ক্যাটেগরিঃ প্রবাস কথন

 

আংটি সমাচার

প্রতিদিন কত ক্রেতা যে আসে, একেকজনের একেক প্রয়োজন, একেক জনের একেক রকম ব্যবহার। আজ যার কথা আমার খুব বেশী মনে পড়ছে, তিনি একজন মোটামুটি বয়স্ক মহিলা। আফ্রিকান আমেরিকান, বয়স মোটামুটি ৬০ এর উপরেই হবে। খুব বেশী বড় কোনো প্রয়োজন নিয়ে আসেননি মহিলা। উনার প্রিপেইড ফোনের জন্য মিনিট কার্ড কিনতে এসেছিলেন। আমি যখন তাকে চেক আউট করি, দেখি তার দশ আঙ্গুলের আট আঙ্গুলেই আংটি শোভা পাচ্ছে। আংটিগুলো আহামরী কিছুনা, বেশীর ভাগ গুলো দেখতে কেমন পেতল পেতল। (১০ ক্যারেট বা ১৮ ক্যারেট গোল্ড এর রঙ এমনই হয়)।আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘তুমি কি আংটি পরতে খুব বেশী ভালোবাস নাকি এই আংটিগুলোর সাথে তোমার কোন স্মৃতি জড়িয়ে আছে”! মহিলা প্রথমে একটু থমকে গিয়ে নিশ্চিন্ত হতে চাইলো আমার ঊদ্দেশ্য সম্পর্কে। বললাম নিছক কৌতুহল, ভাল লাগে সবার গল্প শুনতে। প্রথম আংটি দেখিয়ে বললো তার গ্র্যাজুয়েশান এর সময় ৪০ বছর আগে তার বাবা-মা তাকে ওটা উপহার দিয়েছিল।

দ্বিতীয় আংটি দেখিয়ে বললো তার ছোট ভাই মারা যাওয়ার আগে বড়বোনকে স্মৃতিচিহ্ন দিয়ে গেছে, ৩ বছর আগে। তাকে মাঝ পথে থামিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, তোমার ভাই জানলো কিভাবে নিজের মৃত্যু সম্ভাবনার কথা। জবাবে বললো, ভাইয়ের লাংস ক্যান্সার হয়েছিল, ডাক্তার তাকে জবাব দিয়ে দিয়েছিল।আরেক আংটি দেখিয়ে বললো, তার পাঁচ সন্তানের বার্থ স্টোন দিয়ে বিশেষভাবে তৈরী, আমিও জানলাম যে তার পাঁচ ছেলেমেয়ে। পরের আংটি দেখিয়ে বললো, এটা তার এনগেজমেন্ট রিং কিনতু বিয়েটা হয়নি। প্রশ্ন নিয়ে তাকাতেই বললো যে তার ফিঁয়াসে তার সাথে প্রতারণা করেছে, এনগেজমেন্ট হয়ে যাওয়ার পরও সে অন্য মেয়ের প্রেমে পড়েছিল, তাই তাকে বাতিল করে দিয়েছে। এবারের আংটি যেটা দেখালো, সেটা তার নিছক শখের আংটি। এবার সাদা পাথর বসানো আরেক আংটি দেখিয়ে বললো যে এটাও এনগেজমেন্ট রিং এবং এবারেও বিয়েটা হয়নি। জিজ্ঞেস করার আগেই সে নিজে থেকেই বললো, এবারের ফিঁয়াসেও তার সাথে প্রতারণা করেছে! আমি বললাম, কি ব্যাপার, দুজনেই তোমার সাথে প্রতারণা করলো, অথচ তাদের দেয়া আংটি তুমি এখনও আঙ্গুলে পড়ে আছ? বললো সে তাদের জিজ্ঞেস করেছিল তারা আংটি ফিরিয়ে নিতে চায় কিনা, কিনতু কেউ আর আংটি ফেরত নেয়নি।

