ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

নারায়নগঞ্জের মেয়র নির্বাচন উপলক্ষে সারাদেশে তো বটেই, প্রবাসেও আমাদের সবার মনে ছিল টান টান উত্তেজনা, আশা, নিরাশা, অজানা ভয়, আশংকা মিলিয়ে এক ধরনের মিশ্র অনুভূতি। আর অনলাইন এ ঢুকলেই দেখা যেত নির্বাচনের প্রার্থীদের হয়ে প্রচারণা। অবশ্য প্রচারণা ছিল অনেকটাই এক পক্ষীয় প্রচারণা। শতকরা ৯৯.৯৯% ভাগ প্রচারণা ছিল সেলিনা হায়াত আইভীর পক্ষে। যদিও আমি ফেসবুকে খুব রেগুলার, কিনতু এই নির্বাচন নিয়ে আমি কোন কমেন্ট করিনি দেখে আমার কিছু বন্ধু আমাকে খোঁচাচ্ছিল, জানতে চাইছিল আমি কোন পক্ষে। আমি পড়েছি মুশকিলে, আমি নারায়নগঞ্জের মানুষ, আমার পদবীই সবাইকে বলে দেয়, আমি কোন রাজনৈতিক দলের সমর্থক। সেই হিসেবে শামীম ওসমানকেই সমর্থন করার কথা। আবার এদিকে সেলিনা হায়াত আইভীর মত এমন মেধাবী প্রার্থীকে সমর্থন করবোনা, এটাও কি করে হয়! তাই আমি আমার বন্ধুদের ভুপেন হাজারিকার গাওয়া একটি গান থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে বলেছি, “এপার ওপার কোন পারে জানিনা, আমি সবখানেতেই আছি”। সত্যি আমি দুজনকেই সমর্থন করেছি, ফলে কিছুই হারাইনি, আইভীর জয়ে যেমন আমি গর্বিত, শামীমের পরাজয়েও আমি মন খারাপ না করে বরং স্বস্তি পেয়েছি এই ভেবে যে এই পরাজয় শামীমের জন্য আশীর্বাদ হয়ে এসেছে।

নির্বাচন মানেই এক ধরনের প্রতিযোগীতা, আদর্শের লড়াই, আধিপত্যের লড়াই বা ব্যক্তি ইমেজের লড়াই, যেভাবেই দেখিনা কেনো, যে কোন প্রতিযোগীতাতেই একের অধিক প্রতিযোগী থাকে, একটাই পার্থক্য দেখি, নির্বাচনী লড়াইয়ে প্রতিযোগীরা কোন রাজনৈতিক দল বা কোন গোষ্ঠী থেকে প্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচিত হয়েই প্রতিযোগীতায় অংশগ্রহন করে। সেই হিসেবেই শামীম ওসমান আওয়ামীলীগের প্রতিনিধি নির্বাচিত হয়েছিল, তৈমুর খন্দকার বিএনপি থেকে আর আইভী জনগনের দ্বারা নির্বাচিত হয়ে প্রতিযোগীতায় অবতীর্ন হয়েছিল।

গত কয়েকদিনের পত্র পত্রিকা পড়ে এতটুকু বুঝেছি যে নারায়নগঞ্জের এই নির্বাচন ঘিরে অনেক হিসেব নিকেশ চলছিল। বিএনপি খুঁজছিল নির্বাচন বানচালের অজুহাত, আওয়ামীলীগের জন্য চ্যালেঞ্জ ছিল নির্বাচন কিভাবে সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করা যায়, নির্বাচন কমিশনের জন্য চ্যালেঞ্জ ছিল যাতে করে বিএনপি কোনভাবেই নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ দাবী করার সুযোগ না পায়, শামীম ওসমানের জন্য চ্যালেঞ্জ ছিল ‘গডফাদার’ উপাধী থেকে মুক্তি পাওয়া, আইভীর জন্য চ্যালেঞ্জ ছিল দলীয় সমর্থনের বাইরে গিয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে জয়লাভ করে পিতার ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি করা। আর তৈমুর খন্দকারের জন্য চ্যালেঞ্জ ছিল শামীম-আইভীর দ্বন্দ্বের ফাঁক গলে নিজেকে বিজয়ী করা।

