ক্যাটেগরিঃ মতামত-বিশ্লেষণ

 

মনে আছে হুমায়ুন আহমেদের নাটক ‘বহুব্রীহি’ তে একটা সীন ছিল এরকম; ‘ বাড়ীর কাজের বুয়া রহিমার মা তার বেগম সাহেবার কাছে একটা চশমা আবদার করেছে। বেগম সাহেবা রহিমার মায়ের চশমার কি প্রয়োজন জানতে চাওয়ায় রহিমার মা বলেছিল,’ গরীব বইল্যা কি আমাগোর শখ আহ্লাদ থাকতে নাই?” সত্যিইতো শখ সবারই থাকে, ধনীর যেমন থাকে গরীবেরও থাকে। যার যেমন ক্ষমতা তার শখের উচ্চতাও তেমন। আমি যখন ছোট ছিলাম আমার শখগুলিও ছিল ছোট ছোট। যেমন আ্মার হাতে যদি কোনমতে চার আনা (২৫ পয়সা) পয়সা আসত আমি একটা ‘মিষ্টি বিস্কুট’ কিনে খেতাম। আর যখন দুই একবার একটাকা করে রোজগার করতে পারতাম, সাথে সাথে ‘মেছের আলীর মালাই আইসক্রীম’ খেতাম। বড় হতে হতে শখগুলোও পাল্টে গেছে। তারপরেও যেটুকু শখ এখনও রয়ে গেছে তা হলো, ক্যামেরা দেখলেই পোজ দিতে ইচ্ছে করে, আর শুধু বেড়াতে ইচ্ছে করে। যে শখ এখনও পূরণ হয়নি, তা হলো গান শেখার খুব শখ ছিল, সেটা পূরণ হয়নি বলে রহিমার মায়ের মত আমিও কেউ শুনুক বা নাই শুনুক হেড়ে গলায় গান করে যাই।

আমার মেয়েরা যখন ছোট তখন বাংলাদেশে ‘বাবল গাম’ পাওয়া যেত স্টীকারসহ। বাচ্চারা ‘বাবল গাম’ দিয়ে বেলুন ফুলাত আর স্টীকারটা হাতে বা গালে লাগিয়ে খুব আনন্দের সাথে ঘুড়ে বেড়াত। আমার মেয়েরাও এই আনন্দ থেকে বাদ পড়েনি। পরবর্তীতে দেশের বাইরে এসে তাদের শখের রকমও পালটে গেছে। এইতো গত বছর আমার মেজো মেয়ের শখ হয়েছে নাকে ছোট্ট পাথর পড়ার। তাই নাক ফুটো করতে হবে। আমি তবু হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছি নাক ফুটো করার শখের কথা শুনে। এখানে আমার মেয়ের বয়সী মেয়েরা ভুরু ফুটা করে রিং পড়ে, গালে ফুটা, জিহবার মধ্যে ফুটা করে রিং পড়ে, নাভীর মধ্যে ফুটা করে রিং পড়াতো এদের কাছে শখের দাম লাখ টাকার মতো। আরেকটা শখ হলো দাঁতে ব্রেইস পড়া। নানা রঙ এর ব্রেইস, দাঁতের জন্য যতটুকু না প্রয়োজন, ফ্যাশানের জন্য অনেক বেশী প্রয়োজন। খরচ কত হয়? মিনিমাম ৪০০০ ডলার! ‘ হাসিতে মুক্তা ঝরে’ এমন কথা শুনেই বড় হয়েছি। কিনতু এখানে এসে দেখছি এখানের কালো ভাই-বোনদের হাসি থেকে মুক্তা ঝরেনা, সোনা ঝরে পড়ে! টিভিতে ‘মিঃ টি’ নামের একটা ইংলিশ ধারাবাহিক দেখতাম, তখন দেখতাম মিঃ টি’র গলাতে সোনার চেইন, গোছা গোছা, ঠিক এখানেও দেখি কালো ভাইদের অধিকাংশের গলায় গোছা গোছা সোনার চেইন, দেখলেই সুরকার ও গায়ক বাপী লাহিড়ীর কথা মনে হয়। বাপী লাহিড়ী কোন এক অনুষ্ঠানে বলেছিলেন উনার এই শখের কথা! এদেশে শখ এর আবার রকম আছে। আমার দেখার চোখ দিয়ে আমি যা দেখেছি তা হলো, এখানে কালো জনগোষ্ঠীর পুরুষের কাছে বেশী গুরুত্বপূর্ণ তাদের ব্রান্ড নেইম এর জুতা, আর সোনার গয়না, মেয়েদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হলো হাতের নখ আর মাথার চুলের সাজ। কি কারণে জানিনা, কালো ছেলে মেয়ে সবারই বড় হওয়ার সাথে সাথে মাথার চুলগুলো ঝরে একেবারেই মাথা ফাঁকা হয়ে যায়। তাই মেয়েরা প্রতি সপ্তাহে ৩০/৪০ ডলার খরচ করে পরচুলা লাগায় আর ৩০/৪০ ডলার খরচ করে হাতের আঙ্গুলের আসল নখের উপর নকল রঙ বেরং এর নখ আঠা দিয়ে লাগিয়ে নেয়। সাদা জনগোষ্ঠীর ছেলেদের মাঝে ট্যাটু করাটা একটা বিরাট ফ্যাশান আর মেয়েদের দেহের জায়গায় জায়গায় ফুটা করে রিং পরে থাকাটা ফ্যাশান। বেশী অস্বস্তি লাগে কথা বলার সময় দেখা যায় ঠোঁট বা জিহবার মধ্যে নানা গয়নাগাটি ঝলকাচ্ছে।

