ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

মাননীয় বিরোধী দলীয় নেত্রী, আপনি আজ সংবাদ সম্মেলন ডেকেছেন। খুবই ভালো কথা। দেশে ছিলেন না, সিঙ্গাপুরে গিয়ে চিকিৎসা নিয়ে এসেছেন, নিশ্চয়ই এতদিনে আপনার শরীর স্বাস্থ্য সেরে উঠেছে। তা উঠুক, আপনি সুস্থ থাকুন, সুখে থাকুন, আপনার সুখ দেখে আমরাও সুখী হবো। তা আপনার ডাকা সংবাদ সম্মেলনের সংবাদ পেয়েই আপনার বরাবর অধীনার নিবেদন জানাতেই এই উদ্যোগ।

নেত্রী, আপনি সংবাদ সম্মেলন কেন ডেকেছেন? দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে আপনার দলের নীতি বা ভূমিকা কি, তা পরিষ্কার করার জন্যই তো সম্মেলন ডেকেছেন! বাহ! খুবই ভালো কথা। তা দেশের বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে নিশ্চয়ই জেনেছেন। কারণ উন্মুক্ত মিডিয়ার সুবাদে কোন সংবাদই তো আর গোপন থাকে না। তাছাড়া, আপনার নিজস্ব দলীয় পত্রিকা আছে, দলীয় টিভি আছে, সরকার দলীয় টিভি বা সংবাদপত্রও আছে। জানিনা, আপনি সংবাদপত্র পাঠ করেন কিনা, অনলাইনে যান কিনা, টিভিতে হিন্দী সিরিয়াল, বাংলা সিরিয়াল ছাড়া আর কোন প্রোগ্রাম দেখেন কিনা, নিদেনপক্ষে টিভিসংবাদের হেডলাইনগুলো শোনেন কিনা, যদি এর কোনটাই না করে থাকেন, তাহলে আপনাকে সবিনয় অনুরোধ করে বলতে চাই, সংবাদ সম্মেলন শুরু করার আগে আপনি নিজে শুধু আজকের টিভি সংবাদ শুনুন, অনলাইনে যাওয়ার সীমাবদ্ধতা থাকলে পাঁচ মিনিটের জন্য হলেও অনলাইনে যান। যদি ব্লগ না বুঝেন, (আজকাল সরকারী দল বা বিরোধী দলের কেউই নাকি ব্লগ বুঝে না), খুব সহজ করে বুঝিয়ে বলি, ব্লগ হচ্ছে অনলাইন পত্রিকার মত ব্যাপার, যেখানে যে কেউ স্বাধীনভাবে লিখতে পারে। আমিও লিখি, আপনিও লিখতে পারেন। শুধু নাম রেজিষ্ট্রি করে নিলেই হয়।

তবে এটা সত্যি, এইসব অনলাইনে বর্তমান প্রজন্মের ছেলেমেয়েদের অবাধ বিচরণ, আমাদের মত মধ্যবয়সের মানুষজনের কাছে কম্পিউটার মানেই অচেনা জগত, অনলাইন মানেই কল্পলোক, আর ব্লগ মানেই ‘নাস্তিক রাজ্য’! তবে ব্যক্তিগতভাবে আমি একটু সাহস করেই অনলাইনে ওয়ার্ল্ডে বিচরণ করে থাকি। প্রবাসে থাকি তো, তাই দেশের পত্র পত্রিকা আমার হাতে এসে পৌঁছায় না, অথচ দেশের সংবাদ জানার জন্য প্রাণটা আঁইঢাঁই করে। আমার নাম দেখে আপনার হয়তো আমার ‘দেশপ্রেম’ সম্পর্কে সন্দেহ হতেই পারে, কারণ আপনার দলের মূলনীতি অনুযায়ী, আমি একজন ‘সংখ্যালঘু’। সংখ্যালঘুর আবার দেশপ্রেম কি? সংখ্যালঘু মানেই তো গনিমতের মাল। এরা পাবলিক প্রোপার্টি। একটা সুযোগ পেলেই হলো, দাও এক ধাক্কায় ইন্ডিয়া পাঠিয়ে, এই তো বাংলাদেশে সংখ্যালঘু হিন্দুদের আসল চিত্র।

