ক্যাটেগরিঃ মতামত-বিশ্লেষণ

সকালে অনলাইনে গিয়ে যে খবরটা আমাকে অভিভুত ও আশান্বিত করেছে, তা হলো ‘ফারজানা’ নামের সাহসী মেয়ের সাহসী পদক্ষেপ। যদিও খবরটি এতক্ষনে সবার পড়া হয়ে গেছে, তবুও আমার লেখার প্রয়োজনে সংক্ষেপে খবরটির পুনরাবৃত্তি করছি। ফারাজানার বিয়ের আসরেই বরবেশী হীরনের আত্মীয়-স্বজনেরা হঠাৎ করে যৌতুক দাবী করে বসে। শিক্ষক (?) হীরন আত্মীয়-স্বজনের এমন অনৈতিক দাবীর প্রতিবাদ না করে তাদের দাবীর প্রতি সমর্থন জানাতেই, বধূবেশী ফারজানা প্রতিবাদস্বরূপ ঐখানেই হীরনকে তালাক দিয়ে দেয়। এরপর তার নিজের পরিবারের সকলের অনুরোধ বা তালাক হয়ে যাওয়া বরের অনুরোধ, কোন কিছুই তার অটল সিদ্ধান্ত থেকে তাকে একচুল পরিমান নাড়াতে পারেনি। সাবাস ফারজানা!

এবার আমাকে দিয়ে শুরু করি। খুব সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারে আমার জন্ম। তিন ভাই ও এক বোনের মাঝে আমার অবস্থান তৃতীয়। একটি মাত্র মেয়ে নিয়ে আমার বাবা মা খুব খুশী ছিলেন। খুশী হয়েছিল আমাদের আত্মীয়-স্বজনরাও, তবে আমার গায়ের রঙ দেখে তাদের কপালে একটু দুঃশ্চিন্তার ভাঁজও পড়েছিল। আমার গায়ের রঙ কালো ছিল বলেই সবার হয়তো চিন্তা হচ্ছিল এই ভেবে যে কালো মেয়ের বিয়ে দিতে গেলেতো যৌতুকের চাপে অন্ধকার দেখবে এই আপাত খুশী বাবা। কারন বিয়ের বাজারে কালো মেয়েদের মূল্য নির্ধারিত হয় মেয়ের বাপের অর্থনৈতিক শক্তির উপর। সেদিক থেকে চিন্তা করলে আমার বাবার জন্য অবশ্যই ব্যাপারটা দুঃশ্চিন্তারই ছিল।

বড় হতে হতে আমি কিনতু কখনও গায়ের রঙের জন্য কোন হীনমন্যতায় ভুগিনি। কারন আমার বাবা সব সময় ছেলে মেয়েকে অভিন্ন চোখে দেখতেন। আমার বাবাকে কেউ কখনও জিজ্ঞেস করার সাহস পায়নি, কালো মেয়ের বিয়ের জন্য যৌতুক রেডী রেখেছে কিনা। কেননা আমার বাবা উচ্চকন্ঠে অহরহ একটা কথাই বলতেন, “আমার মেয়েকে এমনভাবে তৈরী করে দিচ্ছি, এই মেয়ে নিজেই একটি বড় যৌতুক। কালো বলে যদি কেউ বিয়ে করতে না চায় আমার মেয়েকে, প্রয়োজনে আমার মেয়ে বিয়ে করবেনা, তবুও যৌতুক দেবনা”। আমার বাবার এমন গর্ব, খর্ব হয়নি কখনও। খুব কম বয়সে অনার্স পড়াকালীন সময়ে কোনরকম যৌতুক ছাড়াই বিয়ে হয়ে গেছে আমার।

