ক্যাটেগরিঃ দিনলিপি

 

মুক্তিযুদ্ধের সময় প্রথম কয়েকমাস আমরা ছিলাম নারায়নগঞ্জের সোনারগাঁও। আমার দাদু ছিলেন মোক্তার (উকিল), উনারই এক মক্কেল এর বাড়ীতে আমরা ছিলাম। পরে পরিস্থিতি বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেয়া হয় যে আমাদের কোন রকমে ইন্ডিয়া চলে যেতে হবে। পরিস্থিতি নিয়ে ঘরে যখন আলোচনা হতো, আমি ঐখানে থাকতাম। আসলে আমি সব সময় মানুষের সান্নিধ্য ভালোবাসি। যদিও আমার মা বড়দের কথায় বাচ্চাদের উপস্থিতি কখনও অনুমোদন করতেননা, তবুও তখন সময় ছিল অন্যরকম। সবাইকে কাছাকাছি থাকতে দেখলে বরং তাঁরা খুশী হতেন। আমার বয়স ছিল ৫/৬। ঐ বয়সে বড়দের মাঝখানে বসে এমন গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা শোনা ঠিক কিনা তা জানিনা, তবে আমি শুনেছিলাম এবং নিজের মতামতও দিয়েছিলাম। ঐ আলোচনাতে উঠে এসেছিল পরিস্থিতির ভয়াবহতার কথা। আমি হঠাৎ করে বলে উঠেছিলাম যে আমি মুক্তিযুদ্ধে যেতে চাই। সবাই হেসে যখন জেজ্ঞেস করল, মুক্তিযুদ্ধে গিয়ে আমি কি করতে পারব, আমি তখন বলেছিলাম, “আমি প্রীতিলতা ওয়াদারের (ওয়াদ্দেদার) মত করে ডিনামাইট মেরে পাকিস্তানী মিলিটারীর ট্রাক উড়াইয়া দিব”। ৫/৬ বছর বয়সী মেয়ের জন্য প্রীতিলতার নাম জানাটা একটু অবিশ্বাস্য হলেও আমরা জানতাম। কারণ আমাদের মা আমাদের সাথে সব সময় বড় বড় মনীষীদের গল্প করতেন।

আমার মায়ের বিয়ে হয়েছিল নবম শ্রেণীতে পড়া অবস্থায়। আমার দাদুর ওকালতীতে অনেক পসার ছিল, তার উপর আমার মা ছিলেন তাঁদের প্রথম সন্তান এবং সুন্দরী, তাই আমার দাদু নিজের কাছাকাছি রাখতে চেয়েছিলেন মেয়েকে। পাত্র হিসেবে আমার বাবা খুব সাদামাটা ছিলেন, কিনতু দাদু দেখেছিলেন পাত্রের বংশ, পাত্রের চরিত্র। আমার বাবা বাইরে থেকে যতই সাদামাটা হোক, মনে মনে ছিলেন খুব আধুনিক, প্রগতীশীল চিন্তার মানুষ। বিয়ের পর আমার মা কে স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেন এবং তখনকার সামাজিক বাধাবন্ধকতা তুচ্ছ করেই মাকে দিয়ে স্কুল ফাইনাল পরীক্ষা পর্যন্ত পাশ করান। আমার মা এত কষ্ট করে আর পড়া চালাতে রাজী না হওয়ায় আমার বাবা আমার মাকে শিক্ষকতার পেশাতে ঢুকিয়ে দেন। নারায়নগঞ্জ উচ্চ বালিকা বিদ্যালয় নামে যে স্কুল শুরু হয়েছিল ১৯৫৭-৫৮ সালের দিকে, আমার মা ছিলেন ঐ নতুন স্কুলের প্রথম শিক্ষকদের একজন। বিনা বেতনে চাকুরী। আমার বাবা এতেই রাজী হয়েছিলেন। আমার বাবার ধারনা ছিল ঘরে বসে থাকলে মেয়েদের বুদ্ধিনাশ হয়, কূটকচালিতে সময় যায়। আমার মা সেই শিক্ষকতার চাকুরী থেকে ৪২ বছর পরে সময়মতো রিটায়ার করেন। শিক্ষকতা না করলে আমার মা কেমন হতেন জানিনা, কিনতু এত বছর শিক্ষকতা করে করে আমার মা আজীবন শিক্ষকই থেকে গেলেন। সব কিছুতে আমার মা নীতি মেনে চলতেন এবং আমাদেরও বাধ্য করতেন নীতি মেনে চলতে।