তবে আপনাকে দায়ী করি না, প্রাক্তন শাসক মরহুম জেনারেল জিয়াউর রহমান এবং লেঃ জেঃ হোসেইন মুহম্মদ এরশাদ আমাদেরকে সংখ্যালঘু বানিয়ে দিয়েছেন। আপনি তো শুধু আপনার স্বামীর মৃত্যুর পর উনার রেখে যাওয়া দলের হাল ধরেছেন, ঠিক যেমনটি ধরেছেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তাঁর পিতার মৃত্যুর পরের আওয়ামীলীগের হাল। যাই হোক, আপনার দলের নীতি যেটাই হোক, তাতে করে আমার জন্মভূমিকে তো আর অস্বীকার করতে পারি না। তাই দেশের টানেই পত্র পত্রিকা পড়তে চাই। সব পত্রিকা একসাথে পাওয়া যায় শুধুমাত্র অনলাইনে গিয়ে। সেজন্যই আমি অনলাইনে যেতে শিখেছি, অনেকটা প্রাণের তাগিদে, মনের তাগিদে। দেশে রয়েছে আমার স্বজন, বন্ধু, তাদের সাথে আমার নাড়ীর টান।

মাননীয় নেত্রী, ব্লগের কথা বলছিলাম, জানিনা, ব্লগ সম্পর্কে আপনার কী ধারণা আছে! যদি অন্যের মুখে ঝাল খান, তাহলে ব্লগ সম্পর্কে একটুও ভাল ধারণা থাকার কথা নয়। কারণ বর্তমানে অনেক বুড়ো বুদ্ধিজীবিরাই মনে করেন, ব্লগ হচ্ছে ‘নৈরাজ্যমূলক প্রতিষ্ঠান’, ‘নাস্তিকদের রাজ্য’ ‘নাপাক, অপবিত্র’। যদিও তাঁরা ব্লগ বুঝেন না, তারপরেও কী করে ব্লগকে এমন ‘ভিলেন’ হিসেবে দাঁড় করিয়েছেন কে জানে! ওদের কথায় বিশ্বাস করতে পারেন, তবে আমার কথাও শুনে দেখতে পারেন। এই যে আমি আপনার কাছে নিয়মমাফিক রীতি মেনে লিখছি, এই লেখাটি ব্লগে পোস্ট করবো। লেখাটি পড়ে কোথাও কোন নৈরাজ্য সৃষ্টির সম্ভাবনা আছে কিনা দেখবেন!

