ক্যাটেগরিঃ দিনলিপি

 

আমার এক সহকর্মীর নাম রয় শেফার্ড। মা জার্মান বাবা আমেরিকান হলেও তার চেহারাতে জার্মান আদলটাই বেশী আসে। রয় আমার খুব ভালো বন্ধু ও সহকর্মী। বয়স ৩৪-৩৫ হবে, গত ৭ বছর ধরে সে ওয়াল-মার্টে চাকরী করছে। সে নিজেকে পরিবারের ‘ব্ল্যাক শীপ’ মনে করে। কারন তার বড় ভাই আমেরিকান মিলিটারীর খুব উঁচু র‌্যাঙ্কে আছে, মেজো ভাই আছে রেলওয়ে কোম্পাণির সিনিয়র ম্যানেজার হিসেবে, আর সে চাকরী করে ওয়াল-মার্টে। রয়ের সাথে আমার কথা বলতে ভালো লাগে কারন সে আমাদের কালচার সম্পর্কে ভালোই জানে। সে মহাত্মা গান্ধী, ইন্দিরা গান্ধী, শেখ মুজিবের নাম জানে, আর জানে আমাদের দেশের প্রধানমন্ত্রী, বিরোধী নেত্রী একজন মহিলা, যা কিনা আমারিকার ইতিহাসে কখনও ঘটেনি।

রয় এমনিতে একজন নাট্যকার, টিভি নাটকের স্ক্রীপ্ট লেখে, পত্রিকাতে কলাম লেখে, অনলাইনে বিজনেসও করে, আর করে ওয়াল-মার্টের ইলেক্ট্রনিক ডিপার্টমেন্টে চাকরী। আমার সাথে তার আরেকটি কারনেও মিলে, আমি যেমন শখের বশে ফোন সার্ভিসে চাকুরী করি, সে-ও শখের বশেই ইলেকট্রনিক জিনিস নিয়ে সুখে আছে।

আমি এই কিছুদিন ধরে একটু আধটু লিখতে শুরু করেছি, প্রবাসে জুতা সেলাই থেকে চন্ডীপাঠ নিজেকে করতে হয় বলে লেখালেখির জন্য আলাদা কোন সময় বের করতে পারিনা। তাই কাজের জায়গাতেটি ব্রেকের সময়, লাঞ্চ ব্রেকের সময় আমি আগে গল্পের বই পড়ে সময় কাটাতাম, আর ইদানিং খাতা কলম নিয়ে আঁকিবুকি করার চেষ্টা করি। আমি ছাড়াও ওয়াল-মার্টে আরও কিছু মহিলাকে দেখা যায় অযথা আড্ডা না মেরে বই পড়ে সময় কাটায়। তারা বয়সে আমার থেকে কত বড় হবে জানিনা, কিন্তু আমাকে আদর করে ‘বুকিশ গার্ল’ ডাকে। আমার শুনতে খুব ভালো লাগে, কেমন যেনো মায়ের আদর মনে হয়। তারা হঠাত করেই আবিষ্কার করে আমাকে খাতা কলমে কিছু লিখে যাচ্ছি। যখন জানতে পারে যে আমি পত্রিকাতে লিখি, ব্লগে লিখি তারা আমাকে খুব উৎসাহ দেয়, যেনো আমি আমেরিকার জীবন নিয়েও কিছু লিখি, প্রয়োজনে তারা আমাকে উপাত্ত দিয়ে সাহায্য করবে। একইরকমভাবে রয় শেফার্ডও আমাকে খুব উৎসাহ দেয়। সে আমাকে যতটা বন্ধু ভাবে তার চেয়েও বেশী বড় বোন ভাবে।

আজকে আমার মনটা একটু খারাপ ছিল। তার উপর এখন ঠান্ডা-জ্বরের সময় বলেই শরীরটাও খারাপ লাগছিলো। টি-ব্রেকের সময় কথা প্রসংগে রয়কে জিজ্ঞেস করলাম যে সে যত আর্টিক্যাল লিখে পত্রিকাতে, সবার পছন্দ হয় কিনা, অথবা কারো পছন্দ না হলে প্রতিবাদ করে কিনা, আর প্রতিবাদ যদি করে, প্রতিবাদের ভাষা কেমন হয়! একনাগাড়ে এতগুলো প্রশ্ন করেছি, রয় অবশ্য অভ্যস্ত আমার এই ধরনের মালটিপোল কোয়েশ্চেন শুনে। সে আমাকে জানালো, পত্রিকার পাতায় যে সমস্ত প্রতিবাদ ছাপা হয়, সেগুলো তেমন কঠিন কিছুনা, কিনতু ফেসবুকে যেগুলো ছাপা হয়, মাঝে মাঝে সেগুলো খুব বাজে ধরনের হয়, যুক্তিছাড়াই নাকি খুব আক্রমনাত্মক ভাষা ব্যবহার করে অনেকে। তবে সে নাকি খুব এনজয় করে এগুলো। আমি একটু অবাক হয়ে গেছি এইকথা শুনে! আমার প্রশ্ন শুনেই সে ধরে ফেলেছে আমার মন খারাপের কারন। সে জানে আমার এই লেখালেখির কথা। আমরা মাঝে মাঝেই রাজনীতি নিয়ে কথা বলি, আমি বলি কম, শুনি বেশী। এমনিতে রয় ওবামাকে সমর্থন করেনা, আমি ওবামাকে সমর্থন করি। আমরা দুজনেই অবশ্য জানি আমাদের এই ভিন্নমতের কথা। আমাদের মধ্যে তর্ক হয়, কিনতু কখনও যুক্তির বাইরে যাইনা অথবা আক্রমনাত্মক ভাষা ব্যবহার করিনা। এভাবেই আমাকে দেখে অভ্যস্ত সে, তাই আমার মনটা খারাপ দেখে সে জানতে চাইলো কি এমন ঘটনা ঘটেছে।

