ক্যাটেগরিঃ ধর্ম বিষয়ক

দেশে প্রতি বছর খুব জাঁক জমকের সাথে দূর্গা পূজা হয়।আমিতো অনেক বছর ধরে দেশের বাইরে আছি, দেশ ছেড়ে আসার পর থেকে পূজার সময়টাতে আর কখনও দেশে যাওয়া হয়নি আমাদের। আমরা দেশে যাই প্রতি দুই বছরে একবার। সবাই মিলে যাই বলে সামারের ছুটিতে না গেলে আমাদের পোষায়না। গরম লাগে প্রচন্ড, তাতে কিছু আসে যায়না, একটানা দুই মাস থাকতে পারি, এটাই সবচেয়ে সুখের।
আমার জন্মের পর থেকে বিয়ের আগে পর্যন্ত সময় কেটেছে নারায়নগঞ্জে। একেবারে ছোট্ট বয়সে থাকতাম নগর খানপুর , শীতলক্ষ্যা নদীর পাড়ে, পাট কোম্পাণীর কোয়ার্টারে। আমার দাদু থাকতেন আমলাপাড়াতে, তাঁর মোক্তারী জীবনের শুরু থেকে। আমার মা কে তিন বছরের নিয়ে এসেছিলেন আমার দাদু ননী গোপাল রায় যেই বাড়ীতে, এই বাড়ীতেই আমার মায়ের বিয়ে হয়েছে, এই বাড়ীতেই ১৯৭০ সনে নগর খানপুরের কোয়ার্টার ছেড়ে দিয়ে আমার বাবা আমাদেরকে নিয়ে চলে আসেন। এই বাড়ীতেই আমার দাদু ৯৫ বছর বয়সে মারা যান, আমার বাবা-মা এখনও এই বাড়ীতেই আছেন, ভাড়া বাড়ী হলেও মনে হয় উনাদের শেকড় এই বাড়ীর মাটির অনেক গভীরে চলে গেছে।

নারায়নগঞ্জের সবচেয়ে প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী দূর্গাপূজা হচ্ছে আমলাপাড়ার পূজা। কবে থেকে শুরু জানিনা, তবে আমার মনে আছে বেশ কয়েক বছর আগে ১০০ বছরপূর্তি হয়েছে। সেই হিসেবে ১১৫ থেকে ১২০ বছরের প্রাচীনতো বটেই। এখন পাড়ার রাস্তাতে প্যান্ডেল বানিয়ে পূজা হয়, কিনতু স্বাধীনতার পরেও বেশ অনেক বছর আমার দাদুর মোক্তারী বৈঠকখানাকে ব্যবহার করা হতো পূজার মন্ডপ বানানোর জন্য। আমার ছোটমামা ছিলেন ছেলে ছোকরাদের লীডার। তার বিরাট ভূমিকা থাকতো এই পূজা আয়োজনে। কিছু মানুষ জন্ম থেকেই মাতব্বর টাইপের থাকে, আমার ছোট মামাও ছিল সেরকম, প্রতিভা ছিল অনেক, কিনতু কাজে লাগাননি, আমার এই মামা মাত্র ৩৯ বছর বয়সে অকালেই মারা যান। এই মামাকে আমরা যমের মত ভয় পেতাম, কারণ মামা সব সময় আমাদের উপর উনার অভিভাবকত্ব খাটাতে চাইতেন। যদিও যমের মত ভয় পেতাম, কিনতু এই মামাই যখন পুজার সন্ধ্যাতে ঢাকীর কাঁধ থেকে ঢাক খুলে নিয়ে নিজের কাঁধে ঝুলিয়ে বাজাতেন, কি যে ভাল লাগতো। এক ধরনের অহংকার বোধ করতাম। বলা বাহুল্য, উনার অনুসারীদের সবারই কিছু না কিছু গুন ছিল। আমার ছোটমামার ঢাকের সাথে আরতি নাচ করত মামার অনুসারী দেবু মামা। আরতি প্রতিযোগীতা হতো শুধুমাত্র আমলাপাড়ার পূজাতে।
ঐ পাড়াতে যত যুবক ছিল, সবাইকে মামা ডাকতাম। কারণ আমার মা ছিলেন সবার দিদি। তেমন এক মামা ছিলেন বিমল মামা। বিমল মামার উপর দায়িত্ব ছিল প্রতিমা সাজানো থেকে মন্ডপ সাজানো, মন্ডপ ছাড়িয়ে রাস্তার আলোকমালা কেমন হবে সব কিছুর দেখভাল করা। প্রতি বছর কোন না কোন চমক থাকতো। স্বাধীনতার আগের পূজার বর্নণা তেমন দিতে পারবোনা, শুধুমাত্র ব্যক্তিগত দুই একটা ঘটনা ছাড়া। ঐ দুই একটা ঘটনার মধ্যে একটা ঘটনা ঘটেছিল আমার তিন বছর বয়সের সময় (পরে শুনেছি আমার বয়স ছিল তিন বছর)। আমার খুব স্পষ্ট না হলেও ভালই মনে পড়ে এক ভীড়ের মধ্যে কেউ আমার গলা থেকে টান দিয়ে কিছু নিয়ে গেছিল, আর আমি খুব কাঁদতেছিলাম। আমার সেজমাসী আমাকে কোলে নিয়ে মনে হয় আদর করছিল। পরে শুনেছি আমার গলায় একটা সোনালী চেইন ছিল, সেটাই ছিনতাই হয়েছিল। আরেকটা ঘটনা মনে আছে, সেটা হলো এক পূজায় আমার গলার নীচের দিকে একটা ফোঁড়া হয়েছিল( আমার ঘামাচি, ফোঁড়া হতো বলেই আমাকে আমার বাবা পচিমা ডাকত), আর সেই ফোঁড়াতে চিকিৎসা হিসেবে চুন লেপে দেয়া হয়েছিল। এতে করে আমার সৌন্দর্য্যহানি ঘটেছিল, সেটা বলাই বাহুল্য। আমার দুই মাসী বুদ্ধি করে একটা সাদা সূতা নিয়ে আমার গলায় মালার মত করে ঝুলিয়ে দিয়েছিল যাতে করে সবাই ভাবে ফোঁড়াটা আসলে ঐ মালার লকেট। আমার কাছে মনে হয় ব্যাপারটা যুক্তিযুক্ত মনে হয়েছিল। মনে আছে আমি ওভাবেই ঘুরে বেরিয়েছিলাম।