নৈরাজ্য সৃষ্টি করতে ব্লগ দরকার হয় না, পত্রিকায় লিখেই নৈরাজ্য সৃষ্টি করা যায়। এই যেমন ‘দৈনিক আমার দেশ’ পত্রিকার সম্পাদক সাহেব উনার পত্রিকায় বৈষম্যমূলক, সাম্প্রদায়িক, উস্কাণীমূলক লেখা লিখে সারা দেশে নৈরাজ্যের সৃষ্টি করেছেন। সে তার লেখায় ব্লগ এন্ড ব্লগার সম্পর্কে দেশের মানুষকে ভুল ধারণা দিয়েছে। সে খুব নোংরাভাবে ব্লগ এন্ড ব্লগারদের বিরুদ্ধে কুৎসা রটিয়েছে। সে বলেছে, ব্লগার মানেই নাস্তিক, আর নাস্তিক মানেই ‘চরম পাপী’। তার প্রচারিত এমন কুৎসিত প্রোপাগান্ডায় বিভ্রান্ত হয়ে অনেক মন্ত্রী, মিনিস্টার, লেখক, সাংবাদিক, অধ্যাপক, আমলা, আইনজীবি থেকে শুরু করে অনেক উচ্চশিক্ষিত ব্যক্তিই নিজেকে ‘আস্তিক’ প্রমানের জন্য জান লড়িয়ে দিচ্ছে। বক্তৃতা, বিবৃতি, টকশোতে এসে তারা অকপটে স্বীকার করছে, তাঁরা ‘ব্লগ’ বুঝেন না, ব্লগে কী লেখা থাকে তা জানেন না, তাঁরা অনলাইনে যান না, এগুলো বলার সময় তাঁদের একবারও মনে হয় না, বর্তমান আধুনিকায়নের যুগে, অনলাইনে না যাওয়াটা কোনভাবেই গৌরবের নয়। তাঁরা অনলাইন বা ব্লগে যান না বলেই বুঝেন না, জানেন না, ব্লগ একটি লেখালেখির মাধ্যম। এর বেশী কিছু না। উনারা ব্লগে যান না বলেই উক্ত সম্পাদক সাহেবের জন্য সহজ হয়েছে, ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের সরল অনুভূতিতে সুড়সুড়ি দিয়ে সবাইকে উত্তেজিত করে দেয়া। আপনার স্নেহভাজন সম্পাদকের ঊদ্দেশ্য সফল হয়েছে, তার ক্রমাগত উস্কাণীমূলক প্রচারণার কল্যানে আজ সারাদেশে আগুণ জ্বলছে। হিন্দুর ঘরবাড়ী পুড়ছে, মন্দিরে লুটিপাট হচ্ছে, মন্দিরের নিরীহ সেবায়েত মারা পড়ছে, দেবতার নিষ্প্রাণ মূর্তি ভেঙ্গে গুঁড়ো হচ্ছে, পুলিশ মারা যাচ্ছে, মুসল্লী মারা যাচ্ছে, বাহ! বেশ বেশ! এটাই চেয়েছিল আপনার স্নেহভাজন সম্পাদক।

কারো ধর্মীয় অনুভূতিতেই আঘাত করা সঠিক ধার্মিকের কাজ হতে পারেনা। অথচ আপনার দলীয় পত্রিকায় আপনার স্নেহভাজন সম্পাদকসহ, এককালের ‘বঙ্গবীর’ উপাধী পাওয়া দূর্ধর্ষ মুক্তিযোদ্ধা পর্যন্ত সাম্প্রদায়িক কথা ছড়িয়ে দিয়েছে, সরল ধর্মপ্রাণ মুসল্লীদের রক্তে আগুন জ্বালিয়েছে। তারা বলেছে, দেশ থেকে ইসলাম চলে যাবে, দেশে কোন ইসলামিক দল থাকবে না, শুধু হিন্দু, বৌদ্ধ, খৃষ্টান থাকবে। এমন কি আপনার একান্ত অনুগত গয়েশ্বর রায় পর্যন্ত দলীয় মিটিং এ বলেছে, দেশে নাকি ইসলাম বিপন্ন, জামাতে ইসলামী বিপন্ন। ছিঃ এমন চাটুকারেরা আপনাকে ঘিরে থাকে! ৯০% ভাগ মুসলমানের দেশে কী করে ১০% ‘সংখ্যালঘু’ রাজত্ব করবে, সেই হিসেবে কেউ গেল না, শুরু করে দিল তান্ডব! যে প্রাণগুলো ঝরে গেল, এর কোন দাম নেই? আপনি তো দেশে ছিলেন না, তাই হয়তো আপনি সব খবর পান নি।