এরপর আমাদের প্রথম সন্তান জন্মালো মেয়ে। মেয়েটা জন্মাবার আগেই আমার এক ঘনিষ্ঠ আত্মীয়া আমাকে বলেছিল, যদি এমন হয়, আমার একটি মেয়ে হলো, এবং গায়ের রঙ পেলো আমার মত, তাহলে কেমন হবে! উত্তরে বলেছিলাম, “সন্তানতো বাবা মায়ের মতই দেখতে হবে। শুধুতো দেখা নয়, মেধাটাও তো পাবে আমাদের থেকে। তাহলেই চলবে, বাবা মায়ের মেধা নিয়ে জন্মালেই হবে। কালো নিয়ে আমাদের কোন অহেতুক দুঃশ্চিন্তা নেই, আমরা চাই সুস্থ সন্তান।“ হ্যাঁ, আমাদের প্রথম সন্তান মেয়ে, দ্বিতীয় সন্তান মেয়ে এবং তৃতীয় সন্তানও মেয়ে। অনেক বাবা মায়ের চোখে মুখে অন্ধকার দেখার কথা তিন মেয়ে নিয়ে, কিনতু আমরা দেখতে পাচ্ছি আলো। আমাদের ভুলেও একবারের জন্যও মনে আসেনি যৌতুক নিয়ে দুঃশ্চিন্তা। আমরা আমাদের সাধ্যমত চেষ্টা করে যাচ্ছি মেয়েদের প্রতিষ্ঠিত করতে।

যৌতুক যদিও এখন সামাজিক ব্যাধি, তবে আগে যৌতুক প্রথা হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। দুঃখের কথা হলো, মেয়ে সন্তান জন্মানোর সাথে সাথেই খুশী হওয়ার বদলে বাবার মাথায় দুঃশ্চিন্তা শুরু হয়ে যেত, আর মায়েদের মুখ শুকিয়ে কালো হয়ে যেতো। মায়েরা ভাবার সুযোগই পেতনা নিজের জীবন বিপন্ন করে আরেকটা প্রানকে পৃথিবীর আলো দেখানোর মধ্যে কতটা গৌরব নিহিত থাকে। মায়েরা আঁতুড়ঘরে বসে থেকে ঘরের মানুষের দীর্ঘশ্বাস, পাড়া-প্রতিবেশীদের টীকা টিপ্পণী শুনত আর চোখের জলে ভেসে নিজেকেই দায়ী মনে করতো এমন অনাসৃষ্টি কাজের জন্য। স্কুলে যখন পড়তাম, বন্ধুদের মধ্যে অনেক বিষয় নিয়েই তর্কাতর্কি হতো। সমস্যা হলো, সব তর্কে যুক্তি দিতে পারতাম, একটিমাত্র বিষয়ে ছাড়া। যখনই বিয়ের কথা উঠতো, বন্ধুরা হিন্দুদের যৌতুক বা পণপ্রথার খারাপ দিক নিয়ে কিছু বললেই আমার মাথাটা নীচু হয়ে যেত। এর কোন প্রতিবাদ করতাম না বা করার কোন ভাষাও জানা ছিলোনা। বাড়ী এসে মাকে জিজ্ঞেস করতাম, যৌতুকের এই প্রথা সম্পর্কে। মায়ের ব্যাখ্যা ছিল এমন, “যেহেতু হিন্দু মেয়েরা বিয়ের পর পিতার সম্পত্তির অংশ পায়না, তাই মেয়ের বিয়ের সময় বাবা যতটুকু পারে, দানসামগ্রী হিসেবে ততটুকু মেয়েকে দিয়ে দেয়। পরবর্তীতে কন্যার প্রতি পিতার এই দূর্বলতার সুযোগ নিয়ে বরপক্ষ ব্যাপারটাকে দর কষাকষির পর্যায়ে নিয়ে গিয়ে প্রথাতে রূপান্তরিত করে ফেলেছে। প্রথা ব্যাপারটা ধর্মীয় না, সামাজিক। হিন্দুদের মাঝে সতীদাহ প্রথা যেমন ছিল, যৌতুকটাও তেমনি প্রথা। যে কোন প্রথাই সমাজের কল্যানে ভাঙ্গা যায়, সতীদাহ প্রথা যেমন বন্ধ করা গেছে, বিধবা বিবাহ যেমন চালু করা গেছে তেমনি যৌতুক প্রথাও বন্ধ করা যায়, তার জন্য প্রয়োজন সচেতনতা। সকলেরই সচেতন হতে হয়, শুধু একপক্ষ সচেতন হলে হবেনা, মেয়েদের সাথে সাথে ছেলেদেরও সচেতন হতে হবে।“

