ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

আজকে আমি যখন কাজের শেষে বাড়ির পথে রওনা হয়েছিলাম, রাত তখন প্রায় সাড়ে নয়টা। ডিসেম্বার মাসে যেমন শীত পড়ার কথা, তেমন শীতই পড়েছে এখানে। বেলা বারোটার সময় যখন কাজে আসি, আকাশ ছিল ঝকঝকে পরিষ্কার, রোদেলা দুপুর যেমন হয় ঠিক তেমনি ছিল দেখতে চারিপাশ। বৃষ্টির কোন সম্ভাব্না নেই দেখে একটু নিশ্চিন্ত ছিলাম মনে মনে। আমাদের সুপার সেন্টারের প্রবেশদ্বার অনেক চওড়া এবং অটো স্লাইডিং ডোর বলেই ভেতর থেকেই বাইরের অনেকটা পর্যন্ত দেখা যায়। আমি আমার ব্যাগ কাঁধে ঝুলিয়ে স্টাফরুম থেকে বের হয়ে খানিকটা এগোতেই নজরে আসলো বাইরেটা। শুধুই ঝাপসা দেখা যাচ্ছে, এমনতো দেখা যাওয়ার কথা ছিলোনা ভেবেই হঠাৎ করেই মনে হলো, স্নো পড়ছেনাতো! দ্রুত পা চালিয়ে দরজার কাছাকাছি এসেও বুঝা যাচ্ছিলোনা কিছুই। শুধু সাদা দেখা যাচ্ছিলো, বাইরে বের হতে দেখি স্নো হচ্ছেনা, ঘন কুয়াশা। আমি একটুক্ষন থমকে দাঁড়িয়ে ছিলাম।

আমি থমকে দাঁড়িয়েছিলাম এমন অসময়ে এমন ঘন কুয়াশা দেখে। আমি থমকে ছিলাম কারন আমার মনে পড়ে গেছিলো বাংলাদেশে আজ ১৪ই ডিসেম্বার। একটা ধাক্কা মত লাগলো মনটার মধ্যে। দুই তিন মিনিট আমি চোখে ঝাপসা দেখছিলাম, ল্যাম্পপোস্টের আলোগুলো কেমন যেনো এক ধরনের রহস্য তৈরী করছিলো। আমি গাড়ীতে গিয়ে বসেই গাড়ীর হিটার ছেড়ে দিয়ে এয়ার ফ্লো উইন্ডো স্ক্রীণে ঘুরিয়ে দিয়ে চুপচাপ বসে থাকলাম, অনেকক্ষন। কারন কুয়াশা কোনভাবেই কাটছিলোনা, আমিও সামনে কিছুই দেখতে পাচ্ছিলামনা। আমার হঠাৎ করেই যেনো ব্যাপারটা ইঙ্গিতপূর্ণ মনে হচ্ছিল। সারা গায়ে একটা কাঁটা দিয়ে উঠলো, আগেও না পিছেও না, আজকের দিনেই এমন কুয়াশা! শীতকালে কুয়াশা পড়বে, শীতকালে তুষাড় পড়বে, এটাতো নতুন কিছু না, কিনতু এই সময়ে, দেশে যখন ১৪ই ডিসেম্বারের সকাল, আর এখানে এই সন্ধ্যারাতে এমন কুয়াশা! কুয়াশা মানেই দিকভুল, কুয়াশা মানেই হতাশা!