এবার তাকে প্রশ্ন করে জানলাম তার একবার বিয়ে হয়েছিল ১৮ বছর বয়সে। সেই স্বামীর সাথে ১৬ বছর সংসার করেছে, পাঁচ ছেলে মেয়ে জন্মানোর পর সে জানতে পেরেছে যে তার স্বামী আরেক নারীর প্রতি অনুরক্ত। যেই জানা অমনি গেট আউট করে দিয়েছে স্বামীকে তার জীবন থেকে। তার পরে ১২ বছর একা থেকে পর পর দুই ফিঁয়াসের কাছ থেকেও একই রকমভাবে প্রতারিত হয়ে এখন সে আবার একা জীবন কাটাচ্ছে। জানতে চাইলাম, “আচ্ছা, যাদের সাথে বিয়ে হয়নি, তাদের দেয়া আংটি এখনও পরে আছ, যার সাথে বিয়ে হয়েছিল তার দেয়া আংটি কোথায় গেল? সে নিজেও মনে হয় অবাক হলো এটা ভেবে, বললো কি জানি কোথায় কখন হারিয়ে গেছে! তবে তার কোন দুঃখ নেই, যারা এমন প্রতারণা করতে পারে, তাদের দেয়া আংটি থাকলেই কি আর না থাকলেই বা কি!

তাঁকে শুভ বিদায় জানাতেই সে আমার দিকে কেমন একটা অবাক চাউনি দিয়ে বললো, ‘এই ধরনের প্রশ্ন এর আগে কেউ আমাকে করেনি, তুমি কোন দূর দেশের মানুষ, আমাকে এমন প্রশ্ন করার কথা কেন তোমার মনে এলো বলোতো! আমি নিজেও খেয়াল করিনি, এত স্মৃতি জড়িয়ে আছে আমার এই আংটিগুলোর সাথে। তবে আমার কাছ থেকে এই শিক্ষা নিয়ে রাখো, পুরুষ কে বিশ্বাস করোনা, এরা তোমার বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে তোমাকে ঠকাবে”। আমি তার প্রতি একটি সহানুভূতি সূচক হাসি দিয়ে তাঁকে বিদায় জানালাম।

আমার অস্ট্রেলিয়ান ভাই

আমি আমার টিব্রেক টাইমে এমনিই দাঁড়িয়েছিলাম ক্রেডিট কার্ড টেবিল এর পাশ ঘেঁষে। আমার এক পাশে কতগুলো টেলিভিশন ডিসপ্লে করা ছিল। হঠাৎ করে দেখি পাতলা শরীর, ৬ ফিটের উপর লম্বা, সাদা চামড়ার এক ভদ্রলোক আমার কাছে এসে ঐ টিভিগুলোর দাম জানতে চাইলো। আমি আমার সহকর্মী আরেকটি মেয়েকে দেখিয়ে দিলাম। কিনতু দেখি ভদ্রলোক আরও কিছুক্ষন দাঁড়িয়ে থাকলো ঐ জায়গাতেই। তাঁর কথা বলার ভঙ্গী বা উচ্চারণ একটু অন্য রকম লাগাতে আমি নিজেই তাকে যেচে জিজ্ঞেস করলাম, সে অরিজিন্যালি কোনদেশের মানুষ। জবাবে বললো অস্ট্রেলিয়ান সে। বললো আমেরিকান এক মহিলা কে বিয়ে করে তিন বছর ধরে সে আমেরিকাতে আছে, আর কিছুদিন পরেই সিটিজেনশীপ পেয়ে যাবে।

আমি যেহেতু অস্ট্রেলিয়াতে ছিলাম কিছুকাল, তাই আমেরিকাতে অনেকেই আমাকে জিজ্ঞেস করে দুই মহাদেশের লাইফ স্টাইলে কোন তফাৎ আছে কিনা। মাত্র তিন বছর থেকে তফাত আর কতটুকুই বা বুঝব, সবাই বলে আমেরিকাতে লাইফ অনেক ফাস্ট, আমি এটাও বলতে পারবনা ভাল করে, কারন আমি অস্ট্রেলিয়াতে বাঙ্গালী কম্যুনিটিতে নিজেকে সীমাবদ্ধ রেখেছিলাম, অস্ট্রেলিয়ান প্রতিবেশী যারা ছিল, তাদের লাইফ স্টাইল আর আমার আমেরিকার প্রতিবেশীদের লাইফ স্টাইল আমার কাছে একই রকম মনে হয়। আমি এই অস্ট্রেলিয়ানকেই জিজ্ঞেস করলাম, সে কোন তফাত বুঝতে পারে কিনা। সেও আমার মতই নির্বোধ, তেমন কোন তফাত দেখেনা। অস্ট্রেলিয়ানদের বর্ণবাদী বলা হয়, আমিতো আমার আশে পাশের আমেরিকানদের মধ্যেও বর্ণ বৈষম্য দেখি। সাদারা কালোদের প্রতি যেমন নাক উঁচু করে রাখে, কালোরাও কম যায়না, সাদাদেরতো দুই চক্ষে দেখতে পারেইনা, তার চেয়েও বড় কথা, মেক্সিকানদের প্রতি আরো বেশী হেলা অশ্রদ্ধা দেখায়। সাদারা তাদের বৈষম্যবাদ প্রকাশ করেনা, কিনতু কালোরা সব কিছুই প্রকাশ করে ফেলে।

