ক্যাটেগরিঃ স্বাস্থ্য

 

আমি যেদিন জানতে পারলাম যে আমি মৌটুসীর মা হতে চলেছি, তার দুইদিন আগেই আমি স্কীন ইনফেকশানের জন্য ডাক্তারের প্রেস্ক্রীপশান অনুযায়ী ৫ দিনের টেট্রাসাইক্লিন কোর্স কমপ্লিট করে ফেলেছি। ফলে প্রথম যে গায়নোকলজিস্টের (ঢাকা শহরের নামকরা চিকিৎসক) কাছে গেলাম, উনি টেট্রাসাইক্লিনের কথা শুনে সাথে সাথে মত দিয়ে দিলেন যেন এখনই এম আর করিয়ে ফেলি। নাহলে অসুস্থ বাচ্চা (দাঁত ও হাড়ের গঠনে ডিফেক্ট থাকবে) জন্মাবে। এই কথা শুনে আমাদের দুজনের মুখই কালো হয়ে যেতে দেখে উনি উনার স্বামীর (উনিও প্রথম সারির গায়নোকলোজিস্ট) মতও নিলেন, সেই বিখ্যাত গায়নোকোলজিস্টও একই মত দিলেন। মন খারাপ করে বাড়ী ফিরে এসে গেলাম আমাদের পারিবারিক বন্ধু রীনা বৌদির কাছে। বৌদি তখন ঢাকা শহরের নামকরা কলেজের ভাইস প্রিন্সিপ্যাল। উনি বললেন তৃতীয় মত নিতে। উনার মত মানুষের কথা ফেলার সাধ্যি আমাদের ছিলোনা। বৌদিই পাঠালেন ডাঃ ফিরোজা বেগমের কাছে।

‘৮৬ সালের নির্বাচনের তোড়জোর চলছিল তখন । ডাঃ ফিরোজা বেগম নিজেই প্রার্থী ছিলেন। খুব ব্যস্ত ছিলেন ঐদিন, যেদিন নিতান্তই অনভিজ্ঞ তরুনী আমি গিয়েছিলাম উনার কাছে, উনার মতামত জানতে। উনি নির্বাচনী মিটিং এ বের হয়ে যাচ্ছিলেন, জুনিয়র ডাক্তারটি ডাঃ ফিরোজা বেগমকে বের হওয়ার মুখেই থামালেন, আমাকে দেখিয়ে বললেন, আমি যা জানতে চেয়েছিলাম। ডাঃ ফিরোজা বেগম থামলেন, আমার দিকে তাকালেন, দুই মিনিটে বলে দিলেন,” কোন অসুবিধ নেই, তুমি বাচ্চা পৃথিবীতে নিশ্চিন্ত মনে নিয়ে আসো। টেট্রাসাইক্লিন এর ইফেক্ট কার্যকর হয় তিন মাসের প্রেগন্যান্সির পর থেকে। তুমি এখনও অনেক আর্লি স্টেজে আছো, যাও, নিশ্চিন্ত মনে বাড়ী ফিরে যাও।

তিনজন বিখ্যাত ডাক্তারের মধ্যে তৃতীয় জনের মতের উপর ভিত্তি করে জীবনের এত বড় একটা ডিসিশান নিতে যাচ্ছি, মনের উপর চাপ অনেক পড়েছে। এমন সময় আমার স্বামী আমাকে শুধু বলেছিলেন, ” আমরা দুজনে ঠিক করেছি বাচ্চাটাকে পৃথিবীতে নিয়ে আসব, যিনি আমাদের সাহস দিয়েছেন, তাঁর কথাটাই মাথায় রেখো, আশা করি সুস্থ বাচ্চা হবে, কিনতু যদি অন্য দুই ডাক্তারের আশংকাই সত্যি হয়, তাহলেও আমরা দুজনেই তাকে মনপ্রান দিয়েই গ্রহন করবো।” ঐ কথার পরে মৌটুসীর জন্ম মুহুর্ত পর্যন্ত আমার মনে আর কখনও একবারের জন্যও কোন দ্বিধা আসেনি। ১৮ ই নভেম্বার, ১৯৮৬, মঙ্গলবার, বিকেল সাড়ে তিনটার সময় সিজারিয়ান অপারেশনের মাধ্যমে আমাদের প্রথম সন্তান মৌটুসী সম্পূর্ণ সুস্থদেহে এই পৃথিবীর আলো দেখে।

