ক্যাটেগরিঃ প্রবাস কথন

 

আমেরিকাতে এখন চলছে ভুত মরশুম। মানুষেরা ঈদ, পূজা, ক্রিসমাস, দিওয়ালী উদযাপন করবে আর ভুতেরা দূর থেকে চেয়ে চেয়ে তা দেখবে, তাতো হতে পারেনা! গনতন্ত্রের দেশে সবার জন্য গনতন্ত্র। তাই ভুতেদের জন্যও বছরের একটা দিন নির্দিষ্ট আছে, ৩১শে অক্টোবার, একটু শখ আহ্লাদ করার জন্য! উৎসবের আবার একটা নির্দিষ্ট নামও আছে, ‘হ্যালুইন’। ৩১ তারিখ সন্ধ্যায় আমেরিকাসহ ইউরোপের অনেক দেশেই সবার বাড়িতেই বিশেষ অতিথিরা এসে দরজায় কড়া নাড়বে। দরজা খুলেই গৃহস্বামী দেখতে পাবে, একদল ভুত-প্রেত এসে দাঁড়িয়েছে, তাদের দাবী হয় তাদের খুশী করে দাও, নয়তো তারা ভয় দেখাবে (ট্রিক অর ট্রিট)।

আমি প্রথম হ্যালুইন সম্পর্কে একটুখানি জেনেছিলাম দেশে থাকতে। দেশে থাকতে আমি এক ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে শিক্ষকতা করেছিলাম। একদিন প্রিন্সিপ্যাল সবাইকে ডেকে বললেন যে বচ্চাদের জন্য হ্যালুইন আয়োজন করতে। সত্যি কথা বলতে কি, আমিতো তখনও আমেরিকা যাইনি, এত কিছু জানবো কি করে! যারা কম-বেশী জানতো তাদের শুধু অনুসরন করে গেছি। দেখেছিলাম বাচ্চারা ভূত-পেত্নী সেজে এসেছিলো, ঘন্টাখানেক ওরা আনন্দ করলো, তারপর তাদের মিষ্টি খাওয়ানো হলো, ব্যস ঐখানেই অনুষ্ঠান সমাপ্ত।

এরপর আমরা যখন আমেরিকাতে এসেছি, সময়টা ছিল অক্টোবার এর মাঝামাঝি। আমাদের তখন খুব মন খারাপ, দেশ থেকে মাত্র এসেছি। হিউম্যান রিসোর্স অফিসার ছিলেন এক জাপাণী ভদ্রলোক। উনি এই হ্যালুইন এর দিন সকালে আমার স্বামীকে বলে দিলেন যেনো আমাদের দুই মেয়েকে রেডি রাখি, সন্ধ্যাবেলা তার মেয়ে এসে ওদের নিয়ে যাবে ‘ট্রিক অর ট্রিট’ করতে। আমি কিছু বলার আগেই আমার মেজো মেয়ে নেচে উঠলো। সে নিজে নিজে ‘ডাইনী বুড়ী’ সেজে ওদের সাথে চলে গেলো এবং ফিরে এলো এক বাকেট ভর্তি চকোলেট নিয়ে। দুইদিন ধরে শুধু নিজের রোজগার করা চকোলেট খেয়ে কাটালো সে।

হ্যালুইন অরিজিন্যালি শুরু হয়েছিল আয়ারল্যান্ড, স্কটল্যান্ডএ। আইরিশ ও স্কটিশ লোকসাহিত্যে হ্যালুইনকে বলা হয়েছে সুপারন্যাচারাল এনকাউন্টারস হিসেবে। ঐ সময়ের মানুষের বিশ্বাস ছিল যে সামারের শেষে শীতের শুরুতে হ্যালুইন সন্ধ্যায় সমস্ত মৃত আত্মীয়-স্বজনের আত্মারা নেমে আসে এই পৃথিবীর বুকে। অষ্টম শতাব্দীতে পোপ গ্রেগরী ১লা নভেম্বার কে ‘অল সেইনটস ডে’ ঘোষণা করেন এবং আগের সন্ধ্যা মানে ৩১শে অক্টোবারকে ‘অল- হ্যালোস-ইভ’ বা হ্যালুইন নামে অভিহিত করেন। মানুষের অন্ধ বিশ্বাস ছিল অল-হ্যালোস-ইভ-এ প্রেতাত্মারা নেমে আসে, তারা মৃত্যুর পরোয়ানা নিয়ে আসে, আর তাই এই প্রেতাত্মাদেরকে প্রতিহত করার জন্য সকলে একসাথে জড়ো হয়ে আগুন জ্বালিয়ে আগুনের চারপাশে ঘিরে থেকে নানা রকম ভঙ্গীতে পালটা ভয় দেখাত। সেই বনফায়ার থেকেই ‘জ্যাক-ও-লন্ঠন’ এর উৎপত্তি। আইরিশ ও স্কটিশরা টারনিপ (শালগম) কে সুন্দর করে কেটে কেটে ভুতের মুখের অবয়ব(হাসি মুখ) দিয়ে লন্ঠন বানিয়ে সকলের বাড়ীর সীমানাতে জ্বালিয়ে রাখত যাতে করে প্রেতাত্মারা আলো দেখেই ভয়ে পালিয়ে যায়। অনেকে খড়-বিচালী দিয়ে ‘কাক-তাড়ুয়া’ বানিয়ে সাজিয়ে রাখত একই ঊদ্দেশ্যে।

