ক্যাটেগরিঃ প্রবাস কথন

টেরি বার্কলার আমার সহকর্মী। সরাসরী সহকর্মী নয়, আমার ডিপার্টমেন্টের পাশেই ওর ডিপার্টমেন্ট। তাই সবসময় ওর সাথে উঠাবসা, কথা বার্তা হয়। মাঝে মাঝে পারস্পরিক সাহায্য সহযোগীতাও চলে। টেরীর বয়স ৪৫ বছর, গায়ের রঙ সাদা, মাথার চুল সোনালী, তার মুখের চেহারা বলে দেয়, যৌবনে সে অসামান্য সুন্দরী ছিল। তাঁর অনামিকার আংটি বলে সে বিবাহিত, কিনতু কেউ জানেনা এটা তার কত নাম্বার বিয়ে। টেরি স্মোক করে এবং তা খুব বেশী মাত্রায় করে। সারাক্ষন হৈ চৈ করে সকলকে মাতিয়ে রাখে। তাকে কেউ রাগ করতে দেখেনি। তাকে কেউ গোমড়ামুখেও দেখেনি। আমি যাদের সাথে কাজ করি, তাদের মধ্যে দুই একজনকে আমি খুবই পছন্দ করি। টেরি তাদের অন্যতম। তাকে পছন্দ করার অন্যতম কারন হচ্ছে তার মজার পার্সোন্যালিটি। তাকে সবাই ক্রেজী ডাকলেও, আমি ডাকিনা। তার মত এমন সদানন্দময়ী হতে পারলে আমি অনেক খুশী হতাম। টেরি এমনই হিউমার জানে যে ছোট্ট একটি উদাহরন দিলেই বুঝা যাবে। টেরির ইউজার আইডি হলো, টেরি বার্কস। আমার কাছে একদিন টেরী এসেছিল আমাদের কম্পিউটার থেকে কিছু ডাটা কালেক্ট করতে। তার ইউজার নেম দেখে আমি শুধু বলেছি টেরি বার্কস, সাথে সাথে ও ‘ঘেউ ঘেউ’ করতে শুরু করে দিলো। এই হলো টেরী বার্কলার।

কিছুদিন আগেই টেরী হসপিটাল থেকেফিরেছে। অনেকদিন সে অনুপস্থিত ছিল কাজে, আমার দিনগুলোও ছিল ভীষন পানসে। আমার একটুও ভালো লাগতোনা যতক্ষন আমি কাজে থাকতাম। এখন টেরি ফিরে এসেছে, কিনতু তাকে দেখে আমার বুকটা মুচড়ে মুচড়ে উঠে। ওর স্বাস্থ্য ভেঙ্গে গেছে, প্রায় সময় দুই হাতে পেট চেপে ধরে রাখে। কাউকে দেখিনা এটা নিয়ে বিচলিত হতে। কারন সবাই ব্যস্ত তাদের নিজেদেরকে নিয়ে।

টেরির কোলন সার্জারী হয়েছে। গত বছর তাকে দেখতাম প্রায়ই পেট চেপে ধরে রাখতো। আমি সব সময় ওকে তাড়া দিতাম, ডাক্তারের কাছে যেতে। ও গায়ে মাখতোনা কথা, আমাকে দেখলেই তার মনে পড়ে যেতো, তার ডাক্তার দেখানো উচিত। আমি কিছুদিন নার্সিং পড়েছিলাম আমেরিকাতে, দুই সেমেস্টার বাকী থাকতেই প্রফেসারের সাথে মতে মিলেনি বলে পড়াটা ছেড়ে দিয়েছিলাম, সে আরেক গল্প, কিনতু যতদিন পড়াটা চালিয়ে গেছিলাম, অনেক কিছুই শিখেছিলাম। উপসর্গ দেখে রোগ সম্পর্কে কিছুটা ধারনা করতে শিখেছিলাম, ওষুধের নামধাম, পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া মোটামুটি এখনও মনে আছে। আমাদের দেশের মত এখানেও অনেকেই সমস্যার কথা ঠিকভাবে বলতে পারেনা, তাই রোগীর সাথে কথা বলে বলে কিভাবে তার সমস্যার কথা বের করতে হয়, সেটাও ভালোই রপ্ত করেছিলাম। সেই জ্ঞান থেকেই ধারনা করতে পেরেছিলাম, টেরির সমস্যা শুধু শারীরিক নয়, মানসিক চাপও আছে। যে কোন কারনেই হোক, সে বাস্তবতাকে আড়াল করতে চাচ্ছে। টেরীকে নিয়ে একদিন বসলাম তার জীবনের গল্প শুনবো বলে।

