ক্যাটেগরিঃ প্রবাস কথন

আমি চাকুরী করি ফোন সার্ভিস ডিপার্টমেন্টে। আমাদের কাজ হলো ফোন সার্ভিস নিতে আসা গ্রাহকদের সবরকম তথ্য নিয়ে তাদের ক্রেডিট চেক করা, তারপর ক্রেডিট রিপোর্টের উপর ভিত্তি করে ফোন সার্ভিস চুক্তি সই করা। আমার সহকর্মী যারা আছে, তারা কেউ এনজয় করেনা কাজটা, আমি খুবই এনজয় করি, কারন কত রকম মানুষের সাথে পরিচয় হয়, তাদের সাথে গল্প করলে কত নতুন নতুন তথ্য পাওয়া যায়। আমাদের এখানে নানা জাতের মানুষ আসে, তাদের মধ্যে মেক্সিকান অনেক, মেক্সিকানদের দেখলেই আমার খুব মায়া লাগে, কেমন দল বেঁধে চলে ওরা, ওদের কথা আমেরিকানরা বুঝেনা, আমাকে দেখলেই ওরা ওদের ভাষাতে ‘অলা’(হ্যালো) বলে কাছে এগিয়ে আসে। আমিও ওদের কথা বুঝিনা, কিনতু ওদের বডি ল্যাঙ্গুয়েজ থেকে বুঝে নেই, ওদের প্রয়োজন, আমার সাধ্যমত চেষ্টা করি, ওদের সাহায্য করতে। কোন কোন দিন কাজে গিয়ে দেখি, কেউ কেউ আমার অপেক্ষায় থাকে, কখন আমি যাব, তবে আমার কাছে আসবে। আমার মনটা ভিজে উঠে গভীর মমতায়। পেটের ধান্ধায় কে কোথায় ছুটে চলে, কাউকে আপন পেলে একেবারে আনন্দে আত্মহারা হয়ে যায়।
আমি এই পর্বে শুধু আমার ভালো লাগা কিছু মানুষের গল্প বলে যাবঃ

বাড়ির ঠিকানা না জানা এক মেক্সিকান গ্রাহকঃ

মেক্সিকান গ্রাহক যারা, তাদের সবাই আমাকে দেখলেই তাদের খুব আপন মনে করে। কারন আমার চেহারা অনেকটাই তাদের মত, আমার নামটাও তাদের কাছে খুব পরিচিত। আজ আমার কাছে এসেছে মেক্সিকান এক লোক, একেবারে মেক্সিকান স্টাইলে ড্রেস আপ করে এসেছে সে, সাথে এক আমেরিকান মহিলা নিয়ে। লোকটা একবর্ণ ইংলিশ বলতে পারেনা, তার সঙ্গীনী, দেখে মনে হয় তার গার্ল ফ্রেন্ড, আমাকে বুঝিয়ে বললো যে লোকটির ফোন সার্ভিস কন্ট্রাক্ট নবায়ন করতে চায়। ভালো কথা, তার আইডি চাইলাম, দিল তার মেক্সিকান পাসপোর্ট, সেখানে তার বর্তমান ঠিকানা লিখা নেই। ঠিকানা জিজ্ঞেস করলাম, মহিলার মাধ্যমে সে জানালো যে সে ঠিকানা জানেনা। মহিলা কাকে যেন ফোন করে ঠিকানা জেনে নিল। সে তার সোশ্যাল সিকিউরিটি নাম্বার জানেনা, মহিলা এটাও বের করে দিল। সবচেয়ে বড় কথা, সে তার ফোন নাম্বার জানেনা। মহিলা এটাও খুঁজে বের করে দিল। আমি প্রথমে একটু অবাক হয়ে গেছি, পরে আস্তে আস্তে নিরাশ হতে শুরু করেছি, এই ভেবে যে এই লোক কিভাবে চলবে এই দেশে! যখন ফোন প্রায় একটিভেট করার শেষ পর্যায়ে, তখন দেখা গেল সে ফোন সেটিং এর সময় পাসওয়ার্ড দিয়েছিল। পাসওয়ার্ড জানতে চাওয়াতে সে মুখের ভাব এমন করলো যে সে এই শব্দ কখনও শুনেনি জীবনে। মহিলা কোনভাবেই বের করতে পারছিলোনা পাসওয়ার্ড, আমি তখন মহিলাকে ক্লু দিলাম, এই লোক যখন ফোন সার্ভিস নিয়েছিল, সাথে নিশ্চয়ই কেউ ছিল, নাহলে তার পক্ষে সম্ভব হয়নি এত কিছু করা। জানা গেল এই লোকের ভাই ছিল সাথে, ভাইকে ফোন করার অনেক চেষ্টা চললো, কিনতু ভাইকে কোনভাবেই পাওয়া গেলনা। ফোন আর এক্টিভেট করা হলোনা, আমি দেখলাম মহিলার অসীম ধৈর্য্য ও ভালোবাসা সেই লোকটির প্রতি। ফিরে যাওয়ার সময় মহিলাকে বলতে শুনছিলাম, ‘ মন খারাপ করোনা, আমি যেভাবে পারি এই পাসওয়ার্ড বের করবো, তারপর তোমাকে এখানে নিয়ে আসবো’।
এই ধরনের মানুষগুলোকে আমি জান-প্রাণ দিয়ে সাহায্য করতে চেষ্টা করি, কারন এদের ভেতর আমি দেখতে পাই আমাদের দেশের সহজ সরল মানুষগুলোকে।

