ক্যাটেগরিঃ স্বাস্থ্য

মাত্র এই কয়েকদিন আগেই টিভিতে নিউজে দেখাচ্ছিল, ক্যালিফোর্নিয়ার কোন এক ছোট শহরে ঘটে যাওয়া এক ঘটনা। এক স্বামী- স্ত্রীর মাঝে বনাবনি হচ্ছিলনা বেশ অনেকদিন থেকেই। মেয়েটি কাজ করত এক বিউটি পার্লারে। ছেলেটি সম্পর্কের তিক্ততার জের হিসেবে এই দুইদিন আগে ঐ পার্লারে ঢুকে সাথে নিয়ে যাওয়া রিভলবারের গুলিতে স্ত্রীসহ পার্লারের সবাইকে মেরে ফেলেছে। এই সকল ক্ষেত্রে সাধারণতঃ দেখা যায়, যে গুলি করে, সবার শেষে সেও আত্মহত্যা করে। কিনতু এইক্ষেত্রে তা হয়নি। এই বিশাল দেহের খুনীকে পুলিশ গ্রেফতার করেছে। মনটা খারাপ হয়, ভাবি যে আমাদের দেশের মানুষগুলো নাহয় গরীব, অভাবে মাথা ঠিক থাকেনা, ঘরে-বাইরে দ্বন্দ্ব-কলহ, মারামারি ,ঝগড়াঝাটি, খুনোখুনিতে জড়িয়ে পড়ে। কিনতু এই সকল উন্নত দেশেও মানুষের প্রাণের মূল্য আর কতটুকু! কত সহজেই মুহূর্তে প্রাণটা বেরিয়ে যায়! খারাপ লাগে, কত দামী, কত মূল্যবান জীবন আরেকজনের বদ খেয়ালের কাছে হেরে যায়। কত পরিবারের স্বপ্ন ভেঙ্গে গুঁড়িয়ে যায়, বিনা কারনে বিনা দোষে!

১৯৯৫-৯৬ সালের কথা, ঐ সময়টাতে আমরা ছিলাম অস্ট্রেলিয়াতে। এক সকালে শুনি, তাসমানিয়াতে এক লোক সকালবেলাতে বন্দুক হাতে এক রেস্টুরেন্টে ঢুকেই এলোপাতাড়ি গুলি চালিয়েছে, সাথে সাথে মারা গেছে ১৫ জন, আহত অনেক। ওটা ছিল ট্যুরিস্ট এলাকা, তাই মানুষ ছিল প্রচুর। পরে জানা গেছে ঐ লোক ছিল মানসিক রোগী। এমন ঘটনা আমি প্রথমবারের মত শুনেছি, আমি এমনিতেই ভীতু টাইপ, ঐ ঘটনা আমার মনে এমন ভয় ঢুকিয়ে দিয়েছিল যে সব সময় মনে হত এমন ঘটনা মেলবোর্ণেও ঘটে যেতে পারে যে কোন সময়। আমরা থাকতাম মুরামবিনা তে, তার দুই স্টেশান পরেই ওকলী নামের আরেক শহরে ভালো একটা মল ছিলো। সেখানে প্রায়দিন যেতাম, আর গেলেই এক পাগলের সাথে দেখা হয়ে যেত। পাগলটার মুদ্রাদোষ ছিল, হাতের মুঠি পাকিয়ে কেমন করে ঘুষি দেখাত। এমন ভয় লাগত যে আমি তাড়াতাড়ি করে আমার মেয়েটাকে সাথে নিয়ে পাগলটার দৃষ্টির আড়ালে চলে যেতাম।

