ক্যাটেগরিঃ ব্যক্তিত্ব

 

গংগা আমার মা, পদ্মা আমার মা’ গানটা প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৭১ সালে, দূর্গাপূজার সময়। ১৯৭১ মানেই আমাদের মুক্তিযুদ্ধ, ‘৭১ মানেই আমাদের পরাধীনতার শৃংখল ভেঙ্গে বেড়িয়ে আসা, ৭১ মানেই আমাদের বিজয়, ‘৭১ মানেই আমাদের বাংলাদেশ। ঠিক ঐ সময়টাতেই এই গানটির সৃষ্টি, কি গভীর গানের কথা, কি গভীর গানের সুর। চোখ ফেটে জল আসে, যখনই গানটি শুনি বুকের ভেতর কি যে এক অনুভূতির সৃষ্টি হয়, সব অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করা যায়না অথবা তা সব সময় করা উচিতও না। আমি গানপাগল মানুষ, গান ভালোবাসি, কয়েকটা গান সঞ্জীবনী মন্ত্রের মত কাজ করে, তার মধ্যে এই গানটি হচ্ছে একটি।

‘৭১ এর মুক্তিযুদ্ধের সময় আমি ছিলাম অনেক ছোট, প্রথম কয়েক মাস দেশের ভেতর নানা জায়গায় পালিয়ে পালিয়ে থেকে শেষ পর্যন্ত ভারতে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছিলাম আমরা। মাসের নাম মনে নেই, তবে আন্দাজ করি জুলাই মাসের দিকে আমরা ভারতে পৌঁছেছিলাম, আমার কাকার ভাড়া করা বাড়ীতেই উঠেছিলাম আমরা। ঐ সময়টা যে আলাদা এক সময় সেটা বুঝতে পারতাম। আমাদের কোন বায়নাক্কা ছিলোনা,
যেমন রেখেছে বাবা মা, তেমনই থেকেছি। বিনোদনের কিছু ছিলনা, শুধু ঐ বাড়ির বারান্দায় বসে থেকে রাস্তার দোকান বা হোটেলগুলো থেকে মাইকে যে গান বাজতো, তাই শুনে কাটাতাম।

কখন দূর্গাপূজা চলে এসেছিল টেরও পাইনি, ঐ পাড়াতেই একটা পূজা হয়েছিল, কিনতু নিজেদের সব সময় বহিরাগত মনে হতো বলে ভীরু ভীরু পায়ে মাঝে মাঝে গিয়ে দাঁড়াতাম প্যান্ডেলের সামনে। দিনরাত মাইকে গান বাজতো। অনেক গানের ভেতর ভুপেন হাজারিকার ‘গংগা আমার মা, পদ্মা আমার মা’ গানটা যখনই বেজে উঠতো, আমি আর আমার ছোট ভাই দৌড়ে বারান্দায় চলে যেতাম আর কান খাড়া করে গানটা শুনতাম। আমার ছোট ভাইটা তার কচি গলাতে কি সুন্দর করে গাইতো এই গানটা। ঐ বছর লতা মুঙ্গেসকরের ‘ও প্রজাপতি, প্রজাপতি, পাখনা মেলো’ গানটাও বেরিয়েছিল, এই গানটাও আমার ছোট ভাইটা সুন্দর করে গাইতো (আমাদের আর কিছুতো করার ছিলোনা)। কিনতু ৬ বছরের এক বালিকার হৃদয়ে ‘গঙ্গা আমার মা’ গানটাতে যে কি তুমুল আলোড়ন সৃষ্টি হতো, তখনই এই গানের কথাগুলো বুঝতে পারতাম, মায়ের কাছে জানতে চাইতাম, গানটা এমন কেন। আমার মায়ের তখন তরুণী বয়স, তার উপর স্বদেশী আন্দোলনের বই পড়ে পড়ে তাঁর চিন্তা ভাবনা গুলো অন্য সব মায়েদের থেকে ভিন্ন ছিল, নিজের ঘর-সংসার ফেলে এসে যাযাবরের জীবন যাপন, কাজেই তাঁর ব্যাখ্যাগুলো ছিল অনেক অন্য রকম। সেই থেকেই আমাদের শিশু হৃদয়ে দেশপ্রেম এর বীজ বোনা হয়ে গেছে, সেই থেকেই ভুপেন হাজারিকা আমার প্রিয় শিল্পী হয়ে গেছে। অনেকের মত আমরাও থেকে যেতে পারতাম ভারতেই, কারন আমাদের কিছুই অবশিষ্ট ছিলোনা দেশে, সাত মাসে আমার বাবা আমাদের স্কুলে ভর্তি করিয়ে দিয়েছিলেন, কাকার ওষুধের দোকানের ব্যবসা খুব সচল করে দিয়েছেন, কিনতু তারপরেও আমরা থাকিনি, আমাদের দেশপ্রেমিক বাবা মায়ের হাত ধরে দেশে চলে এসেছিলাম, আমার বাবা আবার শূণ্য থেকে শুরু করেছিলেন।

