদ্ধ দেখেছেন, আপনি জানেন, মুক্তিযুদ্ধে হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খৃষ্টান, উপজাতি থেকে শুরু করে ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সকলেই অংশগ্রহণ করেছিল, যাঁরা শহীদ হয়েছেন, তাঁদের সকলেই বাঙালী, তাঁদের একমাত্র পরিচয় বাংলা মায়ের সন্তান হিসেবে, যারা বেঁচে গেছেন, তাদের সকলেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, অনেকেই নিঃস্ব হয়েছে। যারা মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছিল, তাদের কথা বাদ। তারা বাংলা মায়ের সন্তান হলেও তারা ‘কুসন্তান’। সেই ‘কুসন্তানে’রাই এতকাল দেশটাকে, দেশের সংবিধানকে দুমড়ে মুচড়ে নস্যাৎ করে গায়ের জ্বালা মেটাতে চেয়েছিল।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, দুষ্টলোকে মন্দ কথা বলবে, স্বার্থে ঘা লাগে বলেই ওরা কুৎসা রটাতে চায়। যে যাই বলুক, দিবালোকের মত স্পষ্ট বিষয় হচ্ছে, আপনার শাসনামলেই ঐসকল ঘৃণ্য অপরাধীদেরকে চিহ্নিত করার কাজ শুরু হয়েছে, আপনার তত্বাবধানেই তাদের বিচারিক কাজ শুরু হয়েছে, যুদ্ধাপরাধী বিচার দাবীর মূল উদ্যোক্তা শহীদ জননী জাহানারা ইমামকে আপনিই সাহস ও শক্তি যুগিয়েছিলেন, শহীদ জননীর পাশে ছিলেন সবসময়। আপনাকে সালাম জানাই। মুক্তিযোদ্ধার সন্তান হিসেবে আপনার প্রতি পরম নির্ভরতা আমাদের। আপনার বিরুদ্ধে অনেকেই অনেক কথা বলেছে, বলছে এবং আরও বলবে। অনেকেই বলছে, আপনার পক্ষে সাম্প্রদায়িক রাজনীতি নিষিদ্ধ ঘোষণা করা সম্ভব নয়। সাহসী পিতার সাহসী কন্যা আপনি, এই সকল কুৎসাকে এক ফুৎকারে উড়িয়ে দিয়ে আপনার শাসনামলেই সাম্প্রদায়িক রাজনীতিকে কবর দিন। আমাদের মত দুঃখী সংখ্যালঘিষ্ঠ বাঙালীর কপাল থেকে ‘সংখ্যালঘু’র কলঙ্ক মুছে দিন। ভবিষ্যত প্রজন্ম আপনাকে তাদের মাথায় ও বুকে ঠাঁই দেবে। ইতিহাসের পাতায় জাতির পিতার মত আপনার নামও স্বর্ণাক্ষরে লেখা হয়ে থাকবে।