আমরা ছিলাম তিন ভাই ও এক বোন। আমরা চার ভাই-বোন জীবনের প্রথম অঙ্কের পাঠ নিয়েছি আমাদের মায়ের কাছ থেকে। আমার মা ছিলেন সাধারণ গনিত বিশারদ। আর ছিলেন অসাধারণ স্মৃতিশক্তির অধিকারী, আরও ছিলেন গল্পের বই এর বিশারদ। মজার ব্যাপার হলো চার ভাইবোনের মধ্যে আমি আমার মায়ের এই দুই প্রতিভার কিছু কিছু পেয়েছি। আমার বড়দা ও ছোট ভাই পেয়েছে শুধুই অঙ্কের প্রতিভা এবং আমার মেজদা পেয়েছে শুধুই গল্পের বই পড়ার প্রতিভা ও প্রখর স্মৃতিশক্তি।

এইতো এই কিছুদিন আগেই পড়ছিলাম জরাসন্ধের লেখা উপন্যাস, লৌহকপাট। প্রথমে লেখকের নাম মনে পড়ছিলনা! কিনতু মনে আছে আমার মায়ের কাছে এই বইটা দেখেছিলাম। সেই কোন ছোটবেলাকার কথা, আমার মায়ের ছিল বই পড়ার নেশা! শাড়ী গয়নার কোন চাহিদা ছিলোনা, শুধু বই কিনতেন। আমার মেজদা আর আমি ধরে রেখেছি মায়ের এই নেশা। ছোট বলে সব বই পড়ার অনুমতি ছিলনা, আমি বেশী পড়তাম সোভিয়েত দেশের রূপকথা। কি যে সুন্দর সুন্দর গল্প ছিল, কয়েকটা চরিত্রের নাম এখনও মনে আছে। যেমন চাষীর ছেলে ইভান, পগাতিকগরোশেক, ছুদোয়ুদো, ব্যাং রাজকুমার আরো কত কি! আর আমার মা পড়তেন যত রাজ্যের মোটা মোটা ভারী ভারী বই। বেশীর ভাগ সময় রবিবার দুপুরে অথবা কখনও স্কুল ছুটি হয়ে গেলে পরে একতু শুয়ে বিশ্রাম করতেন, আমার কাজ ছিল, মা শুয়ে থেকে যখন বলতেন, অমুক বইটা বের করে নিয়ে আয়, সেই আদেশ পালন করা। আর এভাবেই কিছু বইয়ের নাম এখনো মনে আছে, পরবর্তিতে যে বইগুলো আর কোথাও খুঁজে পাইনি। সাধারণ মধ্যবিত্তের সংসারে নেংটি ইঁদুরের পেটে গেছে কত বই, আর কিছু মানুষ পড়ে ফেরত দেয়নি!

লৌহকপাট, পঞ্চতপা, অগ্নিগর্ভ চট্টগ্রাম, ঘানার কালো মানুষ, নেতাজী সুভাষ বলছি, বিনয় বাদল দীনেশ, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন, মাস্টারদা সূর্য সেন,পৌষ ফাগুনের পালা, পথের পাঁচালী, মহাভারত, কলকাতার কাছেই—-আরো অনেক বই ছিল। আমার মেজদা আমার থেকে মাত্র তিন বছরের বড় হয়েও কিভাবে যেন এই বইগুলো পড়তো। অবশ্যই লুকিয়ে লুকিয়ে। এখন ভাবি, কেন আমিও আমার মেজদার মত পড়ার বইয়ের নীচে লুকিয়ে লুকিয়ে পড়তে পারলামনা! তাহলে অমন সুন্দর বইগুলো ইঁদুরে কাটার আগেই পড়ে ফেলতে পারতাম।

যতবার দেশে যাই, ফেরার সময় শাড়ী না এনে বই আনি। স্যুটকেস ভরে বই আনি। আমার বড় মেয়ে ও ছোট মেয়ে পেয়েছে বই পড়ার নেশা, মেজ মেয়ে তার স্কুল জীবনে একটামাত্র গল্পের বই পড়েছে ‘হ্যারী পটার’। গল্পের বই পড়ার মত ধৈর্য্য তার নেই। কোন লেখকের নাম যদি ভুলে যাই মাকে দেশে ফোন করি, কাহিনী মনে আছে অথচ বইয়ের নাম মনে নেই, মাকে ফোন করি। সেদিন মাকে ফোন করে জেনেছি জরাসন্ধের আসল নাম চারু চন্দ্র চক্রবর্তী। দেশে গিয়ে বই কিনতে যাওয়ার আগে মাকেই জিজ্ঞেস করি বইয়ের নাম, আমার মা এখনো সব বইয়ের নাম গরগর করে বলে যান, কিনতু মার্কেটে গিয়ে বইগুলো আমি আর খুঁজে পাইনা। বইগুলো হারিয়ে গেছে, কিনতু আমাদের দুই ভাই বোনের মনে জ্বেলে গেছে ১০০০ ওয়াটের আলো। বিদেশে বসে অনেক সময় মন খারাপ লাগে, কারো সাথে কথা বলতে ভালো লাগেনা, বই পড়ি, মনের আঁধার কেটে যায়।

