ক্যাটেগরিঃ দিনলিপি

জাফরান,

কেমন আছিস দোস্ত! তোর পাঠানো মেসেজ পেলাম! রেগে মেগে অস্থির হয়ে আছিস। তোকে অনেকদিন লিখা হয়নি বলে এত রাগ ঝাড়লি আমার উপর! তোর রাগ এখনি পানি হয়ে যাবে এমন একটা খবর তোকে শুনাব। দোস্ত আমাদের একটা সুখবর আছে। এর বেশী কিছু আর বলবোনা, যদি তোর ঘটে কিছু বুদ্ধি অবশিষ্ট থাকে, তুই সাথে সাথেই বুঝে যাবি সুখবরটা কি হতে পারে, নাহলে কি আর করা, সুখবরটা আমার চিঠির পরবর্তী অংশ থেকে জানতে পারবি।

শোন, আমেরিকাতে আসার পর থেকে আমার আত্মীয়-স্বজনরা আমার মাথার পোকা ঝেড়ে ফেলছে এক কথা বলতে বলতে, ‘নীল, বাচ্চা নিয়ে নাও, বাচ্চা নিয়ে নাও’। আরে! কি ঝামেলা বল, ইউ এস এম এল ই পরীক্ষার জন্য রেডী হতে হচ্ছে, এই পরীক্ষা পাশ না করতে পারলে ডাক্তারী করতে পারবোনা এই দেশে। এই ব্যাপারটা কাউকেই বুঝাতে পারছিনা। শেষ পর্যন্ত আত্মীয়-স্বজনের আকাংক্ষার কাছেই হার মানলাম। তবে চিন্তা করিসনা, পরীক্ষাতে বসবো ঠিক সময়ে, নাহলে এখানে রূপা আন্টির প্যাঁদানী খেতে হবে। খুব অবাক হচ্ছিস রূপা আন্টির নাম শুনে! ভাবছিস এই নামেতো কোন আন্টি ছিলনা আমার! হা হা! সত্যিরে! এই আন্টি আমার নতুন আন্টি। আন্টি এক মজার মানুষ।

খুব সংক্ষেপে আন্টির পরিচয়টা দিচ্ছি। আমাদের বিয়ের সময় আন্টি বাংলাদেশে ছিল বলে আমাদের বিয়ের রিসেপশানে আসতে পেরেছিল। খুব ছোট করে করেছিলাম আমরা অনুষ্ঠানটা, শুধু কাছের মানুষদের নিয়ে। এমন এক ঘরোয়া অনুষ্ঠানে রূপা আন্টির থাকার কথা না, তারপরেও শাহীন আন্টিকে দাওয়াত দিয়েছিল এবং আন্টি এসেছিল। আমিতো নতুন বউ, শাহীন শুধু পরিচয় করিয়ে দিল এই বলে, “নীল, এই আমাদের রূপা আন্টি, আমারিকাতে ইনি আমাদের সবার আন্টি। তোমারও আন্টি”। তারপরতো আমি আমেরিকাতে চলে এলাম, সবার সাথে একটু একটু করে পরিচিত হতে থাকলাম। বিশ্বাস কর জাফরান, এই আন্টি না সত্যি সত্যি ছোট বড় সবার কাছেই আন্টি নামে পরিচিত। এখানে আরও কিছু বাঙ্গালী ফ্যামিলি আছে, আমরা কারো বাড়ীতে দাওয়াত ছাড়া যাইনা, কিনতু রূপা আন্টির বাড়ীতে দাওয়াত ছাড়া যাই। আঙ্কেল-আন্টি দুজনেই উঠে পড়ে লেগে যায় কিভাবে আমাদেরকে একটু যত্ন করে খাওয়াবে। আন্টির হাতে মনে হয় যাদুর কাঠি আছে, যে কোন সময় গেলেই সাত আট আইটেম রেডী করে ফেলে। আঙ্কেল খুবই ভালো মানুষ, কেমন ঋষি ঋষি টাইপ ভালো, আর আন্টি? প্রথমে বলি, আন্টিকে দেখে কেউ বলতে পারবেনা আন্টির আসল বয়স কত, তারপর আন্টির ব্যবহার দেখে কেউ বুঝতে পারবেনা আন্টির বয়স কত, কাজেই বুঝতেই পারিস আন্টির প্রিয়তা কতখানি আছে আমাদের মাঝে। আন্টির বড় মেয়ে ডাক্তারী পড়ে, এবার তুই আন্দাজ করে নে তাঁর বয়স কত হতে পারে।

