ক্যাটেগরিঃ প্রবাস কথন

 

অন্য কোম্পাণীগুলোর পলিসি কেমন হয়, তা আমি জানিনা, আমাদের ওয়ালমার্টের পলিসি হচ্ছে সেপ্টেমবার মাসেই সবাইকে জানিয়ে দেয়া, কেউ যেনো নভেম্বার থেকে ডিসেম্বার পর্যন্ত কোন ছুটির দরখাস্ত না করে। তাই আমিও অযথা ছুটির জন্য ঘ্যানর ঘ্যানর করিনা। তবে গত পাঁচ বছর ধরে আমার কাজের শিডিউল অনুযায়ী, থ্যাঙ্কস গিভিং এর দিন, সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত আমাকে কাজ করতে হয়েছে আর ব্ল্যাক ফ্রাইডেতে সব সময় দুপুর ১২টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত কাজ করতে হয়েছে। এবার একটু ব্যতিক্রম দেখেছি আমার শিডিউলে। থ্যাঙ্কস গিভিং এর দিন আমাকে দুপুর ১২টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত শিডিউলে রাখা হয়েছে।

এমন শিডিউল দেখে আমার মনটা খারাপ হয়ে গেছে। অন্যবার আমি থ্যাঙ্কস গিভিং এর দিন সব ছেলেমেয়েদের (যারা এখানে পিএইচডি করতে আসে) নিমন্ত্রন করি, আমার দুই মেয়েও ছুটিতে আসে, আমি বিকেলে কাজ থেকে চলে আসি, তারপর সবাই মিলে আনন্দ করি। কিনতু এবার রাত ৯টা পর্যন্ত আমাকে কাজে থাকতে হবে শুনেই আমার কেমন দিশেহারা লাগতে শুরু করেছে, কারন আমি জানি আমি বাড়ী না ফেরা পর্যন্ত একজনও আসবেনা আমাদের বাড়ীতে। আমি ম্যানেজারকে দিয়ে সময় ১২টার বদলে ২টা করে নিয়ে, ঐ অতিরিক্ত সময়ের মধ্যেই রান্না সেরে কাজে রওনা হয়ে গেছি।

ওয়ালমার্টের কাছাকাছি যেতেই দেখি, বিশাল বড় কম্পাউন্ড একেবারে শুনশান নীরব, স্টাফদের গাড়ী ছাড়া আর অন্য কোনও গাড়ী নেই সেখানে। থাকার কথাও না, কারন এই সময়টা সকলেই থ্যাঙ্কস গিভিং পার্টি করছে বাড়ীতে, আর প্ল্যান করছে ঠিক কখন গিয়ে লাইনে দাঁড়াতে পারবে। আমি আমার গাড়ী পার্ক করে ওয়ালমার্টের ভেতর ঢুকতেই দেখি, ওয়ালমার্টের ভেতরে বিশাল এলাকা জুড়ে স্পেস তৈরী করা হচ্ছে। রাত দশটার সময় মার্চেনডাইজ এনে রাখতে হবে, তার জন্য এত আয়োজন। আমার মনটা খুব ভালো হয়ে গেলো। কেমন যেনো একটা সাজ সাজ রব চারিদিকে, উত্তেজনা, আয়োজন সব মিলিয়ে হুলুস্থুল কান্ড চারিদিকে। হলুদ সিকিউরিটি টেইপ দিয়ে চিহ্ন দিয়ে দিয়ে লোকজনের জন্য আইল করা হয়েছে, কোন আইটেম কোথায় রাখা হবে, তা একেবারে বেলুনে ছাপিয়ে প্রতি কোনায় কোনায় উড়িয়ে দেয়া হয়েছে, তীর চিহ্ন দিয়ে দিয়ে পথ নির্দেশ করা হয়েছে। এগুলো দেখতে দেখতে আমি আমাদের ব্রেকরুমে গিয়ে ঢুকেছি। ব্রেকরুমের পাশের দেয়ালে বিরাট ম্যাপ এঁকে টানানো হয়েছে, ঐ ম্যাপেই দেখিয়ে দেয়া হয়েছে, কোন আইটেম কোথায় থাকবে, কে কোন দায়িত্বে থাকবে, কারা থাকবে ভীড় সামলানোর দায়িত্বে, ভীড় সামলানোর দায়িত্বে যাদের রাখা হয়েছে, তাদের মধ্যে এক মেয়ের নাম দেখেই বুঝে গেছি, লোকজন তেড়িবেড়ি করলে খবর আছে। সেই মেয়ে দেখতে যেমন রুক্ষ্ম, স্বভাবটাও তেমনি রুক্ষ।