কিছুদিন আগে আমরা গিয়েছিলাম আমেরিকার ওকলাহোমাতে। ওকলাহোমাতে আমার স্বামীর কলেজ জীবনের দুই বন্ধুদাদা থাকেন গত ৩০ বছর ধরে। আমি এই প্রথম উনাদের দেখলাম। মাত্র দুই দিনের জন্য গিয়েছিলাম, কাজেই তেমন কিছুই দেখা হয়নি। তবে ওকলাহোমা সিটির ডাউন টাউন ঘুরতে গিয়ে দেখলাম ও্কলাহোমা সিটি ন্যাশনাল মেমোরিয়াল মিউসিয়াম। মনে পড়ে গেল সেই ওকলাহোমা ট্র্যাজেডির কথা! গাড়ী দূরে পার্ক করতে হবে বলেই গাড়ী থেকে নামতে ইচ্ছে করলোনা, দেখছিলাম ছুটির দিন বলে প্রচুর মানুষ মেমোরিয়ালের ভেতরে বাইরে। যে কোন ঘটনা সম্পর্কে আমার বই পড়ে জানার পরেও মানুষের মুখ থেকে শুনতে বেশী ভাল লাগে। এতে করে যে কোন ব্যাপারে সাধারণ মানুষের মনোভাব, পক্ষে-বিপক্ষে মতামত সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। তাই সাথে থাকা বন্ধু দাদাকেই জিজ্ঞেস করলাম কি হয়েছিল সেদিন!

১৯৯৫ সালের ১৯শে এপ্রিল ছিল সেদিন। সকালবেলাতে সকলেই যে যার মত করে কাজে বেরিয়ে গেছিল। সেদিন আবহাওয়া পূর্বাভাসে বলা ছিল ঝড়-বৃষ্টি হওয়ার কথা। দাদা অফিসে ছিলেন এবং আন্দাজ সকাল ৯টার দিকে বাইরে খুব ভারী কিছু ফাটার আওয়াজ পেয়ে সচকিত হয়ে উঠেন। বিকেলে থান্ডার স্টর্ম হওয়ার কথা ছিল, সেটা আগেই শুরু হয়ে গেছে ধরে নিয়েছিলেন। কিনতু মুহূর্তেই চারিদিকে কোলাহল শুরু হয়ে যাওয়াতে সকলেই সচকিত হয়ে উঠেছিল সেদিন। টিভির পর্দায় দেখাতে শুরু করেছে ওকলাহোমা সিটি ফেডারেল বিল্ডিং এ বোমা ফেটেছে, প্রচুর হতাহত হয়েছে। পরে জানা গেল টিমোথি নামের এক ছেলে সরকারী কোন সিদ্ধান্তের বিরূদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে এই কান্ড করেছে যার ফলে ২০০ জন নিরীহ মানুষ মারা গেছে, ৫০০ জনের উপর আহত হয়েছে টিমোথি ধরা পড়েছিল, তবে অন্যভাবে। সে তার গাড়ী নিয়ে পালিয়ে যাওয়ার সময় ক্যান্সাস বর্ডারের কাছাকাছি, রোড পুলিশ তাকে থামায় গাড়ীতে নাম্বার প্লেট না থাকার কারনে। আর এভাবেই ধরা পড়ে যায় সে পুলিশের হাতে। পরে বিচারে তাকে মৃত্যুদন্ডে দন্ডিত করা হয়।

২০০২ সালের দিকে আমরা থাকতাম ওয়েস্ট ভার্জিনিয়াতে। ঐ সময় হঠাৎ করে এক স্নাইপারের দৌরাত্ম্য বেড়ে যায়। স্নাইপার শব্দটা সম্পর্কে আমার এতটুকুই ধারণা ছিল যারা নিজেকে আড়ালে রেখে অন্যকে হত্যা করার চেষ্টা করে। এই স্নাইপার ভার্জিনিয়াতে গ্যাস স্টেশানগুলিতে ওঁত পেতে থাকত আর প্রতিদিন এক দুই জনকে গুলি করে মেরে ফেলত। এভাবেই সে আমাদের ওয়েস্ট ভার্জিনিয়ার কাছাকাছি চলে আসে। এই খবর গুলো সবসময় টিভিতে প্রচার হতো। আর আমি ভয়ের চোটে আধমরা হয়ে থাকতাম। বাচ্চারা স্কুলে যেত, স্বামী ইউনিভারসিটিতে যেত, ঘরে না ফেরা পর্যন্ত স্বস্তি পেতামনা। এভাবে ১০/১২ জনকে মেরে ফেলার পর পুলিশ তাকে ধরতে পারে গাড়ীতে ঘুমন্ত অবস্থায়। সে ছিল খুব সম্ভব্ত নাইজেরিয়ান বংশোদ্ভূত আমেরিকান। তার সাথে ছিল আরেক কিশোর, হয়তবা তার ছেলে। বিচারে কিশোরের জেল হয় আর ঐ স্নাইপারকে মৃত্যুদন্ড দেয়া হয়।

