ক্যাটেগরিঃ প্রবাস কথন

 

বিখ্যাত ব্ল্যাক ফ্রাইডে সেল থেকে আমরা কি কিছু কিনেছি? না, এখন আর আমরা এই হুড়োহুড়ির মধ্যে যাইনা। প্রায় চার পাঁচ বছর আগে আমরা পরিবারের সবাই মিলে রাত তিনটার সময় গিয়ে লাইনে দাঁড়িয়েছিলাম। তখন অবশ্য স্টোরের ভেতরে লাইন দেয়ার কোন ব্যবস্থা ছিলোনা। ভোর পাঁচটায় স্টোর ওপেন করে দিত, ব্যস যে আগে গিয়ে তার পছন্দের আইটেম ধরে ফেলতে পারতো, সে-ই সেটা পাওয়ার অধিকার অর্জন করতো। আমরা যেবার রাতে লাইনে দাঁড়িয়েছিলাম, সেই রাতে ছিল প্রচন্ড ঠান্ডা, আমাদের মেয়েরা ছিল অনেক ছোট, একটা ফ্ল্যাট স্ক্রীন টিভি কেনার শখ ছিল। রাত তিনটায় পৌঁছে দেখি আমাদের আগেই অন্ততঃ দুইশ জন দাঁড়িয়ে গেছে। তবুও মনে ক্ষীন আশা ছিল, ভীড়ের ফাঁক দিয়ে মেজো মেয়েকে ঢুকিয়ে দিতে পারলেই হলো, আমার মেজো মেয়ে খুব চালাক, সে ঠিক গিয়ে টিভি ছুঁইয়ে ফেলতে পারবে, আর একবার ছুঁতে পারলেই হলো, টিভি হয়ে যাবে আমাদের।

কিনতু স্টোর ওপেন হতেই সবাই এমন হুড়মুড় করে ঢুকে গেল ভেতরে, আমরা শুধু বোকার মত তাকিয়ে থেকে দেখলাম, তারপর ভেতরে গিয়ে টিভি না পেয়ে আবার গাড়ী ঘুরিয়ে ছুটলাম অন্য স্টোরে। কোথাও গিয়েই কিছুই পাইনি। এরপর থেকে আমরা আর এই কাজ করিনা। বরং সকাল ৬টার দিকে গিয়ে পড়ে থাকা জিনিস থেকেই দুই একটা কিনি, যেমন এবার আমি পরেরদিন বিকেল ৫টার সময় একটা ডিজিটাল ক্যামেরা কিনেছি (কারন কিছুই না কিনলে আমার কেমন যেনো নিজেকে পরাজিত মনে হয়)।

তবে ব্ল্যাক ফ্রাইডে সেল থেকে আমাদের তরুণ বন্ধু শাহীন শেষ পর্যন্ত একটা ফ্রীজার কিনতে পেরেছিল। শাহীন আমাদের বাড়ী এসে ওর অভিজ্ঞতা আমাদের বলেছিল, ” আন্টি শুনেন, আপনিতো আমাকে লাইনে রেখে চলে আসলেন, আমি দেখলাম, আমার লাইনে মাত্র দুইজন দাঁড়ানো, নিজেকে খুব এতিম মনে হচ্ছিল, আর মনে হচ্ছিল যে একটা ফালতু আইটেম কিনছি, আর কেউ এদিকে ফিরেও তাকায়নি। অথচ দেড় ডলার দামের টাওয়েল কেনার লাইনে রীতিমত হুড়াহুড়ি লেগে গেছিল, ধাক্কাধাক্কিতে এক লোক হুমড়ি খেয়ে পড়ে যেতেই ম্যানেজার আর পুলিশ এসে ঐ এলাকার সেল বন্ধ করে দিয়েছে। পরে সবাই যখন আবার ঠিকঠাক হয়ে দাঁড়িয়েছে, তখন আবার রিওপেন করেছে।”

