ক্যাটেগরিঃ গণমাধ্যম

 

আমার কিশোরী বয়সে শিক্ষক মায়ের কঠোর শাসনে থেকে কিশোরী বয়সের অনেক আহ্লাদীপনা থেকে বঞ্চিত হয়েছি, আর পাঠ নিয়েছি শুধু নীতি শিক্ষা। সব কিছুর একটা সময় থাকে, আমার বয়সী সবাই যখন রাজ্জাক-শাবানা বা রাজ্জাক-কবরীর গল্প করতো, আমি মুখ শুকনো করে শুনতাম, আর মনের ভেতরে মায়ের শাসনের কারনে এক ধরনের অসহায়তা বোধ করতাম। সবাই সিনেমা জগত সম্পর্কে কতকিছু জানত, ব্যতিক্রম ছিলাম শুধু আমি! গল্পের আসরে আমি কিছুই বলতে পারিনা, কোন মতামতও দিতে পারিনা, এর চেয়ে লজ্জার আর দুঃখের কিছু ছিলোনা আমার কাছে।

বাবার ছিলো খুব হিসাবের সংসার, পত্রিকা কিনতো সাপ্তাহিকগুলো, তাও সব খটমট টাইপ, রাজনৈতিক আলোচনা থাকতো ঐসব কাগজে। যতই আদর্শবাণী শুনিনা কেনো, বয়সটাতো ছিলো বিনোদনমূলক খবর পড়ার জন্য উদগ্রীব। আমাদের ঘরে সিনেমা জগতের কোন কাগজ ঢুকতোনা। আমাকে প্রতিবেশীদের ঘরেও যেতে দেওয়া হতোনা তেমন করে। কারন ছিল, প্রতিবেশীদের ছেলেমেয়েরা পড়াশোনার প্রতি একেবারেই মনোযোগী ছিলনা, পরীক্ষা পাশ নিয়েও তাদের কোন চিন্তা ছিলনা। এমন একটা পরিবেশে থেকে নিজের চারটি ছেলেমেয়েকেই ক্লাসের সেরা হিসেবে দেখতে গেলে বাবা মাকে এমন কঠোর হতেই হয়, যদিও এই বুঝটা এসেছে নিজের সন্তান জন্মানোর পরে।

বন্ধুদের আসরে আমি হারতে রাজী ছিলামনা, তাই যেটুকু সুযোগ পেতাম প্রতিবেশীদের ঘরে যাওয়ার, গিয়েই তাদের পত্রিকার পাতাটা চেয়ে নিতাম। অন্য কোন খবর পড়তামনা, শুধু রূপালী জগতটুকুই পড়তাম। সপ্তাহে একদিন থাকতো রুপালী জগতের খবর। তখন থেকেই পত্রিকা পড়ার নেশা শুরু। এদিকে আমার বন্ধুদের কাছেও আমার কদর বেড়ে যেতে থাকে, এক সময় তারাই আমাকে জিজ্ঞেস করতো নায়ক নায়িকাদের চলতি ঘটনাবলী সম্পর্কে, আমিও বিজ্ঞজনের মত উত্তর দিয়ে যেতাম। ধীরে ধীরে স্কুলের গন্ডী পেরিয়ে কলেজে ঢুকে যাই, তখন আমার রূপালী জগতের গল্প জানার নেশাও কমতে শুরু করে। তবে কলেজ জীবনের দুই বছর ছিল একেবারেই পানসে আলুনী টাইপ।

এরপর বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে বাধাহীন, শাসনহীন স্বাধীন জীবন। আমার ছাত্র জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়। বাবা মায়ের শাসনে থেকে বড় হতে হতে নিজের ভালো-মন্দ বুঝতে শিখে গেছিলাম, তাই আমাকে নিয়ে মায়ের আর দুঃশ্চিন্তাও ছিলনা। তবে কি জানি কেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকাকালীন পত্রিকা ছুঁয়েও দেখিনি কোনদিন। এমনও হতে পারে, হোস্টেলে থেকে টিভি নিউজেই সমস্ত খবর পেয়ে যেতাম, আর তখনতো রঙ্গীন টিভি থাকায় টিভিতে প্রচারিত হামদ-নাত থেকে শুরু করে অনুষ্ঠান সমাপ্তির জাতীয় সঙ্গীত পর্যন্ত সবই দেখতাম। কাজেই টাটকা বাসী দেশী বিদেশী খবর, শিল্পকলার খবর সবই পেয়ে যেতাম।

