ক্যাটেগরিঃ মতামত-বিশ্লেষণ

এই কয়েকদিন আগে আমার ভাগ্নী যুঁই আমার ফেসবুক ওয়ালে একটা লিঙ্ক শেয়ার করেছে। এই প্রথম ও আমার সাথে কোন লিঙ্ক শেয়ার করলো। মেয়েটি গত বছর ইঞ্জিনিয়ারীং পাশ করে এখন চাকুরী করছে, সে সদা ব্যস্ত জানি। যুঁই খুবই বুদ্ধিমতি, স্মার্ট ও মেধাবী। এমন প্রানবন্ত ছেলে মেয়েরা আমাকে যে লিঙ্ক পাঠায় তা আমি সব সময় গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করি। আমার নিজেরও ব্যস্ততা ছিল, তারপরেও লিঙ্কটা ওপেন করতেই দেখি সর্বজন শ্রদ্ধেয় ড; জাফর ইকবালের উপর লেখা একটি প্রতিবেদন এবং সেই প্রতিবেদনের উপর নানা জনের নানা মন্তব্য। ডঃ জাফর ইকবালের উপর লেখা বলেই আমি খুব মনোযোগ দিয়ে লেখাটি পড়লাম। পড়ে আমি যুগপৎ স্তম্ভিত, হতাশ ও আশান্বিত হলাম।

ডঃ জাফর ইকবালের সাথে আমার কখনও চাক্ষুস দেখা হয়নি। তবে উনার বড় ভাই ডঃ হুমায়ুন আহমেদের বাড়ি পর্যন্ত যাওয়ার ও উনার সাথে বসে চা পান করার সুযোগ বেশ কয়েকবার হয়েছে। জাফর ইকবালের বোন শিখু আপার সাথে বেশ ভালো পরিচয় ছিল, জাফর ইকবালের মা কে খুব কাছে থেকে দেখেছি, জাফর ইকবালের ছোট ভাই কার্টুনিস্ট আহসান হাবীবকেও দেখেছি বেশ কয়েকবার আমাদের ইউনিভারসিটিতে। আহসান হাবীবকে চিনতাম শাহীন নামে। তার স্ত্রী ছিল কেমিস্ট্রি তে আমার দুই ইয়ার জুনিয়ার। শাহীন ভাই ছিলেন অতি ভদ্র, কিছূটা লাজুক ও বিনয়ী টাইপ মানুষ। কাজেই ডঃ ইকবালকে চোখে না দেখেও তাঁর পরিবারের যতজনকে দেখেছি, তা থেকেই উনাকে চিনে ফেলেছি। পত্রিকাতে লেখা তাঁর কলাম পড়েতো আমি তাঁর কলামের একনিষ্ঠ ভক্ত হয়ে গেছি। আমি ড; জাফর ইকবাল বা আনিসুল হক এর গদ্য কার্টুন কখনও পেলে না পড়ে ছেড়ে দেইনা।
ডঃ ইকবালকে নিয়ে যা শুরু হয়েছে গত কয়দিন ধরে, তা এককথায় নিন্দনীয়। আগেই আমি বলেছি ড; ইকবালের সাথে সামনা সামনি পরিচিত হওয়ার সুযোগ ঘটেনি, কিনতু উনার লেখার সাথে অনেক আগেই পরিচয় ঘটেছে। পারিবারিক ঐতিহ্যের একটি ব্যাপারতো থাকেই, তার উপরেও উনার নিজস্ব বিচারবোধ, আধুনিক মানসিকতা, মত প্রকাশের সাহস, উনার অসম্ভব মেধা, রুচিবোধ সব কিছুই প্রকাশ পায় উনার প্রতিটি লেখাতে। উনারা দুই ভাই যেন কাঁধে করে দায়িত্ব নিয়েই এসেছেন, বাংলাদেশের তথা সমস্ত বাংলা ভাষাভাষীদের বই পাঠে উদ্বুদ্ধ করবেন বলে। ড; ইকবালের অগ্রজ হুমায়ুন আহমেদতো অনেক আগেই আমেরিকা ছেড়ে দেশে চলে গিয়েছিলেন, আমেরিকা আসার আগেই উনার লেখনী ক্ষমতার কিছু স্বাক্ষর রেখে এসেছিলেন, ‘নন্দিত নরকে’ বা শঙ্কখনীল কারাগার’ লিখে। তাই দেশে ফিরে গিয়ে উনার বইয়ের পাঠক তৈরী করতে তেমন পরিশ্রম করতে হয়নি। জাফর ইকবালও বিদেশের এত লোভনীয় চাকুরী ছেড়ে দিয়ে ১৮/১৯ বছর পর দেশে ফিরে গিয়ে লেখার জগতে প্রথম কিস্তিতেই বাজিমাৎ করে দিলেন। উনি লিখা শুরু করলেন একেবারে অন্য ধারায়। উনার লেখা সায়েন্স ফিকশানগুলো আমার ইংরেজী মিডিয়ামে পড়া মেয়ের কাছেও যেমন আকর্ষনীয় ছিল, বাংলা ভাষায় রচিত বলে বাংলা মিডিয়ামে পড়া আমার ভাগ্নী যুঁইয়ের কাছেও সমান আকর্ষনীয় ছিল। আর আমি নিজে উনার কলামের ভক্ত। হুমায়ুন আহমেদ রাজনীতি বা সমাজের বৈষম্যগুলো নিয়ে না লিখলেও জাফর ইকবাল কিনতু থেমে থাকেননি। উনার সায়েন্স ফিকশনের পাশাপাশি সমাজের নানা বৈষম্য নিয়ে নিয়তই লিখে যাচ্ছেন। আর তাই মনে হয় উনি এই মুহূর্তে এক শ্রেনীর পাঠক দ্বারা আক্রান্ত হয়েছেন।
