ক্যাটেগরিঃ প্রবাস কথন

এমিলি ও তার গর্বিত শাশুড়ী

আমার কাজ হচ্ছে ফোন সার্ভিস নিতে আগ্রহী গ্রাহকদের সহযোগীতা করা। আমি তা অতি আনন্দের সাথে করার চেষ্টা করি। এই কাজ করতে গিয়ে আমি আজ যাদের দেখা পেলাম, আমার মনটা ভালো লাগায় ভরে গেছে। এক হোয়াইট আমেরিকান ভদ্রমহিলা, বয়স আনুমানিক ৫৩ বা ৫৪ বছর হতে পারে, আমার কাছে এসেছিল, ফোনের নেটওয়ার্কের সমস্যা নিয়ে কথা বলতে। যদিও এটা ফোন কোম্পাণীগুলোর টাওয়ারের সমস্যা, তবুও এই কথাগুলোই আমি ভদ্রমহিলাকে বুঝিয়ে বলা শেষ করতেই, ভদ্রমহিলা আমাকে বললো যে আমার ইংলিশ উচ্চারণ নাকি তার কাছে খুব ভালো লেগেছে। স্বাভাবিকভাবেই পরবর্তী প্রশ্ন ছিল আমি মুলতঃ কোন দেশ থেকে এসেছি। বাংলাদেশ থেকে এসেছি শুনেই ভদ্রমহিলা, ‘এমিলি এমিলি শীগগীর আসো’ বলে কাউকে ডাকতেই যে এসে হাজির হলো আমাদের সামনে, দেখি অপূর্ব সুন্দরী ২৫ বছর বয়সী এক তরুণী। একেবারে আমাদের মেয়েদের মত, মুখে কি সলজ্জ হাসি, কি অমায়িক ভাব চেহারাতে!

ভদ্রমহিলা জিজ্ঞেস করে জেনে নিলেন যে আমি বাংলায় কথা কই, আমাকে বললেন এমিলি নাকি কলকাতাতে থেকেছে এক বছর, বাংলা পড়তে ও লিখতেও শিখেছে, বলতেতো পারেই। এরপর তিনি এমিলিকে অনুরোধ করতে লাগলেন আমার সাথে বাংলায় কথা বলার জন্য। মেয়েটা দেখি খুব লজ্জা পাচ্ছিল, আমিই সহজ করে দিলাম মেয়েটাকে, বললাম তুমি শুরু করো। মেয়েটা স্পষ্ট উচ্চারণে যা বললো, “আমার নাম এমিলি, কলকাতাতে আমার স্বামীর সাথে এক বছর ছিলাম। ওখানে গড়িয়াহাটে থেকেছি, আধুনিক শিশু শিক্ষা বিষয়ে পড়াশোনা করতে গিয়েছিলাম। আমি খুব আশ্চর্য্য হয়েছি একজন বাঙ্গালীকে এখানে পেয়ে”। মাত্র একবছরে এমন বাংলা বলতে আমি অন্ততঃ কাউকে দেখিনি। আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে থেকে ওকে বাংলাতেই জিজ্ঞেস করলাম, ‘এই ভদ্রমহিলা তোমার কে হন?” সে উত্তরে বললো, ‘উনি আমার শাশুড়ী। আচ্ছা রীতা আন্টি, আপনি কি রান্নাও করেন এখানে? সব বাঙ্গালী খাবার রান্না করেন?” আমি তাকে জানালাম যে আমি প্রতিদিন রান্না করি, এবং বাঙ্গালী খাবার রান্না করি। (বুঝলাম সে অলরেডী শিখেছে, আমাদের দেশে কাউকে নাম ধরে ডাকার রেওয়াজ নেই, তাই সে আমার নামের ব্যাজ থেকে নামটি দেখে সাথে আন্টি যোগ করে ফেলেছে)।

এমিলির শাশুড়ী এবার জানালেন যে উনারা ইন্ডিয়ানা থেকে এসেছেন মিসিসিপিতে কারন উনার ছেলের পোস্টিং হয়েছে মিসিসিপি এয়ারবেসে, ছেলে তার ফুল ব্রাইট স্কলারশীপ নিয়ে ইন্ডিয়াতে গিয়েছিল, এখানে ফিরে এসে ছেলে খুব আপসেট, কারন কারো সাথে বাংলা চর্চা করার সুযোগ পাচ্ছেনা বলে। ঈশ্বরকে ধন্যবাদ জানালেন যেহেতু আমার মত এমন খাঁটি বাঙ্গালীকে পেয়ে গেছেন। উনার ফোন নাম্বার দিলেন, এমিলির ফোন নাম্বার দিলেন,আমার ফোন নাম্বার নিলেন।