আমার ছোট মেয়ের গজদাঁত আছে। গজদাঁত আমার খুব পছন্দ। কিনতু আমার পছন্দ দিয়েতো আর আমার মেয়ের চলবেনা। মাঝে মাঝে বায়না করে দাঁতে ব্রেইস পরার জন্য। ছোট মানুষ, ওতো আর বুঝবেনা গালে টোল, গজ দাঁতের হাসির আলাদা সৌন্দর্য্যকথা। এদেশে ‘পিয়ার প্রেসার’ বলে একটা চালুকথা আছে। মানে ছেলেমেয়েরা তার সমবয়সীদের কাছে এক ধরনের চাপে থাকে আরকি! সবাই যখন একটা ফ্যাশান করছে তখন নিজেকে আলাদা রাখতে কারই বা ভালো লাগে! কিনতু এইসব শখ মেটানোর জন্য আমার আদৌ ক্ষমতা আছে কিনা তার খবর কেউ রাখেনা। এদেশে অনেককেই দেখি পড়াশোনার ব্যাপারে তেমন আগ্রহ নেই, বই এর দোকানগুলোতে ভীড় থাকেনা, কিনতু জুতার দোকান বা বিউটি পার্লার গুলোতে ভীড় লেগেই আছে।

একদিন আমার বড় মেয়ের একটি ছবিতে দেখলাম হাতে তিনটি উড়ন্ত পাখীর ট্যাটু করা। আমার মেয়েরা আমার পছন্দ অপছন্দগুলো খুব ভালোই জানে। আমি ট্যাটু একেবারেই পছন্দ করিনা জেনেও আমার মেয়ে কিভাবে হাতে ট্যাটু করলো তাই ভেবে অবাক হয়েছি প্রথমে। প্রথমে ভাবলাম যে থাক ডাক্তারী পড়ুয়া মেয়ের উপর মাতব্বরী না করাই ভাল। কিনতু পরক্ষণেই মন পরিবর্তন করে ফোন করে জিজ্ঞেস করেই ফেললাম। মেয়ে জানালো দুঃশ্চিন্তা করার কিছু নেই, ছোটবেলার মত স্টীকার লাগিয়ে ছবি তুলেছে, এর বেশী কিছুনা।

যারা খুব বেশী কিছু জানেনা ট্যাটু সম্পর্কে, শুধুমাত্র তাদের জন্যই বলছি, ট্যাটু হচ্ছে উল্কি করা। ব্যাপারটা খুব পেইনফুল। ইঞ্জেকশান দেয়ার সিরিঞ্জে করে নানা বর্ণের ডাই (অক্ষতিকারক) দেহের পাতলা চামড়ার নীচে খুব আস্তে আস্তে ঢুকিয়ে নানা ধরনের ডিজাইন আঁকা হয় এবং এটা মোটামুটি পার্মানেন্টভাবেই থেকে যায়। আর তাই এটা খুবই ব্যয়বহুল ব্যাপার। আমি চাকরী করি ফোন সার্ভিস ডিপার্টমেন্টে। প্রতিদিন কত বর্ণের, কত পেশার লোকজন আসে এখানে, কারণ একবেলা না খেলেও চলবে সবার, কিনতু ফোন ছাড়া এক মুহূর্ত চলবেনা। ফলে আমার সাথে দেখা হয় ধনী দরীদ্র, কালো সাদা, আমেরিকান, এশিয়ান, মেক্সিকান, তরুণ তরুণী, বুড়া বুড়ী সব লেভেলের মানুষের। আমি কথা বলতে ভালোবাসি বলে আমার এই চাকরীটা আমি খুব এনজয় করি। আমি কাজ করতে করতেই কথা বলি আর কতজনের কত গল্প যে শুনি, ভাবি যদি লিখতে পারতাম, কত ভালো ভালো উপন্যাসের প্লট পেয়ে যেতাম।

