ক্যাটেগরিঃ প্রবাস কথন

মাত্র ১২ ঘন্টার কোলাহল, উত্তেজনা, কে কার আগে যাবে, কার মুখে দেখা যাবে বিজয়ীর হাসি, সব মিলিয়ে এক হুলুস্থূল কান্ড শেষে, ঐতিহ্যবাহী ব্ল্যাক ফ্রাইডে সেলের সমাপ্তি হলো। হ্যাঁ বলছিলাম, আমেরিকার ‘ব্ল্যাক ফ্রাইডে’ সেলের কথা। নভেম্বারের চতুর্থ বৃহস্পতিবার আমেরিকাতে ‘থ্যাঙ্কস গিভিং ডে’ পালিত হয়। ‘থ্যাঙ্কস গিভিং ডে’ জাতীয় ছুটির দিন, অনেককাল আগে থেকেই সরকারীভাবে স্বীকৃত। আর ‘থ্যাঙ্কস গিভিং ডে’র পরের দিন শুক্রবারকে ‘ব্ল্যাক ফ্রাইডে’ বলা হয়। ব্ল্যাক ফ্রাইডেতে বছরের শ্রেষ্ঠ মূল্যছাড় থাকে। এই ব্ল্যাক ফ্রাইডে সেলও সরকারীভাবে স্বীকৃত। কারন ১৯৩৯-৪০ সালের দিকে ভয়ানক অর্থনৈতিক মন্দা কাটিয়ে উঠে বাজার চাঙ্গা করার উদ্দেশ্যেই এই বিশেষ সেল।

কথিত আছে, ব্যবসা জগতে যখন লালবাতি জ্বলেছিল, এই বিশেষ সেলের পরেই বাজার চাঙ্গা হয়ে উঠে, লালবাতি নিভে গিয়ে( ব্ল্যাক মানে কালো হলেও ব্যবসাতে কালোকে গুড সাইন ধরা হয়) বাজার অর্থনীতিতে আলো দেখা যায়। তাই এই ফ্রাইডের সেলকে ব্ল্যাক ফ্রাইডে সেল বলা হয়ে থাকে। আমার ধারনা, যেহেতু এই মৌসুমটা হচ্ছে ফসল উঠার মৌসুম, সকলের হাতেই পয়সা কড়ি কিছু অন্ততঃ থাকার কথা, তাই মানুষের নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস, কিছু সৌখীন পণ্য বা অধিকাংশের চাহিদা্র কথা মাথায় রেখেই পণ্য বাজারে ছাড়া হয়েছিল বিশেষ সুবিধাজনক দামে। ফলে এভাবেই ‘ব্ল্যাক ফ্রাইডে সেল’ তুমুল জনপ্রিয়তা অর্জন করে।

সুবিধাজনক দামে পণ্য সরবরাহ করা হয় বলেই কোয়ানটিটি সীমিত থাকে, দুই তিন সপ্তাহ আগে থেকেই বহু বর্ণের আকর্ষণীয় লিফলেট ছাড়া হয়, টিভিতে প্রচার চালানো হয়, ওয়েবসাইটে প্রচার চলে, এভাবেই ক্রেতাদের মধ্যে এক ধরনের উত্তেজনা তৈরী করা হয়, ক্রেতাদের মধ্যে শুরু হয়ে যায় এক ধরনের প্রতিযোগীতা, কারো প্রয়োজন থাকুক বা নাই থাকুক, ব্ল্যাক ফ্রাইডে সেল থেকে কিছু ‘টপ আইটেম’ কিনতে পারলে এক ধরনের বিশ্ব জয়ের আনন্দ পাওয়া যায়। আইটেমগুলোর মধ্যে ‘টপ আইটেম’ হিসেবে থাকে, এল সি ডি টিভি, এল ই ডি টিভি,( বড় ফ্ল্যাট স্ক্রীন ৪২ ইঞ্চি—৬৫ ইঞ্চি পর্যন্ত), ল্যাপটপ, গেইম সিস্টেম( উই, প্লে স্টেশান ২, ৩), লেটেস্ট গেইমস, কত মডেলের ডিজিট্যাল ক্যামেরা, এস এল আর ক্যামেরা, ইলেক্ট্রনিক বই (কিন্ডেল, নুক), আইপড, আইপ্যাড, স্মার্টফোন, ফ্রীজ, নানাধরনের কুকিং ওয়্যার থেকে শুরু করে টাওয়েল সেট, বেড শীট সেট, বাইক, খেলনার মধ্যে বার্বি, বাচ্চাদের জন্য ফ্লানেলের তৈরী স্লিপিং সুট ইত্যাদি ইত্যাদি।