১৯৭৩ বা ৭৪ এর দিকে ভুপেন হাজারিকা এসেছিলেন বাংলাদেশে, আরও এসেছিলেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়সহ অনেক শিল্পী। বাড়ীওয়ালার বাড়ীতে গিয়ে টিভিতে তাঁদের গানের অনুষ্ঠান দেখতাম। ভুপেন হাজারিকাকে প্রথম দেখেই আমি তাঁর প্রেমে পড়ে গেলাম। সত্যি সত্যি তাঁর প্রেমে পড়ে গেলাম। বালিকা বয়সে বালিকারা কত পুতুলের বিয়ে দেয়, পুতুলের বিয়ে দিতে গিয়ে আমিও স্বপ্ন দেখতে শুরু করলাম,
এই ভুপেন হাজারিকাকে বিয়ে করতে পারলে তাঁর গান সব সময় শুনতে পারা যাবে এই আশায়। আমার খেলার সাথীরা আমাকে ক্ষেপাতো, ঐ বূড়াকে বিয়ে করতে চেয়েছি বলে।

যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ি, ‘৮৪-‘৮৫ সালের দিকে, ভুপেন হাজারিকা আবার এসেছিলেন বাংলাদেশে, হোষ্টেলের টিভিরুমে সবাই মিলে তাঁর গান দেখছিলাম, মাঝে মাঝে মনে মনে লজ্জা পাচ্ছিলাম বালিকা বয়সের পাগলামীর কথা মনে করে, হঠাৎ করেই দেখি বাংলার শেফালী আপা (খুব উচ্ছল স্বভাব) জোরে জোরে বলছে, এই বুড়াকে উনি বিয়ে করতে চায়। সারা হলরুমে হাসির রোল পড়ে গেল। ভুপেন হাজারিকার চাউনি নাকি তার হৃদয়ে বাণ মেরেছে! আমার ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়লো এই ভেবে যে একা তাহলে আমিই নই, এই গায়ক অনেকের হৃদয়বীণাতে ঝঙ্কার তুলেছে।
সময় বয়ে যায়, আমার বয়স বাড়তে থাকে, বুদ্ধি বিবেচনা বাড়তে থাকে। কৈশোরের চাপল্য কেটে গিয়ে আসে তারূন্যের উদ্দীপণা। ন্যায়-অন্যায় বুঝতে শুরু করি, শাসন-শোষন, বঞ্চণা, তোষন সব কিছুর সাথে পরিচয়ের শুরু। এই বোধগুলো জাগতে শুরু করে ভুপেন হাজারিকার যত কালজয়ী গানের মাধ্যমে। ছোট্টবেলায় যে গানগুলো মানে না বুঝেই গাইতাম, সেই গানগুলোর কথা বুঝতে শুরু করি। আর মায়ের কাছে যেতে হয়নি ভুপেন হাজারিকার গানের মানে বুঝতে। “বিস্তীর্ণ দু’পারের, অসংখ্য মানুষের, হাহাকার শুনেও, নিঃশব্দে নীরবে, ও গঙ্গা তুমি বইছো কেন?” গানটি যে কোন তরুণ তরুণীর রক্তে দোলা জাগায়, অন্যায়ের বিরূদ্ধে ফেটে পড়ার ইচ্ছে জাগায়, সব বিবেকবান মানুষকে ভাবতে শেখায়। অথবা, ‘শরৎবাবুর কাছে খোলা চিঠি’ এই একটি গানই যথেষ্ট আমাদের গ্রাম-বাংলার নিপীড়িত জনগণের দুঃখ-দূর্দশার চিত্র তুলে ধরতে।
কালজয়ী গান, ‘মানুষ মানুষের জন্যে, জীবন জীবনের জন্যে, একটু সহানুভূতি, মানুষ কি পেতে পারেনা!’ সরাসরি মানুষরূপী অমানুষদের গালে এক কঠিন চপেটাঘাত। মাঝে মাঝে যখন হতাশায় মন নিমজ্জিত হয়, মানুষের নিষ্ঠুরতায় মন বিবশ হয়ে আসে, চীৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছে করে, কেবলই মনে হয়, সব মিথ্যে, মনে হয় মানুষ শুধু তার নিজের জন্যে, আর বুঝি কারো জন্যে তার কিছুই দায় নেই। কিনতু আবার হতাশা ঝেড়ে ফেলি, গানটি শুনি,’ বল কি তোমার ক্ষতি, জীবনের অথৈ নদী, পার হয় তোমাকে ধরে, দূর্বল মানুষ যদি’। নিজেকে দিয়েই শুরু করি, আমি নিজেই আমার দূর্বল হাত বাড়িয়ে দেই, আমার চেয়েও বেশী দূর্বল হাতের দিকে। চেষ্টা করি যাতে করে দূর্বলকে টেনে এক কদমও সামনে আনতে পারি। আমি যদি এক কদম সামনে টেনে আনতে পারি, আমার অসমাপ্ত কাজ আমার পরবর্তীজন শেষ করবে। আমাদের জন্যই এই গানগুলো সৃষ্টি করে গেছেন ভুপেন হাজারিকা।

