ক্যাটেগরিঃ চারপাশে

খুব সম্প্রতি ঘটে যাওয়া দুইটি অপমৃত্যু আমাকে ভীষনভাবে নাড়া দিয়েছে। একটি মৃত্যু নিয়ে অনেকের মাঝে আলোচনা-সমালোচনার ঝড় উঠেছে, আরেকটি মৃত্যু শুধুমাত্র সংবাদপত্রে ছাপা হয়েই সকলের চোখের আড়ালে চলে গেছে। বলছিলাম হাসান সাইদ ও জালাল আলমগীরের মৃত্যু নিয়ে আমার অনুভূতির কথা। হাসান সাইদের মৃত্যু নিয়ে পক্ষে বিপক্ষে কিছু বলার নেই( অনেক তদন্ত হবে, তাই কিছুই বলা উচিত না) শুধু একটাই অনুভূতি মনের গহীনে, ‘আহারে! কি করুন পরিনতি একটি সম্ভাবনাময় সুখী পরিবারের’।হাসান সাইদের মৃত্যুর ঠিক আগের দিন সংবাদপত্রে এসেছিলো জালাল আলমগীরের মৃত্যু সংবাদ। ব্যাংককের সমুদ্রে ডুবে মৃত্যু।

সাধারনতঃ ঘটনা একটা ঘটে গেলে পরে তা নিয়ে নিউজ করতে খুব বেশী বেগ পেতে হয়না। কিনতু বিশেষ বিশেষ জনের ক্ষেত্রে নিশ্চয়ই বেগ পেতে হয়, যেমন জালাল আলমগীরের মত এমন অসম্ভব মেধাবী তরুনকে নিয়ে লিখতে গেলে, যে পিতা বা চাচার পরিচয় ছাড়াও নিজের পরিচয়েই বিশেষভাবে পরিচিত, তাহলেতো কথাই নেই। প্রতিবেদনকারীর কলম থেমে যাওয়ার কথা প্রতিটি মুহূর্তে, তার আঙ্গুল ব্যথা করার কথা গুনাবলীর এত বড় ফর্দ তৈরী করতে গিয়ে, মন বিবশ হয়ে যাওয়ার কথা এমন রূপবান, গুনবান তরুনের করুন জীবনাবসানের কথা লিখতে গিয়ে।

এক দৈনিক পত্রিকার সূত্র ধরেই পরিচয় পেলাম, জালাল আলমগীর ডঃ মহিউদ্দীন খান আলমগীরের পুত্র, ডঃ বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীরের ভ্রাতুষ্পুত্র। আর জালাল আলমগীর নিজে ছিলেন আমেরিকার সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ের (বোস্টন ইউনিভার্সিটি) তরুন শিক্ষক ও গবেষক। মাত্র এই বছরের জানুয়ারীতেই বিয়ে করেছেন। দেশে এসেছিলেন এক বছরের ছুটিতে, গবেষনার কাজ হাতে নিয়ে। কাজের একঘেয়েমী কাটাতে স্ত্রী ও কিছু বন্ধুকে নিয়ে গিয়েছিলেন ব্যাংকক। জালাল আলমগীর সাঁতারে খুব পারদর্শী ছিলেন। সেই আত্মবিশ্বাসে ভর করেই চলে গিয়েছিলেন সমুদ্রের গভীরে।

পত্রিকার পাতায় তাঁকে নিয়ে বেশ গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেদন ছাপা হয়েছে। সেখানেই পড়লাম যে জালাল আলমগীর ভীষন এডভেঞ্চার করতে ভালোবাসতেন। প্রতিবেদনে লেখা হয়েছে “ ভ্রমণ আর অভিযানের প্রচণ্ড নেশা ছিল তার। পাহাড় ডিঙানো আর সাগরে সাঁতার কাটতে পছন্দ করতেন। আর সেই শখই কাল হলো তরুণ গবেষক ড. জালাল আলমগীর শুভর জন্য। শনিবার সেখানেই সমুদ্রে সাঁতারের নেশায় পেয়ে বসে জালালকে। যদিও পর্যটকদের সাঁতারের জন্য সব রকম ব্যবস্থা ছিল সেখানে, তবুও এডভেঞ্চারপ্রিয় শুভ প্রাণীকূলের সৌন্দর্য উপভোগ করতে করতে কখন যে কূল থেকে দূরে চলে যান তা টেরই পাননি। সমুদ্র তলদেশের রহস্য খোঁজার নেশায় মত্ত শুভ যখন বুঝতে পারলেন তার অক্সিজেন মাস্ক বিকল হয়ে গেছে, অক্সিজেনের অভাবে দম বন্ধ হয়ে আসছে, তখন তার আশপাশে কেউ নেই। এমনকি সৈকতের নিরাপত্তায় নিয়োজিত রক্ষীরাও তার থেকে অনেক দূরে। মৃত্যুর মুখোমুখি শুভ’র হাত ছোড়াছুড়ি দেখে সবাই ছুটে গিয়ে তীরে এনে তার স্পন্দন ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেন। নিয়ে যাওয়া হয় স্থানীয় চিকিৎসা কেন্দ্রে। কিন্তু চিকিৎসকরা জানালেন সাঁতার-প্রিয় শুভকে সাঁতারই টেনে নিয়েছে পরপারে।“