আমি অস্ট্রেলিয়াতে ছিলাম শুনে ভদ্রলোক তার চোখ মুখ বড় করে ফেললো, আমাকে জিজ্ঞেস করলো আমি মেলবোর্ণের কোন অংশে ছিলাম, আমি তাকে বিনীতভাবে বললাম যে আমি ‘দিককানা’ (আসলেই আমি দিককানা, পূর্ব পশ্চিম কিছুই বুঝিনা বা আমার ব্রেইন এর এই অংশ কখনও ডেভেলপ করেনি), তাই শহরের নাম বললাম, শহরের নাম শুনেই সে পারলে ঐখানেই এক লাফ দেয় আর কি। তার ছেলে থাকে ঐ শহরে, তাই আমার সাথে সে এক আত্মীয়তার বন্ধন নাকি টের পাচ্ছে। সে তিন বছরে এই প্রথম একজনকে পেল যে নাকি তার দেশে ছিল, সে ঐ মুহূর্তেই আমার সাথে বোন সম্পর্ক পাতিয়ে ফেললো (আমি দেখলাম যত বড় ডিগ্রীধারীই হইনা কেন, স্বদেশ এর প্রসঙ্গ আসলেই সবাই এক কাতারে চলে আসি।)

পরিশেষেঃ আমি অস্ট্রেলিয়াতে থাকাকালীন সময়ে আমার স্বামীর সাথে শপিং এ গেছি একদিন। মলের এক কোনায় দাঁড়িয়ে আছি, বিরাট দশাসই এক সাহেব কাছে এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করলো আমি কোন দেশের। বললাম বাংলাদেশের, সে বললো সে ঢাকাতে ছিল অনেকদিন, ১৯৭০ সালের দিকে, সে বাংলা শিখেছে, এখনও কিছু মনে আছে। আমি সোৎসাহে জিজ্ঞেস করলাম, কি কি মনে আছে, আমার স্বামীও একটু কৌতহলী হয়ে উঠল, সে দুই একটা মামুলী বাংলা শব্দ বলে লজ্জা লজ্জা মুখ করে বললো তার বিশেষ করে মনে আছে সব গালি গালাজ গুলো। বললো সে এক রিকশাওয়ালার সাথে খাতির করে এই শব্দগুলো শিখে নিয়েছে। তার মুখনিঃসৃত শব্দগুলো শুনে আমি প্রথমে স্তম্ভিত হয়ে গেছি, বিশেষ করে আমার অত্যন্ত ভদ্রলোক বরের উপস্থিতিতে এমন রুট লেভেলের গালিগালাজ শুনব ধারণাতেও ছিলনা! পরে মনে হলো, হোক গালিগালাজ, তবুওতো বিদেশের মাটিতে বসে বিদেশীর মুখ থেকে বাংলা শুনলাম, যে ২৫ বছর আগে শিখে এসেছিল শব্দগুলো, এখনও মনে রেখে দিয়েছে, সাংবাদিকতা করতে গিয়ে তার কাজইতো ছিল, একেবারে রুট লেভেলে মিশে যাওয়া। খুশীর চোটে আমি তাকে নেমন্তন্ন করে ফেললাম, অবশ্য তাকে ঠিকানা দিতে ভুলে গেছিলাম, ফোন নাম্বারও দেয়া হয়নি, তাই তার সাথে আর দেখাও হয়নি। কিনতু মনে গেঁথে আছে ঐদিনের ওই ছোট্ট মুহূর্তটুকু!