ক্যাটেগরিঃ ইতিহাস-ঐতিহ্য

 

আগামী ২৪শে নভেম্বর, মাসের চতুর্থ বৃহস্পতিবার, আমেরিকাতে অতি বিখ্যাত ‘থ্যাঙ্কস গিভিং ডে’ উদযাপিত হবে। আমেরিকার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছুটির দিন হচ্ছে এই বৃহস্পতিবারটি। এই ছুটির দিনটি ‘থ্যাঙ্কস গিভিং ডে’ নামে সরকারীভাবে স্বীকৃত। থ্যাঙ্কস গিভিং ডে কে অন্যভাবে দ্য টার্কী ডেও বলা যায়। কারন এই উপলক্ষকে ঘিরে সবকিছুতেই থাকে টার্কী( বনমোরগ জাতীয় পাখী)দের আধিপত্য। দোকানে বিশাল সাইজের টার্কী বিক্রী হয়, খাবারের প্লেট থেকে শুরু করে টেবল ক্লথ, গ্লাস, বাটি, ন্যাপকিন এমনকি পোশাকেও থাকে টার্কীর ছবি। মানে এই একমাস সব কিছুতেই শুধু টার্কীকে দেখা যায়।

সাধারনতঃ এই দিনটিতে আমেরিকানদের ট্র্যাডিশান হচ্ছে, পরিবারের সবাই, আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব মিলে একসাথে খাওয়া-দাওয়া , গল্পগুজব, নানারকম আনন্দ অনুষ্ঠানের ভেতর দিয়েই কাটিয়ে দেয়া। খাবারের মধ্যে মূল আইটেম হচ্ছে টার্কীর মাংস। ন্যাশনাল টার্কী ফেডারেশানের ভাষ্যমতে ৯০% আমেরিকান ঐদিন টার্কী দিয়েই সারাদিনের ভোজপর্ব সম্পন্ন করে থাকে। কেউ বেক করে, কেউ রোস্ট করে কেউবা আবার ডিপ ফ্রাই করে খায়, অথবা সবরকমভাবেই রান্না করতে চেষ্টা করে। সাথে থাকে ক্র্যানবেরী সস, ম্যাশড পটেটো, স্টাফিং, ক্যাসেরোল, গ্রীন বীন, পামকিন পাই, পিকান পাই ইত্যাদি ইত্যাদি। এইদিনে অনেকে আবার খাবার দাবার ভলানটিয়ারিং করে, কোন কোন প্রতিষ্ঠান নিম্নবিত্তদেরকে ফ্রি ডিনার করিয়ে থাকে। কেউ থ্যাঙ্কসগিভিং ডিনার থেকে বঞ্চিত হয়না। আমেরিকার সব প্রতিষ্ঠান, অফিস, স্কুল কলেজ, হোটেল, রেস্টুরেন্ট বন্ধ থাকে ঐদিন (একমাত্র ব্যতিক্রম মনে হয় আমার কাজের জায়গা, বিখ্যাত ওয়াল-মার্ট)। টানা চার-পাঁচ দিনের ছুটি থাকে বলে অনেকেই ভ্যাকেশনে চলে যায়, যেখানেই যাক, টার্কী উৎসব সবখানেই আছে।

আমার প্রথম থ্যাঙ্কস গিভিং ডিনারের অভিজ্ঞতা হয়েছে ২০০১ সালে, আমাদের এক বন্ধু ব্রুস এর বাড়ীতে। তারা স্বামী স্ত্রী মিলে অনেক কিছু রান্না করেছিল। আমি তখনও থ্যাঙ্কস গিভিং কি বা কেন কিছুই জানতামনা। টেবিলে ১৪/১৫ পাঊন্ড ওজনের টারকী রোস্ট সাজানো দেখে আমি নিশ্চিন্ত মনে আগেই অনেকটা নিয়েছিলাম প্লেটে, কিনতু আমাদের মুখে যেখানে ঝাল-মশলা দেয়া খাবার ভালো লাগে, সেখানে এমন আলুনী টাইপ মশলা ছাড়া পাখীর মাংস খেতে ভালো লাগার কথা নয়। তাই আমার ভালো লাগেনি, গন্ধটাই ভালো লাগেনি। ওদের মুখেই শুনলাম টার্কীর সাইজ এতই বড় হয় যে, টার্কী লেগের সাইজ হয় দেখতে ঠিক মানুষের বাচ্চার পায়ের সাইজ এর সমান।