প্রতিবেদনকারী লিখেছেন, “জালাল আলমগীরের কাজের ব্যাপ্তি ও গভীরতার পরিচয় মেলে উইকিপিডিয়ায় গেলেই। তার নামে সার্চ দিলেই বেরিয়ে আসে বিপুল কাজের ফর্দ। বিস্ময়কর প্রতিভার অধিকারী জালাল খুব অল্প সময়েই নিজেকে দক্ষিণ এশিয়ার একজন বিশিষ্ট গবেষক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। বিশ্বায়ন এবং প্রতিনিধিত্বশীল রাজনীতির বিশেষজ্ঞ জালাল ব্রাউন ইউনিভার্সিটি থেকে অর্জন করেছেন পিএইচডি ডিগ্রি। হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক সাউথ এশিয়া ইনিশিয়েটিভের ফেলো ছাড়াও তিনি ব্রাউন ইউনিভার্সিটিতে ওয়াটসন ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজে, কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটিতে সাউদার্ন এশিয়ান ইনস্টিটিউট এবং নয়া দিল্লিতে সেন্টার ফর পলিসি রিসার্চে গবেষণায় নিয়োগ পেয়েছিলেন। এছাড়া জাতিসংঘের জনসংখ্যা তহবিল এবং বিভিন্ন সংস্থাকে পরামর্শ দিয়েছেন।“

কি লাভ এই ধরনের এডভেঞ্চার করে! প্রতি বছর আমাদের দেশে কক্সবাজার সমুদ্রস্নানে গিয়ে দুইজন একজন মেধাবী ছাত্রের সমুদ্রে ডুবে মৃত্যুর কথা শোনা যায়। এই বছরই আবিদ নামের ক্লোজ আপ ওয়ান তারকা সমুদ্রে ডুবে মারা গেলো। আমার এক পরিচিত ভাবির একমাত্র ছেলে, বুয়েটের শেষ বর্ষের ছাত্র ছিল, বন্ধুরা মিলে সমুদ্রস্নানে গিয়েছিল, ভাবির ছেলেটি সমুদ্রে ডুবেই মারা গেলো। আমাদের দেশের সমুদ্র সৈকতে অনেক বছর আগে গিয়েছিলাম, খুব বেশীদূর যাইনি, কাছাকাছি থেকেই সমুদ্রস্নান করেছিলাম। কারন জানতামনা পর্যটকদের জন্য বিপদসীমা নির্ধারন করে দেওয়া ছিল কিনা। এরপর অনেক বছর পার হয়ে গেছে, এতদিনে নিশ্চয়ই ডেঞ্জার জোন নির্ধারন করে দেয়া আছে। তারপরেও তারুন্য যে কোন বাধাই মানতে চায়না, তারুন্য নিজের ভালো-মন্দ বুঝতে চায়না, তারুন্য বাবা-মায়ের আকুতির কথা মনেই আনতে চায়না। এডভেঞ্চার করতে গিয়ে প্রানটাই চলে গেলে, লাভটা কার হলো, না নিজের, না পরিবারের, না দেশের।

