ক্যাটেগরিঃ প্রবাস কথন

 

আগে এমনটা হতোনা, কিনতু গত কয়েক বছর যাবৎ বিজয় দিবস এলেই সুনন্দা চৌধুরীকে খুব মনে পড়ে। সুনন্দা চৌধুরীর সাথে আমাদের পরিচয় হয়েছিল অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ণ শহরে থাকাকালীন সময়ে। আমরা তিন বছর ছিলাম মেলবোর্ণে, ঐ তিন বছরেই সুনন্দা চৌধুরী আমাদের বাংলাদেশীদের কাছে হয়ে উঠেছিল ‘বাঙ্গালির পরম বন্ধু, অথবা সকলের দিদি’।

আমি যখন মেলবোর্ণ যাই, তখন আমার দুই মে্যেই ছিল বেশ ছোট, একজনের বয়স আট, আরেকজনের বয়স ছিল চার। ওখানে গিয়ে আমরা প্রথম উঠি আমারই বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের এক সিনিয়র দিদির বাড়িতে। সেই দিদির সাথে আমার আগে থেকে তেমন আলাপ ছিলোনা, কারন আমি যখন প্রথম বর্ষের ছাত্রী ছিলাম, উনি ছিলেন ফাইনাল ইয়ারের ছাত্রী। তবে উনার দাদা ছিলেন আমার নিজের দাদার বন্ধু, আমার স্বামীর সহকর্মী এবং আমার শিক্ষক। তাই উনার বাড়ীতেই নির্দ্বিধায় উঠেছিলাম। উনাদেরও ছিল দুই মেয়ে, দিদির স্বামীও ছিলেন খুবই সজ্জন মানুষ। আমি ওখানে গিয়েই খোঁজ করছিলাম, বাংলাদেশ সমিতি নামে কোন কিছুর অস্তিত্ব আছে কিনা। দিদির সাথে যাদের পরিচয় ছিল তারা খুব কনজারভেটিভ ঘরাণার মানুষ ছিলেন। কাজেই দিদি কোন সমিতি টমিতির খোঁজ দিতে পারলেননা, তবে আমার বড় মেয়েকে ইন্ডিয়ান বেঙ্গলী এসোসিয়েশানের কালচারাল প্রোগ্রামে নাচ করার ব্যবস্থা করে দিলেন। আমরা ওখানে যাওয়ার তিন চার মাস পরেই ছিল দূর্গাপূজা, সেই দূর্গাপূজার অনুষ্ঠানেই আমার বড় মেয়ে একটা নাচ করার সুযোগ পেয়ে গেলো। ওইবারই প্রথমবারের মত রীতিমত ঘোষণা দেয়া হলো যে বাংলাদেশের ছোট্ট মৌটুসীর নাচই হবে ঐদিনের অনুষ্ঠানের বিশেষ আকর্ষন, পরে জেনেছি তা করা হয়েছিলো সুনন্দা চৌধুরীর নির্দেশে।

এখানেই সুনন্দা চৌধুরীর সাথে পরিচয়ের সূত্রপাত। ঐ সময়ে মেলবোর্ণে বাঙ্গালীদের কালচারাল অনুষ্ঠান হতো শুধুমাত্র দূর্গাপূজা ও সরস্বতী পূজার সময়ে। সেই কালচারাল প্রোগ্রামের মূল দায়িত্বে থাকতেন সুনন্দা চৌধুরী। কি যে অপূর্ব সুন্দর হতো অনুষ্ঠানগুলো, বাইরে থেকে কাউকে ভাড়া করে আনতে হতোনা, ইন্ডিয়ান এসোসিয়েশানের প্রতিটি সদস্যই ছিল খুবই গুণী। সুনন্দা চৌধুরী শুধু সকলের ট্যালেন্টগুলোকে ব্যবহার করে করে একেকটা চমৎকার অনুষ্ঠান দাঁড় করিয়ে ফেলতো। দূর্গাপূজাতে শুধু বড়রাই অংশগ্রহণ করত আর সরস্বতী পূজাতে শুধুমাত্র ছোটরা অংশগ্রহন করত। আর বলাই বাহুল্য যে সবকিছু হতো সুনন্দা চৌধুরীর কঠোর তত্বাবধানে।