অনেক পরে ভুপেন হাজারিকা রাজনীতিতে যোগ দিলেন, বিজেপি, যাকে হিন্দু জামায়াত বলা হয়, অনেকের মনে কষ্ট লেগেছে, অনেক ভক্ত মনে কষ্ট পেয়েছে। অনেকেই তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা হারাতে শুরু করেছে। আমার খুব কষ্ট লেগেছে, আমরা নিজেরা কিছুই করতে পারিনা, অথচ ভুপেন হাজারিকার মত এমন জনদরদী মানুষ, যিনি জীবনের তিন-চতুর্থাংশ সময় পার করে দিলেন সাধারণ জনগনের কল্যাণের কাজে, তাঁর এই একটা রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের কারনে তাঁর যত সৃষ্টিশীল কর্ম কি করে মুছে যাবে! আমার হৃদয়ে তিনি ঠাঁই পেয়েছিলেন দুরন্ত এক সময়ে, দুরন্ত এক গানের মাধ্যমে, তাঁকে ঠাঁই দিয়েছি তাঁর কালজয়ী গানের জন্য, তাঁকে চিনেছি তাঁর কালজয়ী গানের ভেতর দিয়ে, তাঁর প্রেমে পড়েছিল শেফালী আপা, তাঁর মোহময় দৃষ্টির কারনে, কি অসাধারণ উন্মাদনা সৃষ্টি করেছিলেন মুক্তিযোদ্ধাদের হৃদয়ে, আসামের মানুষ তিনি, কেউ তাঁকে বলে দেয়নি বাংলাদেশের পাশে দাঁড়াতে, উনি নিজের বিবেকের তাড়নায় বাংলাদেশের মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন, গানের মাধ্যমে কি অসাধারন মমতা সৃষ্টি করেছিলেন ভারতীয় জনগনের মনে, তারা আমাদের মত অসহায়দের দিকে তাদের সহযোগীতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল বলেই আমরা সাময়িক আশ্রয় পেয়েছিলাম। ভুপেন হাজারিকার রাজনৈতিক আদর্শ নিয়ে আমার কোন দুশ্চিন্তা ছিলনা, কারন যে মানুষ জনগনের জন্য গান করেছেন, তাঁর দ্বারা জনগনের কোন ক্ষতি হতেই পারেনা। কিভাবে ভুলে যাব, এক নিদারুন দুঃসময়ে এই শিল্পী আমাদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন। গনমানুষের জন্য উনার সঙ্গীত উৎসর্গ করেছিলেন!
ভুপেন হাজারিকার বয়স হয়েছিল, উনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন, সেই হিসেবে তেমন দুঃখ নেই, দুঃখ শুধু একটাই, মানবদরদী মানুষগুলো হারিয়ে যাচ্ছে, এখনই অনেক বেশি প্রয়োজন ছিল উনাদের বেঁচে থাকাটা। উনি যত মানুষের হৃদয়ে ঠাঁই করে নিয়েছেন, শুধুমাত্র তাঁর শেষ বয়সের রাজনৈতিক মতাদর্শের কারনে যারা উনার প্রতি তাঁদের শ্রদ্ধা হারিয়ে ফেলেছেন, তাঁদের বাদ দিয়েও আমার মত ভক্ত যারা থেকে যাবে, সেই আমাদের অশ্রুনদীর স্রোতে উনার ডিঙ্গা ভাসিয়ে উনি নিশ্চিন্তে নিরাপদে স্বর্গে পৌঁছে যাবেন।