পাশ্চাত্যের দেশগুলিতে দেখি, ছেলে-মেয়ে নির্বিশেষে সকলেই এডভেঞ্চার করতে ভালোবাসে। তাদের কথা আলাদা, বাবা মায়েরা হাতে ধরে বাচ্চাকে পরিচয় করিয়ে দেয় নানারকম দুঃসাহসিক কর্মকান্ডের সাথে। তারা জানে ১৮ বছর বয়স হয়ে গেলে ছেলে মেয়েরা স্বাধীনভাবে থাকতে শুরু করবে, তারা নিজেরাও তাই করেছে তাদের নিজেদের জীবনে। তাই স্বাবলম্বী করে দেওয়ার একটা চেষ্টা। এমিউজমেন্ট পার্কগুলোতে গেলে বুঝা যায়, এখানে মোটামুটি সকলেই খুব এডভেঞ্চারপ্রিয়। আমার নিজের মেয়ে বাঞ্জি জাম্প করার জন্য কি ঝুলোঝুলি, আমার উপস্থিতিতে পারেনি, কিনতু আমি জানি সে এটা করেছে বা করবে। কারন সে নিজেও খুব এডভেঞ্চার পছন্দ করে। কোন ছোটবেলাতে সে ওয়াই ডাব্লিউ স্কুলে থাকতে লোহার সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে মাটির সাথে সমান্তরাল মই এর স্টেপগুলো পার হচ্ছিল, হঠাত করেই একটা ফাঁক দিয়ে সে ধুপ করে অত উঁচু থেকে মাটিতে পড়ে যায়, কিনতু সে এক ফোঁটাও কাঁদেনি। ঐ তার শুরু। দেশে তেমন সুযোগ পায়নি, কিনতু বিদেশে তাদের অবারিত সুযোগ এডভেঞ্চার করার এবং সে করেও। আমিতো আর তাকে সব সময় পাহারা দিয়ে রাখতে পারবোনা তাই আমার মেয়ে এডভেঞ্চার করে, আমি ঘরে বসে অসহায়ভাবে ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করি, যেনো মেয়ে সুস্থ থাকে, এডভেঞ্চারের নেশা যেনো কেটে যায়।

কিনতু আমাদের দেশের পরিপ্রেক্ষিত একেবারেই ভিন্ন। বাবা মা কত আশা ভরসা নিয়ে ছেলে মেয়ে বড় করেন। তারাতো শুধু নিজের জন্য বড় করেননা ছেলে মেয়েকে, মেধাবী ছেলে মেয়েগুলো জীবনে প্রতিষ্ঠিত হয়ে পরিবারের বাইরেও নিজেদেরকে নিয়োজিত করবে, সমাজের উন্নতিতে অবদান রাখবে, যা কিনা সামগ্রিকভাবে দেশের উন্নতিতে কাজে আসবে।

জালাল আলমগীরের পরিবারের সকলেই বংশানুক্রমিকভাবেই অসাধারন কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখে চলেছেন। তার বাবা -চাচারা যেমন উচ্চশিক্ষা লাভ করেছেন, একই আশা নিয়ে পিতা মাতাও নিজেদের ছেলেদের বড় করেছিলেন, ছেলেও পিতামাতার আকাংখাকে নিশ্চয়ই ছাড়িয়ে যাচ্ছিল, সেও তার বাবা-চাচার মতই কৃতী হয়ে ফিরে আসতো দেশে। সবই এখন ‘হতে পারতো’ হয়ে গেছে, আর কোনদিনও হবেনা। আর ফিরবেনা ডঃ জালাল মহিউদ্দীন আলমগীর তার বাবা-মা, স্ত্রী স্বজনদের কাছে, অথবা এই পোড়া দেশটার কাছে। মুহূর্তের দুঃসাহস, মুহূর্তের দিকভুল নিয়ে গেলো এই উজ্জ্বল তারুন্যকে, রেখে গেলো নিঃস্ব করে বাবা-মা, স্ত্রী, স্বজনদেরকে। এরা চলে যায়, রেখে যায় হাহাকার আমাদের মনে, আমরা আফসোস করি, ভাবি, আহারে! এরা যদি বেঁচে থাকতো দেশের কত কাজে লাগতো। রোগে শোকে মৃত্যু হলে সান্ত্বনা থাকে মনে, কিনতু এমন অনর্থক এডভেঞ্চার করতে গিয়ে মৃত্যু হলে মনে হয়, এরা নিজেকে ফাঁকি দিলো, দেশকেতো ফাঁকি দিলোই। হতভাগা জাতি শুধু এদের আত্মার শান্তি কামনা করেই সন্তুষ্ট থাকবে।