বাড়ী এসে আমার স্বামীকে বললাম ঘটনাটি, বেশ কিছুক্ষন পরে আমার স্বামী আমাকে বললেন যেনো নেক্সট ছুটির দিনে এমিলি ও তার শাশুড়ীকে নেমন্তন্ন করি। মনে পড়ে গেল, এমিলির শাশুড়ীও আমাকে বলেছিল, মাঝে মাঝে যেনো এমিলির খোঁজ খবর নেই। আমার স্বামীর প্রস্তাবে আমি সায় দিলাম।

প্রিয়ার মুখে হাসি ফোটাতে

কালো এক ভদ্রলোক এসেছিলেন আমাদের এখানে ফোন সার্ভিস কন্ট্র্যাক্ট নিতে। আমিই ছিলাম ডিউটিতে। নতুন ফোন সার্ভিস নিতে চাইলে আমাদের প্রথম কাজ হলো, গ্রাহকের ক্রেডিট হিস্ট্রি চেক করা। আমরা গ্রাহকের সমস্ত পারসোন্যাল ইনফর্মেশান কম্পিউটারে সাবমিট করার পর ক্রেডিট ব্যুরো থেকে রেজাল্ট আসে। সেই রেজাল্টের ভিত্তিতেই ঠিক হয় গ্রাহককে কোন ডিপোজিট মানি জমা দিতে হবে কিনা। ভদ্রলোক দেখি কেমন একটু আমতা আমতা করছিল। আমি তাকে সব কথা বুঝিয়ে বলার পর সে আবার ফিরে আসবে বলে চলে গেলো।

আধঘন্টা বাদে সে সাথে করে নিয়ে এল সাদা আমেরিকান এক মেয়ে।( ইদানিং প্রায়ই দেখি কালো ছেলেদের সাথে সাদা মেয়েদেরকে। কিনতু সাদা ছেলের পাশে কালো মেয়ে কখনও দেখিনি। কে জানে, এদেশেও হয়তো সাদা চামড়ার কদর বেশী!) বাচ্চা মেয়ে, কেমন অভিমানী অভিমানী মুখ করে পাশে দাঁড়িয়েছে। আমি ক্রেডিট চেক করে দেখলাম দুই ফোন লাইনের জন্য তাকে দিতে হবে ৬০০ ডলার ডিপোজিট। তার উপর অভিমানী জেদ ধরেছে ‘আইফোন ৪’ দিতে হবে তাকে। দুই বছরের কন্ট্র্যাক্ট নিলে প্রতিটি ‘আইফোন ৪’ র জন্য দিতে হবে ৯০ ডলার। ছেলেটি দেখি করুণ মুখে দাঁড়িয়ে আছে। আমি তাকে অন্য ফোন নিতে বললাম, যেগুলো একটু সস্তা পড়বে। ছেলেটি মেয়েটির দিকে তাকাতেই মেয়ে মুখ ঘুড়িয়ে ঐ জায়গা থেকেই চলে গেল। ছেলেটিকে আমি বললাম যে তুমিতো অনেক বড়লোক মনে হয়, নাহলে ৬০০ ডলার ডিপোজিট দেয়াতো সোজা কথা না! সে বললো যে সে একেবারেই সাধারণ মানুষ, কিনতু তার ফিঁয়াসে কে সে এত ভালোবাসে যে এই টাকার পরিমান তুচ্ছ তার কাছে।

শেষ পর্যন্ত প্রিয়ার আবদারে সে ৬০০ ডলার ডিপোজিট দিয়ে, ২০০ ডলার ফোনের জন্য দিয়ে, ৮০ ডলার একটিভেশান ফি দিয়ে দুইটি ‘আইফোন ৪’ নিতেই, মেয়েটির মুখ অনিন্দ্য সুন্দর হাসিতে ভরে গেলো। সে যখন চুক্তিপত্রে সাইন করছিলো, আমি তাদের জিজ্ঞেস করলাম তারা কবে বিয়ে করতে যাচ্ছে। উত্তরে ছেলেটি বললো, ‘এই ডিসেম্বারে’ আর মেয়েটি বললো, ‘আমরা এখনও জানিনা কবে বিয়ে করবো। এক বছর আগে আমাদের এমগেজমেন্ট হয়েছে, আরও সময় দরকার বিয়ের ডিসিশান নিতে।” বয়স কত জানতে চাইতেই মেয়েটি জানাল তার বয়স ১৮, ছেলেটির বয়সতো আমি আগেই জেনেছি, ২৬ বছর।

চুক্তিপত্র সাইন হয়ে যেতেই দেখি মেয়েটির মুখে হাসির বন্যা, ছেলেটির মুখেও প্রশ্রয়ের এক অপূর্ব হাসি। আমার দেখে এত ভালো লাগলো যে ছেলেটিকে বলেই ফেললাম, ‘জীবনে টাকা আসে টাকা চলেও যায়, কিনতু এমন মুহুর্ত বার বার আসেনা। তোমাদের অভিনন্দন”।