বাংলাদেশের রীতি অনুযায়ী সুনন্দা চৌধুরীকে শুরুতেই আমি দিদি ডাকতে শুরু করি, কারণ উনার বয়স কত ছিলো তা কেউ বলতে পারতোনা, সে ছোট বড় সবাইকে নাম ধরে ডাকতো এবং তাকেও সকলে নাম ধরে ডাকতো (এমনটাই তার নির্দেশ ছিল)। সে খুব সুন্দরী ছিল, পেশায় ছিল ইঞ্জিনীয়ার, তার গুণের অভাব ছিলনা, নাচ, গান, পিয়ানো বাজানো থেকে শুরু করে বাদ্যযন্ত্রের নানা খুঁটিনাটি ছিল তার নখদর্পনে, ভীষন মুডি ছিল উনি, আর ছিল খুবই ডিসিপ্লিনড। তাকে সকলেই ভয় বা সমীহ করতো কারন এত গুনের বাইরে যে আসল গুন ছিল উনার, উনি ছিলেন বাংলা সাংস্কৃতিক জগতের মেলবোর্ণ সম্রাজ্ঞী। ইন্ডিয়ান বাংগালী কম্যুনিটিতে গুনী মানুষের অভাব ছিলনা। প্রত্যেকেই নিজেদের পেশাগত যোগ্যতার বাইরেও গান-বাজনা, নাচ, বাদ্যযন্ত্র বাজানোয় ছিলো অত্যন্ত দক্ষ। তাদেরকে নিয়ে কত ভাল ভাল অনুষ্ঠান যে সুনন্দা চৌধুরী তৈরী করতেন, সবাইকে সামাল দিতে গেলে যে ব্যক্তিত্বের প্রয়োজন থাকে, তার প্রতিটি জিনিস ছিল সুনন্দা চৌধুরীর মাঝে। উনাকে নিয়ে অনেক রহস্যও ছিল, কেউ জানতে পারেনি কোনদিন উনি জীবনে বিয়ে করেছিলেন কিনা। কথায় বলে ‘অতি বড় সুন্দরী না পায় বর, অতি বড় ঘরণী না পায় ঘর’, উনার জীবনে মনে হয় এই প্রবাদটাই সত্যি ছিল। আমার দুই মেয়েকেই সুনন্দা’দি খুব ভালোবেসে ফেলেছিলেন, বিশেষ করে আমার চার বছরের মিশাকে উনি চোখে হারাতেন। এই প্রথম উনি একটু একটু করে ঘর-সংসারের টান অনুভব করতে শুরু করেন।

আমার মতই আরেক সংস্কৃতি পাগল ছিল তুহীন’দা। তুহীন’দাও বাংলাদেশের ছেলে, মেরীন ইঞ্জিনীয়ার, তার বউ শিল্পীও খুব ভালো গান করতো। ফলে তুহীন’দার সাথেও সুনন্দা’দির বেশ একটা আন্তরিক সম্পর্ক তৈরী হয়। এই যখন অবস্থা, তুহীনদাই একদিন আমার কাছে প্রস্তাব করলো, বাংলাদেশ সমিতির ব্যানারে একটা প্রোগ্রাম করলে কেমন হয়! আমিতো এমনিতেই নাচুনী বুড়ি, তার উপরে ঢোলে বাড়ির মত অবস্থা হয়ে গেলো আমার। তুহীন’দা কিভাবে কিভাবে যেনো বাঙ্গালী পাড়ায় গিয়ে কিছু তরুণকে যোগাড় করে ফেললো, তারপর সবাই মিলে ঠিক করা হলো যে ‘বিজয় দিবস’ উদযাপন করা হবে। আমি তখনই জানতে পারলাম যে বাংলাদেশ সমিতি আছে এবং তারা শুধু ‘ঈদ পুণর্মিলনী’ করে। সেখানে সবাই মিলে একসাথে খাওয়া দাওয়া করে, প্রচুর আয়োজন থাকে খাবার দাবারের, ব্যস! এই পর্যন্ত।

তুহীন’দা খুবই ডাকাবুকো টাইপ ছেলে, যেটা ধরবে সেটার শেষ না দেখে ছাড়বেনা। সে প্রথমেই বাংলাদেশ সমিতির নেতৃত্ব হাতে নেয়, যদিও বয়সে বড়, টাকা পয়সায় ধনী আরও অনেকেই ছিল বাংলাদেশীদের মধ্যে, কিনতু সকলেই এইসব বিশেষ দিবস উদযাপনকে খুবই কঠিন কাজ মনে করতো। তুহীন’দা ঠিক করলো সুনন্দা চৌধুরীকে ধরবে আমাদের জন্য একটা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজনের দায়িত্ব নিতে। ইন্ডিয়ান এসোসিয়েশানের সবাই জানতো যে যদিও সুনন্দা খুবই গুণী একজন মানুষ, তারপরেও সুনন্দা খুব মুডি, ভীষন জেদী, সংসারী নয়, তার রান্না খাওয়ার ঠিক নেই, আদর ভালোবাসা বুঝেনা, যখন তখন রেগে উঠে সবাইকে বকাবকি করে। আর আমরা খুঁজে পেয়েছি আরেক সুনন্দা’দিকে, যে খুবই ভালোবাসার কাঙ্গাল। বাংলাদেশীরাতো এমনিতেই খুব অতিথিপরায়ন, তার উপর অতিথি যদি এমন গুনের হয়, তাহলেতো তাকে মাথায় রাখবো নাকি তুলোয় মুড়িয়ে রাখবো, সেই চিন্তাতেই অস্থির হয়ে উঠে। তুহীন’দা বাংলাদেশ সমিতির সদস্যদের অতিথিপরায়নতার সুযোগ নিয়েই সুনন্দা’দিকে বশীভূত করে ফেললো।