ডিসেম্বার আসলেই আমার মনটা নানারকম মিশ্র অনুভূতি মেশানো থাকে। ১৬ ডিসেম্বারের অপেক্ষায় থাকি, কিনতু ১৪ ডিসেম্বারকে ডিঙ্গাতে পারিনা। ১৪ ডিসেম্বার সামনে এসে সোজা দাঁড়িয়ে থাকে। কি গভীর বেদনায় ঢাকা থাকে আশেপাশের সবকিছু। পরাজয় নিশ্চিত জেনে পাকবাহিনী পৈশাচিক আক্রোশের বশবর্তী হয়ে কাপুরুষের মত রাতের অন্ধকারে, নিজেদের দোসর রাজাকার, আলবদর দিয়ে বাংলাদেশের যাঁরা আলোকবর্তিকা ছিলেন, তাঁদেরকেই হত্যা করে ফেলেছে। কেবলই মনে পড়ে যায় ১৯৭১ এর এই দিনে, কিভাবে রাজাকারেরা তাদের নিজেদের তৈরী তালিকা দেখে দেখে বাড়ী থেকে তুলে এনেছিল দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তানদের, তারা গিয়েছিল এমনই রাতের অন্ধকারে অথবা দিনের আলোতে, গিয়েছিলো কাদা মাখা মাইক্রোবাস নিয়ে। সকলকেই মিথ্যে আশ্বাস দিয়েছিলো আবার বাড়ী ফিরিয়ে দিয়ে যাবে বলে। কাউকেই ফিরিয়ে দিয়ে যায়নি ওরা, সকলকেই হত্যা করেছিল, হত্যা করে লাশ ফেলে দিয়েছিল রায়েরবাজারের বধ্যভূমিতে। স্বজনেরা গিয়ে পেয়েছিল তাদের প্রিয়জনের গলিত দেহ, চোখ বাঁধা, হাত পিছমোড়া করে বাঁধা অবস্থায়। স্বজনেরা চোখের জলে তাঁদের দাফন করেছিলো। কিনতু অনেকেই তাদের প্রিয়জনের কোন খোঁজই পায়নি সারা জীবনে। কারন রাজাকারেরা কারো কারো লাশ গায়েব করে দিয়েছিলো, তাদের স্বজনেরা অযথাই মিথ্যা আশায় দিন গুনেছিলো বছরের পর বছর।

স্বজনের হাহাকার দেখার দূর্ভাগ্য আমার হয়েছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফুলার রোডের প্রফেসারদের কোয়ার্টারের (বৃটিশ কাউন্সিলের পাশে) গেট দিয়ে ঢুকলেই ডানপাশে একটি ছোট্ট শহীদ বেদীর মত ছিল (এখন হয়ত আরো বড় করা হয়েছে)। এখানে ঐ কোয়ার্টারগুলোতে বাস করতেন যাঁরা, তাঁদেরই সতীর্থ কয়েকজনের স্মৃতি রক্ষার্থে (তাঁদেরকে রাজাকারেরা নিয়ে গিয়ে হত্যা করেছিলো) তৈরী করা হয়েছিলো ঐ ছোট্ট বেদী। আমি ঐ কোয়ার্টারে অনেকবার গিয়েছি ভাইয়ের বাড়ীতে। আসা-যাওয়ার পথে আমি নিজের অজান্তেই প্রতিবার সালাম দিতাম ঐ বেদীটার দিকে তাকিয়ে। আমার দাদা যে বিল্ডিং-এ ছিলেন, তার উলটো দিকের বিল্ডিং-এই ছিল মিতি ও নীলিম নামের দুই ভাই-বোন। আমার ভাইয়ের মেয়েদের সাথে খুব বন্ধুত্ব ছিল ওদের। মিতির ভালো নামটা এত সুন্দর ছিল (দ্যুতি অরণি), মিতির বাবা রেখেছিলেন মেয়ের ভালো নাম, তখনই জানি মিতির বাবাই ডাঃ মুর্তজা। যাঁকে ১৪ ডিসেম্বারে একদল ছেলে কাদামাখা মাইক্রোবাসে করে তুলে নিয়ে গেছিল, বলে গেছিল রুগী দেখাতে নিয়ে যাচ্ছে, আর ফিরিয়ে দিয়ে যায়নি। কত ছোট্ট ছিল মিতি, কত ছোট্ট ছিল নীলিম, তাদের মা কি ব্যক্তিত্ব সম্পন্না ছিলেন দেখতে, সব সময় কেমন এক বিষাদ মাখা ছিলো উনার মুখে। আমার নিজের বিয়ে হয়নি বলেই হয়ত আমি উনার স্বামী হারানোর দুঃখের গভীরতা টের পাইনি তখন, কিনতু মিতি আর নীলিমকে দেখলে আমার খুব মায়া লাগত। আরো বেশী দুঃখের ছিল, যে প্রফেসর দেখিয়ে দিয়েছিল ডাঃ মুর্তজার বাসা, সেই প্রফেসর মিতিদেরই উলটো দিকের বিল্ডিং-এ থাকতো স্বাধীনতার পরবর্তী বছরগুলোতে। মিতির মুখে টুকটাক গল্প শুনেছিলাম ওর বাবার সম্পর্কে। মিতির ছোট্ট শাড়ী দিয়েই ডাঃ মুর্তজার চোখ বাঁধা হয়েছিল। ব্যস! ঐ পর্যন্তই, আমার নিজেরওতো ঐ বয়সে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নিয়ে অত ভাবার সুযোগ ছিলনা। থাকবেই বা কিভাবে, রাষ্ট্র যদি উদাসীন থাকে খুনীদের ব্যাপারে, রাষ্ট্র যদি নিশ্চুপ হয়ে থাকে এত বড় অন্যায়ের বিরূদ্ধে, তাহলে আমি একজন টিন এজার হয়ে এর চেয়ে বেশী ভাবার উৎসাহই বা কোথায় পাবো!

এইজন্যই আজকের কুয়াশা দেখে সাথে সাথে ব্যাপারটা কাকতালীয় মনে হয়েছে আমার কাছে। মনে হয়েছে এই দিনে এতজন বুদ্ধিজীবিকে হত্যা করে বাংলাদেশকে কুয়াশায় ঢেকে দিতে চেয়েছিল পাকিস্তান, ঢেকে দিয়েওছিল। সেই কুয়াশা এতই ঘন ছিল যে চল্লিশ বছর পার হয়ে গিয়েও কুয়াশা এতটুকুও কাটলোনা। যাঁরা কুয়াশা কাটানোর পদ্ধতি জানতেন, তাঁদের অনেকেই বয়সের ভারে, কেউ বা রোগের ভারে আমাদের মায়া কাটিয়ে চলে যেতে শুরু করেছেন। সর্বশেষ চলে গেলেন সর্বজন শ্রদ্ধেয় জাতীয় অধ্যাপক কবীর চৌধুরী। আগেই চলে গেছেন জাহানারা ইমাম, কবি শামসুর রাহমান, ওয়াহিদুল হক, হেনা দাস সহ সকল অগ্রসৈনিকেরা। কুয়াশা ঘন হচ্ছে, সেদিন দেখলাম কে একজন লিখেছে কবীর চৌধুরীদের পরিবার নাকি পাকিস্তানের সেবক ছিল, বঙ্গবন্ধু নাকি পাকিস্তানে ‘জামাই আদরে’ ছিল, শেখ হাসিনার ছেলে জয় নাকি রীতিমত পাকিস্তান সরকারের দেয়া সকল রকম সুযোগ সুবিধার ভেতরেই জন্ম নিয়েছে, আরও দিন গেলে আরও নানা কিছু শুনতে পাব। দেশে রাজনৈতিক কুয়াশা, অর্থনৈতিক কুয়াশা, সামাজিক নানা সমস্যা মিলিয়ে যে কুয়াশা তৈরী হয়েছে, এর মধ্যেই যেটুকু আলো দেখতে পাওয়া যায়, সেই আলোটুকুকেও কেমন রহস্যমাখা মনে হয়। ঠিক আজকে যেমনটা আমার কাছে মনে হয়েছে।

আমি অনেকক্ষন গাড়ির হিটার চালিয়ে বসেছিলাম। কুয়াশা কাটছিলনা দেখে খুব অল্প গতিতে গাড়ী চালাতে শুরু করেছি। আমার আশে পাশে আরও অনেক গাড়ীকেই দেখলাম অতি সাবধানে কুয়াশা কেটে কেটে বেরিয়ে যাচ্ছে, আমিও আমার লেইন ঠিক রেখে কুয়াশা কেটে কেটে ঠিক বেরিয়ে এসেছি। এখন বাজে রাত দেড়টা, জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখি বাইরে কিছুই দেখা যায়না, ঝাপসা চারিধার। কি জানি কেন মনে হচ্ছে, এই কুয়াশা আমাকে দেশের চল্লিশ বছর আগের এইদিন ও বর্তমান বছরের এই দিনকে বার বার আঙ্গুল তুলে দেখিয়ে দিচ্ছে। কি দেখাতে চাইছে প্রকৃতি, ঠিক আমাদের মতই যদি লেইন ঠিক রেখে ধীরে ধীরে সামনে এগুনো যায়, তাহলে কুয়াশার চাদর ভেদ করে ঠিক ঠিক আপন মঞ্জিলে পৌঁছে যাওয়া যাবে!