টেরী বিবাহিত। বর্তমান বিয়েটা টেরির তৃতীয় বিয়ে। তার বর্তমান স্বামী ফ্র্যাঙ্ক একসময় মিলিটারীতে কাজ করতো (কি কাজ জানিনা), সে আর্লি রিটায়ারমেন্টে চলে যায় এবং কোন ফ্যাক্টরীতে কাজ করতে থাকে। কিনতু কিছুদিন পরেই ফ্র্যাঙ্ক অসুস্থ হয়ে পড়ে, ডাক্তার দেখিয়েও কোন লাভ হয়নি, কারন ডাক্তার বলেছে ফ্র্যাঙ্ককে ড্রিঙ্ক করা বন্ধ করতে, অবশ্যই ধীরে ধীরে (কারন সে কঠিন এল্কোহলিক)। ফ্র্যাঙ্ক মিলিটারী থেকে রিটায়ার করার পর পেনশনের টাকা সমস্ত তুলে খরচ করে ফেলেছে। এখন বাড়ীর মর্টগেজ, সমস্ত ইউটিলিটি বিল, ডাক্তারের বিল মিটাতে গিয়ে তারা মোটামুটি ফতুর হয়েছে। এখন টেরির একা চাকুরীর পয়সাতে চলেনা, ঋনগ্রস্ত হয়ে পড়েছে, তারপরেও ফ্র্যাঙ্কের ড্রিঙ্ক করা বন্ধ হয়নি, টেরির সিগারেট টানা বন্ধ হয়নি। সমস্ত শুনে আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম এত ব্যথা বুকে নিয়ে, এত সমস্যার চাপ মাথায় নিয়ে সে কি করে এমন হাসি খুশী থাকতে পারে! এই কথা শুনার সাথে সাথে সে এক মুহূর্ত থমকালো, তারপর সে কেঁদে ফেললো, সে কান্না কোন হাউ-মাউ কান্না নয়, বুকের ভেতর থেকে উঠে আসা কান্না। তাকে দেখে আমার এত কষ্ট হচ্ছিল, ওর পিঠে হাত রেখে বুঝালাম, ডাক্তারের কাছে না গেলে যে ও মরেও যেতে পারে, মরে গেলে পরে যে সবই শেষ, এই কথা সেও ভালোই বুঝে, কিনতু ভিনদেশী কারোর মুখে এমন দরদের কথা শুনে সে এমনভাবে তাকালো যেনো মনে হলো এমন কথা এই প্রথম ও শুনলো আমার কাছে।

টেরী ডাক্তারের কাছে যাওয়ার পর ডাক্তার ডায়াগনোসিস করলো যে ওর কোলনের কিছু অংশ ইনফেকটেড হয়েছে এবং তা সার্জারির মাধ্যমে কেটে ফেলতে হবে। টেরি চলে গেলো হসপিটালে, টেরি আসেনা, দুই সপ্তাহ হয়ে যায় টেরি আসেনা, আমি একদিন জুলিয়াকে বললাম, টেরিকে ফোন করে দেখতে, জুলিয়া ফোন করে নাকি টেরিকে বলেছে, রীটা তোমার জন্য পাগল হয়ে গেছে। তুমি পারলে রীটার সাথে কথা বলো। আমি অবশ্য জানতামনা এত কথা। টেরীই আমাকে জানালো এই কথা, বললো যে কেউ যায়নি তাকে হাসপাতালে দেখতে, তবু ভালো যে আমি তার কথা সব সময় জিজ্ঞেস করেছি। আমার খুব অপরাধবোধ হতে লাগলো ভেবে যে টেরীকেতো ওয়েলকাম ব্যাকও জানানো হয়নি বা হসপিটালে ‘গেট ওয়েল সুন’ বেলুন বা কার্ড নিয়েও কেউ যায়নি। অথচ এগুলো নিয়ে তার কোন দুঃখ নেই, কোন অভিযোগ নেই, আমি শুধু ওর কথা জানতে চাইতাম, এতেই সে ধন্য হয়ে গেছে। হায় ঈশ্বর, এমনও ভালো মানুষ হয়!

সেদিন টেরিকে দেখি আবার পেটে হাত দিয়ে দাঁড়ানো, কাজে জয়েন করতে হয়েছে, ছুটি যা পাওনা ছিল সব শেষ হয়েও অতিরিক্ত ছুটি নিয়ে সে ছুটির খাতায়ও দেউলিয়া হয়ে গেছে। এখন সে কাজে আসে ঠিকই, কিনতু নীচু হতে কষ্ট হয়, হাঁটতে কষ্ট হয়, পেট চেপে ধরে হাঁটে। খাওয়া দাওয়াতে নাকি রুচী নেই, এদিকে সিগারেট ঠিকই টেনে যায়। আমি তাকে বললাম যে ডাক্তারের সাথে যোগাযোগ করো, তখনই সে বললো, আর কেউ আমাকে নিয়ে ভাবেনা, তুমি একমাত্র আমার পেছনে এভাবে টিকটিকির মত লেগে আছো। ডাক্তারের কাছে সে ভয়ে যায়না, যদি আবার সার্জারী করতে বলে, তাহলে সে বিল শোধ করতে পারবেনা। বললাম তোমার ইন্সিওরেন্স কোম্পানী বিল মেটাবে। কিন্তু এও জানি ইন্সিওরেন্স কোম্পানী ৮০% মিটায়, বাকী ২০% বিলের ধাক্কাও বিশাল টাকার ধাক্কা। (সত্যি কথা বলতে কি, এই ভয়ে আমি নিজেই ডাক্তারের কাছে যাইনা, অপেক্ষায় থাকি, কবে দেশে যাব, সেখানে গিয়ে চেক-আপ করিয়ে আসবো))। বলি তাহলে সিগারেট ছেড়ে দাও, বলে সিগারেট না খেলে ও পাগল হয়ে যাবে। কারন তাকে প্রচন্ড চাপের ভেতর দিয়ে যেতে হচ্ছে।

