ক্যাটেগরিঃ দিনলিপি

আমেরিকাতে এখন শীতকাল। খুবই ঠান্ডা, তাপমাত্রা হিমাঙ্কে চলে যাচ্ছে। বলছি এই মুহূর্তে মিসিসিপির শীতের কথা। অন্য অনেক স্টেটে স্নো পড়তে শুরু করেছে আরও একমাস আগে থেকে। মিসিসিপিতে ওয়েদার আমাদের দেশের মত, তাই স্নো হয়না, তাই মিসিসিপিবাসীর মনে হয়তো একটু দুঃখ আছে। টিভিতে, খবরের কাগজে সারাক্ষন দেখায়, অমুক স্টেটে স্নো, অমুক স্টেটে স্কুল কলেজ সব বন্ধ করে দেয়া হয়েছে হেভী স্নো এর জন্য, তখনতো নিজেকে একটু ফেলনা মনে হতেই পারে। স্নো হয়না বলে আমরা ন্যাশনাল নিউজেও আসিনা।

স্নো না হলেও মিসিসিপিতে শীতকালেই মাঝে মাঝেই তুমুল বৃষ্টি হয়। ঝাঁপিয়ে আসে বৃষ্টি। সেই বৃষ্টি মোটেও সুখের বৃষ্টি নয়। নয়। আমি এখনও কাউকে দেখিনি বৃষ্টি নিয়ে আদিখ্যেতা করতে। আদিখ্যেতা করবেই বা কি করে, বৃষ্টিতে না ভিজতে পারলে কি আর বৃষ্টির মর্ম বুঝা যায়! এখানে এমনিতেই কড়া ঠান্ডা, তার উপর বৃষ্টির একটু ছাঁট গায়ে লাগলে আর উপায় আছে! ঠান্ডা শরীরের ভেতরে ঢুকে হাড়ে হাড়ে ডুগডুগী বাজাবে! আমার নিজেরইতো দুঃশ্চিন্তা হতে থাকে, বৃষ্টির মধ্যে গাড়ী চালাতে হলে। একেক সময় কাঁচ ঝাপসা হয়ে যায়, হিটার ছেড়ে দিয়ে বসে থাকতে হয়, ফ্রন্ট উইন্ডোর ঝাপসা ভাব কেটে যাওয়ার জন্য। তবে সত্যিকথা বলতে কি, আমি যখন প্যাসেঞ্জার সীটে থাকি তখন স্বার্থপরের মত মনে মনে বলতে থাকি, ‘আয় বৃষ্টি ঝেঁপে, ধান দেবো মেপে’, ড্রাইভারের অসুবিধার কথা মাথায় থাকেনা। সেইজন্যই কাজের জায়গাতে সকলকেই দেখি বৃষ্টি দেখলেই হাঁকডাক শুরু করে দেয়, ছাতা কই, ছাতা নাই বলে।

আমরা হলাম বাংলাদেশের মানুষ। আমাদের দেশে ছয় ঋতু। শুধু বৃষ্টির জন্যই ‘বর্ষা’ নামে আলাদা একটি ঋতু আছে। অন্য ঋতুতেও বৃষ্টি হয়, তবে বর্ষার বৃষ্টির সাথে কি আর কোন বৃষ্টির তুলনা চলে! বৃষ্টিরও কত রকম আছে, টিপটিপ বৃষ্টি, টাপুর টুপুর বৃষ্টি, ঝুম বৃষ্টি, ইলশে গুঁড়ি, কুকুর-বিড়াল বৃষ্টি ইত্যাদি ইত্যাদি। সবচেয়ে আদরের বৃষ্টি হলো টাপুর টুপুর বৃষ্টি। কত কবিতা, কত গান রচিত হয়েছে এই বৃষ্টি নিয়ে। হবে না-ই বা কেন, এই বৃষ্টি আসে একেবারে মাপা সুরে ও মাপা তালে। এখানে আমি যখন বাড়িতে থাকি, তখন বৃষ্টির সুর-তাল কিছুই টের পাইনা। কিনতু যখন কাজে থাকি, বৃষ্টি নামলেই বৃষ্টি পতনের শব্দ শুনি, ঝুম ঝুম বৃষ্টি, সূর্য্য ছাদের( সান রুফ) উপর বৃষ্টির ধারা পড়েই এমন ঝুম ঝুম আওয়াজ তুলে।

