ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

 

বেশ কয়েক মাস বিরতির পর টিপাইমুখ নিয়ে আবার শোরগোল শুরু হয়েছে। আমি গনিত খুব ভালো বুঝলেও ভূগোল এ একেবারেই কাঁচা ছিলাম। ভূগোল এ কাঁচা ছিলাম বলেই আবহাওয়া, নদ, নদী, প্রকৃতি সম্পর্কে আমার ভৌগোলিক ধারনা কম। তারপরেও দেশের ভাল-মন্দ বুঝার তাগিদেই কম আকর্ষণীয় হলেও পত্র পত্রিকা পড়ে টিপাইমুখ সম্পর্কে কিছু জানার চেষ্টা করছি। টিপাইমুখ বাঁধ নিয়ে এত বাদাবাদি দেখে আমি ভেবেছিলাম বুঝি বাঁধ তৈরী হয়ে গেছে।

আমাকে আরও পড়তে হবে ভালো করে জানার জন্য, এই সত্যিটা স্বীকার করে নিয়েও বলতে পারি, পত্রিকার পাতায়, ব্লগে, ফেসবুকে যে ধরনের গরম গরম বক্তব্য পাঠ করি, প্রথমেই আমার মনে হয়েছে যেহেতু দুই দেশের ব্যাপার, তাই ভাষা ব্যবহারে কুটনৈতিক ভদ্রতা বজায় রাখা ফার্স্ট প্রায়োরিটি, দুই দেশের নেতা নেত্রীদের জন্য অন্ততঃ। আজকের কাগজেই পড়লাম, বেগম জিয়া গাড়ী মার্চে কুষ্টিয়াতে পৌঁছে যে বক্তৃতা দিয়েছেন, তাতে তিনি স্পষ্ট করেই বলেছেন, আওয়ামীলিগ ভারতের তাঁবেদার, বাংলাদেশকে ভারতের করদ রাজ্যে পরিনত করবে, করিডোর, ট্র্যানজিট, গঙ্গার পানি, তিস্তার পানি সব ভারতকে দিয়ে দিয়েছে, বিনিময়ে তারা ক্ষমতায় বসতে পেরেছে। এটা হচ্ছে তিনবারের প্রধান মন্ত্রীর বক্তব্য, খোলা ময়দানে বিশাল জনসভায় উপস্থিত সবাইকে সাক্ষী রেখে। এই ধরনের জনসভাতে ভারতীয় সাংবাদিক থাকা অসম্ভব কিছুনা, তাঁরা নিশ্চয় তাঁদের মত করেই রিপোর্ট পাঠায়।

প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী আরও বলেছেন, টিপাইমুখ বাঁধের ব্যাপারে তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে চিঠি পাঠিয়েছেন। এই কথাটা উনি খুব গর্বের সাথে বলেছেন, যা কিনা উনি করতেই পারেন। ভারতের প্রধান মন্ত্রীরও জানা থাকা উচিৎ যে বাংলাদেশটা রামরাজত্ব নয়, সেদেশের বিরোধী দলের নেত্রীও সদা সজাগ দৃষ্টি রেখেছেন দেশের স্বার্থের ব্যাপারে। শেখ হাসিনার সাথে আঁতাত করা গেলেও বেগম জিয়ার কাছে কোন খাতির নেই। আর এমনটা ভেবেই হয়তো ডঃ মনমোহন সিং বেগম জিয়ার চিঠির উত্তর সাথে সাথে পাঠিয়েছেন। আমার কেনো যেনো মনে হচ্ছে, প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী এখানেই একটি কুটনৈতিক ভুল করেছেন, উনি ভারতের প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে চিঠিপ্রাপ্তির কথা জনসভায় বলেছেন, অথচ ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে একটা ধন্যবাদ দেননি, অথচ বরফ ভাঙ্গতে হলে এটা দিয়েই শুরু করা উচিৎ ছিল। উনি তাতো করেনই নাই, উপরন্তু চিঠি প্রাপ্তির কথা এমনভাবে বলেছেন যেনো কোন যদু মধুর কাছ থেকে চিঠি এসেছে যে পরে খোলা হবে। হায়! সংসারজীবনে এই ধরনের অভিমান চলে, অথবা গলা ফাটিয়ে ঝগড়া করা চলে, প্রতিবেশীকে শাপশাপান্ত করা চলে, কিন্তু দেশ চালাতে গিয়েতো এইসব অভিমান, গলাবাজি, শাপশাপান্ত করলে চলবেনা।

