ক্যাটেগরিঃ ব্লগ

গত পরশু রাত ১টা পর্যন্ত জেগে বসেছিলাম, নিজের কানে ‘আল্লামা হুজুরের’ বিচারের রায় শুনবো বলে। জ্বরের তাপে আর বসে থাকতে পারলাম না, বিছানা নিতেই হলো। তবে আমার একটু কু-সংস্কার আছে, ‘কাদের মোল্লা’র রায় শোনার জন্য জেগেছিলাম বলেই তার ‘ফাঁসীর রায়’ হয় নি, এটাও একটা কারণ ছিল ‘আল্লামার’ রায় নিজ কানে না শোনার পেছনে।

যাই হোক, রায় ঘোষিত হওয়ার সাথে সাথেই আমার বন্ধু ডঃ মিল্টন বিশ্বাস দেশ থেকে আমাকে এসএমএস পাঠিয়ে জানালো, “হুজুরের ফাঁসী হইছে, এইবার নিশ্চিন্তে ঘুমান”। আমার ২২ বছর বয়সী কন্যাটি রাত জেগে বসেছিল, হুজুরের বিচারের রায় শোনার জন্য। তার ক্রমাগত পাঠানো টেক্সট মেসেজের টুং টুং আওয়াজে আমার ঘুমানোর কোন সুযোগই ছিল না। এক সময় বাধ্য হয়ে ফিরতি মেসেজ পাঠিয়েছি, ” মা রে, এখনই এত নাচানাচি করার কিছু নাই, এখন আসল দুঃসময় আসতেছে, তোরা তো আর এইসব সাপের বাচ্চাদের চিনস না, ছোবল দিবে এরা, অপেক্ষা কর, নাচানাচি না করে সতর্ক থাক, আর আমার মাথা ব্যথা করছে, আমাকে একটু ঘুমাতে দে”।

গতকাল পর্যন্ত মনে করেছি জ্বর আসার আর সময় পেলো না, সবাই নিজের কানে এমন একটি বিচারের রায় শুনলো, আর আমিই কিনা লেপ মুড়ি দিয়ে শুয়ে থাকলাম।

জ্বর এলেতো তিনদিন যন্ত্রণা থাকবেই, গতরাতে ছিল জ্বরের ২য় দিন। এখনতো অনলাইনে থেকেও দেশের উত্তাপ টের পাওয়া যায়। অনলাইনে থেকেও যুদ্ধ করা যায়। আমি সারাদিনই যুদ্ধ করেছি, আমাদের বিরোধীনেত্রী সিঙ্গাপুর থেকে ফিরে সংবাদ সম্মেলণ করবেন শুনেই উনার বরাবর আবেদন পাঠিয়েছি যেনো ‘সাম্প্রদায়িক রাজনীতি’র পথ থেকে সরে আসেন। যেনো নতুন করে ভাবেন, দেশটি আমাদের সকলের, আর কোন হানাহানি নয়, বিভেদ নয়! আবেদন পাঠিয়েছি সংবাদ সম্মেলন শুরু হওয়ার প্রায় ২৪ ঘন্টা আগে। আমার ফেসবুক ফ্রেন্ডলিস্টে, নানা ব্লগে উনার মতানুসারী অনেক ভক্ত আছেন, তাদের মাধ্যমেই আমার আবেদন পৌঁছে যাবে, সেই ভরসায় মাথায় প্রচন্ড ব্যথা নিয়ে রাত ৩টায় বিছানা নিয়েছি। একটু আফসোস ছিল ভেবে যে আর মাত্র দুইটা ঘন্টা জেগে থাকতে পারলেই বেগম জিয়ার সংবাদ সম্মেলন নিজ চোখে দেখতে পারবো, উনার বক্তব্য নিজ কানে শুনতে পাব।