নারায়নগঞ্জের মেয়র নির্বাচনে সত্যের জয় হয়েছে, জয় হয়েছে গনতন্ত্রের, অশুভ যত কিছু বিদায় হয়েছে, সকল শুভ কিছুর সূচনা হয়েছে। শামীম ওসমানের পরাজয় তার জন্য শুভ হয়েছে। নির্বাচনের আগে প্রচারণা চলাকালে শামীম ওসমানকে একচেটিয়া যেভাবে ‘গডফাদার’, মাফিয়া ডন’, সন্ত্রাসী’ অভিধা দেয়া হয়েছে, তা ভুল প্রমানিত হয়েছে। সে সুযোগ চেয়েছিল নিজেকে প্রমান করার যে সে ‘সন্ত্রাসী’ নয়, এটা সে এই পরাজয়ের ভেতর দিয়ে প্রমান করেছে। সে যদি সত্যি সত্যি সন্ত্রাসী বা গডফাদার হতো, তাহলে সে সন্ত্রাস করেই জিতে যেত অথবা আর কিছু না পারুক নির্বাচন ভন্ডুল করে দিতে পারত। বাংলাদেশের ইতিহাসে আরেকটি ‘মাগুরা’ নির্বাচন সৃষ্টি হতো, খালেদা জিয়া হাতে মারনাস্ত্র পেয়ে যেতেন, সারা দেশে অশান্তির আগুন জ্বলত, কিনতু তা সে করেনি, নির্বাচনী ফলাফল মেনে নিয়েছে, যতটুকু অভিযোগ করেছে, পরাজয়ের ধাক্কা অনেক কঠিন ধাক্কা, সেই ধাক্কা খেয়ে এতটুকু অভিযোগ করতেই পারে।

‘গডফাদার’ শব্দটা প্রথম জেনেছি হিন্দী কোন একটা মুভি দেখে, আমি অত সিনেমা পাগল নই, তাই গডফাদার নিয়ে মাথা ঘামাইনি। পরবর্তীতে দেখেছি বাংলাদেশের প্রথম সারির দৈনিকে শামীম ওসমান, জয়নাল হাজারীকে ‘গডফাদার’ আখ্যা দিতে। আমার কাছে একটু খটকা লেগেছিল, মতিউর রহমান নিজামী, গোলাম আযম, সাকাচৌ এদেরকে ‘গডফাদার’ না বলে ঐ পত্রিকা বেছে বেছে শামীম ওসমান ও জয়নাল হাজারীকে গডফাদার বানিয়ে ফেললো! ঐ পত্রিকাতো ‘নিরপেক্ষ’ পত্রিকা বলে দাবী করে, তাহলে ফেণীর জয়নাল আবেদীন ফারুক বা নারায়নগঞ্জের তৈমুর আলম খন্দকারকে কেনো ‘গডফাদার’ বা ‘সন্ত্রাসী’ বলেনি! তারা সবাইতো নিজের নিজের এলাকাতে একই মাপের ক্ষমতাশালী। কিজানি, রাজনীতির মারপ্যাঁচ বুঝিনা, আমি এই কথাগুলো লিখছি শুধুমাত্র নিজের হিসেবে মিলছেনা বলে। জয়নাল হাজারী বা জয়নাল আবেদীন ফারুক, কাউকেই আমি চিনিনা, দুজনের ক্ষমতার দাপটের কথা পত্রিকান্তরেই জেনেছি, তবে জয়নাল আবেদীনের ভাগ্য ভালো যে সে নিশ্চয়ই ঐ পত্রিকা সম্পাদকের গুডবুকে আছে। তবে শামীম ওসমানকে চিনি, কারণ আমাদের এলাকার লোক সে। সে একবার ‘গোলাম আযম’ কে নারায়নগঞ্জে ঢুকতে দেয়নি, ঠিক মনে পড়ছেনা ঐ সময়টাতেই কি সে খালেদা