ক্যালিফোর্নিয়ার এক দোকানে এক ক্রেতা লাইনে আগে ঢুকার জন্য আগে থেকে দাঁড়ানো মানুষজনের কাছে গিয়ে হঠাত করেই মরিচের গুঁড়া স্প্রে করতে থাকে। শুরু হয়ে যায় আরেক হট্টগোল। পরে অবশ্য ঐলোককে আটক করা হয়। গত বছর আমাদের ওয়ালমার্টে এক প্র্যাগনেন্ট মহিলার পায়ের উপর কেউ বোধ হয় হুমড়ি খেয়ে পড়েছিল, ওয়ালমার্ট কর্তৃপক্ষ সাথে সাথে এম্বুল্যান্স ডেকে তাকে হসপিটালে পাঠিয়ে দেয়। আরেকবার এক ক্রেতা কিছু কিনতে না পেরে, হাতের স্টীক দিয়ে পিটিয়ে পিটিয়ে জ্যাম জেলীর বোতলগুলি ভেঙ্গে গুঁড়া করতে শুরু করেছিল। আর এবার আমাদের ডিপার্টমেন্টে হট আইটেম ছিল ‘মটোরোলা টাচ স্ক্রীন ফোন’ মাত্র ৩৫ ডলারে। সন্ধ্যা সারে সাতটা থেকে মানুষ লাইন দিতে শুরু করে, রাত ১২টায় ফোন কিনবে বলে। রাত বারোটায় সেল শুরু হয়ে শেষ হয়ে যাওয়ার পর, এক মেয়ে এসে চড়াও হয়েছে আমার সহকর্মী রয় শেফার্ডের উপর। তার একটাই প্রশ্ন ছিল, তিন ঘন্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও কেন সে ফোন পেলোনা!

যাই হোক, ব্ল্যাক ফ্রাইডের দিন বেলা বারোটায় আমি যখন কাজে গেলাম, আবার দেখি চারিদিক ফাঁকা। আগেরদিনও ফাঁকা ছিল, ফ্রাইডেতেও ফাঁকা, কিনতু দুইদিনের ফাঁকাতে অনেক তফাৎ। আগেরদিন ছিলো হাট শুরুর প্রস্তুতি, পরেরদিন ভাঙ্গা হাটের নীরবতা। ফ্রাইডেতেও একইভাবে ফাঁকা পার্কিং লটে গাড়ী পার্ক করে ভেতরে ঢুকে সরাসরি চলে গেছি ব্রেকরুমে। ঐদিনও ছিল স্পেশাল আয়োজন, সকল স্টাফদের জন্য, দুইদিনের পরিশ্রমের সফল সমাপ্তি উপলক্ষ্যে আবার খাওয়া দাওয়া। ব্যাগ রেখে ক্লক ইন করে আমার কাজের এরিয়াতে ঢুকে গেলাম। তবে আমার কাজের এরিয়াতে প্রচন্ড ব্যস্ততা ছিল। ওয়ালমার্ট সকল গ্রাহকদের জন্য সাত দিনের একটা ডিল দিয়েছে, যে বা যারা নিজেদের কন্ট্র্যাক্ট রিনিউ করবে বা নতুন কন্ট্র্যাক্ট সাইন করবে সে-ই ১০০ ডলারের ওয়ালমার্ট গিফট কার্ড পাবে, তবে একখান কথা আছে, গ্রাহককে অবশ্যই স্মার্টফোন নিতে হবে, স্মার্টফোন নিতে গেলেই বাধ্যতামূলকভাবে ইন্টারনেট কানেকশান নিতে হবে। নিয়েছে, এখানের হুজুগে মানুষেরা তা-ই নিয়েছে। তাৎক্ষনিক ১০০ ডলার পাওয়ার জন্য মাসিক অতিরিক্ত ২৫ডলারের ইন্টারনেট কানেকশান নিয়েছে। আর এভাবেই আমার পুরো সময়টা ব্যস্ততার মধ্যেই কেটে গেছে। ঠিক করেছি, নেক্সট ইয়ারে আমি ওভারনাইট ডিউটি করবো, তাহলে এই ব্ল্যাক ফ্রাইডে সেলের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সব রকম অভিজ্ঞতা হয়ে যাবে। (শেষ)