আইরিশ ইমিগ্র্যান্টরাই হ্যালুইনের প্রচলন করে এই উত্তর আমেরিকাতে। সময়ের স্রোতে হ্যালুইনের সূচনালগ্নের কুসংস্কার ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে গিয়ে পেয়েছে স্যেকুলার, শিশোতোষ আনন্দের নির্মল চেহারা। হ্যালুইনকে এখন শুধুই বাচ্চাদের আনন্দ উৎসব বললে ঠিক বলা হয়। সাথে যোগ হয়েছে আমেরিকান ব্যবসায়িক বুদ্ধি ও সাফল্য। যদিও আইরিশরা টারনিপ ব্যবহার করতো ‘জ্যাক-ও-লন্ঠন’ বানানোর জন্য, আমেরিকানরা পামকিন ব্যবহার করে। এতে করে সাপও মরে লাঠিও ভাঙ্গেনা। আমেরিকানরা সব কিছুতে স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখতে চেষ্টা করে বলেই বোধ হয় টারনিপ ব্যবহার না করে পামকিন ব্যবহার করে, তাছাড়া ‘লন্ঠন’ হিসেবে পামকিন অনেক বেশী আকর্ষনীয় ও বানাতে সহজ। আরেকটা ব্যাপার লক্ষ্যনীয়, যেহেতু হ্যালুইনের সাথে আইরিশ ও স্কটিশদের ধর্মীয় অনুভূতি জড়িত, তাই ভুত-প্রেতের থিমটাও রাখা হয়েছে। বাচ্চারা ঐদিন যে কোন রকম অশরীরীর গেট-আপ নিয়ে সবাইকে ভয় দেখিয়ে আনন্দ পায়। আবার এই ভুতদের কে প্রতিহত করতে মানে খুশী করতেই চকোলেট, ক্যান্ডি দেয়া হয়। বানিজ্যিক কোম্পাণীগুলো এত নতুন নতুন আইডিয়া বের করে যে বাচ্চারা খুব সহজেই আকৃষ্ট হয়, এবং বাবা মা কে কনভিন্সড করে ফেলে সহজেই। ‘ট্রিক অর ট্রিট’ হচ্ছে বাচ্চাদের কাছে সবচেয়ে মজার খেলা। তারা হো হো করে বা হাঁউ মাঁউ করে ভয় দেখাবে আর বড়রা ভয় পাওয়ার অভিনয় করবে, তখনই বাচ্চারা বলবে ‘ট্রিক অর ট্রিট’ (মানে খুব সহজ, হয় আমাদের খুশী কর নয়তো ভয় দেখাবো)।বাবা মায়েরা সাথে সাথে তাদের হাত ভরে চকোলেট দেবে, অথবা তাদের খুশী করার জন্য আরো অনেক কিছুই দিতে পারে, যার যেমন সামর্থ্য। মাত্র এক সন্ধ্যার জন্য বাবা মায়েরা কত ডলার খরচ করে তার কোন হিসেব নেই।

আমরা তিন বছর ওয়েস্ট ভার্জিনিয়াতে থেকে চলে এসেছি মিসিসিপিতে। মিসিসিপিতে এসে ওয়াল-মার্টে চাকুরী করা শুরু করি। আমাদের দেশে হিন্দুদের বারো মাসে তেরো পার্বণের কথা শুনেছি, কিনতু আমেরিকাতে বারো মাসে তেরো না শুধু, পারলে প্রতিদিন পার্বণ। কিছু না কিছুতো লেগেই আছে। এটা আরো ভালো করে টের পাওয়া যায় সুপার স্টোরগুলোতে ঢুকলে পরে। বিশেষ করে ওয়াল-মার্টে ঢুকলেই বলে দেয়া যায়, কখন কিসের মরশুম চলছে। এই মুহূর্তে চলছে হ্যালুইন মরশুম।