জিয়ার গাড়ীবহর আটকে দিয়েছিল কিনা, তবে এটা জানি, ঐ সময়ই ঐ নিরপেক্ষ দৈনিকে তার নামের পাশে ‘গডফাদার’ তকমা জুড়ে দেয়া হয়েছিল। তবে গোলাম আযমকে নারায়নগঞ্জে ঢুকতে না দিয়ে শামীম ওসমান আমাদের নারায়নগঞ্জবাসীর মুখ উজ্জ্বল করেছিল। স্বদেশী আন্দোলনের ইতিহাসে চট্টগ্রাম ও নারায়নগঞ্জের নাম স্বর্নাক্ষরে লেখা আছে। নারায়নগঞ্জের মাটিতে গোলাম আযমকে ঢুকতে না দিয়ে শামীম নারায়নগঞ্জের ইতিহাসকে সমৃদ্ধ করেছে, বিনিময়ে ঐ পত্রিকার সম্পাদকের রোষানলে পড়ে এই অনাকাংক্ষিত ‘গডফাদার’ আখ্যা পেয়েছে। এই নির্বাচনের পরাজয়কে যদি শামীম পজিটিভভাবে দেখেন, সেটা হবে তার জন্য মঙ্গল। এক জয় পরাজয় মানুষের সদিচ্ছাকে থামাতে পারেনা। যে ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান সে, নারায়নগঞ্জের রাজনীতির ইতিহাসে যে পরিবারের নাম আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে, একটি মাত্র পরাজয় তার কাছেতো কিছুই না। শামীম যদি নির্বাচনে জয়লাভও করতো, শতভাগ নিরপেক্ষ নির্বাচন হলেও ঐ ফলাফল নিয়ে সমালোচনার ঝড় উঠতো। তার চেয়ে এই ভাল হয়েছে, এই পরাজয়ে মানুষ দেখেছে শামীমের রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, ফলাফল মেনে নেয়ার মানসিকতা, সবার চেয়ে বড় কথা সেই তেজী মনোভাবের বদলে তার চেহারাতে দেখা গেছে ধীর স্থির বিনয়ের আভাস। এক নির্বাচণী প্রচারণায় আইভীর সাথে শামীমের মাঝপথে দেখা হতেই শামীম বড় ভাইয়ের মত আইভীর মাথায় হাত দিয়ে স্নেহমাখা কন্ঠে কথা বিনিময় করে। শামীম পরাজিত হয়েছে তার ছোটবোনের কাছে। ভাই-বোনে বাকবিতন্ডা হরহামেশাই হয়, কখনও ভাই জেতে, কখনও বোন জেতে। এখানে ভাই-বোন দুজনেরই জয় হয়েছে। একজন মেয়র হিসেবে, আরেকজন তার এতদিনের রাজনৈতিক প্রজ্ঞা দিয়ে নারায়নগঞ্জবাসীকে ধন্য করবেন, সারাদেশে নারায়নগঞ্জের মঙ্গল প্রতীক হয়ে থাকবেন। তাদের দেখে অন্যেরা শিক্ষা নেবে। ভাগ্য ভালো যে ভাই-বোনের এই দ্বন্দ্বের সুযোগ নিয়ে অন্য কোন অশুভ শক্তি ঢুকে পড়েনি।

আসলে শেখ হাসিনা বা শামীম ওসমানের হয়েছে এক অবস্থা। তাঁদের ‘ধারেও কাটে, ভারেও কাটে’। পুরানো মুখ দেখতে চাইনা, পরিবারতন্ত্র চাইনা, নতুন নেতৃত্ব চাই শুনতে শুনতে বিতশ্রদ্ধ হয়েই হয়ত শেখ হাসিনা নতুনের হাতে নেতৃত্ব ছাড়তে চেয়েছিলেন ( সাথে সংস্কারপন্থীদের অনাবশ্যক শিক্ষা দিতে চেয়েছিলেন)। তাছাড়া প্রবীণ রাজনীতিবিদদের বাদ দিয়ে রাজনীতিতে অপেক্ষাকৃত নবীন রাজনীতিবিদদের সুযোগ দিতে চেয়েছিলেন। হয়ত এইজন্যও ডাঃ দীপুমনির হাতে পররাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ের দায়িত্ব দিয়েছিলেন। কিনতু নিন্দাই যার ভাগ্যে লেখা সে শত ভালো কাজ করলেও নিন্দাই কুড়াবে। প্রথম থেকেই দেখা যাচ্ছে শেখ হাসিনার নিন্দুকের অভাব নেই। তাই দীপুমনিকে নিয়েও সমালোচনার ঝড় বইছে। মনে হয় যেনো প্রাক্তন পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা আগে কতো সম্মান আদায় করে এনেছিলেন দেশের জন্য, যা কিনা ডাঃ দীপুমনি পারছেন না। এই যখন বাস্তবতা তখন শেখ হাসিনা কেনো রাজনীতিতে অপেক্ষাকৃত নবীন আইভীকে মনোনয়ন না দিয়ে তুলনামূলকভাবে রাজনীতিতে অভিজ্ঞ শামীমকে মনোনয়ন দিলেন, সেটা নিয়েও সমালোচনার ঝড় বয়ে গেছে। তাহলে কোনদিকে যাবেন একজন নেত্রী, যখন একটি পদের জন্য অনেকগুলো যোগ্য প্রার্থী থেকে একজনকে বাছাই করতে হয়! নিকট অতীত থেকে শিক্ষা নিয়েই হয়তো আওয়ামীলীগ শামীমকে মনোনয়ন দিয়েছে, আবার এটাও জানতো যে দুজনের মধ্যে যেই জিতুক না কেনো সে আওয়ামীলীগের হয়েই থেকে যাবে। এই ক’দিনে আইভীকে নিয়ে অনেক ভালো ভালো কথা হয়েছে যা কিনা আইভীর প্রাপ্য। আইভী অবশ্যই মেধাবী, উচ্চশিক্ষিত, প্রগতীশীল এক নারী। তেমনি এক মেধাবী, উচ্চশিক্ষিত, আলোকিত, অত্যন্ত বিনয়ী, ভদ্র আরেক নারী ডাঃ দীপুমনি। যোগ্য মানুষকেই পররাষ্ট্রমন্ত্রী বানিয়েছিলেন শেখ হাসিনা। যেই মানুষগুলো আজকে আইভীর মেধা নিয়ে উচ্চকিত, তারাই আবার ডাঃ দীপুমনিকে নিয়ে ঠাট্টা, উপহাস করে। রাজনীতিবিদ শফিকুল গণি স্বপন (প্রয়াত) ‘তৃতীয় মাত্রা’ তে এসে শেখ হাসিনার সমালোচনা করতে গিয়ে বলেছিলেন,” এই যে কারে যেনো পররাষ্ট্রমন্ত্রী বানানো হইছে, খুকুমনি না কি যেনো নাম”। আমার ভয় এখানেই, এরাই আবার আইভীকে নিয়ে উপহাস শুরু করবে। কারণ আইভীর জন্য যারা জান লড়িয়ে দিয়েছিল, তাদের অনেকেই আসলে ‘শামীম ঠেকাও’ মনোভাব নিয়ে কাজ করেছে। নারায়নগঞ্জের মেয়ে হিসেবে, নিজে নারী হয়ে আইভীর বিজয়ে আমি গর্বিত, আশান্বিত। নারায়নগঞ্জের মেয়ে হিসেবে আমি শামীমকে নিয়েও গর্বিত এই ভেবে যে সে প্রমান করে দিয়েছে জোরপূর্ব্বক শুধু তার গায়ে ‘গডফাদার’ তকমা এঁটে দেয়া হয়েছে (একই দোষে দুষ্ট আর কারো গায়ে এই তকমা লাগানো হয়নি), সে নির্বাচনকে শান্তিপূর্ণ হতে দিয়ে প্রমাণ করেছে, নারায়নগঞ্জে শামীম একজন নিবেদিত আওয়ামীলীগ কর্মী, সন্ত্রাসী নয়। শামীমকে ঠেকাতে যারা একযোগে কাজ করেছে তারা অবশ্যই শামীমকে ঠেকাতে পেরেছে, আশা করবো আইভীকে নির্বিঘ্নে কাজ করতে দেয়া হবে। পান থেকে চুন খসলেই যেনো ডাঃ দীপুমনির মত আইভীকে নিয়েও কৌতুক না করা হয়।