এরপরতো বিয়ে করি, নিজের সংসার, নিজের সবকিছু, প্রথমেই দৈনিক পত্রিকা রাখতে শুরু করি। একটু একটু করেই পড়তাম, কেননা কেমিস্ট্রি অনার্স ফাইনাল পরীক্ষা চলে আসাতে পড়াশুনাতে মন দিতে হয়েছে, কারন সারা বছর বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের স্বাধীনতা ভোগ করতেই বেশী মনোযোগী ছিলাম, ছুটির দিনগুলিতে পড়াশুনা বাদ দিয়ে আমরা বন্ধুরা মিলে কোথায় কোথায় বেড়াতে চলে গেছি, ফলে পড়ার রেসে পিছিয়ে গেছিলাম। বিয়ে হয়েও মুক্তি নেই, বাবার রক্তচক্ষুর ভয়ে বেড়ানো খেলানো বাদ দিয়ে কিছুদিনের জন্য বই নিয়ে বসতে হয়েছিলো। তারপর পড়াশুনার পাট সাঙ্গ হলো, আবার শুরু করলাম রেগুলার পত্রিকাপাঠ। এবার বয়সের সাথে সাথে আমার পড়ার বিষয়বস্তু বদলাতে লাগলো। ভাল লাগতে শুরু করলো, সম্পাদকীয়, খোলা কলম জাতীয় সব রাজনৈতিক বিশ্লেষনধর্মী লেখাগুলো। রাখতে শুরু করলাম সাপ্তাহিক ‘যায় যায় দিন’। যায় যায় দিনের প্রথম থেকে শেষ পাতা পর্যন্ত না পড়তে পারলে আমার ঘুম আসতোনা। চলে গেলাম অস্ট্রেলিয়া, আমার স্বামী আমার জন্য এক বছরের যায় যায় দিন ম্যাগাজিনের মেম্বারশীপ কিনে দিলেন। মেলবোর্ণে বসে থেকেই দেশের রাজনীতির খবর পেতাম।

দেশে ফিরে এলাম। ততদিনে আরও কত নতুন নতুন আধুনিক পত্রিকা বের হয়ে গেছে। অপশন বেড়ে গেছে। কয়দিন এই পত্রিকা রাখি, কয়দিন আবার অন্যটা রাখি, মোটের উপর আমার নেশা ধরে গেল। শিক্ষকতা পেশাতে যোগ দিলাম, অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতা এলো, হাতে একটু অবসর সময়ও পেলাম। ঐ সময়টুকুতে আমি পুরোপুরিই পড়ার জগতে ঢুকে গেলাম। ভাল ভাল গল্পের বই, নানা ধরনের ম্যাগাজিন, সাপ্তাহিকীসহ সবকিছুই কি আগ্রহ নিয়ে পড়তাম। খবরের কাগজের প্রথম পাতা থেকে শুরু করে সম্পাদকীয়, খেলার খবর, খোলা কলম, দেশের আনাচে কানাচের সব খবর শেষ করে শেষ পর্যন্ত বাড়ীভাড়ার বিজ্ঞাপন, পাত্র চাই পাত্রী চাই বিজ্ঞাপনসহ সব কিছুই খুব উৎসাহ নিয়ে পড়তাম।

এরপর আবার দেশ থেকে চলে এলাম আমেরিকাতে। এবার আর কোন পত্রিকার মেম্বারশিপ কিনতে হয়নি। অনলাইনের সুবাদে আমি হাতে পেয়ে গেলাম সাত আসমানের তারা। ঘরের কাজের প্রতি আমার কখনওই কোন আগ্রহ ছিলোনা, যেটুকু না করলে না হয়, সেটুকু করেই আমি বসে যেতাম কমপিউটারে। আমরা যখন ওয়েস্ট ভার্জিনিয়া থেকে মিসিসিপিতে চলে আসি, আমাদের নতুন বাড়ীতে উঠতে ১৫ দিন সময় লেগেছিল, আমি ঐ ১৫ দিন সমস্ত জগত থেকে মনে হয় বাইরে ছিলাম, এরপর নিজেদের এপার্টমেন্টে উঠেই কম্পিউটার সেট করতে লাগলো আরও ৭ দিন। এর মধ্যেই ঘটে গেলো শাহ কিবরিয়ার উপর বোমা হামলার ঘটনা। সেদিন আমি অবশ্য একজনের বাড়ীতে বেড়াতে গিয়ে তাদের কম্পিউটার অন করতেই খবরের শিরোনাম দেখে আঁতকে উঠি। তারপরতো বাড়ী এসে ইন্টারনেট কানেকশানের জন্য ঘ্যানর ঘ্যানর করতে থাকি। এর মধ্যেই আমার কাজিন সুমন আমাকে ফোন করে জানায় যে শেখ হাসিনার সভাতে বোমা ফেটেছে, প্রচুর হতাহত হয়েছে (সুমন জানতো আমার পত্রিকা পড়ার নেশার কথা)। এই খবর শুনে আমার অস্থিরতা টের পেয়ে আমার স্বামীও কোথা থেকে একজনকে ধরে এনে কম্পিউটারে ইন্টারনেট কানেকশান লাগিয়ে দেয়।