অক্টোবারের ৩১ তারিখ হ্যালুইন। ওয়াল-মার্টের অর্ধেক এরিয়া জুড়ে শুধু মিষ্টি কুমড়ার ছড়াছড়ি। দেশে চাল রাখার জন্য মাটির জালা (মটকা) থাকে। একেকটা কুমড়া সেই মাটির মটকা সাইজের হয়। এই কুমড়াগুলো শুধু এই সিজনেই হয়। হ্যালুইন উপলক্ষ্যে দেদা্রসে বিক্রী হয়। মানুষজন এই কুমড়াগুলোকে সুন্দর করে কেটে কেটে হাস্যমুখী ভুতের অবয়ব তৈরী করে। তারপর সেই কুমড়া ভুতগুলোকে দরজার সামনে সাজিয়ে রাখা হয়। অনেকেই এই কুমড়োগুলোর ভেতরে (আগেই ভেতরের বিচী বের করে ফেলা হয়) মোমবাতি জ্বালিয়ে রাখে। দূর থেকে সুন্দর দেখা যায়। ফসলকাটা হয়ে গেলে যে সকল খড় বিচালী থাকে তা দিয়ে ‘কাক তাড়ুয়া’ বানিয়ে এই সময়ে বিক্রী করা হয়। ওয়াল-মার্টে আরেক অংশ জুড়ে আছে নানারকম ভৌতিক কস্ট্যুম, ভুতের মুখোশ, কংকালের মুখোশ, স্পাইডারম্যান বা সুপারম্যানের কস্ট্যুম সহ কালো বিড়াল, কালো বাঘের নানারকম ভয়ংকর ভঙ্গীমায় তৈরী পোষাক এবং মুখোশ। মেয়েদের জন্য থাকে পরীর কস্ট্যুম, সিনডেরেলা, তুষার কন্যার কস্ট্যুম। আর বিক্রী হয় চকোলেট, ক্যান্ডি। পরিসংখ্যান অনুযায়ী আমেরিকাতে সারা বছরে বিক্রীত ক্যান্ডির এক চতুর্থাংশ বিক্রী হয় হ্যালুইনের সময়।

আমি হ্যালুইন সম্পর্কে সাধারণ মানুষের কি ধারণা তা জানার জন্য আমার কাজের জায়গাতে বিভিন্ন বয়সী সহকর্মীদের জিজ্ঞেস করেছিলাম। যাদের জিজ্ঞেস করেছি, তাদের প্রায় সকলেই বলেছে তারা এর পেছনের ইতিহাস জানেনা, শুধু জানে যে বাচ্চারা ঐদিন একটু মজা করে, ছেলেবেলাতে তারাও শুধুই ফান করতো ঐদিন, ব্যস এইটুকুই। লিওনার্দো নামে আমার এক সহকর্মী আছে যে এখন মাস্টার্স করছে, সে বলেছে এভাবে, “দেখো, একসময় যারা ধর্মে বিশ্বাস করতোনা, তারা ঈশ্বরের উপাসণাকে চ্যালেঞ্জ করে ঘোস্ট উপাসনার মত করে এই হ্যালুইন উদযাপন করা শুরু করে। তারা এমনও বলতো যে ঐরাতে সকল ভুত-প্রেত পৃথিবীতে নেমে আসে, তারা তাদের প্রিয়জনদের দেখতে আসে। ঈশ্বর বলে কিছু নেই, মৃত্যুর পরে সবাই ভুত হয়ে যায়। এই ধরনের প্রচারণাতে সমাজের অনেকের বিশ্বাসে আঘাত লাগতে থাকে, কিনতু আমেরিকাতে যেহেতু কারো স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করা যায়না, তাই সমাজে কোন রকম অসন্তোষ সৃষ্টির আগেই বানিজ্যিক কোম্পাণীগুলো এই ভুতভাবনাকে অন্যভাবে পরিবেশন করতে শুরু করে। তারা এই ফসল কাটার সময়টাকে বেছে নেয় হ্যালুইন উদযাপনের জন্য। এই উপলক্ষে এত এত মিষ্টি কুমড়া বিক্রী করে কৃষকের লাভ হয়, এত কস্ট্যুম, এত মুখোশ, এত রাশি রাশি চকোলেট, ক্যান্ডি বাজারজাত করে ব্যবসায়িক কোম্পাণীগুলো লাভবান হয়। আর মানুষ খুব সহজেই এই উপলক্ষটাকে বাচ্চাদের জন্য ফান হিসেবে গ্রহন করে। আর এভাবেই সেই মুষ্টিমেয় কিছু ঈশ্বর অবিশ্বাসীদের উদ্দেশ্য বিফলে যায়।“