আমাদের মৌটুসী আগামী বছর আমেরিকার মিসিসিপি মেডিক্যাল স্কুল থেকে ডাক্তারী পাশ করে বের হবে। সারা শিক্ষাজীবন সে ফুল স্কলারশীপ নিয়ে পড়ে এসেছে। সে অত্যন্ত বিনয়ী, খুব ভালো আর্ট জানে, নাচ জানে, খুব ভালো স্পীচ দিতে জানে, নানারকম সামাজিক উন্নয়নমূলক কাজে নিজেকে সম্পৃক্ত রাখে।

এখন ভাবি, কি হতো, সেদিন যদি রীনা বৌদির কাছে না যেতাম, তাহলেতো ডাঃ ফিরোজা বেগমের কাছে যাওয়া হতোনা। যদি ডাঃ ফিরোজা বেগমের কাছে না যেতা্ম তাহলেতো ঐ ঐশ্বরিক বাণীটাও পেতামনা, আমার স্বামীরও আমাকে এমন সাহসী বাণী শুনানোর প্রয়োজন হতোনা, সব কিছুই যদি ‘না’ হতো তাহলে আমরা এমন স্কলার মেয়েটাকে পেতামনা, অথবা যদি প্রথম দুই ডাক্তারের মতের প্রতিই শ্রদ্ধা রাখতাম, তাহলে আমাদের দেশ আগামীর এমন মেধাবী একজন ডাক্তারকে পেতোনা। (আমার মেয়ে ঠিক করেই রেখেছে, সে হয়তো বাংলাদেশেই গিয়ে তার চিকিৎসা সেবা শুরু করবে। জীবনের বাস্তবতায় তা যদি পুরোপুরি সম্ভব নাও হয়, তবুও সে বাংলাদেশের সাথে তার লিঙ্ক রাখবে।)

মেয়ে মেডিক্যাল স্কুলের ফাইনাল ইয়ারে আছে। ইদানীং সে খুব দুঃশ্চিন্তা করে। কি নিয়ে এত দুঃশ্চিন্তা জিজ্ঞেস করতেই সে জানালো যে আর কিছুদিন পরেই শুরু হবে তার আসল পরীক্ষা, সব সময় তটস্থ থাকতে হবে যেনো তার মুহূর্তের ভুলের খেসারত আরেকজনকে দিতে না হয়। মেয়ে আমার কিছু নিয়ে দুঃশ্চিন্তা করলেই আমি নিজেই খুব চিন্তিত হয়ে পড়ি। এইবেলা খুব নিশ্চিন্ত বোধ করলাম। এটাই চেয়েছিলাম। আমাদের জীবনে ঈশ্বরের পরেই ডাক্তারকে জন্ম-মৃত্যুর নিয়তি নির্ধারক ধরা হয়। কাজেই আদর্শগত দিক চিন্তা করলে চিকিৎসাপেশা হচ্ছে আগাগোড়া একটি মহত পেশা। মানুষের জীবন-মৃত্যুর সূতা তাদের হাতেই থাকে, কাজেই তটস্থতো থাকতেই হবে। নিজের পক্ষে যততুকু সম্ভব ততটুকুতো করতেই হবে। নাহলে আর কিসের জন্য ডাক্তারী পড়তে যাওয়া!

তবে বর্তমানে বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। বাস্তবে চিকিৎসাপেশা হচ্ছে সবচেয়ে লোভনীয়, আকর্ষনীয় ও ব্যস্ততম পেশা। আমাদের দেশে অন্ততঃ ডাক্তার হতে পারলেই হলো, জীবনে আর পিছন ফিরে তাকানোর প্রয়োজন হয়না। আমাদের দেশে জনসংখ্যাই শুধু বাড়ে, আর তার সাথে সাথে বাড়ে অভাব অনটন ও রোগ শোক। যতই অভাব থাকুক, যতই রোগে-শোকে জর্জড়িত হোক, শেষ পর্যন্ত সহজেই মরতে কে আর চায়! তাই ডাক্তারের কাছে ধর্না দিতেই হয়। আর এইজন্যই দেশে প্রতিটি ডাক্তারের কাছে রোগীর ভীড় লেগেই থাকে। পছন্দের ডাক্তার দেখাতে গেলে একমাস আগে থাকতে এপয়েন্টমেন্ট নিতে হয়। সমস্যা হলো, সব অসুখ নিয়েতো আর বসে থাকা যায়না। এমনও বিপদ হয় যে এই মুহূর্তে সঠিক ঔষধ না পড়লে হয়তো রুগীকে বাঁচানোই যাবেনা, সেক্ষেত্রে কি করবে সাধারন মানুষ। তারপরেও ভুল চিকিৎসারতো শেষ নেই। যতবার পত্রিকা পড়ে জানতে পারি ভুল চিকিৎসার ফলে অথবা চিকিৎসকের গাফিলতির ফলে কত প্রান অকালেই ঝরে যায়, তখন মনে হয়, আমেরিকার মত, আমাদের দেশেও যদি ডাক্তারদের জবাবদিহিতা থাকতো, যদি রুগীদের ক্ষমতা থাকতো আইনের দ্বারস্থ হওয়ার, তাহলে শ্রদ্ধেয় মৃদুলকান্তি চক্রবর্তীকে এভাবে হারাতে হতোনা।