আপনি দেশে থাকতেই দেখে গিয়েছিলেন, যুদ্ধাপরাধী বিচারের দাবীতে প্রজন্ম চত্বর গঠিত হয়েছিল। আপনি নিজেও প্রজন্ম চত্বরের সরাসরি বিরোধিতা করেন নি, বলেছেন, পর্যবেক্ষণ করবেন। তা পর্যবেক্ষণ তো করেছেন, আপনিই বলুন, পর্যবেক্ষণ করে কী পেলেন? প্রজন্ম চত্বর থেকে কী একবারের জন্যও বলা হয়েছে যে দেশ থেকে ইসলাম উঠিয়ে দেয়া হবে, থাকবে শুধু হিন্দু, বৌদ্ধ, আর খৃষ্টান? তারাতো শুধু ‘৭১ এর যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছে। আপনারা যারা দেশ শাসন করছেন গত ৪২ বছর ধরে, আপনাদেরইতো উচিৎ ছিল যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করা। আপনারা অযথাই মিথ্যে কথা প্রচার করেছেন, বঙ্গবন্ধু নাকি সবাইকে ক্ষমা করে দিয়ে গেছেন। ভুল ভুল, এমন কথা সর্বৈব মিথ্যা। আপনারা না জানলেও বর্তমান প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা অনলাইন ঘেঁটে মুক্তিযুদ্ধের সমস্ত ইতিহাস জেনেছে। এই জন্যই তারা তথাকথিত সাম্প্রদায়িক বলয় থেকে বের হতে পেরেছে। তাদের দাবী আজ সারা দেশে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে। আজ যুদ্ধাপরাধী দেইল্যা রাজাকারের ফাঁসীর রায় ঘোষনা করা হতেই সারা দেশব্যাপী তান্ডব শুরু হয়েছে!

আজ আমি অত্যন্ত দুঃখের সাথে জানাচ্ছি, আপনার দলীয় নেতাদের ক্রমাগত উস্কাণী পেয়ে জামায়াত শিবিরের নেতা কর্মীরা সারাদেশে তান্ডব চালিয়েছে। আমি অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হয়েছি যখন দেখেছি, আপনার অনুগতদের হাতে সারাদেশের নিরীহ সংখ্যালঘুদের বাড়ীঘর দাউ দাউ করে জ্বলছে। মাননীয় নেত্রী, আমরা তো সংখ্যায় খুবই কম, ১০% এরও কম। আমরা শত নির্যাতন সয়েও শুধুমাত্র মাটির টানে দেশে পড়ে আছি। আমাদের নিজস্ব পৈতৃক ভিটায়ও থাকতে পারি না, পৈতৃক ভিটা আপনার দলীয় ক্যাডারদের হাতে ২০০১ সালের পরেই ছিনতাই হয়ে গেছে। তারপরেও মাতৃভূমির টানে ‘সংখ্যালঘু’রা পরের বাড়ীতে ঘর ভাড়া নিয়ে থেকেও দেশে থাকার তৃপ্তিতে ঢেঁকুর তোলার চেষ্টা করে। সেই সুখটুকুও আপনার অনুগতদের সহ্য হলো না। আর সরকারের কথা কী-ইবা বলবো। উনারা ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় কিছু ধর্মান্ধ পিশাচের হাতে দেশের হিন্দু সম্প্রদায় লাঞ্ছিত হচ্ছে, উনারা কিছুই করতে পারছেন না। এ থেকেই বুঝে নিয়েছি, প্রধান মন্ত্রীর কাছে নালিশ জানিয়ে লাভ নেই, উনার নিজের জীবনই তো দেখি হুমকীর মুখে থাকে। সেই দিক থেকে আপনাকে খুবই নিরাপদ জীবনের অধিকারী মনে হয়। তাই আপনার কাছে আবেদন, আজকের সংবাদ সম্মেলনে যা কিছুই বলেন না কেন, সাথে এটুকু যোগ করবেন, হিন্দুদের উপর অত্যাচার যেন বন্ধ করে।