তাছাড়া উনার চেলাচামুন্ডারা যে ভাষাতে কথা বলে, উনার সেই ভাষাতে কথা বলা উচিত না। উনি যখনই বিরোধী দলে থাকেন, তখনই শিষ্টাচার বহির্ভুতভাবে, কুটনৈতিক রীতিনীতি অগ্রাহ্য করে বছরের পর বছর ধরে ভারতের বিরূদ্ধে বিষোদগার করেন। অথচ উনি যখন আবার প্রধানমন্ত্রী হবেন( আর দুই বছর পরেইতো হবেন), তখনও ভারতকেই পাবেন প্রতিবেশী দেশ হিসেবে। তখন উনি কি এভাবেই কথা বলতে পারবেন? তাতো পারবেননা, কেননা এর আগেও তিনবার প্রধানমন্ত্রী থাকা কালে উনাকে কখনও একটা টু শব্দও করতে শুনিনি ভারতের বিরূদ্ধে। এটাতো আবহমানকাল ধরেই চলে আসছে, জোর যার, মুল্লুক তার। ভারত বিশাল বড় দেশ, তাদের ক্ষমতা, শক্তি সবই বেশী, শক্তি যে বেশী ধরে, তার চলনে বলনে সব সময় হামবড়া ভাব কাজ করে। আমেরিকার মাতব্বরীতে সারা পৃথিবী কম্পমান। ভারত দাদাগিরি করে বলে দাদার সাথে ঝগড়া করেতো কোন লাভ নেই, বরং নিজের স্বার্থে একটু মন রেখে কথা বলে যদি স্বার্থ হাসিল করা যায়, সেটাই হবে কাজের কাজ। তবে একইসাথে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বা পররাষ্ট্রমন্ত্রীর টিপাইমুখ বাঁধের ব্যাপারে আরও জোরালো বক্তব্য আশা করে বাংলাদেশের জনগন। আপনারা সোচ্চার নাহলে ‘ভারতের প্রতি নতজানু’ অপবাদ জীবনেও ঘুচবেনা। বন্ধুবৎসল থেকেও অন্যায়ের প্রতিবাদ করা যায় এবং সেটা করা উচিত।

কিন্তু বেগম জিয়ার বক্তৃতা নিয়ে অনেক ভারতীয় বাঙ্গালীদের মনেও ক্ষোভ আছে। উনার বক্তৃতার প্রতিটি কথা ভারতীয়দের মগজে ঢুকে গেছে। উনি যে ভাষাতে গত দুই যুগ ধরে বক্তৃতা দিয়ে আসছেন, তিনবার কেনো, ছয়বার প্রধান মন্ত্রীত্ব পেলেও মনে হয় উনার ভাষার কোন পরিবর্তন হবেনা। তাছাড়া উনার কথাতো এখন আর বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়না। আগের টার্মে বলেছিলেন, আওয়ামীলীগ ক্ষমতায় আসলে দেশ ভারতের কাছে বিক্রী হয়ে যাবে, দেশের কোন কোন অঞ্চল থেকে আযানের বদলে উলুধ্বনি শোনা যাবে, আরও কত কিছু। কই আওয়ামীলীগতো এসেছে ক্ষমতায়, কিছুইতো হয়নি, সব ঠিক আছে, বরং ২০০১ সালে বিএনপি যখন ক্ষমতায় এলো, দেশের আনাচে কানাচে যে মৃদু আওয়াজে উলুধ্বনি শোনা যেতো, সেটাও স্তব্ধ করে দিয়েছিল বেগম জিয়ার সোনার ছেলেরা। যদি বলি, বেগম জিয়ার এই ভাষার বক্তৃতা শুনেই উনার ছেলেরা উজ্জীবীত হয়ে এমন পাশবিক কাজ করেছিল, সেটা কি খুব বেশী ভুল বলা হবে?

এক ব্লগারের লেখাতে দেখলাম, সে আহবান জানিয়েছে সবাইকে, ব্লগে যেনো সবাই কড়া প্রতিবাদ জানায় ভারতের বিরূদ্ধে। অবশ্যই অনলাইন হচ্ছে খুব ভালো মাধ্যম লেখালেখির জন্য, তবে ব্লগার যদি সাথে যোগ করতো, লেখার ভাষা খুব তীক্ষ্ম হতে পারে কিনতু শিষ্টাচার বর্জিত নয়, তাহলে খুব ভালো হতো। কারন আমরা ব্লগে লিখি কেনো, যাতে করে শুভবুদ্ধিসম্পন্ন সকলেই পড়তে পারে। তাদের মধ্যে ভারতীয় বাঙ্গালীদের দৃষ্টি আকর্ষণও জরুরী। ভারতীয় বাঙ্গালীরাও পড়ে, আমার কাছে এক ছেলে ফেসবুকেই মন্তব্য করেছিল, ” আমরা নিজেরাও চাই যে কোন সমস্যার সুন্দর সমাধান। আমি নিজে বাংলাদেশের প্রতিটি পত্রিকা নিয়মিত পড়ি, বাংলাদেশের লেখকদের গল্প উপন্যাস পড়ি, আমার ভালো লাগে বলেই পড়ি, কিনতু খুব খারাপ লাগে যখন খালেদা জিয়া ভারতকে গালিগালাজ করে, খারাপ লাগে যখন কিছু ছেলেপেলে উলটা পালটা কমেন্ট করে, তখন মনটা বিরূপ হতে শুরু করে। মমতা ব্যানার্জী বাংলাদেশে যাননি, আমরা নিজেরাও এটা সমর্থন করিনি, আমরা এখানে অনেক সমালোচনা করেছি তাঁর, কিনতু খালেদা জিয়ার বক্তব্যের তেমন সমালোচনা হতে দেখিনা, উনি এসব বলা বন্ধও করেননা। বাংলাদেশের নেতা নেত্রীদের নিজেদের মধ্যেইতো সৎভাব নেই, উনারা নিজেরা যদি কিছু কিছু ব্যাপারে একাট্টা থাকতো, তাহলে অনেক সমস্যার সমাধান হতো। নিজেদের দেশের ভেতর বোমাবাজি হয়, কতজন নেতা নেত্রীর মৃত্যু হলো, এগুলোতো ভারতীয়রা গিয়ে করেনি। আসলে আমরাও চাই, বাঙ্গালী হিসেবে সকলেই ভালো থাকি, কিনতু সাধারন জনগন চাইলে কি হবে, নেতা নেত্রীদের চাইতে হবে।”

মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কথা আর কি বলবো, নতুন মন্ত্রী সভাতে চমক দেখিয়েছিলেন, চমক কেটে গেছে সকলের। পররাষ্ট্রমন্ত্রী অত্যন্ত সুশীলা, উচ্চশিক্ষিতা, বিনয়ী তবে এই উপমহাদেশে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হতে গেলে এই গুনগুলোই শেষ কথা নয়, কথা চালাচালি জানতে হবে, কথা বেচতে হবে, কথা আদায় করতে হবে। কেন যেনো মনে হচ্ছে এই মেধাবী ডাক্তার ছাত্রজীবনে অসামান্য সাফল্যের অধিকারী হলেও, এইবেলা এসে অকৃতকার্য্য হয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর যদি বোধোদয় না হয়, মাননীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রীর উচিৎ এই মন্ত্রীত্ব পদ নিজে থেকেই ত্যাগ করা, উনার মেধা উনি উনার পেশাগত যোগ্যতা বলেই মানুষের সেবায় নিয়োজিত করতে পারেন।

এবার টিপাইমুখের কথায় আসি, মাত্র একটি রাজ্য সরকারের সাথে কোন এক কোম্পানীর চুক্তি হয়েছে। এখনও কিছুই হয়নি, হাতে সময় আছে, তার চেয়েও বড় কথা ডঃ সিং সর্বসমক্ষে বিবৃতি দিয়েছেন, বাংলাদেশের ক্ষতি হয়, এমন কিছু করা হবেনা। এরপরেও যদি উনার কথার বরখেলাপ হয়, আসামীর কাঠগড়ায় তাঁকে দাঁড়াতেই হবে। ডঃ সিং রীতি মেনে আমাদের বিরোধী নেত্রীর চিঠির উত্তর দিয়েছে, উনার যদি বদ খায়েশ থাকতো, এত দিনে সেটা বুঝা যেতো। তাছাড়া যেখানে ভারতেরও ঐ সীমান্তবর্তী জনগনের প্রবল আপত্তি আছে, এই বাঁধ নির্মানের ব্যাপারে, এটা জানার পরেও কি ভারত সরকার এমন একটি সিদ্ধান্ত জোর করে চাপিয়ে দিবে আমাদের উপর! যাই হোক, ভারতীয় সরকারের দায়িত্ব নিজের জনগনের ভালো-মন্দ বুঝা, আমরা বুঝবো আমাদের ভালো-মন্দ, প্রয়োজন আমাদের, নিজের প্রয়োজন যখন বড় হয়, বুদ্ধিমানদের উচিৎ, ছলে বলে কৌশলে নিজের ভাগ আদায় করে নেওয়া। ঝগড়াতো করাই যায়, যে কোন সময়, ভদ্রতাটুকুই বড় কঠিন। এই কঠিন কাজ না করতে পারলে আর নেতার মর্যাদা দেবো কেন, তাহলেতো আমাদের মত সাধারনের পর্যায়েই চলে আসতে হবে সকল নেতা নেত্রীকে। দুই দেশের ব্যাপার, আলাপ আলোচনার মাধ্যমেই সুরাহা করার কথা। আলাপে বসার আগেই যদি এমন তিক্ততা তৈরী হয়, আলাপে বসলেওতো ভালো কথা বের হবেনা মুখ থেকে। এমনিতেই দেশে হাজার সমস্যা, নেতা নেত্রীদের পারস্পরিক সহনশীলতা, ধৈর্য্যশীলতাই এমন সমস্যা থেকে উত্তরনের সহজ উপায়। বেগম জিয়া বলেছেন, এই ব্যাপারে সহযোগীতা করবেন সরকারকে, এটাই বরং করেন, সব ভারতীয়তো খারাপ চায়না আমাদের, ঐ যে, যার কথা একটু আগেই বললাম, সে খাঁটি ভারতীয় হয়েও শুধুমাত্র বাঙ্গালী হিসেবেই সে বাংলাদেশের ভালো চায়, তার আকাঙ্খাই পূর্ণ হোক, এই ব্যাপারে অন্ততঃ দুই নেত্রী একেবারে নেতাসুলভ ভঙ্গীতে একসাথে কাজ শুরু করুন। ডঃ মনমোহন সিংও নিশচয় উনার মেধা, জ্ঞান ও প্রজ্ঞাকেই ব্যবহার করবেন এই যৌথ সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে।