ক্যাটেগরিঃ দিনলিপি

 

১। আজকে আমাকে সকাল ৭টায় কাজে উপস্থিত থাকতে হবে বলেই ভোর সারে পাঁচটার আলার্ম দিয়ে রাত ২টায় ঘুমিয়েছিলাম। ঘুম ভাঙ্গলো, স্নানে গেলাম, রেডী হলাম, তারপর ঘড়িতে দেখি তখন বাজে মাত্র ভোর ৪টা বেজে ২৫ মিনিট! কি আর করা, বাকী দুই ঘন্টা বোকার মত আধো ঘুম, আধো জাগরণে কাটালাম।

২। আমার ডিপার্টমেন্ট ওপেনিং টাইম সকাল ৯টা, তারপরেও সকাল ৭টা থেকেই ফোন আসতে শুরু করলো (এটা আমার সবচেয়ে বিরক্তিকর লাগে), ঘুম জড়ানো গলায় স্মার্ট ফোন এর ইতিহাস জানতে চাইছে। ফোনে ইতিহাস বলি …আর আমার লগবুক রেডী করি। একফাঁকে আমার দুই মেয়েকে ফোন করলাম, দেখি দুজনেই দিব্বি ঘুমাচ্ছে, বলে দিলো, অনেকদিন ঘুমাইনা, আজকে ঘুমাবো অনেকক্ষন।

৩।লগবুক রেডী করতে গিয়ে দেখি, আগের দিনের ফাঁকিবাজ দুইমেয়ে, তাদের কাজ শেষ করে রেখে যায়নি। ফলে আমার কাজ বেড়ে দ্বিগুন হয়েছে।

৪। আমার বন্ধু পিঙ্কী আজকে দেশে যাচ্ছে, যাওয়ার আগে আমাকে ফোন করেছে, ফোন ধরতেই দেখি আমার রেজিষ্টারের সামনে বিরাট এক মূর্তি এসে দাঁড়িয়েছে, হাতে তার ফোন ও ফোনের খালি প্যাকেট, রিটার্ন করতে এসেছে। মূর্তির দিকে তাকিয়েই বুঝেছি, কঠিন জিনিস। পিঙ্কীর সাথে কথা শেষ করতে পারলামনা, ফোন রেখে দিলাম পরে দেশে ফোন করবো বলে।

৫। মূর্তির হাতের ফোনের দিকে তাকিয়েই দেখি, ফোনের এলসিডি স্ক্রীনে ইন্টারন্যাল হেমারেজ হয়েছে, তার রিসিট দেখি, একসপায়ারেশান ডেট চলে গেছে, ফেরত নেয়া যাবেনা বলতেই মূর্তির চোখ বড় বড় হয়ে উঠলো। আমি তাকে বললাম ম্যানেজারের সাথে কথা বলতে। ম্যানেজারকে পেজ করলাম। ম্যানেজার এবিগেইল এমনিতে ঠাটং পাটং করে থাকলে কি হবে, ভীতুর ডিম। আমাকে ফোনের মাধ্যমে বলে যে বিদায় করে দাও। আমি বলেছি, সে তোমার সাথে দেখা করতে চায়।

৬।ভীতু ম্যানেজার পাঠিয়েছে তার জুনিয়রকে, কিম এসেই আমাকে দেখে একটু সাহস পেয়েছে (ওরা কোম্পাণী পলিসি মনে রাখতে পারেনা, কিছু জানতে হলে আমাকে জিজ্ঞেস করে)। মূর্তি শুরুতেই বলে দিয়েছে, “আমি ফোন কোথাও ফেলিনি, তোমরা বললেতো হবেনা যে এটা ড্যামেজ, আমার টাকা ফেরত দাও” কিম ভয় পেয়ে রিফান্ডের কথা বলে ফেলার আগেই আমি রিসিট এর ডেট দেখালাম (সকাল বেলাতেই আমার মাথাটা গরম হয়ে গেছে বেটার এটিটিউড দেখে)। এবার কিমকে বলতেই হলো যে রিফান্ড দেয়া সম্ভব না। ব্যস, আর যায় কোথা, বেটা ফোন, চার্জার, বাক্স সব একসাথে মুড়িয়ে ঢিল মেরে ঐখানেই ছুঁড়ে মেরেছে, মনে হয় ঢিলটা তেমন জোরে হয়নি, তাই আবার হাতে নিয়ে এক আছাড় দিয়ে দুম দুম করতে করতে চলে গেছে।

৭। কিম আমাকে হেসে জিজ্ঞেস করলো, ‘হাউ আর ইউ রীটা’! আমিও হেসে বললাম যে শনিবারের সকালে এর চেয়ে ভালো আর কি হতে পারে! গুড স্টার্ট।

৮। আমাদের দুই কম্পিউটারের মধ্যে মেইনটা আজকেই শাট ডাউন হয়ে যেতেই একটার উপর খুব চাপ পড়ে গেলো। গ্রাহকের লাইন লেগেই আছে, কারন আজকেই লাস্ট ডে, যদি কেউ স্মার্ট ফোন কেনে, তাহলে ১০০ ডলার গিফট কার্ড পাবে। আমি এক অসম্ভব ভদ্র মহিলার জন্য কাজ শুরু করলাম। অন্যদিন অটোমেটেড মোডে সব হয়ে যায়, আজকে দেখি ম্যানুয়্যালি করতে হচ্ছে। ক্রেডিট রেসাল্ট না পেয়ে ফোন কোম্পানীকে কল দিতে হয়েছে, তারা আমাকে হোল্ড করে রেখেছে প্রথমে ১০ মিনিট, তারপর বলে তাদের সিস্টেম লকড হয়ে গেছে, আবার নতুন করে শুরু করলাম, এবার হোল্ড করে রাখলো ১৫মিনিট। ২০ মিনিটে যে কন্ট্র্যাক্ট শেষ হয়, সেটা শেষ হতে লেগে গেলো ৫০ মিনিট।