তাকে বললাম, আমি সাধারনতঃ হাট্টিমা টিম টিম টাইপ লেখা লিখে থাকি, সাধারন ভাষায় খুব সাধারন বিষয় নিয়ে। দুই একজন প্রশংসাও করে। কিনতু মাঝে মাঝেই আমি রাজনৈতিক নেতাদের কথাবার্তা নিয়ে দুই একটা লেখা লিখে ফেলি, যেটাতে আমার মতটাকেই আমি ব্যাখ্যা করে যাই। যে দুই একটা লেখা লিখেছি, প্রতিক্রিয়া পেয়েছি অনেক বেশী। প্রতিক্রিয়াগুলো খুব একপেশে, কখনও কখনও এমন আক্রমনাত্মক ভাষা ব্যবহার করে পাঠকেরা, এগুলো পড়ে আমার কেমন জানি এক ধরনের অশান্তি লাগে মনে। নিজের লেখাটা আবার পড়ে দেখি, ভেবে পাইনা কেনো কেউ কেউ এমন ক্ষ্যাপাটে ধরনের সমালোচনা করে। অনেকে ব্যক্তিগতভাবে আক্রমন করে থাকে। হাসতে হাসতেই রয়কে বললাম, একজন বাংলাদেশী প্রফেসর আমাকে ‘ওয়ালমার্টের চীপ এসোসিয়েট’ বলে তাচ্ছিল্য করার চেষ্টা করেছে। অন্যেরা আমাকে ইন্ডিয়ার পাচাটা, ইন্ডিয়ার দালাল সহ নানা উপাধীতে ভূষিত করেছে। এগুলো শুনে রয় শেফার্ডও হাসতে হাসতে বললো যে “তারা তোমাকে চেনেনা, তারা জানেওনা তোমার যোগ্যতা সম্পর্কে, তাই তারা এমন করে বলে। যদি কখনও তোমার সাথে ওদের একবার দেখা হয়, আমার বিশ্বাস তারা নিজেদের ভুল ধারনার জন্য সরি ফিল করবে। হয় এগুলো ইগনোর করো, নাহয় আবার মেরি হ্যাড আ লিটল ল্যাম্ব লিখতে শুরু করো”।

টি-ব্রেক টাইম শেষ হয়ে যাওয়ার আগেই রয় বলল, “পলিটিক্স নিয়ে কথা বলা মানেই জেনে শুনে কাঁটা বিছানো পথ ধরে হাঁটা, পা বাঁচিয়ে চলতে চেষ্টা করবে, নাহলে কাঁটা ফুটলে চিমটা দিয়ে কাঁটাটা টান দিয়ে তুলে ফেলবে। ব্যথা একটু পাবে অবশ্যই, তবে ঐ ব্যথা ধরে বসে পড়লে আর পথ শেষ হবেনা। আমাকেও অনেকে বুশের চামচা বলে, কেউ কেউ ওয়ালমার্টের সাধারন কর্মী মনে করে, তারা কেউই জানেইনা আমার অন্য পরিচয়, তাতে কি, তারা জানেনা বলেতো আর তোমার যা অর্জন, সেগুলোতো আর কমে যাবেনা। তোমার বিশ্বাস থেকে তুমি লিখবে, যাদের ভালো লাগবেনা সেটা তাদের ব্যাপার, তারা যদি বাজে মন্তব্য করে, সেটাও তাদের ব্যাপার, ওগুলো পড়োনা, বা পড়লেও মাথায় ধরে রেখোনা, ফালতু কথার উত্তরও দিতে যেয়োনা। যদিও আমিও উলটা ধাক্কা দেই, তবে তোমার দ্বারা এগুলো সম্ভব হবেনা। কাজেই বি পজিটিভ। আস্তে আস্তে অভ্যাস হয়ে যাবে।”

রয় এর সাথে কথা বলতে এইজন্যই ভালো লাগে। সব সময় পজিটিভ কথা বলে, রাখঢাক না রেখে, আবার খেয়ালও রাখে কথা বলার সময়, পাছে কেউ ব্যথা না পায় মনে তার কথা শুনে। ফিরে আসার আগে আবার মনে করিয়ে দিলো, মন খারাপ না করে প্রয়োজনে ‘হাট্টিমা টিম টিম’ অথবা ‘মেরী হ্যাড এ লিটল ল্যাম্ব’ জাতীয় রাইম লিখতে, যাতে করে মনটা আবার চনমনে হয়ে উঠে।