আন্টির সাথে ফেসবুকেও আমার দারূন জমে। আমি সবসময় শাহীনকে নিয়ে স্ট্যাটাস লিখতাম ফেসবুকে, অনেকেই আমাকে তার জন্য ঢংগী বলতো শুধু আন্টি আমার স্ট্যাটাসগুলি খুব এনজয় করতো। আম্মু আমাকে না করেছে এমন স্ট্যাটাস আর লিখতে, তাই আমি আর লিখিনা, কিনতু সেদিন আন্টি আমাকে বললো অন্য কথা,” নীল, শোন, যারা নিজেরা আনন্দ করতে জানেনা, তারা অন্যকেও আনন্দ দিতে জানেনা। তুমি নিজে আনন্দ করতে জানো বলেই তোমার স্ট্যাটাসগুলোতে তা প্রকাশ পায়, সেই আনন্দ তোমার সাথে আমরাও শেয়ার করে নেই। এখানে দোষের কিছু নেই, যাদের পছন্দ হবেনা তারা পড়বেনা, ব্যস হয়ে গেল, অন্যের ভালো লাগার মূল্য দিতে গিয়ে নিজের ভালোলাগাটুকু নষ্ট করোনা”। এই আন্টি দেখি ফেসবুকেও খুব রেগুলার। মজার কথা কি জানিস, বাচ্চা মেয়েদের মত আন্টি প্রতিদিন প্রোফাইল পিকচার চেঞ্জ করে। এত ছবি তুলে আন্টি যে তুইও ফেল আন্টির কাছে। আন্টির মেয়েও ফেল আন্টির কাছে। আমার মনে হয় কি জানিস, আন্টির প্রোফাইল পিকচার দেখেই অনেকে আন্টির সাথে ফ্রেন্ডশিপ করতে চায়। আমিতো আন্টির সাথে খুব ফ্রী, আমি আন্টিকে যদি এগুলো নিয়ে ঠাট্টা করি, আন্টি খালি মুচকী মুচকী হাসে, তারপর আবার হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ে। হয়ত কোন গোপন রহস্যের কথা মনে পড়ে যায়, তাই হাসে। ভালো কথা, আঙ্কেল আর আন্টির সম্পর্কের কথা বলি নাই, উনাদের দুইজনকে দেখলে মনটা ভালো লাগায় ভরে যায়। কি গভীর ভালোবাসা উনাদের মধ্যে, কোন রকম লোক দেখানো কিছু নেই, তারপরেও যে কেউ বলে দিতে পারে এদের গভীর ভালোবাসার কথা। আমি মাঝে মাঝে আঙ্কেলকে ক্ষেপাই এই বলে যে, আঙ্কেল আপনিতো ফেসবুকের খবর রাখেননা, আন্টি কিন্তু অনেক জনপ্রিয় ফেসবুকে, আপনার দিকে খেয়াল দেয়তো ঠিক মত? আঙ্কেলও খালি হাসে। ওহ! আসল কথাই লিখিনি, আন্টি ফেসবুকে শুধু স্ট্যাটাস আর ছবি নিয়েই ব্যস্ত থাকেনা, উনি কিনতু লেখিকা হয়ে গেছে ইদানীং। প্রথম প্রথম উনার লেখা আমাদের ওয়ালে শেয়ার করতো, আমিও না পড়েই একটা ‘লাইক’ দিয়ে দিতাম, মাঝে মাঝে ‘অপূর্ব’ দারুন’ ‘এক্সেলেন্ট’ টাইপ কমেন্টও দিতাম। একদিন আন্টি আমাকে শাহীনের সামনেই বললো,” আচ্ছা নীল, তুমি ঐ লেখাটাতে ‘লাইক’ দিয়েছো কেন, ওটাতো লাইক এর জন্য না” সাথে সাথে শাহীন বলে দিয়েছে যে আমি না পড়েই লাইক দিয়ে যাই। আমি এমন লজ্জা পেয়েছি, আর আন্টি দেখি হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ে! এরপর থেকে আন্টি এই কাজটা করা বন্ধ করে দিয়েছে। আর কারো সাথে শেয়ার করেনা, কিনতু লিখে চলেছে দূর্বার গতিতে, পত্রিকাতেও ছাপা হয় দেখি উনার লেখা।
সেদিনই ঘটলো ঘটনাটা, আমরা আন্টির বাড়ীতে গেছি আমাদের সুখবরটা দেয়ার জন্য। খাওয়া দাওয়া করে ফেরার সময় আঙ্কেলকে বললাম,” আঙ্কেল, আন্টি দেখি প্রতিদিন দুইটা তিনটা করে লেখা পোস্ট করছে, তার মানে আন্টি আপনার দিকে আর খেয়াল দিতে পারেনা, সারাদিন মনে হয় লেখা নিয়েই বসে থাকে”। আঙ্কেলও হাসতে হাসতে উত্তর দিল,’ “ আরে আর বলোনা, এখন দুপুরে ঘরে এসে আমি খাবার পাইনা, যদিও তেমন অসুবিধা হয়না, আমি মুড়ি খেয়ে আবার চলে যাই কাজে, কিনতু তোমার আন্টি নিজেও খায়না, রান্নাও করেনা আগের মত”। আন্টির মুখটা দেখি কেমন ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। আমতা আমতা করে বললো,” কেন, আমিতো রান্না করি, আমার সকালে কাজ থাকলে শুধু চলে যেতে হয়, নাহলে রাতেতো এখনও আমরা তিন আইটেম দিয়েই খাই। অবশ্য এটা ঠিক, আমি আর রান্না করার মত সময়ও পাইনা, ইচ্ছেও করেনা। ঘরও গোছাতে ইচ্ছে করেনা, খালি মনে হয় লিখি আর লিখি। মরে গেলেতো আমার কিছুই থাকবেনা, লিখতে পারলে আমার লিখাগুলো থেকে যাবে তোমাদের কাছে।“
আমি বাড়ী চলে এসে পর্যন্ত মনটা খারাপ হয়ে আছেরে। গত পাঁচ দিন হয়ে গেল, আন্টির লেখা পোস্ট হচ্ছেনা। আন্টিকে ফোন করেছিলাম, আন্টি আগের মত কি সুন্দর করে আমার খোঁজ খবর নিল, কিনতু যেই মাত্র লেখার কথা জানতে চাইলাম, ঐ প্রসঙ্গে একটা কথাও না বলে খুব মিষ্টি করে একটা হাসি ছড়িয়ে দিল ফোনের ভেতর দিয়ে। আমার মনটা আরো খারাপ হয়ে গেলোরে!