১৬ই এপ্রিল, ২০০৭ এ আরেকটি ঘটনা ঘটে। এটা ঘটেছিল ভার্জিনিয়াতে। আমার বড় মেয়ে ভার্জিনিয়াতে হলিন্স ইউনিভারসিটিতে তখন আন্ডারগ্র্যাড স্টুডেন্ট ছিল। ওর ইউনিভারসিটি থেকে ৪০ মাইল দূরে আমেরিকার প্রথম সারির ইঞ্জিনিয়ারিং ইন্সটিটিউট এবং স্টেট ইউনিভারসিটি ‘ভারজিনিয়া টেক’ অবস্থিত।ঐ সকালে ক্লাস চলাকালীন সময়ে এক ছাত্র (সাউথ কোরিয়ান বংশোদ্ভুত) ক্যাম্পাসে ঢুকে তার হাতের রিভলবার থেকে উন্মত্তের মত গুলি ছুঁড়তে থাকে, এতে করে শিক্ষক ও ছাত্র-ছাত্রী মিলিয়ে ৩২জন প্রাণ হারায়, ২৫ জন মারাত্মকভাবে আহত হয়। শেষ গুলিটি সে নিজের জন্য ব্যবহার করে। এটা ছিল আমেরিকার ইতিহাসে কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সংঘটিত সবচেয়ে হৃদয় বিদারক ঘটনা। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে হওয়ার কারণেই বোধ হয় সারা পৃথিবীতে এই ঘটনায় তোলপাড় সৃষ্টি হয়।

উপরের ঘটনাগুলো ছাড়াও টুকিটাকি ঘটনা লেগেই আছে এইসব দেশে। উপরের ঘটনাগুলোর সাথে কোন না কোনভাবে আমার ঐ সময়ের স্মৃতি জড়িয়ে আছে, তাই শুধু ঐ ঘটনাগুলোর অবতারণা করলাম। যখন অস্ট্রেলিয়াতে ছিলাম, তাসমানিয়ার ঘটনাতে হতভম্ব হয়ে গেছিলাম। সভ্য দেশে এ কোন অসভ্য ঘটনা। জানতে পেরেছিলাম, শুটার ছিল মানসিক রোগী। মানসিক রোগী কিভাবে এমন আগ্নেয়াস্ত্র হাতে ঘুরে বেড়ায় সেটাইতো ছিল লাখ টাকার প্রশ্ন! ভার্জিনিয়া টেকের শুটারও ছিল মানসিক রোগী। সে ছোটবেলা থেকেই চিকিৎসাধীন ছিল। ভার্জিনিয়া টেকে ভর্তি হওয়ার সময় এই ব্যাপারগুলো খুব ব্যক্তিগত বলে বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি কমিটি জানতে পারেনি। এই ছেলে দুই মেয়েকে নানা ভাবে উত্যক্ত করতো, এক মেয়ে তার প্রস্তাবে সাড়া না দেয়াতে সে এই ঘটনা ঘটিয়েছে। এমনকি যেদিন ও এই ঘটনা ঘটায়, সে দুই হাতে দুই রিভলবার নিয়ে একটা ছবি তুলে এনবিসি টিভিতে পাঠিয়ে দেয়।

এই ঘটনার পরেই সারা পৃথিবী জুড়েই হাহাকারের শব্দ শোনা গিয়েছিল। এমন নামীদামী বিশ্ববিদ্যালয়ের এতগুলো মেধাবী ছেলেমেয়ে ও শিক্ষক, এক মানসিক রোগীর এক মুহূর্তের খেয়ালের বলি হয়ে গেছে। এটা মানা যায়! কিনতু আসলে যে প্রশ্ন উঠেছে তা হলো সে কিভাবে রিভলবার কিনলো। এখানে নিজের নিরাপত্তার জন্য অনেকেই লাইসেন্সড আগ্নেয়াস্ত্র রাখতে পারে। আগ্নেয়াস্ত্র কিনতে গেলে ফটো আইডি লাগে, বয়সের সীমা দেয়া থাকে। যথেষ্ট ভ্যালিড কারন দেখাতে হয় আগ্নেয়াস্ত্র রাখার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে। মানসিক রোগীদের কাছে কোনভাবেই আগ্নেয়াস্ত্র বিক্রী করার কোন বিধান নেই। তারপরেও এত কঠিন আইনের ফাঁক গলিয়ে কি করে সেই কোরিয়ান ছেলে এতোগুলো গুলি কিনলো, দুইটা রিভলবার কিনলো, ঘটনা ঘটে যাওয়ার পরে এই প্রশ্ন বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। কিনতু এখনও প্রায়ই দেখা যায় এই ধরণের শ্যুটিং এর ঘটনা ঘটেই চলেছে। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় সকল ঘটনার সাথে মনোবৈকল্যের একটা যোগাযোগ পাওয়া যায়। এটাতো ঠিক, সুস্থ মনের মানুষেরতো এমন মনোবিকৃতি ঘটার কথা নয়। যেটা দুশ্চিন্তার সেটা হলো মানসিক রোগীর সংখ্যা বেড়েই চলেছে এইসব দেশে। মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা কি বলেন সেই দিকে না তাকিয়েও বলা যায়, ব্যক্তি স্বাধীনতার অধিক সুযোগের অপব্যবহার, প্রাচুর্য্য, নারী পুরুষের অবাধ মেলামেশা, হৃদয়ঘটিত জটিলতা, বিয়ের অনিশ্চয়তা, যখন তখন বিবাহ-বিচ্ছেদ, পিতা-মাতার সাথে দূরত্ব, অল্প বয়সে বাবা মা হয়ে যাওয়ায় অতিরিক্ত মানসিক চাপ, সর্বোপরি লেখাপড়ার প্রতি চরম উদাসীনতা থেকেই এক ধরণের নৈরাশ্য তৈরী হচ্ছে। নৈরাশ্য থেকে বিষন্নতা এবং বিষন্নতা থেকেই ধীরে ধীরে মনোবৈকল্য দেখা দেয়। এখানে মানসিক রোগীদের চিকিৎসা শেষে পুনর্বাসণের প্রতি অনেক জোর দেয়া হয় (যা আমার ভাল লাগে), আমাদের দেশের মত পাগলা গারদে সারা জীবনের জন্য নির্বাসন দেয়া হয়না। আমাদের দেশের সমাজ ব্যবস্থায় মানসিক রোগীদের প্রতি যে ধরনের ঔদাসীন্য বা অবহেলা দেখানো হয়, চিরতরে একঘরে করে রাখার যে প্রবনতা, তা কখনও সমর্থন না করেও অর্থনৈতিক দূর্বলতাকে দায়ী করে মনে মনে এক ধরনের সান্ত্বণা পেতে চেয়েছি। অথচ এই সকল উন্নত দেশে সরকারীভাবে, সামাজিকভাবে এত সুযোগ-সুবিধা দেয়ার পরেও এই ধরনের পৈশাচিক ঘটনাগুলো থামানো যাচ্ছেনা। ভাবি, এমন সভ্য দেশে, যেখানে আমাদের মত দিনে এনে দিনে খেতে হয়না, কোন দুঃখে, কোন যাতনায় কিছু মানুষের এমন মনোবৈকল্য ঘটে, যেখানে তাদের কাছে জীবনের কোন মূল্য থাকেনা, না নিজের জীবনের, না অন্যের জীবনের!