ব্রেকরুমে গিয়ে দেখি সকল স্টাফদের জন্য লম্বা টেবিলে খাবার ভর্তি করে থালা সাজিয়ে রাখা হয়েছে। যার যখন ইচ্ছে, যতবার ইচ্ছে খেতে পারে, কোন ধরা বাঁধা নিয়ম নেই। দেখে নিলাম, কিছু কিছু স্টাফ প্লেট ভর্তি করে নিয়ে খেতে বসেছে, সকলেই একটু মন;ক্ষুন্ন এমন দিনে কাজ করতে হচ্ছে বলে, কিনতু বেশীক্ষন ধরে রাখছেনা এই অভিমান, কেমন যেনো নিজেরই কাজ মনে করে সকলেই কাজ করে যাচ্ছে। আমি আমার ব্যাগ রেখে ক্লক ইন করে চলে গেলাম আমার এলাকায়। সারা বছর এত ব্যস্ত থাকতে হয়, এই ফোন সার্ভিস নিয়ে, অথচ আজ কোন গ্রাহক নেই। আমিও মাঝে মাঝেই ঘুরে ঘুরে দেখে বেড়াচ্ছিলাম, এমন বড় যজ্ঞিবাড়ির আয়োজন।

সন্ধ্যা নাগাদ সব স্টাফ, ম্যানেজার (বড়, মাঝারি, ছোট, পাতি, উপ)দের উপস্থিতিতে সরগরম হয়ে গেলো পুরো ওয়ালমার্ট। আমার এলাকাতে আসতে লাগলো কিন্ডেল ফায়ার, মটোরোলা টাচ স্ক্রীন ফোন, জিপিএস, গেইমস, গেইম সিস্টেম। সবাই মিলে এগুলোকে সাজাতে লেগে গেলাম, কারন সিস্টেমেটিকভাবে না রাখতে পারলে এই জনসমুদ্র সামলানো যাবেনা। সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা নাগাদ দেখি আমাদের রেজিস্টারের কাছাকাছি এসে এক মোটাসোটা কালো মহিলা তার ফোল্ডিং চেয়ার পেতে বসে পড়লো। আমার সাথে চোখাচোখি হতেই আমি হেসে ফেললাম, আমার হাসি দেখে মহিলার সাথে আসা মেয়েটিও হাসি দিয়ে তার মা কে খোঁচা মেরে দেখালো, যে আমি হাসছি। মহিলা আমার দিকে তাকাতেই ভেতর ভেতরে একটু কুঁকড়ে গিয়েও তাকে খুব উৎসাহিত করলাম এই বলে যে, আজকে তুমিই হবে উইনার। এটা শুনেই মহিলার মুখটা নরম হয়ে গেলো, আর আমিও ঐ জায়গা থেকে সরে পড়লাম।