জাপানী বুড়ীমা

আরেকজনের গল্প বলিঃ এক বুড়ী মহিলা, দেখতে একেবারে তিব্বতী বুড়ীদের মত, হাতে একটা কিছু নিয়ে ঘুরছিল, আমাকে দেখতে পেয়েই সাথে সাথে আমার কাছে চলে এলো, হাতের মুঠি খুলে দেখালো একটি ব্যাটারী, তার টেলিফোনের জন্য ঠিক ঐ রকম একটি ব্যাটারী প্রয়োজন। আমাদের কাছে ব্যাটারী ছিলোনা, কিনতু আমি বুড়ীমার সাথে গল্প জুড়ে দিলাম। জানতে চাইলাম বুড়িমা কি চাইনিজ অরিজিন নাকি। বুড়ীমা কেমন এক ধরনের ভাঙ্গা ভাঙ্গা ইংরেজীতে বললো, সে জাপানীজ। আমিও তার মত করে ভাঙ্গা ভাঙ্গা ইংরেজীতে জিজ্ঞেস করলাম, কত বছর ধরে সে এই দেশে আছে। সে বললো ৬২ (বাষট্টি) বছর ধরে আছে। জানতে চাইলাম, তাহলে তোমার বয়স কত? জবাব পেলাম ৮৭ (সাতাশি) বছর। আমি একটু চমকে গেলাম, বুড়ীমা বলেছি ঠিক, কিনতু মনে হয়েছিল সত্তর বছর বয়স হবে। তারপর সে জানালো, সে বিয়ে করেছিলো আমেরিকান নেভীর এক দারূন সুন্দর স্মার্ট যুবককে। তারা একসাথেই ছিল তার স্বামীর মৃত্যুর আগে পর্যন্ত। তাদের ছেলেমেয়েরাও বুড়ো হয়ে যাচ্ছে। তার এখন আর মনেই পড়েনা সে কখনও জাপানে ছিল। ফিরে যাওয়ার সময় আমার বয়স জানতে চেয়ে আমার উত্তরের অপেক্ষা না করেই নিজে নিজেই হিসেব করে বলে দিল যে আমার বয়স ১৮ বছর। আমি বললাম, তুমিও আমার মত হিসেবে পাকা। আমি তোমাকে বলেছিলাম ৭০ বছর, তোমার আসল বয়স থেকে ১৭ বছর কম, আর তুমি দেখি আমার সেই সম্মানটুকুও রাখলেনা, একেবারে টিন এজ বানিয়ে দিলে? সে মিষ্টি হেসে বললো, বাংলাদেশের মেয়েদের বয়স বোঝা যায়না! আমি অনেক বাংলাদেশের মেয়ে দেখেছি, সবাই তোমার মত দেখতে। ধন্যবাদ জানিয়ে বুড়ীমাকে বিদায় দিলাম।