রয় নামে আরেক সহকর্মী বলল, ‘ এটা কিছুইনা, শুধুই বিজনেস। আমেরিকাতে সব কিছুর পেছনে থাকে বিজনেস। এই সময়টা হচ্ছে ফসল কাটার মরশুম, এর পরেই শীত চলে আসবে। সকলে ঘরে ঢুকে যাওয়ার আগে আরেকবার ফূর্তি করার উপলক্ষ্য এটা। তবে বিশ্বাসযোগ্য করার জন্য একটা গল্প চালু আছে। গল্পটা হলো, এক সৈনিককে যুদ্ধের মাঠে তার শত্রু তরবারীর আঘাতে ধড় থেকে মাথা কেটে ফেলে দেয়। এরপর থেকে ঐ মুন্ডুহীন সৈনিক ভুত হয়ে রাতের বেলা ঐ পথ দিয়ে কাউকে যেতে দেখলেই তাকে মেরে ফেলতে শুরু করে। এতে করে লোকজন মুন্ডুহীন সৈনিকের মুখোমুখি না হয়ে ঘুরপথে যেতে শুরু করে। তাই মুন্ডুহীন সৈনিক বুদ্ধি করে ফসলের মাঠ থেকে এই সময়ের ফসল ‘মিষ্টি কুমড়া দিয়ে তার মাথা বানিয়ে ঘাড়ে বসিয়ে দিয়ে আবার শুরু করে হত্যাযজ্ঞ’ রয় আর বাকীটুকু জানেনা, তাই আমি গল্পটা শেষ করে দিলাম এভাবে, ‘কুমড়োমাথা ভুতকে খুশী করার জন্য গ্রামবাসী ঠিক করে যে তাকে তার প্রিয় মিষ্টি খেতে দিলেই সে এই অত্যাচার বন্ধ করবে। আর সেই থেকেই তাকে মিষ্টি খেতে দেয়া হয় এবং সে খুব খুশী হয়ে হত্যাযজ্ঞ বন্ধ করে দেয়’ আর এভাবেই নিশ্চয় মিষ্টি, চকোলেট, পামপকিন কেক, পামপকিন পাই এর বিজনেস রমরমা হয়ে উঠে। আর বিস্বাদু মিষ্টি কুমড়োগুলিকে হাস্যমুখ ভুত বানিয়ে বিক্রী করে দেয়া হয়। আমার এই শেষাংশটুকু রয়ের খুব পছন্দ হয়।

তবে অনেকে এই ফেস্টিভ্যালটাকে পছন্দ করেনা। কেউ কেউ মনে করে এইসব হচ্ছে কুসংস্কার, কেউ কেউ ভাবে পয়সার অপচয়, অনেকে ঐদিন সন্ধ্যায় ঘর বন্ধ করে অন্য কোথাও চলে যায়, যাতে করে বাচ্চাদের চকোলেট না দিতে হয়, কিছু পয়সাতো বাঁচে। আবার শাহীনের মত শিশু দরদী ছেলে প্যাকেট ভর্তি চকোলেট নিয়ে ২৫ মাইল রাস্তা ড্রাইভ করে আমাদের বাড়ী এসে মিথীলাকে (আমার ছোট মেয়ে, দিদি কাছে নেই বলে আর ট্রিক অর ট্রিট এ যেতে পারেনা) চকোলেট দিয়ে যায়। ইদানীং অনেক বাবা-মা বাচ্চাদের একা একা চকোলেট হান্টিং বা ট্রিক অর ট্রিট এ বের হতে দেননা। কারণ দিনকাল এদেশেও খারাপ হয়ে যাচ্ছে। যে কোন সময় বাচ্চা কিডন্যাপ হয়ে যেতে পারে, শত্রুতা করে কেউ খাবারের সাথে বি্ষ মিশিয়ে দিতে পারে বলে তাদের ভয়। আবার কেউ কেউ ট্রিক অর ট্রিট এর উছিলায় এসে ঘরে ঢুকে ডাকাতিও করে যেতে পারে। সময় এখানেও খুব কঠিন হয়ে যাচ্ছে।