একদিন দাদীমাকে নিয়ে এক নাতি এসেছে। নাতির বয়স ২৫ বছর হবে। তার দুই হাতে ট্যাটু করা দেখে তাকে জিজ্ঞেস করলাম, “আচছা তুমি যে দুই হাতে ট্যাটু করেছ, এগুলোতো পার্মানেন্ট, কখনও যদি এই ডিজাইনগুলো আর ভাল না লাগে তখন কি করবে? উত্তরে সে বললো, “এমনটা হতেই পারে। তখন আবার সব ডিলিট করে দিয়ে নতুন করে করাব। এত খরচ, তাছাড়া আবার ব্যথা লাগার প্রশ্নে জানালো, “ শখের কাছে ব্যথা কিছুনা।“ জানতে চাইলাম খরচের পরিমান, সে তার চোখের কোনায় ছোট্ট একটা ট্যাটু দেখিয়ে বললো খরচ হয়েছে ৬০০ ডলার। তার দাদীমা সায় দিয়েছেন নাতির কথায়। তারপর নাতি বললো, “ আমার এই দুই হাতেই শুধু ট্যাটু না, ট্যাটু আমার সারা দেহে করা আছে। খরচ লেগেছে ১৫০, ০০০ ডলার” আমি ভেবেছি ভুল শুনেছি। আবার জিজ্ঞেস করাতে এবার দাদীমা বললেন যে উনার নাতি ঠিক বলেছে। ১৫০,০০০ ডলার শুনে সাথে সাথে ৭০ দিয়ে গুন করে বের করে ফেললাম শখের দাম পড়েছে ১ কোটি ৫ লক্ষ টাকা! তবে ছেলেটি খুব ভদ্র বলে আমাকেও ট্যাটু করার অফার দিলো। তার ফোন নাম্বার আমাদের রেকর্ডে আছে বলে সে প্রয়োজনে সেই নাম্বারে ফোন করতে বললো। তাকে বললাম যে তুমি ১৫০,০০০ হাজার ডলার দিয়ে সারা দেহ ট্যাটু করেছ, আর ১৫০ ডলারে আমার সপ্তাহের বাজার খরচ হয়ে যায়। সে আরও বিনয়ী হয়ে আমাকে জানালো কোন চিন্তা না করতে, আমি যখনই মন ঠিক করতে পারবো, সে প্রয়োজনে ফ্রী করে দিবে। দাদীমাও খুব খুশী হয়ে নাতির সাথে সাথে তাল মিলিয়ে গেলেন।

শুধু আমেরিকানদের শখ নিয়ে বললাম, আমাদের দেশের মানুষের শখই বা কম কোথায়! অনেকদিন দেশের বাইরে বলে পত্রিকা পড়ে যতটুকু জানি তাতেই মাঝে মাঝে আক্কেল গুড়ুম হয়ে যায়। শাড়ীর দাম আড়াই লাখ টাকা!!! একেকটা হিন্দী সিনেমা মুক্তি পায় আর আমাদের মার্কেট বাবলি-বান্টি ড্রেস, আনারকলি ড্রেস, পার্বতী-চন্দ্রমুখী শাড়ীতে ছয়লাব হয়ে যায়। মানে কি আর বলবো, সত্যি কথা বলতে কি একেকবার খারাপও লাগেনা যখন ভাবি, শখ থাকলেই বেঁচে থেকে আনন্দ পাওয়া যায়, শখ না থাকা মানেতো স্বপ্নহীন জীবন। পরক্ষনেই ভাবি, আমাদের দেশের মত দেশে থেকে একেকটা ড্রেস বা শাড়ির পেছনে লাখ লাখ টাকা খরচ করাটা অর্থহীন। আমাদের দেশে কোরবানী ঈদের সময় গরুর দাম উঠে কয়েক লাখ টাকায়। মানুষ কিনেও, আবার সেটা ফলাও করে পত্রিকাতে ছাপা হয়। যাদের অনেক আছে তারা সেটা ফলাও করে প্রচার করে কি সুখ পায় কে জানে, এটা কি ধরনের আত্মপ্রচার তাও বুঝিনা। দেশে থেকেই আমেরিকানদের রোগে ধরে বসেছে এদেরকে। শুধু শখের বশে কয়েক লাখ টাকা খরচ করে একটি গরু বা একটি শাড়ী কেনা যেই কথা, আমেরিকায় থেকে ১ লাখ ৫০ হাজার ডলার খরচ করে সারা দেহে ট্যাটু করাটাও একই ব্যাপার মনে হয় আমার কাছে!