আমাদের সবচেয়ে কাছের যে কয়জন শুভার্থী আছে আমেরিকাতে, স্কট রজার্স ও রেবেকা রজার্স তাদের অন্যতম। আমার মেজ মেয়ে যখন মিডল স্কুলে পড়তো, রেবেকা রজার্স ছিলেন ঐ স্কুলে মিউজিক টিচার। কি কারনে জানিনা, আমার মেয়েকে মিসেস রজার্সের খুব পছন্দ হয়েছিল। মেয়েকে ডেকে একদিন ওর মুখ থেকে ওর দেশের কথা শুনতে চেয়েছিল, আর আমার মেয়ে কতটুকু বুঝিয়ে বলতে পেরেছিল, তা একমাত্র ঈশ্বর জানেন। তবে আমার মেয়ের কথায় মুগ্ধ হয়ে আমাদের সাথে যোগাযোগ করেছিলেন উনি, গড়ে উঠে আমাদের মাঝে গভীর বন্ধুত্ব, হয়ে উঠেন এই বিদেশ বিভুঁইয়ে আমাদের পকৃত শুভার্থী। প্রতি থ্যাঙ্কস গিভিং এ কতদূর থেকে উনারা আমাদের জন্য খাবার দাবার মেইল করে পাঠিয়ে দেন। একবারের জন্যও বাদ যায়নি।

আসলে ‘থ্যাঙ্কস গিভিং ডে কি বা কোথা থেকে এর শুরু, এর তাৎপর্য্যইবা কতটুকু, এই জানার কৌতুহল থেকেই যতটুকু জেনেছি সংক্ষেপে বলতে গেলে বলতে হয়ঃ

১৬২০ সালে ‘মে ফ্লাওয়ার’ নামের এক জাহাজে চড়ে ১০২ জন নানা ধর্মীয় মতের মানুষ স্বাধীনভাবে ধর্মচর্চা করার উদ্দেশ্যে ইংল্যান্ড ছেড়ে নতুন আশ্রয়ের সন্ধানে বের হয়। দুই তিন মাস বাদে তারা মেসাচুসেটস বে তে এসে থামে। যাত্রীদের অনেকেই অর্ধাহারে, শীতের কোপে পরে অসুস্থ ও দূর্বল হয়ে পড়ে। যাত্রীদের মাঝে যারা সুস্থ ছিলো, তারা জাহাজ থেকে তীরে এসে নামে। ওখানেই তারা প্লিমথ নামে গ্রাম গড়ে তোলে। স্কোয়ান্তো নামের এক উপজাতি আমেরিকান ইন্ডিয়ানের সাথে তাদের পরিচয় হয়। স্কোয়ান্তো তাদের নিজে হাতে ধরে শিখিয়ে দেয় কিভাবে কর্ন চাষ করতে হয়, বা মাছ ধরতে হয়, কিভাবে মেপল গাছ থেকে রস সংগ্রহ করতে হয়।

১৬২১ সালের নভেম্বার মাসে প্লিমথবাসী তাদের উৎপাদিত শস্য কর্ন নিজেদের ঘরে তুলতে পারলো। কর্নের ফলন এত বেশী ভালো হয়েছিল যে গভর্নর উইলিয়াম এই উপলক্ষে সমস্ত আদিবাসী এবং এই নতুন প্লি্মথবাসীদের সৌজন্যে ‘ফিস্টি’ আয়োজন করেন। ঐ অনুষ্ঠানে সকলে প্রথমে ঈশ্বরকে ধন্যবাদ জানায় তাদের সুস্থভাবে বাঁচিয়ে রাখার জন্য, এমন সুন্দর শস্য ফলনের জন্য, তারপর প্রত্যেকে প্রত্যেককে ধন্যবাদ জানায়, সারা বছর ্ধরে একে অপরকে সাহায্য সহযোগিতা করার জন্য। এই অনুষ্ঠানটি আমারিকার ‘সর্ব প্রথম থ্যাঙ্কস গিভিং’ ডে হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে।