শুধু কি ভুল চিকিৎসা? চিকিৎসকের দ্বারস্থ হতেইতো কত কাঠ-খড় পোড়াতে হয়।সম্প্রতি আমাদের পরিবারে ঘটে যাওয়া ছোট্ট একটি ঘটনা বলিঃ গত জুলাই মাসের ১৫ তারিখ ছিল শুক্রবার, আমার বাবা হঠাৎ করে অসুস্থ হয়ে পড়লেন। ৮৪ বছর বয়সী বাবাকে ফোন করেছিলাম, আমাদের বিবাহবার্ষিকীতে আশীর্বাদ চেয়ে। ফোন করেই জানতে পারলাম বাবা চেতনার ভেতর নেই। আমার ভাই ডাক্তারের জন্য ছোটাছুটি করে হয়রান হচ্ছে। কিনতু শুক্রবার নারায়নগঞ্জে কোন ডাক্তার নাকি পাওয়া যায়না। ঐদিন ডাক্তারদের ছুটি। রুগী মরে গেলে যাক, কিনতু ডাক্তার কারো বাড়ী যাবেইনা। হাসপাতালে নিতে গেলে লাগে এম্বুল্যান্স, এম্বুল্যান্স পেতে গেলে আরেকদফা দৌড়াদৌড়ি, এভাবেই যখন বাবাকে ক্লিনিকে (বেটার ট্রিটমেন্টের আশায়) নিয়ে গেল, হাসপাতাল থেকে বলে দেয়া হলো ঢাকা নিয়ে যেতে। এবার আমার ভাইয়েরা চোখে মুখে সর্ষেফুল দেখতে লাগলো। শুক্রবারের রাত ৯টায় রওনা দিয়েছে নারায়নগঞ্জ থেকে, ঢাকা পৌঁছেছে রাত সাড়ে এগারোটায়। ঢাকা মেডিক্যালে নিলে বারান্দায় রাখতে হবে রোগীকে, এতো রাতে ঢাকা শহরে এই চেতনাহীন বৃদ্ধ বাবাকে নিয়ে ছেলেদের ছোটাছুটি নতুন কোন ঘটনা নয়, কিনতু যাদের বাবা, তাদের কাছেতো ব্যাপারটা খুবই হতাশাজনক। আমেরিকা থেকে কিছুটা প্রভাব খাটিয়ে ঢাকা শহরের সবচেয়ে নামী দামী হাসপাতালের একটিতে ভর্তি করানোর ব্যবস্থা হতেই জানা গেলো যে ব্লাডে সোডিয়াম লেভেল এত বেশী নীচে নেমে গেছিল যে সময়ের আরেকটু হেরফের হলে ডাক্তারের হাতের বাইরে চলে যেত ব্যাপারটা। আমাদের ভাগ্য ভাল বলতেই হবে, বাবাকে সুস্থ করতে পেরেছি।

আমাদের দেশের বর্তমান বাস্তবতায় ডাক্তারদের জন্যও মায়া লাগে। তারাওতো মানুষ, তাদেরও একটা জীবন আছে, তাদেরও ভাল-লাগা মন্দ লাগা আছে, তাদেরও পরিবার-পরিজন আছে, তার প্রতিও পরিবারের সদস্যদের কিছু দাবী থাকে, সেই দাবী সব সময় উপেক্ষা করা যায়না অথবা উপেক্ষা করা উচিতওনা। সবচেয়ে ভালো হয়, যদি সাধারন মানুষের ভেতর সচেতনতা বাড়ানো যায়। ‘নিজেকে সুস্থ রাখাটা প্রধান কাজ’ এই বোধটা প্রত্যেকের ভেতর তৈরী হলে কিছু কিছু রোগ থেকে নিজেকে মুক্ত রাখা যায়। ডাক্তারের উপরও চাপ কমে আসবে, ডাক্তাররাও হাতে কিছুটা সময় পাবে একটু পড়াশোনা করার, রোগের চিকিৎসা পদ্ধতি নিয়ে অন্যরকম কিছু ভাববার, তাছাড়া চিকিৎসা করার এই একঘেয়েমী থেকেও মাঝে মাঝে মুক্তি পাবে। তাদেরওতো মুক্ত বায়ু দরকার, কারন তারাও আমাদের মতই রক্ত-মাংসে গড়া মানুষ।