একজন লেখক যখন লিখেন, উনার লেখা সবার পছন্দ হবেনা এটা জেনে নিয়েই লিখেন। একই সাথে লেখক আশা করেন তাঁর লেখার যেই অংশটি পাঠকের ভালো লাগবেনা, পাঠক শুধু সেই অংশটি নিয়ে প্রতিবাদ জানাতে পারে নানাভাবে। নানাভাবে প্রতিবাদ জানানো মানে কি লেখকের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে টানাটানি? এটাতো চরম কাপুরুষতার লক্ষ্মণ। লেখক তাঁর লেখার জন্য দায়বদ্ধ থাকেন পাঠকের কাছে, কিনতু নিজের পারিবারিক জীবন, ব্যক্তিগত চাওয়া-পাওয়াতো বন্ধক রাখেন না পাঠকের কাছে। জাফর ইকবালের লেখা সবার পছন্দ হওয়ার কথা নয়, নোবেলজয়ী রবীন্দ্রনাথের লেখাইতো অনেকের কাছে ভালো লাগেনা, রবি ঠাকুরের তুলনায় উনারা ভ্রাতৃদ্বয়তো শিশু। লেখা পছন্দ নয় বলে উনাকে আঘাত করার জন্য যে পথ বেছে নিয়েছে কিছু পাঠক, এতো আধুনিকতার মুখে চপেটাঘাতের মত! এই পাঠক শ্রেণী অবশ্যই শিক্ষিত (?), নাহলে কম্পিউটারের মত এমন আধুনিক মাধ্যমকে বেছে নিতনা কুৎসা প্রচারের জন্য। এই প্রসঙ্গেই বলতে ইচ্ছে করে, তরুণ সমাজকে কম্পিউটারের প্রতি, বিজ্ঞানের প্রতি, গনিতের প্রতি উৎসাহিত যাঁরা করেছেন, ডঃ জাফর ইকবালের নাম সবার আগে চলে আসবে। অথচ তাঁর কাছ থেকে আলোটুকু নিয়ে, সেই আলোটুকু দিয়ে অন্ধকার না ঘুচিয়ে তাঁকেই আক্রমণ করা হলো। প্রবাদ আছে, ‘উপকারীকে বাঘে খায়’, এতো দেখি তাই দাঁড়াচ্ছে।

আমি এতক্ষন ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে অনেক গিবত গাইলাম। মা হয়ে সন্তানতুল্য আরেক মেয়ের আনন্দোচ্ছল তারুণ্যের কতগুলো ছবি দেখে ভীরমি খাওয়ার মত সংস্কার আমার নেই। আমি খুবই ক্ষুব্ধ হয়েছি অন্য কারণে। এই ছবিগুলো নিশচয় ফেসবুক বা এমনই কোন নেটওয়ার্ক থেকে সংগৃহীত। ছবিগুলো যেমনই হোক, মেয়েটি নিজেতো নিজের একাউন্টের বাইরে কোথাও পোস্ট করেনি। ওর কোন ফ্রেন্ড (?) এমন কাজ করেছে। ফ্রেন্ড মানে ফেসবুক ফ্রেন্ড। ফেসবুকে অনেকেই ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠায়, তারূন্যতো বন্ধুত্বই চায়, এটাই তারূন্যের ধর্ম। তার বন্ধুত্বের সুযোগ নিয়ে যে বা যারা এই কাজটা করেছে, তারা মেয়েটির বন্ধুত্বের অমর্যাদা করেছে। তাদের ঊদ্দেশ্যেই বলি, জাফর ইকবাল এর মত মানুষ সংখ্যায় খুব অল্প, তাঁরা দেশের কান্ডারী, জাতির বিবেক। নির্লোভ এই মানুষটি বিদেশের সমস্ত সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য পেছনে ফেলে, শুধুমাত্র দেশকে ভালোবেসে পরিবার পরিজন নিয়ে দেশে চলে গেছিলেন। শিক্ষকতার মত মহান পেশায় টাকা-পয়সা