যৌতুক প্রথা যে একটি সামাজিক ব্যাধি, সেটা আরও স্পস্ট হয়েছে যখন যৌতুকের লোভ হিন্দু, মুসলমান নির্বিশেষে সবার মাঝে ছড়িয়ে পড়েছে। আগে ভাবা হতো বুঝি সুন্দরী মেয়েদের ক্ষেত্রে যৌতুক লাগেনা, (যদিও আমার মত অনেকের কাছেই সৌন্দর্য্যের সংজ্ঞা আলাদা) কিনতু দিনে দিনে সব ধারনা বদলে গেছে। এখন সুন্দরী বা কালো মেয়ে বলে আলাদা কোন বিবেচনা করা হয়না, বিয়ে করাতে গেলেই ছেলের বাবা মায়েদের চাহিদার ফর্দ বাড়তেই থাকে। আমার অবাক লাগে ভাবতে, মেয়ে হয়েও কিভাবে ছেলের মায়েরা, ফুফু-খালারা, মাসী-পিসীরা ছেলে বিয়ে করাতে গিয়ে কন্যার বাবা-মায়ের উপর এমন চাপ সৃষ্টি করে! এভাবেই আরও স্পস্ট হয়েছে, একটি পুত্র লাভের আশায় কেন বাবা মায়ের এত আহাজারী। পুত্র মানেই ভবিষ্যত নিশ্চয়তা। পুত্র যদি বিয়ের যুগ্যি হতে পারে কোনরকমে, তাহলেই কেল্লা ফতে। ব্যস শুরু হয়ে যায় বিনা খরচে লাভজনক ব্যবসা। ভারতের দক্ষিনী এক মেয়ের সাথে আমার পরিচয় হয়েছিল। মেয়েটি আমেরিকাতে এসেছে পি এইচ ডি করতে, দেখতে মিষ্টি কিনতু গায়ের রঙ কালো বলে তার বিয়ের ভবিষ্যত নিয়ে দুঃশ্চিন্তা ছিল। এমন গুণী মেয়ের কিসের এত দুঃশ্চিন্তা জিজ্ঞেস করতেই সে জানালো, তাদের সমাজে মেয়ের বিয়েতে ‘ডাউরী’ বা যৌতুক একটি প্রচলিত প্রথা। মেয়ে কালো না ফর্সা, বিদূষী নাকি অশিক্ষিতা, সেটা নাকি তেমন ইম্পর্ট্যান্ট না। মাঝে মাঝে সে নাকি চিন্তাও করে, বিয়ে না করেই বাকী জীবন কাটিয়ে দেওয়ার।

তবে সময় পাল্টেছে। এখন মেয়েরা অনেক বেশী সচেতন হয়ে উঠছে। আর এই সচেতনতার কাজটুকু শুরু হচ্ছে ঘর থেকে। আমার বাবার বয়স বর্তমানে ৮৪ বছর। আমার বাবা সেই কোন আমলেই সচেতন ছিলেন, তাঁর সচেতনতা আমার ভেতর ছড়িয়ে দিয়েছিলেন। আমার নিজের তিনটি মেয়ে হয়েছে, আমার মেয়েগুলি আমার সম্পদ। আমার ছেলে থাকলে যেভাবে মানুষ করতাম, একইভাবেই মেয়েদের বড় করছি। আমিতো মেয়েকে মেয়ে হিসেবে বড় করছিনা, মানুষ হিসেবে তৈরী করছি। আমি মেয়েদের বলে দিয়েছি, আমার মেয়েকে শুধু জীবনসঙ্গী হিসেবে মর্যাদা দিয়ে যে বিয়ে করতে চাইবে, তাকেই যেন বিয়ে করে। কোন বোকা যদি ভুল করে যৌতুক দাবী করে বসে, তার কথা যেন আর দ্বিতীয়বার চিন্তা না করে। ফারজানার বাবাও নিশ্চয়ই তাঁর চার মেয়েকে পড়ালেখা শেখানোর দিকেই বেশী মনোযোগ দিয়েছিলেন, নিজের পায়ে দাঁড়াতে শিখিয়েছিলেন, সেই ফাঁকেই ফারজানা নিজের মর্যাদা বুঝতে শিখেছে, নিজেকে অন্যের সম্পত্তি না ভেবে, নিজেই যে একটি অমূল্য সম্পদ সেই বোধকে লালন করেছে, আর তাই ফারজানা বিয়ের আসরেই হীরনকে তালাক দিতে পেরেছে।