মুক্তিযুদ্ধের সময় আমরা ইন্ডিয়াতে ছিলাম। আমাদের শরণার্থী শিবিরে থাকতে হয়নি। আমার ছোটকাকা থাকতেন বারাকপুরে। ঐ বাড়িতে আমার মেজোকাকীমাও থাকতেন উনার এক ছেলে ও এক মেয়ে নিয়ে। আমার মেজোকাকা চাকুরীসূত্রে থাকতেন জলপাইগুড়ী চা বাগানে। ঐ বছর আমরা পূজা দেখেছিলাম বারাকপুরে। আমার মা প্রচুর বই পড়তেন। আমার মা অনেক কিছু জানতেন। সেই জানার ভেতর ছিল কুমারটুলীর কথা। কুমারটুলী হচ্ছে প্রতিমা বানানোর জন্য বিখ্যাত। আমার মা অমন দুঃসময়ের ভেতরও কিভাবে যেন ব্যবস্থা করেছিলেন আমাদের নিয়ে কুমারটুলী যাওয়ার। কুমারটুলীতে গিয়েতো আমাদের চোখ ছানাবড়া। মূর্তি এত বড় বড় হতে পারে তাইতো ধারণা ছিলনা। কত রকমের ডিজাইন! একটা মনে আছে, অসুরকে দেয়া হয়েছে পাকিস্তানী মিলিটারীর আদল। ছোট চোখেই কি এমন মনে হয়েছিল নাকি আসলেই কুমারটুলীর কর্মশালা এমনই বৃহৎ কে জানে! আমার কাকাত ভাইটা ছিল খুবই দুষ্ট। সে গিয়ে একটা সিংহের দাঁত ধরে এমন টান দিয়েছে যে দাঁত ভেঙ্গে গেছে। আমরা ভয়ের চোটে প্রতিমা দেখা সাঙ্গ করে সাথে সাথে চলে এসেছিলাম। ঐ বছরটাই শুধু কলিকাতার পূজা দেখেছিলাম। মনে আছে, কি জাঁকজমক, কি আলোকসজ্জা দেখেছিলাম। ঐ বছরের পূজাতে লতা মুঙ্গেস্কারের গান ‘ও প্রজাপতি, প্রজাপতি পাখনা মেলো’ গানটা বেরিয়েছিল। ভূপেন হাজারিকার গান, ‘গঙ্গা আমার মা, পদ্মা আমার মা’ ঐ বছরেই বের হয়।

