ক্যাটেগরিঃ দিনলিপি

 

আমার বাগানে ঝিঙ্গেলতা হলুদফুলে ছেয়ে আছে। আরো আছে সীমের লতা যেখানে বেগুনী ফুল ফুটতে শুরু করেছে। ক্লাস সেভেন/এইট-এ আমাদের বাংলা পাঠ্যবই-এ দুইটা কবিতার চরণ মনে পড়ে।

‘ঝিঙ্গেফুল ঝিঙ্গে ফুল, সবুজ পাতার দেশে হলুদিয়া ঝিঙ্গেফুল।
গুল্মের পর্ণে, লতিকার কর্ণে,দোল দোল দোলে দোল, ঝিঙ্গে ফুল ঝিঙ্গে ফুল’।
অথবা ‘নিমন্ত্রণ’ কবিতায়,
‘ তুমি যদি যাও, দেখিবে সেখানে, মটরলতার সনে,
সীম আর সীম হাত বাড়ালেই মুঠি ভরে সেই ক্ষণে’।
আমার মেয়েরা দেশে খুব বেশীদিন থাকেনি, যতদিন থেকেছে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে পড়েছে ( কারণ আমার মেয়েকে অস্ট্রেলিয়া থেকে দেশে ফেরার পর কোন বাংলা মিডিয়াম স্কুলে ভর্তি নেয়নি)।ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে বাংলা থাকে একটা সাবজেক্ট হিসেবে। কাজেই আমার মেয়েদের বাংলা শেখার সুযোগ তেমন ছিলনা। তার উপর শহরে থেকেছি বলে বাংলার রূপ তেমন দেখেনি ওরা।
তারপরেও আমার বড় মেয়ে যদিও ইংলিশ মিডিয়ামে পড়েছে, কিনতু তার বই পড়ার প্রচন্ড নেশা আছে বলে সে নিজে থেকেই অনেক বাংলা বই পড়েছে, এখন তার ডাক্তারী পড়ার চাপে গল্পের বই পড়া আপাতত বন্ধ আছে, কিনতু বাংলার প্রতি তার আগ্রহ কমেছে বলে মনে হয়না। মেজো মেয়ে মোটামুটি বাংলা পড়তে পারে, লিখতে পারে (কেউ জিজ্ঞেস করলে সে গর্বের সাথে বলে যে সে ‘লক্ষ্মীর পাঁচালী’ পড়তে পারে) , কিনতু মেজো মেয়ে বাংলা গল্পের বই না পড়লেও ফটোগ্রাফীতে ও এত ভাল যে দেশে গেলে ওর ক্যামেরাতে উঠে আসে গ্রাম বাংলার অপূর্ব দৃশ্যগুলো, যেগুলো দিয়ে অনায়াসে পোস্টার বানানো যায়, আমার বড় মেয়ে ও এই মেয়ে তাদের স্কুল কলেজে বাংলা সংস্কৃতিকে তাদের নাচ ও গানের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা করেছে।
গত বছর দিওয়ালীর প্রোগ্রামে আমার মেজো মেয়ে পাঁচজন আমেরিকান বন্ধুকে নিয়ে হাবীবের গানের সাথে নাচ করেছে, এবার পাঁচ জনের বদলে ৯ জন আমেরিকান মেয়েকে নিয়ে সে বাংলা নাচ করবে। আমার মেজো মেয়ের রেফারেন্সেই তার এক আমেরিকান বন্ধু যে কখনও আমেরিকার বাইরে যায়নি, এই কিছুদিন আগেই দুই বছরের স্কলারশিপ নিয়ে বাংলাদেশে গেছে। সে বাংলাদেশ থেকে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছে আমার মেয়ের সাথে, সে খুব খুশী বাংলাদেশে থেকে, ছোটটি দুই বছর বয়সে চলে আসে আমেরিকাতে। তার কোন সুযোগ হয়নি বাংলাদেশকে ভাল করে দেখার বা জানার। তারপরেও আমার ছোটমেয়ে খুব সুন্দর করে বাংলা কবিতা আবৃত্তি করে, সেরাকন্ঠ, ক্লোজ-আপ ওয়ান, ক্ষুদে গানরাজ, সুরদরিয়া এপার ওপার দেখে দেখে বাংলা গানের সাথে পরিচিত হয়ে গেছে।