আর কত ভারত জুজুর ভয় দেখাবেন? ভারত থেকে প্রজন্ম চত্বরের দাবীকে সমর্থণ জানানো হতেই আপনার দলের মহাসচিবের গায়ে ফোস্কা পড়েছে। তা পড়তেই পারে, আমাদের দেশ সম্পর্কে অন্য দেশ কেন নাক গলাবে! এখানেই আমার একটি প্রশ্ন, ১৯৯২ সালে ভারতের অযোধ্যাতে ‘বাবরী মসজিদ’ নিয়ে যে হুলুস্থূল হয়েছিল, তার দায় কেন বাংলাদেশের হিন্দুদেরকে বহন করতে হয়েছিল। আমি ব্যক্তিগতভাবে সেই আক্রোশের শিকার হয়েছিলাম। ঐ সময় আমরা থাকতাম গ্রীন রোডের ভুতের গলির ‘যুগল নিবাস’ নামের একটি বিল্ডিং এর দোতালার ফ্ল্যাটে। এত বড় বিল্ডিং এ আমরাই ছিলাম একটিমাত্র হিন্দু পরিবার। আমাদের উপরেই যারা থাকতো, তারা ছিল বিএনপির সমর্থক। ওরা বিএনপির সমর্থক হলেও বাড়ীর কর্ত্রীর সাথে আমার ছিল খুব সখ্যতা। আমার স্বামী একজন অত্যন্ত শ্রদ্ধাভাজন অধ্যাপক ছিলেন। ছোট ছোট দুই মেয়েকে নিয়ে আমরা ঐ দোতলার বাসায় ভাড়া থাকতাম। যেদিন সুদূর অযোদ্ধায় বাবরী মসজিদ ইস্যুতে হিন্দু-মুসলমান’ দাঙ্গা হয়েছিল, সেদিন আমি ছোট দুই মেয়েকে বুকে জড়িয়ে ঘরের ভেতর চুপ করে বসেছিলাম, ঘরের বাতি অফ করে দিয়ে। ঠিক রাত নয়টার দিকে, তিনতলা থেকে নেমে আসে ঐ বাড়ীর ছোট ছেলে, সাথে আরও তিনজন বন্ধুকে নিয়ে। আমাদের বন্ধ দরজার উপর দড়াম দড়াম করে লাথি মারে আর বলতে থাকে,
“অই মালাউনের বাচ্চা, দরজা খোল। লাইট অফ কইরা বইসা আছস ক্যান? তরা ইন্ডিয়া যা”!
আমার মেয়ে দুটো থরথর করে কাঁপছিল, স্বামী আঙুল ঠোঁটে চেপে চুপ থাকতে ইশারা করেছেন। আমি পা টিপে টিপে হেঁটে দরজার কাছে গিয়ে ফুটো দিয়ে ওদের হিংস্র চেহারা দেখে ভয়ে নীল হয়ে গেছিলাম (বাইরের লাইট জ্বালানো ছিল)।মাননীয় নেত্রী, সেদিনের সেই ভয় আমাকে দেশ ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করেছে। প্রাণের ভয়ে, ইজ্জতের ভয়ে আমরা পালিয়ে গেছিলাম, আমাদের মেধা ছিল, তাই প্রবাসে মেধাকে কাজে লাগাচ্ছি।

নেত্রী, কথায় বলে, চুন খেয়ে মুখ পুড়লে দৈ দেখলে ভয় করে”। আমার গল্প শুনে হয়তো বলবেন, এই একটা পুচকে ছেলের হুমকীতে কেন দেশ ছাড়লাম! নেত্রী, ‘৬৪ সালে যে রায়ট হয়েছিল, তদানিন্তন পূর্ব পাকিস্তানে, সেই রায়টে আমাদের বাড়ীর আটটি তাজা প্রাণকে জবাই করে হত্যা করা হয়েছিল। সেই থেকে ধর্মের নামে যে কোন যুদ্ধকে ভয় পাই, ঘৃণা করি। আমি বিশ্বাস করি, যার যার ধর্ম তার তার কাছে। এই সুযোগেই বলে রাখি, ‘নাস্তিক’দের নিয়ে আমার মনে কোন দুশ্চিন্তা নেই। নাস্তিকতাও আরেক টাইপের ধর্ম। নাস্তিক বলতে আমি বুঝি, আস্তিকের বিপরীত শব্দ, আমি বিশ্বাস করি, একজন আস্তিকের মত একজন নাস্তিকেরও নিজ দেশের মাটিতে সসম্মানে বেঁচে থাকার পূর্ণ অধিকার আছে। বর্তমানে টিভিতে বুড়ো ধাড়িদের নিজেকে ধার্মিক প্রমাণ করার প্রতিযোগীতা দেখে লজ্জা পাই, মনে হয় জনগণের ট্যাক্সে চালিত টিভিতে পুরো ছ্যাবলামী হচ্ছে।