আমার আপন মামা এবং পাড়াত মামারা মিলে আগে থেকেই প্ল্যান করত প্রতি বছর পূজাতে কি নতুন চমক আনা যায়। কাজেই দেশ স্বাধীন হওয়ার পরেই প্রথম চমক ছিল প্রতিমাকে সত্যিকারের শাড়ী পরানো হবে। আমাদের যে কি উচ্ছ্বাস, কি গর্ববোধ হচ্ছিল এই নিয়ে! প্রতিদিন আখড়াতে গিয়ে বসে থাকতাম, ঠাকুর বানানোর জন্য যখন খড় আনা হতো তখন থেকে শুরু করে ঠাকুর রঙ করা পর্যন্ত সবকিছু আমরা বসে বসে দেখতাম। এখন কে প্রতিমাকে শাড়ী পরায় জানিনা, কিন্তু তখন আমার ছোট মামা যেমন ছিল ঢাক বাজানো আর লাইটিং এ শ্রেষ্ঠ, তেমনি প্রতিমাকে শাড়ী পরানো থেকে শুরু করে প্রতিমার চুলের স্টাইল, গয়নাগাঁটি কেমন হবে এই ব্যাপারে বিমল মামা ছিল একমেবাদ্বিতীয়ম। তার উপর ছিল লাইটিং এর খেলা। কত রকমের সাউন্ড এফেক্ট তৈরী করা হতো, ঝড়-বৃষ্টি থেকে শুরু করে অসুরের অট্টহাসি পর্যন্ত সবকিছু।

আমার মাসীরাও কম মাতব্বর ছিলোনা। বিশেষ করে আমার ছোটমাসী ছিল মেয়েদের দলের লীডার। তারা প্ল্যান করত অন্য রকমের। নিজেদের বাড়ীর ভেতর পূজা বলেই তাদের ঠাটবাট ছিল অনেক বেশী। আমাকে অবশ্য তাদের দলে নেয়া হতোনা। কারণ আমি সব সময় তাদের প্ল্যান মায়ের কাছে ফাঁস করে দিতাম বলেই আমার মাসী আমাকে তার দলের অন্তর্ভুক্ত করেনি। আমার মা সারা জীবন শিক্ষকতা করেছেন বলে ভাই-বোন, ছেলেমেয়ে সবার সাথেই শিক্ষকের মত নীতিপরায়ন আচরণ করতেন। অনেকটা ‘সদা সত্য কথা বলিবে, সৎপথে চলিবে’ টাইপ। আর আমার বাবাতো সবার কাছেই বিভীষিকাসম ছিল। আমার বাবার হুঙ্কারকে সবাই ভয় পেত। এইসব নানা বিধিনিষেধের কারণেই আমাকে আলাদা থাকতে হতো। একমাত্র আমার মেজদা সব বিধিনিষেধকে জয় করতে পেরেছিল বলেই আমার মেজদার সাথে মাসীর খুব খাতির ছিল। আমার মাসী এবং তার সাঙ্গপাঙ্গরা কি করতো তার একটা ছোট্ট উদাহরণ দিতে ইচ্ছে করছে। বিকেল থেকেই শুরু হতো দর্শণার্থীদের ভীড়। এই ভীড় ক্রমশঃ বাড়তেই থাকতো। মহিলাদের জন্য আলাদা লাইন ছিল। মহিলারা যখন ভক্তিভরে প্রতিমার দিকে তাকিয়ে আছে বা প্রণাম করছে, এই সময়ে আমার মাসীর দলের মেয়েরা সেই মহিলাদের কেউ একজনকে এমন জোরে চিমটি দিত যে ভীড়ের মধ্যেই ‘ও মাগো রে’ বলে চিৎকার শোনা যেত। ততক্ষনে সবাই যখন মহিলাকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ত, এই সুযোগে একইসাথে অনেককে চিমটি দেয়া হতো। ব্যস! এক তুমুল হৈ চৈ শুরু হয়ে গেলে মাসীর দল বের হয়ে এসে হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়তো। আমি শুধুই দর্শক ছিলাম, শত ইচ্ছে থাকলেও আমার কোন উপায় ছিলোনা, কারণ আমি ছিলাম ছোটমাসীর রেডবুকে।