জীবন থেকেই নেয়া গল্প

আজ আমার মনটা বেশ খারাপ হয়ে গেছে। আমাদের ডিপার্টমেন্টটা একেবারেই আলাদা সবার থেকে। কারন ফোন সার্ভিস কনট্রাক্ট যারা নিতে আসে তাদের ব্যক্তিগত যত ইনফর্মেশান নিয়ে আমাদের কাজ করতে হয় বলেই আমাদের উপর কিছু বাড়তি দায়িত্ব থাকে। তাই ফোন আর ইলেকট্রনিক জিনিস ছাড়া অন্য কিছু আমরা সহজে চেক আউট করিনা। আজ আমার হাতে একটু অবসর সময় ছিল বলে আমি এগিয়ে গেছি আরেকটা মেয়েকে সাহায্য করতে। মেয়েটা এক মহিলাকে চেক আউট করছিল। দেখলাম ভদ্রমহিলা গেমস কিনছেন আর সাথে কিনছে খুব সুনদর কিছু আর্টিফিসিয়াল ফুল। এখানে আর্টিফিসিয়াল ফুলগুলি এত সুন্দর হয় দেখতে যে প্রতিদিন আমি টাইম পেলেই ফুলের সেকশানে চলে যাই আর ঘুরে ঘুরে ফুল দেখি। আমি ভদ্রমহিলাকে তাঁর পছন্দের জন্য আন্ত্ররিকভাবেই প্রশংসা করলাম। ভদ্রমহিলা একটু বয়স্ক, কিনতু খুব সম্ভ্রান্ত পরিবারের তা উনার কথাতেই বুঝা যায়। এর মাঝেই আরেকজন কম বয়সী মহিলা এলো সেখানে, ভদ্রমহিলার মেয়ে। ফুলগূলো তার জন্য কেনা হচ্ছে জানতে পারলাম। এবার উনি আসল গল্পটা বললেন আমাকে, ” জানো, এই ফুলগুলো আসলে আমার মেয়ের জন্য কিনছি। আমার মেয়ের ঘরের নাতিটা এই গত মে মাসে গাড়ি একসিডেন্ট করে মারা গেছে। মাত্র ২১ বছর বয়স হয়েছিল। তুমি বারবার ফুলগুলো এত সুন্দর বলছো, আমার নাতিরও খুব পছন্দের ফুল এগুলো। তাই নিয়ে যাচ্ছি নাতির ঘরটাকে সাজিয়ে রাখব। আমার নাতিটা বন্ধুর বাড়িতে যাচ্ছিল। রাতে তার ঘুম হয়নি কাজে ছিল বলে। মনে হয় গাড়ী চালাতে চালাতে সে ঘুমিয়ে পড়েছিল, গাড়ী গিয়ে হিট করেছে রাস্তার পাশের এক গাছকে। সাথে সাথে মৃত্যু। তোমার মেয়েরও এক্সিডেন্ট হয়েছিলো বললে, তোমার মেয়েটাতো তবু ফিরে পেয়েছো। আমরা ফিরে পেলামনা আমাদের আদরের ছেলেটাকে”

এতক্ষন আমি লক্ষ্য করছিলাম ভদ্রমহিলার মেয়ে মুখ মলিন করে দাঁড়িয়েছিল কেনাকাটার সময়। তখন বুঝিনি কি ব্যথা বুকে নিয়ে সে ঘুরে বেড়াচ্ছে। আমার তখনি মনে হচ্ছিল তাকে বুকে জড়িয়ে ধরি, তার প্রতি আমার সমবেদনা জানাই। কিনতু এগুলোতো সত্যি সত্যি আর করা যায়না। তাই আমি মুখে তাকে বললাম তার প্রতি আমার আন্তরিক সমবেদনার কথা। এতক্ষনে সে আমার দিকে মুখ তুলে তাকালো এবং খুব অস্ফুটে আমাকে ধন্যবাদ জানাল। কিনতু আমি তার মুখে বেদনার যে ছায়া দেখলাম, আমি কোনদিন তা ভুলতে পারবোনা। আরেকটা কথা ভুলতে পারবনা, আমিতো তবু আমার মেয়েটাকে ফিরে পেয়েছি বলে যে কথাটা ভদ্রমহিলা বললেন! আমি ঠিক উনার মনের ভেতরের সেই হাহাকারটুকু শুনতে পেয়েছি। ঠিক একই পরিস্থিতিতে পরেছিলাম গত মাসে। আমার বড় মেয়ের আশীর্বাদ অনুষ্ঠানের কথা জানিয়ে ফোন করেছিলাম আমার এক পিসীকে। উনার একমাত্র মেয়ে অনার্স ফাইনাল ইয়ারে থাকা অবস্থায় মারা যায়, হার্টের ভালবে ছিদ্র ছিলো বলে। চিকিৎসকরা সময়মতো ধরতে পারেনি। পিসীকে বলাটা নৈতিক এবং সামাজিক কর্তব্য বলেই বলতে হয়েছিল। আমি জানি আমার পিসীর বুকের ভেতর কি ঝড় উঠেছিল সেদিন। জন্মেছি যখন মরতেই হবে, তাই বলে এমন অনাকাংক্ষিত মৃত্যু!!!!!!!!!!