ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

 

আমি প্রথম বিজয় দিবসেই বাড়ী ফেরার রাস্তা হারিয়ে ফেলেছিলাম। ১৯৭২ সালের ১৬ই ডিসেম্বার দেশে প্রথমবারের মত বিজয় দিবস উদযাপনকালে আমি ছিলাম নিতান্তই বালিকা। তৃতীয় শ্রেণী পাশ করে চতুর্থ শ্রেণীতে উঠেছি, ক্লাসে প্রথম স্থান লাভ করেছি, কাজেই মনে তখন শুধুই আনন্দ আর আনন্দ। আমার মা ছিলেন স্কুলের সহকারী শিক্ষিকা, কাজেই তাঁকে ১৬ই ডিসেম্বারের সাত সকালে স্কুলে যেতে হয়েছে, আমি মায়ের সঙ্গ নিয়ে স্কুল পর্যন্ত গিয়েই একফাঁকে মায়ের কাছ থেকে সরে গিয়েছি। আমি দেখছিলাম, মেয়েরা সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়েছে, স্টেডিয়ামে যাবে বলে। একজনের কাছে জানলাম, স্টেডিয়ামে নাকি অনেক রকমের অনুষ্ঠান হবে।

আমার মা’কে না বলেই আমি সেই মেয়েদের লাইনে দাঁড়িয়ে পড়লাম। একফাঁকে লাইনের সকলের সাথে পায়ে পা মিলিয়ে হাঁটতে হাঁটতে স্টেডিয়ামে পৌঁছে গিয়ে দেখি বিরাট উৎসব লেগে গেছে চারিধারে। মানুষ আর মানুষ, মাঠে কুচকাওয়াজ হচ্ছে, ব্যান্ড বাজছে, ব্যান্ডের তালে তালে বিভিন্ন স্কুলের ছাত্র ছাত্রীরা তাদের শারীরিক কসরত দেখিয়ে যাচ্ছিল। আমি ওখানেই থেমে গেছি, সাথের সাথীরা কখন কোথায় চলে গেছে খেয়াল করিনি। এক সময় যখন হুঁশ হলো দেখি আমি আমার আশেপাশে পরিচিত কাউকেই দেখছিনা। আমার হঠাৎ করেই মনে হলো আমি আর কোনদিন বাসায় ফিরতে পারবোনা। ঐ বয়সে আমি খুবই মুখচোরা বা হাঁদা টাইপের ছিলাম। বড় কাউকে যে জিজ্ঞেস করবো, সেই বুদ্ধিও মাথায় আসেনি। ঝট করে স্টেডিয়ামের বাইরে চলে এসে প্রথ্মেই চিন্তা করলাম যে আমাকে আজকে আমার মা মেরেই ফেলবে, সেই ভয় আমার মাথার সব বুদ্ধিকে এলোমেলো করে দিলো। এসেছিলাম সোজা রাস্তা ধরে, অথচ ফিরে যাওয়ার সময় সেই সোজা রাস্তাই অচেনা মনে হচ্ছিল।

আমি আন্দাজেই হাঁটা শুরু করেই কান্না শুরু করলাম। আমার এখনও মনে পড়ে ‘হারিয়ে গেছি’ ভয়ে আমি কাঁদছিলাম। খানিকটা যেতেই দেখি এক ছেলে আমাকে নাম ধরে ডাকছে, আমি তার দিকে তাকাতেই দেখলাম আমার এক পাড়াত মামা অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখছে আমাকে। তার বিস্মিত হওয়ার কারন ছিল, সে ভেবে উঠতে পারছিলোনা আমি কিভাবে এখানে চলে আসলাম (কারন তারা সকলেই জানে বাবা-মায়ের কঠিন শাসনে আমরা বন্দী সব সময়)। আমি তাকে বললাম যে আমি হারিয়ে গেছি বলে কাঁদছিলাম, সে তখন আমার হাত ধরে বাসায় পৌঁছে দিয়ে চলে গেলো। আমি ভেবেছিলাম হারিয়ে যাওয়ার কথা কেউ জানবেনা।