এরপর থেকে আমি আবার স্বাভাবিক গতিতেই আবার পত্রিকা পাঠ করতে থাকি। চাকুরীতে ঢুকেছি, অতিথি আপ্যায়নতো আছেই, বেড়ানো খেলানোও আছে, তার উপরে আছে আমার জন্য বরাদ্য তিনটি ঘন্টা, ৬টি পত্রিকার ইন্টারনেট সংস্করন পাঠের জন্য। ইন্টারনেটে পত্রিকা পড়ি, গল্পের বই পড়ি, অনলাইনে বাংলা নাটক দেখি, মোটকথা আমি দেশের বাইরে থেকেও দেশের ভেতরই ছিলাম।

কিনতু ইদানীং আমার মধ্যে বিরাট পরিবর্তন চলে এসেছে। উচ্ছলতার বদলে আমাকে ধীরে ধীরে গ্রাস করছে একধরনের নির্লিপ্তি। আমার হাতে এখন অনেকটাই অবসর সময় আছে, কিনতু আমি আর পত্রিকা পড়িনা। একটানা কয়েকমাস আমি পত্রিকা পড়িনি, কারন পত্রিকার পাতা খুললেই আমি শুধু হতাশার খবর দেখতে পাই। দেশের বাইরে আছি মা বাবা, ভাই-বোন, বন্ধু স্বজন ছেড়ে, এমনিতেই মনটা খারাপ থাকে, অনেক আশা নিয়ে পত্রিকার পাতায় চোখ বুলাই, যদি কোন ভালো সংবাদ পাই। কিনতু কেন যেনো গত এক বছরে হঠাৎ খুশী হওয়ার মতো কোন সংবাদ চোখে পড়েনি। আমার এমন বিষন্ন সময়ে হঠাৎ করেই আমার এক বন্ধু আমাকে উৎসাহ দিল লেখালেখি শুরু করতে। হয়ত বন্ধু আমার ভাল চেয়েছে, যাতে করে আমার লির্লিপ্তি কেটে যায়, সেইজন্যই লিখতে বলেছে। তাই লেখার প্রয়োজনেই আমি আবার পত্রিকা পড়তে শুরু করেছিলাম। দেখি দেশের কি চরম দুঃসময় চলছে! জ্বালানী তেলের দাম বৃদ্ধি, শেয়ার বাজারে ধ্বস (আমি নিজেও ভুক্তভোগী), ভারতের সাথে সম্পর্কের টানাপোড়েন, মন্ত্রীদের চরম ব্যর্থতা, বাজারে জিনিসপত্রের অগ্নিমূল্য ইত্যাদি ইত্যাদি সব হতাশার খবর। রাজনৈতিক খবর পড়তে আমি বেশী ভালোবাসতাম, এখন সেই রাজনৈতিক খবরের প্রতিই আমার চরম বিতৃষ্ণা এসেছে। রাজনীতিবিদদের খেয়োখেয়িতো আছেই, তা আগেও ছিলো, কিনতু আগের মানুষের মধ্যে সততা ছিল, রাজনৈতিক বক্তব্যে যুক্তি ছিল, পরস্পর পরস্পরের বিরূদ্ধে তেমন কটুক্তি করতোনা।

এখন সব পালটে গেছে, এখন পত্রিকা খুলেই দেখি একজন বিখ্যাত মুক্তিযোদ্ধা (বীর বিক্রম), রিটায়ার্ড সামরিক অফিসার, উচ্চশিক্ষিত(ডক্টরেট), স্মার্ট সুদর্শন বয়স্ক ব্যক্তি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার জন্য নারী সংসদ সদস্যের বিরূদ্ধে নোংরা, অশ্লীল বক্তব্য দিয়ে পুরো শিক্ষিত পুরুষ শ্রেণীর মুখে কালিমা লেপন করে দিয়েছেন। ভদ্রলোক(?) নিজের মা, স্ত্রী, বোন, কন্যার কথা খেয়ালে না রেখেই দেশের সমস্ত নারী সমাজকে পুরুষের ভোগের সামগ্রী বানিয়ে দিয়েছেন! ছিঃ ছিঃ। অনেকদিন বিরতি দিয়ে পত্রিকা পড়া শুরু করেছিলাম, আজ থেকে আবার পত্রিকা পড়া ছেড়ে দিলাম। এটাই ঐ সকল শিক্ষিত(?) পুরুষের বিরূদ্ধে আমার ছোট প্রতিবাদ। জানি কারো কিছু যাবে আসবেনা, কিনতু আমার নিজের চোখ দুটো কিছুদিনের জন্য বিরতি পাবে, ঐসব নোংরামী থেকে।