আমার মা আরো কিছু অতি অবশ্য জরুরী জিনিস শিখিয়েছেন। কারো ব্যক্তিগত ব্যাপারে নাক না গলানো, আগ বাড়িয়ে কারো সাথে তর্কে না জড়ানো, মানুষকে বিপদে সাহায্য করা, কারো কাছে কিছু প্রত্যাশা না রাখা জাতীয় সকল প্রয়োজনীয় শিক্ষা দিয়েছেন। সারা জীবন আমাদের শুধু সাবধান করেই গেলেন যেনো কোন উলটা পালটা কিছু না করে বসি।

সারাক্ষন আমাদের নিয়ে ভয়েই থাকেন, কোথায় কি ভুল করে বসি। এই কিছুদিন আগেই মা কে ফোন করে বললাম আমার একটা লেখা পত্রিকায় ছাপা হওয়ার কথা। মা প্রথমেই জিজ্ঞেস করলেন, কোন আজেবাজে কথা লিখেছি কিনা! সেদিন ছিল আমার মায়ের জন্মদিন, ফোন করে বার্থডে উইশ করে বললাম যে তোমাকে নিয়ে একটা লেখা লিখতে চাই। সেই একই কথা, যেন কোন আজে বাজে কথা না লিখি, কারো নাম না লিখি। আমি হেসে বলি, তোমাকে নিয়ে লিখবো তাতে অন্যকে ভয় পাওয়ার কি আছে! এই মাকে নিয়ে কি করি! সন্তানের মঙ্গল চিন্তায় তাঁর সময় কেটে যায়! আমরা চার ভাই-বোন আজ যেখানে এসে দাঁড়িয়েছি, জানিনা আমার মায়ের তৃপ্তি কতটুকু, কিনতু আমাদের তৃপ্তি হলো ষোল আনার জায়গায় বত্রিশ আনা। আমাদেরতো এমন সুন্দর জীবন পাওয়ার কথাই ছিলোনা যদি আমরা এমন আলোকিত মা না পেতাম!

২০০৮ সালে ভারতের বারানসীতে গিয়েছিলাম আমার মেজোমাসীর কাছে। বারানসী হলো হিন্দুদের পূণ্যতীর্থভূমি। কাশী-বারাণসী সম্পর্কে এই মুহূর্তে কিছু না বলে ছোট একটা ধর্মীয় শিক্ষামূলক গল্প বলিঃ বারাণসীর বিশ্বনাথ মন্দির দর্শন করতে গিয়ে গঙ্গাতে স্নান করে পূজা দিয়ে যখন চারিদিকে তাকাচ্ছি, আমার মাসীর মেয়ে আমাকে নদীতে হেলে পড়ে যাওয়া একটা মন্দির দেখিয়ে বললো, কথিত আছে, এক ছেলে তার মায়ের জন্য মন্দির বানিয়ে দিয়ে বলেছিল ‘মাগো এই নাও, তোমার প্রতি আমার ঋণ শোধ করলাম’। ছেলের এই কথার সাথে সাথে মন্দির কাত হয়ে জলে পড়ে গেছে। সেই থেকে মন্দিরটা আজ পর্যন্ত একভাবেই আছে। আমি বলি, আহারে বোকা ছেলে! মায়ের ঋণ শোধ করার দরকার কি ছিল তোর! কোন মা কি ছেলেমেয়েকে ঋণের জালে আটকায়! মা তো মা, সন্তানের সাথে তাঁর নাড়ীর সম্পর্ক, দেহের সম্পর্ক, আত্মার সম্পর্ক, এখানে ঋণের কথা আসেই বা কেন? আর যদি ঋণের কথা আসেই, তাহলে শুধুমাত্র মায়ের কাছেই ঋণী থাকতে চাই।