ফ্র্যাঙ্ক কেমন আছে জিজ্ঞেস করতেই সে মুখে লজ্জা এনে বলে, “ফ্র্যাঙ্ক বলেছে সে বেশীদিন বাঁচবেনা, কিনতু আমাকে সে পাগলের মত ভালোবাসে। এটা শুনে আমার মায়া লাগে, তাই তাকে আর কিছু বলিনা। থাক ড্রিঙ্ক না করতে দিলে সে আরও তাড়াতাড়ি মরে যাবে। আমি সেটা সইতে পারবোনা। যার যার জীবন তার তার। আমার সার্জারীর সময় ফ্র্যাঙ্ক নিজের অসুস্থ শরীর নিয়েও আমাকে অনেক যত্ন করেছে, তাই আমিও তার শেষ সময়টা তার নিজের মত করেই থাকতে দিতে চাই।”

এই কথা শুনার পর আমি আরেক টেরিকে আবিষ্কার করলাম। যে মাত্র ১৬ বছর বয়সে প্রথম প্রেমে পড়েছিলো, ১৭ বছর বয়সে একটি মেয়ে জন্মের পরেই সেই বয়ফ্রেন্ডকে বিদায় করে দিয়ে ২০ বছর বয়সে প্রথম একজনকে বিয়ে করে। কিনতু বিয়ের কিছুদিন পরেই স্বামীকে খুব ‘Bossy’ মনে হতেই সাথে সাথে তাকে কিক আউট (টেরির ভাষাতে) করে দিয়ে কিছুদিন সে অপেক্ষা করে। কলেজের পড়াশুনাও বাদ দিতে হয় তাকে, ২৪ বছর বয়সে দ্বিতীয় আরেকজন (হ্যারী)কে সে বিয়ে করে। এই স্বামীকে তার খুব মনে ধরে। তার আরেকটি মেয়ে হয়। দুই মেয়ে ও স্বামী নিয়ে তার সংসার ভালোই চলছিলো। বেশ কয়েক বছর পরে তার হঠাৎ করেই স্বাধীন হতে ইচ্ছে করে। নিজে রোজগার করে নিজে নিজে সংসার চালাতে কেমন লাগে এটা দেখার জন্য সে দ্বিতীয় স্বামীকে ডিভোর্স দেয়। এরপর বেশ কিছুদিন স্বাধীনতা ভোগ করে ক্লান্তি আসে, ফ্র্যাঙ্ককে বিয়ে করে। ওদের এই সংসারের বয়স ৭/৮ বছর। আবার বিয়ে করার ইচ্ছে আছে নাকি জিজ্ঞেস করতেই সে বলে যে তার আর বিয়ে করার ইচ্ছে নেই।

টেরিকে জিজ্ঞেস করলাম, চারজনের সাথে ঘর করেছো, কাকে তোমার সবচেয়ে বেশী ভালো লেগেছে। সে বললো, ” বয়ফ্রেন্ডকে হিসেবে ধরিনা, হ্যারী সবচেয়ে ভালো ছিল। আমি তাকে ডিভোর্স দিয়ে তার প্রতি অবিচার করেছি। মনে হয় এই পাপের শাস্তি এখন পাচ্ছি। হ্যারীর সাথে থাকলে আমার এই অবস্থা হতোনা”।

জানতে চাই, ওর কোন স্বপ্ন আছে কিনা, বললো স্বপ্ন টপ্ন নিয়ে মাথা ঘামায়না এখন, শুধু একটাই ইচ্ছে , যদি একটা লটারী পেয়ে যায়, তাহলে তাদের যত ধারদেনা হয়েছে সব শোধ করে, ফ্র্যাঙ্কের চিকিৎসা করাবে, নিজের আরও ভালো চিকিৎসা করাবে। সবশেষে দু’জনে মিলে দূরে কোথাও বেড়াতে যাবে, ইচ্ছে হলে ফিরে আসবে, নাহলে ঘুরে ঘুরে কাটিয়ে দিবে বাকী জীবন। আমি টেরীকে বললাম, ” টেরী তোমার চাওয়া খুব বেশী বড় কিছু না, এমনও হতে পারে, ঈশ্বর তোমার মনের আশা পূর্ণ করবেন”। আমার কথা শুনে টেরীর নীল চোখ দুটো কি উজ্জ্বল দেখালো, ঐ মুহূর্তেই আমি ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করলাম যেনো এই সদানন্দময়ীর জীবন থেকে সমস্ত দুশ্চিন্তা দূর হয়ে যায়, বাকী জীবনটা যেনো ওর খুব শান্তিতে কাটে।