ভালো মানুষের মত ঘরে ঢুকতেই আমার মা আমাকে ধমকাচ্ছিলো মা’কে না বলে চলে যাওয়াতে। ওইদিন নাকি সিনেমা হলগুলোতে ফ্রী সিনেমা দেখিয়েছিলো, সিনেমার নাম মনে আছে, ‘টাকা আনা পাই’। নায়িকা ছিল ববিতা, নায়কের নাম মনে নেই। আমার মায়ের আফসোস হচ্ছিল আমি সিনেমা দেখতে পারিনি বলে। মায়ের আচরনে আমি একটু অবাক হয়েছিলাম, কারন আমার মনে ভয় ছিলো যে বাসায় ফিরলেই মায়ের হাতে পিটানি খেতে হবে (আমার মায়ের একটা দোষ ছিল, আমাদের ভাই-বোনদের মধ্যে একজন কেউ দুষ্টামী করলেই, আমাদের সবাইকে এক নাগাড়ে লাইন ধরে পিটাতো) কিনতু নতুন আফসোস শুরু হয়ে গেলো, ‘টাকা আনা পাই’ সিনেমা দেখতে পাইনি বলে। আসলে আমার মা আর আমার দিদিমা একসাথে অনেক সিনেমা দেখতো, সাথে বাহন হিসেবে আমাকে নিয়ে যেতো। তাঁদের সাথে আমি দেখেছিলাম, ‘নীল আকাশের নীচে’, ‘মোমের আলো’, ‘যে আগুনে পুড়ি’, ‘আবির্ভাব’সহ আরও কিছু ছবি (সব ছবির নাম আমার মনেও নেই)। সবই ছিলো পাকিস্তান আমলে দেখা ছবি, আর স্বাধীন বাংলাদেশে সেই মেয়েই বাদ পড়ে গেলো এমন একটা সিনেমা দেখা থেকে, এটাই ছিলো মায়ের আফসোসের কারন।

সিনেমা দেখতে পাইনি বলেই হয়তো আমাকে টিভি দেখার পারমিশান দেয়া হলো। বাড়ীওয়ালা মামার বাসায় টিভিতে হাসির নাটক দেখাচ্ছিলো ‘বুলেট-টোটা’ নামে। যতটুকু মনে পড়ে আশীষ কুমার লোহ আর ফরিদ আলী ছিলো চরিত্র চিত্রনে। সবাই যখন খুবই মজা করে দেখছিলো নাটকটি, ঠিক ঐ সময় ভগ্নদূত হয়ে হাজির হলো সেই মামা,যে আমাকে হাতে ধরে বাড়ী পৌঁছে দিয়েছিলো। সে ঐখানে আমাকে দেখেই খুবই উচ্চঃস্বরে সবাইকে মজার খবর শোনাচ্ছে ভঙ্গীতে বলে দিলো আমি কিভাবে কেঁদে কেঁদে বাড়ি ফিরছিলাম। আমার লজ্জাতে মাথাটা নীচু হয়ে গেছিলো। আমার মা আমার হারিয়ে যাওয়ার কথা শুনে শুধু বললো, ‘ভালো হয়েছে, সব কিছুতে এত তড়বড় করলে এমনই হয়। তুমি আমার সাথে থাকলে হারাতেওনা, আবার সিনেমাটাও দেখতে পেতে’। কি আর করা! বোকামী করেছি, তার কাফফারা দিতে হয়েছে আর কি।

বড় হয়ে আমি আবিষ্কার করলাম, আমার মনের ভেতরে পাকাপাকিভাবে দানা বেঁধেছে হারিয়ে যাওয়ার ভয়। এই ভয় বাড়তেই থাকে, ভয় ভাঙ্গিয়ে দেওয়ার কোন চেষ্টা ছিলোনা কোন তরফ থেকে। আমার মায়েরও দোষ নেই, আমাদের দেশে মেয়েদেরকে ঘরে বন্দী করে রাখাটাই নিয়মে দাঁড়িয়ে গেছিলো। তবুওতো আমার মা আমাকে একা একা কতদূরে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে পাঠিয়েছিল, একা একাই আমি আসা যাওয়া করতাম। কিনতু আমি কাউকে জানতেও দেইনি যে আমি চেনা রাস্তা ছাড়া চলতে ভয় পাই। আজও এই পরিনত বয়সে এসেও আমার হারিয়ে যাওয়ার ভয় সব সময় আমাকে তাড়া করে বেড়ায়। আজও আমি চেনা রাস্তা ধরেই হাঁটি।

মনে মনে আওড়াই, “থাকবো না-কো বদ্ধঘরে, দেখবো এবার জগতটাকে”। আমি জগত দেখতে পারিনি বলেই নিজের মেয়েদেরকে জগত দেখার জন্য উৎসাহ দেই, আমি সব সময় শাসনের বেড়াজালে বন্দী ছিলাম, কারন আমাদের সময়ের মেয়েদের চারিপাশের জগতটাই ছিলো মেয়েদের জন্য প্রতিকূল। প্রতিকূলতা ভাঙ্গবার শক্তি বা সাহস কোনটাই আমাদের ছিলোনা, কিনতু সময় বদলে গেছে, আ্মার মত মেয়েদের যে রাস্তাটুকু একা একা হেঁটে আসার সাহস ছিলোনা, সেই সমস্ত মায়েদের মেয়েরা এখন একা একা বিশ্বভ্রমন করছে, সারা পৃথিবীর যে কোন জায়গাতে গিয়েই নিজেদের বিজয় ঘোষনা করছে, এটাওতো আমার মত মায়েদের জন্য এক বিরাট অর্জন!