আমি আমার বাবার কাছ থেকে মুখে মুখে বলে, কাজের মাধ্যমে, অথবা হাতে কলমে বাচ্চাদের কিছু শেখানোর কায়দাটা বেশ ভালই রপ্ত করেছি। মিথীলা আমার ছোট মেয়ে। আমার মিথীলাকে বাংলা পড়তে শিখিয়েছি, লিখতেও শিখিয়েছিলাম (চর্চ্চার অভাবে একটু ভুলে যাচ্ছে), সে বাংলা যে কোন বাঙ্গালী বাচ্চার চেয়েও ভাল বলতে শিখেছে। এখন শুধু মিথীলাই আমাদের সাথে আছে। বাকী দুইমেয়ে যার যার কলেজের ডর্মে থেকে পড়াশুনা করছে। আমার ঘর অনেকটাই ফাঁকা হয়ে গেছে। হাতে অবসর সময়ও পাই আগের তুলনায় অনেক বেশী। আর এই সময়টাতেই আমার মনে পড়ে যায় ছেলেবেলার দিনগুলো। কারণ আমার চোখের সামনে ঘুরে বেড়ায় আমার মিথীলা ঠিক আমার ছোটবেলার রূপ ধরে। ওকে আমি চিনিয়ে ফেলেছি দোপাটি ফুল, গন্ধরাজ , জবা, পদ্ম ফুল, বেলী ফুল, নয়নতারা ও সন্ধ্যামালতী। আমি আমার বাগানে এলোমেলোভাবে লাগিয়েছি এই সমস্ত ফুলের গাছ। বাগানে অনেক পরিশ্রম করে ঝিঙ্গের লতা, সীমের লতা, পুঁই এর লতা, মিষ্টি কুমড়া, লাউ, কলমিশাক, করলার লতা লাগিয়েছি, একেবারে শেষের দিকে কচুগাছ লাগিয়েছি। আমার মিথীলা এর প্রতিটির সাথে খুব ভালভাবে পরিচিত হয়ে গেছে। আমাদের প্রতিদিনের খাবারের মেন্যুতে ডাল আর শাক রাখতেই হয়, মিথীলার জন্যে। এই দুই আইটেম থাকলে মিথীলাকে খুব নিশ্চিন্ত দেখা যায়। মাছ সে ভালোবাসে। সুযোগ পেলেই বাংলাদেশী দোকান থেকে মাছ কিনে আনি, তার মধ্যে সে ভালোবাসে ইলিশ, পাবদা, বেলে (বাইল্লা), রুই। পটল পেলেতো খুশীর সীমা থাকেনা তার। সে আরও যা ভালোবাসে তা হলো দুধ কলাভাত, দুধকলা ভাত খেতে বসলেই আমি ওকে আমার ছোটবেলায় শোনা অতি পছন্দের ছড়াটা আমার মত করে শুনাই,
খুকী খুকী করছি মায়
খুকীটা গেলো কাদের নায়
সাতটি কাকে দাঁড় বায়
খুকীরে তুই ঘরে আয়”
ছোট্ট মানুষ সে, দেশে গেলেই তাকে মশা কামড়ায়, তারপরেও সে প্রতি বছর দেশে যেতে চায়। গরমের মধ্যে ফুল স্লীভ জামা, পায়জামা পড়ে থাকে, মশার কামড় থেকে বাঁচার জন্য( সে নিজেই বের করেছে উপায়)। এই মিথীলাই আমার ছোটবেলা, এই মিথীলাই আমার বাংলাদেশ। এই মিথীলাকে আমি গল্পের ছলে শুনিয়ে যাই, আমার ছোট্টবেলাতে শেখা কিছু ছড়া, যা আমার এখনও মনে আছে।
আমার পাঁচ আর ছয় বছর বয়সে শেখা তিনটি ছড়া মিথীলাকে শুনিয়েছি সেদিনঃ

“খুকু যেদিন জন্ম নিলো, ছোট্ট মোদের ঘরে
পরীরা সব দেখতে এলো, কত সোহাগ ভরে।
আদর করে দোল খাওয়ালো, ফুলের বিছানায়”

‘এক যে আছে একানোরে, সে খালি তালগাছেতে চড়ে,
দাঁতদুটো তার মূলোর মতন, পিঠখানা তার কুলোর মতন,
কানদুটো তার নোটা নোটা, চোখ দুটো আগুনের ভাটা
কোমরে বিচুলীর দড়ি, বেড়ায় লোকের বাড়ী বাড়ী,
যে ছেলেটা কাঁদে, তাকে ঝোলার ভেতর বাঁধে,
গাছের উপর চড়ে আর তুলে আছাড় মারে। অথবা

‘ও পাড়েতে যেওনা ভাই, ফটিং টিং এর ভয়
তিন মিনসের মাথাকাটা পায়ে কথা কয়’

প্রথম ছড়াটা মিথীলাকে বলার সময় ছোট্ট একটা গল্প জুড়ে দেই। বলি জানিসতো, এই ছড়াটা আমাকে নিয়ে লিখা হয়েছিল। কারণ আমি জন্মানোর আগে আমাদের বাড়ী শুধুই ছেলে আর ছেলেতে ভর্তি ছিল। আমার মায়ের মনে খুব দুঃখ ছিল, ঘরে একটাও মেয়ে ছিলনা বলে। তখন আমি জন্ম নিলাম। সত্যি সত্যি সব পরীরা নেমে এসেছিলো, আকাশ থেকে, আমাকে দেখবে বলে। তখনই ছড়াকার এই ছড়াটা লিখেছিল। কথাগুলো বিশ্বাস করবে কি করবেনা তা ভেবে মিথীলা একটু বিভ্রান্ত হয়। কিনতু আমার মুখে এই ধরনের গল্প শুনতে ওর ভালো লাগে তা ওর হাসি হাসি মুখটার দিকে তাকালেই বুঝতে পারি।