তবে শুধু মেয়েরাই সচেতন হয়নি, এখনকার যুগটাই আসলে একেবারে অন্যরকম। এখানে খারাপ মানুষ যেমন আছে, তার চেয়ে ভালো মানুষের সংখ্যা অনেক বেশী। ফারজানা যে কাজটি আজকে করেছে, এই একই কাজ যদি ২৫ বছর আগে কোন মেয়ে করতো, জানিনা সমাজ কোন চোখে দেখতো মেয়েটিকে। অথচ আজকের দিনে, ফারজানার এই সাহসী কাজটিকে সত্যিকারের মর্যাদা দিচ্ছে সমাজের অধিকাংশ ছেলেমেয়েরা। যদিও ‘হীরন’ও এই যুগেরই ছেলে, তবে এদের সংখ্যা মনে হয় কমতে শুরু করবে। কারন বিবেকবান ছেলেমেয়ের সংখ্যা বেড়েই চলেছে, নাহলে এত প্রতিবাদ শুরু হতোনা ‘হীরনের’ বিরুদ্ধে।
এবার ‘হীরনের’ উদ্দেশ্যে কিছু কথাঃ পত্রিকা পড়ে জানলাম, বিয়ের আগেই ফারাজানার সাথে আপনার কথাবার্তা হয়েছিল। আপনি শিক্ষক মানুষ, মানুষ চেনার কথা, আপনি চিনতে পারেননি ফারজানার মত এমন তেজস্বী মেয়েকে! এই মেয়েই যখন কারও বউ হবে, সেতো তার জন্য খুব বড় অবলম্বন হবে। তারপর এই মেয়ে যখন মা হবে, সে হবে একজন তেজস্বী মা, যে সন্তানকে সুশিক্ষা দিয়ে বড় করবে। আপনি ফুফুর কথাকেই মূল্য দিলেন, ভবিষ্যতে ফুফুর কথামত হয়ত যৌতুক নিয়ে বিয়েও করবেন। ভবিষ্যতে যখন ছেলেমেয়ে হবে, ছেলে হলেতো ভালো, খুবই খুশীর কথা, ছেলের বিয়ে দিয়ে যৌতুক নিতে পারবেন আর যদি ফারজানার বাবার মত আপনারও চারটি মেয়ে হয়, একেক মেয়ের বিয়ের যৌতুক দিতে গিয়ে আপনার মত শিক্ষকের কি অবস্থা হবে, একটু ভেবে দেখবেন। কারন আপনাদের কারনে ফারজানার বাবা যেভাবে বিব্রত হয়েছেন, ফারজানা প্রশংসিত হওয়ার পাশাপাশি কিছুটা হলেও বিব্রতও হয়েছে নিশ্চয়ই, প্রকৃতির নিয়ম অনুযায়ী আপনাদের জীবনেও আবার ফিরে আসবে এই দিন। তারচেয়ে বরং যা হয়েছে তাতো হয়েই গেছে, পত্রিকাতে বিজ্ঞাপন দিয়ে ক্ষমা চান ফারজানার কাছে, ফারজানার বয়সী সমস্ত মেয়েদের কাছে, ফারজানার বাবার কাছে। তাহলে কিছুটা হলেও কৃতকর্মের জন্য প্রায়শ্চিত্ত হবে।