সেল শুরু হয় মাঝরাতে, শেষও হয়ে যায় রাতের মধ্যেই। তাই আমার কাছে ‘ব্ল্যাক ফ্রাইডে’ নামের তাৎপর্য্য হচ্ছে, রাতেই শুরু রাতেই শেষ যে সেল। দুই তিন বছর আগেও সেল শুরু হতো ভোর চারটার দিকে। কিনতু মানুষের ক্রেজ এত বেড়ে গেছে যে এখন নির্দিষ্ট আইটেমের জন্য নির্দিষ্ট টাইম বেঁধে দেয়া হচ্ছে। আমি আমাদের ওয়ালমার্টের কথাই বলছি, (বলতে দ্বিধা নেই, বিক্রয়ের সাফল্যের লিস্টে ওয়ালমার্ট থাকে সবার উপরে), ওয়ালমার্টে রাত ১০টায় থাকে একটা সেল, (লিফলেটে বলে দেয়া থাকে কোন আইটেম কোন সময় বিক্রী হবে), রাত ১২টায় থাকে আরেক সেল, ভোর ৫টায় থাকে এবং সাধারণ জিনিস থাকে সকাল ৮টায়। এই সময় নির্ধারণ করে দেয়ার পিছনে অনেকগুলো কারন আছে, সবার প্রথম যে কারন, তা হলো অনাকাঙ্খিত ভীড় এড়ানো, অনাকাংখিত ভীড়ের কারনে সংঘটিত দূর্ঘটনা এড়ানো (কারন আমেরিকাতে দূর্ঘটনা একটা ঘটলে সবাই দেখি ঐ কোম্পাণির বিরূদ্ধে মামলা করে দেয়, অনেক সময় ব্যবসায়িক সুনাম বজায় রাখার জন্য কোম্পানীগুলো অর্থদন্ডি দিয়ে মামলা মিটমাট করে নেয়, ফলে কিছু সুবিধাবাদী লোক তালে থাকে, কিভাবে মামলা ঠুকে দেয়া যায়, বলা যায়না, পয়সাকড়ি আসলে আসতেও পারে)। তাছাড়া কোম্পাণির এসোসিয়েটদের জন্যও সুবিধা হয়, সিস্টেমেটিকভাবে তারা তাদের দায়িত্ব পালন করতে পারে।

এবারের সেলে ৩০ মিনিটের মধ্যে বিক্রী শেষ হয়ে গেছে ‘টাচ স্ক্রীন মোবাইল ফোন’ মাত্র ৩৫ ডলার দামে, ফোন বিক্রী শুরু হয় রাত ১২টায়, কিনতু মানুষ লাইন ধরতে শুরু করেছে, সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায়। কিছু ছেলে মেয়ে খুবই রেগে গিয়েছিল, কারন তারাও ৪ ঘন্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও ফোন কিনতে পারেনি, তাদেরকে সান্ত্বনা দেয়ার কিছু জানা ছিলনা, কারন ৫ ঘন্টা আগে যারা এসে দাঁড়িয়েছিল, তারাই বিশ্বজয়ের আনন্দ নিয়ে বাড়ী ফিরেছে। (চলবে)