রাত ৯টায় আমার ডিউটি শেষ, তার আগেই আমি আমার বসকে জিজ্ঞেস করলাম, ডিস্পলে ফোনগুলো তুলে ফেলবো কিনা( এটাই নিয়ম, ক্লোজিং এর সময় সকল ফোন তুলে ফেলতে হয়, নাহলে আশ্চর্য্যজনক হলেও সত্যি, কালো জনগোষ্ঠীর মধ্যে চু্রির প্রবনতা আছে এবং দিনের বেলাতেই সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে ফোন চুরি করে নিয়ে যায়)। আমার বস মিশেল গেল তার বস কিমকে জিজ্ঞেস করতে। মিশেল ও কিম দুজনেই এক স্বভাবের, কাজের কাজ কিছুই করেনা, অযথা দৌড় ঝাঁপ করতে থাকে। দেখলাম কিম আর মিশেলের মধ্যে রাগারাগি হচ্ছে, আমি শত হাত দূরে চলে এলাম, শুনলাম আজকে ফোন তুলতে হবেনা।

আমি যে ছেলেমেয়েদেরকে নেমন্তন্ন করেছিলাম, তারা আসবে ৩০ মাইল দূর থেকে। তাদের মধ্যে নিশো ও তার বর শাহীন ঠিক করেছে ফ্রিজার কিনবে, ওদেরকে ফোনে বলে দিলাম এক ঘন্টা আগে আসতে, লাইনে দাঁড়াতে হবে, নিশো, শাহীন, শাহীনের বোন লাকী ও লাকীর বর জাকারিয়া চলে এলো আমার কাছে। আমাদেরকে আগেই জানানো হয়েছিল, তিনভাগে হবে এই সেল। এই সেলে ইলেকট্রনিক আইটেমগুলি হচ্ছে ‘হট’ আইটেম। তাই আইটেমগুলো এক জায়গাতে রাখা হয়নি। ল্যাপটপ রাখা হয়েছিল ‘গাড়ী সারাই’ এলাকাতে, টিভি ‘গার্ডেন সেন্টার’এ, এখন ফ্রিজার কোথায় রাখা হবে তা জানিনা। কারন ফ্রিজার হচ্ছে হাউজ এপলায়েন্স ডিপার্টমেন্টের। কাসটমারদের জানানো হয়েছে অনেক আগে থেকে, সেলের দিন দুই ঘন্টা আগে এসে টিকেট নিতে হবে ‘হট’ আইটেম পেতে হলে। এখন আমিতো আমার এই ছেলেমেয়েগুলিকে নিয়ে এখান থেকে সেখানে যাচ্ছি ভীড় ঠেলে ঠেলে, খুঁজেই পাচ্ছিনা ফ্রিজারের অবস্থান।

কিমকে জিজ্ঞেস করতেই কিম দিশেহারা হয়ে একে জিজ্ঞেস করে, তাকে জিজ্ঞেস করে, কি অবস্থা, দেখে আমার হাসি পেয়ে গেল। এর মধ্যেই দেখি বিশালদেহী পুলিশ সবখানে আছে, এক সময় দেখি আমার খুব প্রিয় এক ম্যানেজার (ডেভিড)কে, তাকে গিয়ে জিজ্ঞেস করতেই সে বললো, গার্ডেন সেন্টারেই আশেপাশে কোথাও হবে হয়তো। আমার সাথে কথা শেষ করেই ডেভিড হঠাৎ ঘোষনা করলো, লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা জনতার উদ্দেশ্যে, ‘ তোমরা যেখানে দাঁড়িয়েছো, এটা লাইন বলে ধরা হবেনা, তোমরা ঐপাশ দিয়ে গিয়ে লাইনে দাঁড়াও। বলতেই এত বড় বড় ট্রলি নিয়ে সবাই একসাথে দৌড় দিল, পুলিশও ছুটে গেলো তাদের সাথে সাথে, এক মহিলা হুমড়ি খেয়ে মাটিতে পড়ে গেলো। আমি আবার বিপদের গন্ধ পেয়ে সরে গেলাম ওখান থেকে। কারন এই সেলে দুই তিন বছর আগে নিউইয়র্কে মানুষের ভীড়ে পায়ের নীচে চাপা পড়ে কয়েকজন মারা গিয়েছিল।(চলবে)