কিন্তু আবারও সেই কু-সংস্কার নামের পাখীটা ‘ তুই শুনিস না, তুই শুনিস না’ বলে খোঁচাতে লাগলো। ভাবলাম, থাক বাবা, আমি না হয় ঘুমিয়েই থাকি, আমি জেগে থাকলে ‘কাদের মোল্লার’ কেইস হয়ে যেতে পারে, আর জেগে না থাকলে ‘আল্লামা হুজুরের’ কেইস হতে পারে। আমি তো চাই, আমাদের ‘সুন্দরী’ নেত্রী প্রজন্ম চত্বরের তরুণদের ডাক শুনবেন। আমেরিকার জল হাওয়ায় বেড়ে উঠা আমার মেয়ে ‘মিশা’র মধ্যে যদি জন্মভূমির জন্য এত প্রেম, মমতা থাকতে পারে, তাহলে ‘মুক্তিযোদ্ধার স্ত্রী’ হিসেবে বেগম সাহেবারও নিশ্চয়ই বোধোদয় হবে। উনি জামাতের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করবেন, উনি জেগে উঠা তরুণ প্রজন্মকে সাপোর্ট করবেন। এমনটা ভেবেই ঘুমিয়ে পড়েছি। ঘুম ভাঙ্গতে দেরী হয়েছে, মোবাইল ফোনের স্ক্রীনে নজর বুলালাম, কোন মেসেজ আসেনি। বুকটা ‘ছ্যাঁত’ করে উঠেছে। ব্যাপার কী!! নেত্রী কি তাহলে সব ‘গুবলেট’ করে দিয়েছেন! খুশীর সংবাদ থাকলে আমার মেয়ে আমাকে মেসেজ পাঠাতো, আমার বন্ধু মেসেজ পাঠাতো।

দ্বিতীয় দিনের মত ‘সীক কল’ দিলাম, চলে গেলাম অনলাইনে। ব্লগে ঢুকে দেখি, “হায় হায়! নেত্রী তো দেখি সব গুবলেট করে দিয়েছে! মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে বর্তমান বিরোধী দলীয় নেত্রী, জেড ফোর্সের অধিনায়ক, স্বাধীনতার ঘোষনা পাঠক, মুক্তিযোদ্ধা মেজর জিয়াউর রহমানের স্ত্রী, পাকিস্তানী সৈন্যদের হেফাজতে নিরাপদে ছিলেন। আমি একজন নারী, তাই আমি নারীর মান-সম্মান, ইজ্জত, সম্ভ্রমের ব্যাপারে খুব সেনসিটিভ। বেগম জিয়ার রাজনৈতিক আদর্শের সাথে মতের অ-মিল থাকতে পারে, কিন্তু উনার পাকিস্তানী মিলিটারীদের হেফাজতে আরাম আয়েসে জীবন-যাপন নিয়ে অনেকেই যে বিদ্রূপাত্মক উক্তি করে থাকে, আমি তার সাথে কখনও ভুলেও গলা মিলাইনি। যতই প্রবাদ থাকুক, ” যা রটে, তার কিছুটা তো বটে’, তবুও কারো সাথে গলা মিলাইনি।

আমি নারী বলেই অন্য যে কোন নারীর মুখ থেকে কটু, দূর্গন্ধময় উক্তি শুনলে নিজে লজ্জা পাই। সেদিন বিএনপি নেত্রী ‘নীলুফার মনি’ যখন টকশো’তে উক্তি করেছে, উনি নাকি নিজের বুকে হাত দিয়ে বলতে পারেন যে মুক্তিযুদ্ধে ত্রিশ লক্ষ বাঙালী শহীদ হয়নি, এটা শুনেই আমি বাথরুমে ঢুকে ‘বমি’ করেছি। ‘মনি’ হয়তো জানেনা, তার এই অশোভন, নিথ্যা উক্তির খেসারত দিতে হচ্ছে আমাদের, অর্থাৎ আমাদের মত নারীদেরকে। কারণ, মনি’র উক্তিতে ক্ষুব্ধ তরুণ প্রজন্ম তার বিরুদ্ধে এমন তীব্র ভাষায় সোচ্চার হয়েছে যে নারী হিসেবে আমি নিজেই লজ্জিত বোধ করছি।

এবার নেত্রীর পালা! ভাগ্যিস ভালো, জ্বরের ধাক্কায় কাত হয়ে গেছিলাম। তাই ‘গোলাপ সুন্দরীর’ নির্লজ্জ মিথ্যায় ভরা, কৌতুকপূর্ণ, দূর্গন্ধময় বক্তব্য শোনার সুযোগ হয়নি। এক ‘মনি’র একটা বক্তব্যেই ‘বমি’ করে ভাসিয়েছি, গোলাপী আপার গোলাপ সুন্দর মুখনিঃসৃত বিষাক্ত বক্তব্য শুনলে হয়তো হার্ট অ্যাটাক হতো! কারণ অনলাইনে গিয়ে বিভিন্ন জনের পোস্ট করা ভিডিও (বেগম সাহেবের সংবাদ সম্মেলন) দেখেই আমার হার্ট বীট ‘অনিয়মিত’ হয়ে গেছে। তাই ভিডিও এক সিটিং এ না দেখে ভেঙ্গে ভেঙ্গে দেখেছি। অযৌক্তিক বক্তব্য শুনে ‘লাইফ রিস্ক’ তো নিতে পারি না!