নেই জেনেও এই পেশাকেই উনি বেছে নিয়েছেন। মেধাবী বাবা মায়ের সন্তানেরাও মেধাবী হয়। বাবার দেশপ্রেম যদি সন্তানের মধ্যেও থেকে থাকে, তাহলে উনার মেয়েটারও তার মেধা দেশের কাজেই উৎসর্গ করার কথা। কিনতু পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে মেয়েটা আজ বাবার কাছে যদি প্রশ্ন করে, কেন তাঁকে আজ এই পরিস্থিতির শিকার হতে হলো, কি উত্তর দিবে বাবা তাঁর মেয়েকে। মেয়েটা যদি এখন আমেরিকাতেই ফিরে আসতে চায়, কিভাবে আটকাবে বাবা তাঁর এই ব্যথায় নীল হয়ে যাওয়া মেয়েটাকে! অনলাইনের এই কিস্যা কাহিনী দেখে আমাদের মত দেশে ফিরে যেতে আগ্রহী বাবা মায়ের ছেলে মেয়েরা যদি বেঁকে বসে, তাহলে কি খুব অবাক হওয়ার কিছু থাকবে! খুব অন্যায় আচরণ করা হয়েছে ডঃ ইকবালের প্রতি, তাঁর মেয়েটার প্রতি। বিশ্বাসঘাতকতার ফল আজ না হোক, কাল এরা পাবে। নিজের ঘরেই বিদ্রোহ শুরু হবে। নিজের মনেই পাপবোধ আসবে, পাপবোধের যন্ত্রণা নাকি অসহ্য যন্ত্রণা! তবে তারা সংখ্যায় অনেক কম, তাদেরকে এখনই থামাতে হবে। কারন ডঃ ইকবালের আদর্শে তৈরী তরূন সমাজে তরূন-তরূনীর সংখ্যা অগুনতি। অনলাইনে ‘নিটোল’ নামের বাচ্চা এক ছেলে ডঃ ইকবালের হয়ে যে লেখাটি লিখেছে, ছেলেটির কাছে আমার এবং অনেকের অনেক কিছু শেখার আছে। কি সুন্দর যুক্তি দিয়ে, ভালো-মন্দ দুই দিক উল্লেখ করে করে লেখাটি সে তৈরী করেছে। ২২/২৩ বছর বয়সী এক ছেলের কলম থেকে বের হয়ে এসেছে ৬০/৭০ বছর বয়সীর অভিজ্ঞতাসম লেখা। সমবয়সী ভাগ্নী যুঁই তার শত ব্যস্ততার মাঝেও আমাকে লিঙ্কটা পাঠাতে ভুলেনি। নিটোলের লেখাটির নীচেই অনেক কমেন্ট লেখা হয়েছে। কমেন্টদাতাদের মধ্যে যারা বয়সে তরুন, তাদের কমেন্টগুলো পড়ে আনন্দে চোখে জল আসে, ভাল লাগায় মনটা ভরে যায়। এরাই আমাদের ভবিষ্যত, এরাই আমাদের আশার আলো। কিছু কমেন্ট পড়তে গিয়েই থেমে গেছি, ওখানেই, কারন এই কমেন্টগুলো পড়া শেষ হলেই মুখটা তেতো হয়ে যাওয়ার ভয় ছিল। আলোকিত ছেলেমেয়েদের কমেন্ট পড়ে মনের কষ্ট অনেকটাই লাঘব হয়েছে। এরাই ডঃ ইকবালের অনুসারী। ডঃ ইকবাল যতটুকু লজ্জা পেয়েছেন তাঁর প্রানপ্রিয় মেয়েটার কাছে, উনার মেয়েটা যতটা বিব্রতবোধ করেছে তাঁর প্রানপ্রিয় বাবার সামনে, নিটোলের এই একটি লেখাই পুরো আধুনিক তরুন সমাজের প্রতিনিধিত্ব করে, এই একটি লেখার মাধ্যমেই অনলাইন পাঠকেরা বাবা ও মেয়ের কাছে ক্ষমা প্রার্থণা করে। এখানেই ডঃ ইকবালের সাফল্য। কয়লাখনি ঘেঁটে তবেই হীরক খন্ড পাওয়া যায়, হীরকটাই থেকে যায় হাতে, কয়লা পড়ে থাকে। নিটোল আমাদের হীরক খন্ড, বাকী যাদের নিয়ে এতক্ষন গিবত গাইলাম, তারা কয়লা।

মেয়ে ইয়েশিমকে বলছি, মামনিগো শোন, আমার কথা নয়, কবির কথা, “মেঘ দেখে তোরা করিসনে ভয়, আড়ালে তার সূর্য্য হাসে।
হারা শশীর হারা হাসি, অন্ধকারেই ফিরে আসে”
তোমরাই টিকে থাকবে, তোমরাই জয়ী হবে, মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারিওনা, বিশ্বাসে মিলাবে বস্তু।