জাফরান, ভালো থাকিস। এবার নিশ্চয় বুঝতে পারছিস, কেন আমার এই মৌনতা। আমার শরীর ভালো আছে। মনটাই শুধু একটু খারাপ আছে। দেখি আন্টিকে আবার লেখা লেখিতে ফিরিয়ে আনা যায় কিনা। তোকে বলি, পরে আমি আন্টির লেখাগুলো সবগুলো পড়েছি, অনেক ভালো লেখে আন্টি, আগে আন্টির সাথে ঠাট্টা করেছি এই বলে যে পত্রিকার সম্পাদক মনে হয় আপনার প্রেমে পড়েছে, নাহলে যাই লিখেন তাই ছাপাতোনা। ঠিক করেছি আজকে আন্টির বাড়ী গিয়ে আন্টির অভিমান ভেঙ্গে দিয়ে আসবো। আমাদের রূপা আন্টি আবার লিখতে শুরু করবে। বলে আসবো আমাকে নিয়ে যেন একটা গল্প লিখে ঈদ সংখ্যাতে পাঠায়, যাতে করে আমার আম্মু দেখে যে তার মেয়েটা হঠাৎ করেই বিখ্যাত হয়ে গেছে! উত্তর দিবি কিনতু চিঠির। আকাশ ভাইয়াকে আমার শুভেচ্ছা জানাস। আমাদের সুখবরটাও জানাতে ভুলিসনা।
তোর ‘নীলাম্বরী’