নেত্রী, আজকের সংবাদ সম্মেলনে আপনি এটা কী করলেন! কী বললেন? সম্মেলন কক্ষে আসার আগে সংবাদপত্রের পাতায় চোখ বুলিয়ে আসেন নি? আপনি কী প্রজন্ম চত্বরের ‘সুন্দর দেশ’ গড়ার প্রত্যয়ী শপথের কথা পড়েন নি? আপনি কী নতুন তারুণ্যের গর্জণ শুনতে পান নি? আপনি কী অসহায় সংখ্যালঘুদের হাহাকার শুনতে পান নি?

তাহলে দূর্জনের কথাই কী ঠিক? আপনি ‘সিঙ্গাপুর’ গিয়েছিলেন অন্যরকম ঊদ্দেশ্য নিয়ে? আপনি তাহলে মুক্তিযুদ্ধের সময় ‘মহানন্দেই’ ছিলেন? আপনার দোসর জামাতের ‘হুজুর’ সাহেব যখন ‘৭১ সালে হিন্দু নারীদের মহানন্দে ধর্ষণ করছিল (যুদ্ধাপরাধ), আপনি তখন পাকিস্তানী ক্যাম্পে নিরাপদে, খোশ মেজাজে ছিলেন, নিন্দুকেরা বলে, পাকিস্তানীদের প্রতি সেদিনের সেই ঋণ স্বীকারের দায়িত্ব নিয়েই ‘মুক্তিযোদ্ধার স্ত্রী’ হয়েও আজ আপনি নগ্নভাবে জামাতের পক্ষ নিলেন। আপনি নিজ দলের কর্মীদেরকে হুমকীর মুখে ঠেলে দিলেন। আপনি একমুখে সরকারকে ‘গণহত্যা’র জন্য দায়ী করেছেন, আরেকমুখে নিজ কর্মীবাহিণীকে আহবান জানিয়েছেন মাঠে নেমে ‘কেয়ামত’ সৃষ্টি করার জন্য। আপনি তো নিজের কর্মীদের চরিত্র ভালোই জানেন, এদেরকে যদি বলা হয় ‘আ’, এরা তিন অক্ষর এগিয়ে বুঝে ‘আমড়া’। সেই ‘আমড়াবাহিনী’ যদি গোলাপমুখ থেকে এমন ধ্বংসের আহবান পেয়ে ‘হা রে রে রে’ করে মাঠে নামে, কেয়ামত হতে আর বাকী থাকবে না। যা কিছুই করছেন, আবার দেশের ক্ষমতায় যাওয়ার জন্যই তো করছেন! আপনার উস্কাণীতে দেশে যদি কেয়ামত নেমে আসে, দেশ যদি জ্বলে পুড়ে ছাড়খাড়ই হয়ে যায়, জনশূণ্য পোড়াদেশের সিংহাসনে বসে আপনি আর কাকেই বা ধমকাবেন, কার মাথায়ই বা ডান্ডা মারবেন! দেশকে ধ্বংসের দিকে টেনে নিতে চাইছেন, ক্ষমতার লোভ কী এতটা হিংস্র করে তুলতে পারে মানুষকে! কী হবে এই সিংহাসনে বসে!কাজটা ঠিক হলো না মাননীয় নেত্রী। আপনার সংবাদ সম্মেলন শেষ হওয়ার সাথে সাথেই অনলাইনে নিন্দার ঢেউ উঠেছে। একেকজন একেকরকম মন্তব্য করছে, আপনাকে নানা অভিধায় ভুষিত করছে। সবচেয়ে মজার এবং কিছুটা যৌক্তিক অভিধা হচ্ছে ” গোলাপী এখন ড্রেনে”! ম্যাডাম, আপনি সত্যিই ড্রেনে পা দিয়েছেন!

ক্যাটেগরি:
তাজা খবর