আজকেও বৃষ্টি নেমেছিল, আমি তখন ছিলাম ওয়ালমার্টের টি-রুমে। মোক্ষম সময়ে বৃষ্টিটা এসেছিল, যখন আমার হাতে ছিল গরম কফির পেয়ালা। যদিও বৃষ্টি মানেই গরম চা, সাথে তেলে ভাজা, মুড়ি বা চিঁড়ে ভাজা, কিনতু বিদেশে নিয়ম নাস্তি। এই প্রবাসে আমার সেই সুযোগ আর আসেনা, যখন অনেকে মিলে জোর আড্ডা দেবো, বাইরে হবে ঝুম বৃষ্টি বা টাপুর টুপুর বৃষ্টি, রান্নাঘরে যে থাকবে, তাকে বলবো আদাকুচি, পেঁয়াজকুচি, সরষের তেল দিয়ে মুড়ি মেখে নিয়ে আসতে, সাথে গরম ধোঁয়া উঠা চা অথবা বন্ধুদের বসিয়ে রেখে নিজেই হেঁশেলে ঢুকে হাঁড়িতে খিচুড়ি চাপিয়ে দেবো, সাথে থাকবে ইলিশ মাছ ভাজা অথবা কিছুই না থাকলে ডিমভাজা, আলুভাজাতো আছেই। এখানে চা খেতে ইচ্ছে করলে নিজেকেই করতে হবে, মুড়ি মেখে নিজে নিজে খেতে হবে, কাকে পাবো আড্ডা দেয়ার জন্য, সকলেই ব্যস্ত। ইলিশমাছ ভাজা খাবো কিভাবে, একটা ইলিশ মাত্র রাখা আছে ফ্রিজারে, মেয়েরা ছুটিতে আসবে, তবেতো সবাই মিলে খাবো। এখন যদি ইলিশভাজা খেয়ে ফেলি, আরেকটি ইলিশ আনতে আবার যেতে হবে আটলান্টা শহরে, পাঁচ ঘন্টা গাড়ী চালিয়ে। এইসব সাত-পাঁচ ভেবে মনে হয়, থাকুক না হয়, বৃষ্টি হলেই ইলিশ ভাজা খেতে ইচ্ছে করবে, এটাই বা কেমন কথা!

নাহ! কিছুই আর আগের মত হয়না। তবু ভালো যে আজকে মোক্ষম সময়ে আমার হাতে গরম কফির পেয়ালা ছিল, ছোটবেলায় পড়া কবিতার চরনগুলো মনে পড়ে গেলো,
“বৃষ্টি পড়ে রিমঝিমিয়ে, রিমঝিমিয়ে
টিনের চালে, গাছের ডালে,
বৃষ্টি পড়ে তালে তালে”।

যখন অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ণে ছিলাম, সেখানেও শীতকাল মানেই কুকুর-বিড়াল বৃষ্টি, সাথে ছাতা উলটানো বাতাস। অস্ট্রেলিয়াতে আমরা গেছিলাম জুনমাসে। ওখানে জুন মাসে শীত, ডিসেম্বারে গ্রীষ্ম। বয়স কম ছিলো, প্রথমবারের মত বিদেশ যাত্রা, সব কিছুতেই অজানা ভয়, ওখানে প্রচন্ড শীত হয় শুনেই ঢাকার বঙ্গবাজার থেকে কি মোটা মোটা পার্কা কিনে নিয়ে গেছিলাম মনে পড়লে এখনও হাসি পায়। তবে পার্কাটি স্টাইলের না হলেও আমার মত নবাগতার জন্য মেলবোর্ণের শীতে শীত নিবারনের জন্য মোক্ষম ছিল।

আমি প্রতি সকালে আমার ৪ বছর বয়সী মেয়েকে নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে চলে যেতাম তার কিন্ডার স্কুলে। স্কুলে মেয়েকে রেখে আমি কিছুক্ষন হাঁটাহাঁটি করতাম, আধঘন্টা হাঁটাহাঁটি করে বাড়ী ফিরতাম। প্রায় প্রায় বৃষ্টি নামতো, আমি সেই মোটা পার্কা পড়ে, ছাতা একখানা খুলে ঝুম বৃষ্টির মধ্যে সোজা বরাবর রাস্তা ধরে হাঁটা দিতাম। কি যে ভালো লাগতো, ফাঁকা রাস্তায় কেউ কোথাও নেই, আমিই রাস্তার রানী (রাস্তার রাজা বলতে পারলে ভালো হতো, কিনতু ব্যাকরনে ভুল হবে), ঘোরের মধ্যে হাঁটতাম, গান করতাম, দেশের কথা মনে পড়তো, অঝোরে কাঁদতাম, সুবিধা ছিলো, বৃষ্টির জলে আমার কান্নার জলে মিলে মিশে একাকার হয়ে যেতো। কেউ দেখে ফেললেও ধরা পড়ে যাওয়ার ভয় ছিলোনা, ‘এতবড় মেয়ে রাস্তায় হাঁটছে আর কাঁদছে’।