১৮১৭ সালে নিউইয়র্কে সর্ব প্রথমে ‘থ্যাঙ্কস গিভিং ডে’ অফিসিয়ালি সরকারী ছুটির দিন হিসেবে স্বীকৃত হয়েছে। এরওপরে ১৮২৭ সালে বিখ্যাত নার্সারী রাইম ‘মেরি হ্যাড আ লিটল ল্যাম্ব’ রচয়িতা সারাহ যোসেফা উদ্যোগ নেন, যেন ‘থ্যাঙ্কস গিভিং ডে’ কে জাতীয় ছুটির দিন হিসেবে ঘোষনা করা হয়। দীর্ঘ ৩৬ বছর তিনি একটানা আর্টিক্যাল, এডিটোরিয়েল লিখাসহ এই আবেদনের সপক্ষে প্রচুর চিঠিপত্র গভর্নর, সিনেটর, প্রেসিডেন্ট, রাজনীতিবিদদের কাছে পাঠিয়ে গেছেন। শেষ পর্যন্ত ১৮৬৩ সালে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন, সারাহ যোসেফের আবেদন খুব গুরুত্ব সহকারে গ্রহন করেন এবং যখন ‘সিভিল ওয়ার’ একেবারে তুঙ্গে, তখনই জনগনের উদ্দেশ্যে আবেদনমূলক ঘোষনা দেন, যেন পরম করুনাময় ঈশ্বরের কাছে সকল আমেরিকাবাসী প্রার্থনা জানায়, “হে ঈশ্বর! তোমার স্নেহের পরশ, তোমার অপার করুনা তুমি তাদের উপর বর্ষন করো, যারা সিভিল ওয়ারে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যে নারী স্বামী হারিয়েছে, যে সন্তান পিতৃহারা হয়েছে, যা ক্ষতি সমস্ত জাতির হয়েছে, সবার যেনো মঙ্গল হয়, দেশের ক্ষতি যা হয়েছে তা যেনো তাড়াতাড়ি সারিয়ে তোলা যায়’। এরপরেই আব্রাহাম লিঙ্কন নভেমবারের শেষ বৃহস্পতিবারকে ‘থ্যাঙ্কস গিভিং ডে’ হিসেবে সরকারী ছুটির দিন ঘোষনা করেন। ১৯৩৯ সাল পর্যন্ত এভাবেই পালিত হয়েছে, কিনতু ১৯৩৯ সালে ফ্র্যাঙ্কলিন রুজভেল্ট তখনকার অর্থনৈতিক মন্দা (গ্রেট ডিপরেশান) কাটিয়ে উঠার লক্ষ্যে, রিটেল সেল বাড়ানোর জন্য এই ছুটি এক সপ্তাহ এগিয়ে আনা্র ঘোষনা দেন, এবং এরপর থেকে নভেম্বার মাসের চতুর্থ বৃহস্পতিবার ‘থ্যাঙ্কস গিভিং ডে’ পালিত হয়, পরেরদিন শুক্রবার বিশেষ মূল্যছাড়ে অথবা আকর্ষণীয় মূল্যে যাবতীয় জিনিস বিক্রী হয় লিমিটেড সময়ের জন্য। তবে বর্তমানে ‘থ্যাঙ্কস গিভিং’ আর কোনভাবেই ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য্যে পালিত হয়না, পুরোপুরি কমার্শিয়াল ব্যাপার স্যাপার হয়ে গেছে।

থ্যাঙ্কস গিভিং ডের ঠিক পরের দিন শুক্রবার হয় আরেক উন্মাদনা, যাকে বলা হয় ‘ব্ল্যাক ফ্রাইডে’। এই শুক্রবারে প্রচুর জিনিস বিক্রী হয়, প্রচার করা হতে থাকে দুই সপ্তাহ আগে থেকে, ব্ল্যাক ফ্রাইডে সেলে কি কি আইটেম আসবে বাজারে। আমরা সহ সমস্ত আমেরিকাবাসী তাদের শখের কিছু জিনিস কিনতে হলে ব্ল্যাক ফ্রাইডের আশায় অপেক্ষা করে। এটা সম্পূর্ণ আমার ধারনা থেকে বলছি, শুক্রবারটিকে কেন ‘ব্ল্যাক’ বলা হয়, কারন মাঝ রাত্রি থেকে ক্রেতাদের লাইন ধরা শুরু হয়, অন্ধকার থাকতেই স্টোর ওপেন করে দেয়া হয়, বন্যার জলের মত মানুষ হুড়মুড় করে দোকানের ভেতর ঢুকে যে যেটা আগে ধরতে পারে, সে সেটা সাথে সাথে কিনে ফেলে। এই সেলের ব্যাপারটা শেষ হয়ে যায় ঘন্টা খানিকের মধ্যে। তারমানে সকাল হওয়ার আগেই। কাজেই সবকিছু ঘটে যায় দিনের আলো ফোটার আগে, তাই মনে হয় এই সেলের নাম ‘ব্ল্যাক ফ্রাইডে সেল’।

আমাকে আমাদের বন্ধু মিসেস রজার্স ফোন করেছেন এই দুইদিন আগে, থ্যাঙ্কস গিভিং হলিডেতে কোথাও যাচ্ছি কিনা জানতে, কারন উনি আমাদের জন্য নানা রকম হোম মেড গুডিজ পার্সেল করবেন, যা তিনি প্রতিবার করে থাকেন। আমি জানিয়েছি, আমাকে ঐদিন কাজে থাকতে হবে, আমাদের কাজের জায়গাতে নোটিশ দেয়া থাকে ‘থ্যাঙ্কস গিভিং থেকে ক্রিসমাস’ পর্যন্ত কেউ কোন ছুটি চাইতে পারবেনা। অবশ্য ঐদিন সারাদিন সবার জন্য খাবার দাবার পর্যাপ্ত পরিমানে সরবরাহ করা হয়, সেদিক থেকে কারো দুঃখ থাকেনা। ঠাট্টা করে মিসেস রজার্সকে বললাম, এইবার থ্যাঙ্কস গিভিং ডে তে গড এর কাছে প্রার্থনা করো যেন সামনের বছর আমি ছুটি পাই এবং তোমাদের কাছে যেতে পারি। তোমাদের কাছে গিয়ে সকলে মিলে ঈশ্বরকে ‘ধন্যবাদ’ জানাব আমার প্রতি তাঁর করুনা বর্ষনের জন্য!