৯। আজকেই আমাদের স্টোরে স্যান্টা ক্লজ ইভেন্ট শুরু হয়েছে, প্রতি শনিবার কেউ একজন স্যান্টা সেজে বাচ্চাদের সাথে ছবি তুলবে। আমার পাশেই ফটো ল্যাব, এরিকা আমাকে ডেকে নিলো, স্যান্টার সাথে ছবি তোলার জন্য। তুললাম ছবি স্যান্টার সাথে, সাথে সাথে আমার সময়টা ভালো হতে শুরু করলো।

১০। ছুটির আগ মুহূর্তে মেজোকে ফোন করলাম আবার। দুই একটা কথা বলার পর বললাম, ওর ফোন আপগ্রেড করে স্মার্ট ফোন নিলে ১০০ ডলারের একটি ওয়ালমার্ট গিফট কার্ড পাওয়া যাবে এবং আজকেই লাস্ট ডে। (আমার চারটি ফোন লাইন রেডী হয়ে আছে আপগ্রেড করার জন্য)। মেয়ে আমাকে বললো, ” স্মার্ট ফোন নিলে ইনটারনেট নিতেই হবে, তার জন্য বিল বেশী হবে, ১০০ ডলার পেতে গিয়ে এক্সট্রা বিল দিতে হবে তোমাদের, তার চেয়ে আমার পুরানো ফোন দিয়ে আরো এক বছর চালাই, আগামী এক বছরে আরও নতুন ডিল আসবে।” বললাম যে আমার মনটা খুব খারাপ, তুমি এত হিসাব করে চলো অথচ তোমাকেই ভুগতে হয় নানা সমস্যাতে। (সম্প্রতি ওর প্রিয় লাল গাড়ীটা আমার এক কথায় ও দিয়েছিল ওর দিদিসোনাকে, ওর দিদিসোনা আটলান্টা গিয়েছিল রেসিডেন্সীর ইন্টারভিউ দিতে, কিনতু গাড়ীটা আর ফেরত আসেনি ওর কাছে। নানা ঘটনার ভেতর দিয়ে ওর গাড়ীটা বিক্রী হয়ে যায়, বদলে দিদিসোনা ব্র্যান্ড নিউ গাড়ী পায়)। সেই থেকে আমি ওর কাছে কেমন একটা অপরাধবোধে ভুগতে শুরু করি। সেই থেকেই আমি খুব মনমরা হয়ে থাকি। মেয়েটা যখন জানতে পারে, ওর গাড়ীটা বিক্রী হয়ে গেছে, ও আমাকে একটামাত্র লাইনে টেক্সট পাঠায়,” আমি তোমার কথায় গাড়ীটা দিলাম, আমি ল্যাবে ছিলাম, আর তোমরা আমার গাড়ীটা বিক্রী করে দিলা!” ওই মেসেজটা আমি সেভ করে রেখেছি, মাঝে মাঝে দেখি, আর ভেতরটা কেমন কুঁকড়ে যায়। আমি আরও মনমরা হয়ে থাকি।
আজকে আমাদের ফোনালাপ শেষ হতেই আবার কাজে ঢুকে যাই,প্যান্টের পকেটে টের পাই, ফোন ভাইব্রেট করছে, বুঝি কেউ টেক্সট পাঠালো। ছুটি হয়ে যেতেই ফোন খুলি, টেক্সট পাঠিয়েছে ্মেজো মেয়ে।
” মা, মন খারাপ করোনা, বি হ্যাপী। গাড়ি নিয়ে আমার আর কোন দুঃখ নেই। তবুওতো একটা গাড়ী চালাচ্ছি ( দিদিসোনার পুরানো গাড়ী, রিপেয়ার করার পরে)। আমি জানি, একদিন আমার হাসব্যান্ড আমাকে ‘ব্র্যান্ড নিউ রেড কার’ কিনে দিবে। মা, ভগবান সবকিছু ঠিকই দেখে, আমাদের ভালো হবে, আমরা কখনও কারো খারাপ করিনা। তাই আর মন খারাপ করে থেকোনা, বি হ্যাপী”।এই মেসেজটাও আমি সেভ করে রেখেছি, রেখে দেবো আজীবন।

দিনটার শুরু হয়েছিলো কি বিশ্রীভাবে, অথচ শেষ হলো কত অন্যরকমভাবে। আমার মনের অমানিশা কাটতে শুরু করেছে। আমি সত্যি সত্যি ভাবি, আমার মেয়েগুলো এতো ভালো, এতো বুঝদার হয়েছে, এটা কি কম কথা! আমারতো লক্ষ, কোটি টাকা থাকলেও এত সুখ হতোনা, যত সুখ আমি পাচ্ছি এই মেয়ে তিনটার কাছ থেকে। আমেরিকার মতো দেশে থেকে ওরা কখনও কোন কিছু নিয়ে অন্যায় আবদার করেনি, দুইজনেই ফুল স্কলারশীপ নিয়ে পড়াশুনা করছে, কতরকম কালচারাল একটিভিটিতে নিজেদের সম্পৃক্ত করছে, পরিচিত অপরিচিত সকলেই যখন ওদের প্রশংসা করে, আমার তখন মনে হয়, আমার উপর অর্পিত দায়িত্ব হয়ত আমি ঠিকমতই পালন করতে পেরেছি। আমাকে নিয়েও আমার বাবার অনেক স্বপ্ন ছিল, সব পূরন করতে পারিনি, আমার অপূর্ন কাজগুলোই হয়ত আমার মেয়েরা পূরণ করে দিচ্ছে।