এখন আপনিই বলুন, আপনার অনুগতরা যদি কথায় কথায় আমাদের দরজায় লাথি মারে, মন্দির ভাঙ্গে, বিগ্রহ ভাঙ্গে, হিন্দুদের বাড়ীঘর জ্বালিয়ে দেয়, তাহলে আমরা কোথায় যাব? আমাদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে বলেই আজ প্রজন্ম চত্বরের সৃষ্টি হয়েছে। প্রাণের ভয়ে, ইজ্জতের ভয়ে আমরা পালিয়ে গেছিলাম, কিন্তু আমাদের ছেলেমেয়েরা পালাতে রাজী নয়। আমাদের ছেলেমেয়েরা ভারতকে সালিশ মানতে রাজী নয়। তারা শুধু একটি সুন্দর বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখে। সেই ছেলেমেয়েরা বাঙালী, ওদের গায়ে কোন ধর্মীয় স্টিকার লাগানো নেই। এই মুহূর্তে হয়তো সরলপ্রাণ মুসলমানদের অনুভূতিতে সুড়সুড়ি দিয়ে অশান্তি করা যাবে, তবে আমাদের ছেলেমেয়েরা আমাদের মত পালিয়ে বাঁচতে চায় না। তারা নিজেদের অধিকার আদায়ে একসাথে লড়ছে, এদেরকে বলে ‘তরুণ প্রজন্ম’, এদেরকে বলে ‘দ্বিতীয়বারের মুক্তিযোদ্ধা’।

এইজন্যই আপনার কাছে অনুরোধ করেছি, আপনি কথা কম বলেন, এইজন্য আপনাকে অনেকেই স্বল্পভাষীনি বলে থাকে। নেত্রী, আপনি স্বল্প কথায় আজকের সংবাদ সম্মেলনে দলের সকলকে হুঁশিয়ার করে দেন, আর যেন সাম্প্রদায়িক কথাবার্তা না বলে। হিন্দুরাও বাংলাদেশের নাগরিক, আপনাকে আবার ক্ষমতায় আসতে হলে ‘গয়েশ্বর রায়’ নামক কিছু হিন্দুর সহযোগীতা লাগবে। আপনার দলে কতবড় মুক্তিযোদ্ধা আছে জানিনা, দেশ বিখ্যাত মুক্তিযোদ্ধা কাদের সিদ্দিকীকেও তরুণ প্রজন্ম ‘নব্য রাজাকার’ আখ্যা দিতে ভয় পায় নি। কাদের সিদ্দিকী বীর মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন, উনি বুঝতে পারছেন, এই জাগ্রত তরুণরা উনার চেয়ে কম সাহসী নয়। আর এটা জানেন বলেই বাঘের কন্ঠ থেকে মিঁউ মিঁউ শোনা যাচ্ছে।

নাফিসের কথা মনে পড়ে মাননীয় নেত্রী? আপনার এখনই রাশ টানা জরুরী হয়ে পড়ছে। নাহলে এই সকল অর্বাচীনদের কল্যানে আরও ‘নাফিস’ তৈরী হবে, দেশ ছাড়িয়ে জিহাদ করতে মার্কিন মুল্লুকে আসবে। এসেই এফ বি আই এর পাতা ফাঁদে পা দেবে। জিহাদের স্বপ্ন ধূলায় লুটাবে, বাবা-মায়ের কোলের নিরাপদ আশ্রয় ছেড়ে আমেরিকার জেলে বসে বার্গার খেতে হবে পরবর্তী ত্রিশ বছর! ভারত জ্জুজুর ভয় দেখিয়েও কাজ হবে না, আমেরিকা নামের অতি বড় জুজু আড়ালে থেকে হাসবে।