তারপর দশমীর দিন এলে পরে আমাদের ভারী মন খারাপ হতো। দশমীর পূজা হয়ে গেলে পরে আমার মা আমাকে দিয়ে একটি কাজ করাতেন। আর কেউ জানতোওনা, আমাকে দশমীর ঘটে হাত ডুবাতে বলা হতো, সেই ঘটের জল নিয়ে মুখে মাখতে বলা হতো। জল মুখে মাখলে সুন্দর হওয়ার সম্ভাবনা ছিল ( আমি ছিলাম আমার ফর্সা মায়ের কালো মেয়ে) এবং হাত ধুলে রান্না ভালো হওয়ার কথা ছিল। সুন্দর হইনি কিনতু আমার রান্না করার হাত ঠিকই খুব ভালো হয়েছে। প্রতিমা বিসর্জন দিয়ে সবাই যখন ফিরে আসত, পূজা মন্ডপে জল ফেলে কাদা তৈরী করে সবাই খুব মজা করত, তারপর শান্তিজল মাথায় নিয়ে যার যার ঘরে ফিরে যেত।

দশমীর লাড্ডু আর আমিত্তি খাওয়ার জন্য আমার এখনও প্রাণটা আঁইঢাঁই করে। নারায়নগঞ্জ হলো মিষ্টির জন্য বিখ্যাত। আর দশমীর লাড্ডু একমাত্র নারায়নগঞ্জেই বানানো হয়। আর যেখানেই যত লাড্ডু বানানো হোক না কেন, নারায়ণগঞ্জের কারিগরদের কাছে সবাই লাড্ডু বানানোতে ফেল করবে। সেই লাড্ডু আমিত্তি সবার ঘরে পাঠানো হতো, সবার বাড়ি থেকে আমাদের বাড়ীতেও মিষ্টি আসত। সবচেয়ে মজা ছিল আমাদের বাড়ীওয়ালাদের। উনাদেরকেও আমরা মামা মামী ডাকতাম। উনার ভাড়াটিয়া ছিল ১৮ ঘর। তার মধ্যে ১৭ ঘর হিন্দু আর একঘর মুসলমান। ফলে ১৭ ঘরের থেকে মিষ্টি যেত বাড়ীওয়ালা মামার ঘরে। উনার আত্মীয়-স্বজন সবাই আসত ঐদিন উনার বাড়িতে। নাহলে এত মিষ্টি খাবে কে! উনারাও পাঠাতেন রোজার সময় ইফতারী আর ঈদের সময় সেমাই, সব ভাড়াটিয়ার ঘরে।
অনেক বছর হয়ে গেল, দেশের বাইরে আছি। আর কোনদিন পূজার সময় দেশে থাকা হবেনা। তাছাড়া সেই দিনগুলোতো আর আসবেনা। সেই মানুষদের ভেতর কতজন মারা গেছেন, কেউ কেউ বিয়ে হয়ে দূরে চলে গেছে। আমার সেই ছোটমাসী এখন সুনামগঞ্জের লক্ষ্মী বউ, কেউ ধারনাও করতে পারবেনা মাসী কৈশোরে কিরকম দুরন্ত ছিল। আমার মেজদাও এখন কত ভদ্র, হাসিখুশী সর্বজনপ্রিয় সিনিয়ার অফিসার ব্যাংকে!

প্রতিমা বন্দোপাধ্যায়ের কন্ঠে গাওয়া একটি আধুনিক বাংলা গানের অন্তরাটা এরকম, “ ‘স্মৃতির জানালা খুলে চেয়ে থাকি,
চোখ তুলে যতটুকু আলো আসে,
সে আলোয় মন ভরে যায়’
এই নির্জন প্রবাসে আমার মনটাও ভরে যায় যখন স্মৃতির জানালা খুলে তাকিয়ে দেখি সোনালী দিনের ছবি।