সুনন্দা’দি খুবই ভালোভাবে অনুধাবন করলো বিজয় দিবস ঘিরে আমাদের আবেগ অনুভূতিকে। সে সম্পূর্ণ দায়িত্ব হাতে নিল, বাংলাদেশের যে সমস্ত ছেলে ট্যাক্সি চালাতো, হোটেলে চাকুরী করতো, ফ্যাক্টরীতে কাজ করতো, তাদেরকে একত্র করে সোজা বলে দিল যে তাদেরকে দিয়েই উনি পুরো অনুষ্ঠানটি তৈরী করবেন, একটাই শর্ত, উনার সাথে একমাসব্যাপী রিহার্স্যাল করতে হবে, দিনে রাতের যে কোন সময় উনি ডাকবেন, সবাইকে উপস্থিত হতে হবে। প্রথমেই ছেলেগুলো ফাঁপরে পড়ে গেলো এমন হুমকী শুনে, কিনতু রাজী না হয়ে উপায় ছিলনা, কারন সুনন্দা’দি বেঁকে বসলে বাংলাদেশ সমিতির প্রোগ্রাম হবেনা। শুরু হলো রিহার্স্যাল, বাংলাদেশীদের স্বভাব অনুযায়ী সব অনুষ্ঠানেই খাবার দাবারের আয়োজন থাকতো অঢেল, মানুষের ক্যাঁচোর ম্যাঁচোর, বাচ্চাদের হল্লা, রিহার্স্যালের মাঝেই গল্প গুজব চলতো। একদিন সুনন্দা’দি সিনিয়র এক ভাইকে ডেকে সোজা বলে দিলেন, প্রোগ্রাম করতে চাইলে এগুলো বন্ধ করতে হবে, যার যার বাড়ীতে গিয়ে খাওয়া দাওয়া করতে পারো, এখানে এসব চলবেনা। উনার এই এক ধমকেই কাজ হয়ে গেলো, এরপর থেকে সবাই কি যে মনপ্রাণ ঢেলে কাজ শুরু করে দিল, কোন আর্টিস্ট ডাকতে হয়নি, আমাদেরকেই উনি তৈরী করে ফেললেন, উনি নিজে কী-বোর্ড বাজালেন, আমাদেরকে দিয়ে লাইভ গান করালেন, আমাদের গানের সাথেই বাংলাদেশের কিশোরী মেয়েরা অতি চমৎকার নাচ করলো। যদিও তুহীন’দা তবলা বাজাতে পারে, তবুও সুনন্দা’দি তবলাতে তুহীনদা’কে নিলোনা, তুহীন’দাকে ব্যস্ত রাখলো আমাদের দেশের আবেগী মানুষদের সামলে রাখতে, বদলে মেলবোর্ণের অতি পরিচিত গানের শিক্ষক বিজয় আম্বলী মেসোকে নিয়োজিত করল তবলা বাদনে। বিজয় আমব্লী মেসো পূর্ব বঙ্গের লোক ছিলেন, তাই উনি নিজেকে উজাড় করে দিয়েছিলেন অনুষ্ঠান সফল করতে। আর আমরাতো নিজেরা সকলেই ছিলাম বাংলাদেশের মানুষ, আমাদের মনপ্রান উজাড় করে দেয়া ছাড়া গত্যন্তর ছিলোনা যে!

সকলের অক্লান্ত পরিশ্রমে ও আন্তরিকতায় ১৯৯৬ সালের বিজয় দিবসে তৈরী হলো মেলবোর্ণের বাংলাদেশ সমিতির প্রথম সার্থক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, ‘ষড় ঋতুর দেশ’। সুনন্দা’দিকে দিয়ে অনুষ্ঠান করাতে গিয়ে রিহার্সাল চলাকালীন সময়ে বাংলাদেশী কিছু নাকউঁচু মানুষকে বলতে শুনেছি নানা বিদ্রূপাত্মক মন্তব্য, ইন্ডিয়ান এসোসিয়েশানের কেউ কেউ বাঁকা হাসি হেসেছে সুনন্দা’দি কে উদ্দেশ্য করে, কিনতু অনুষ্ঠান দেখতে এসে দুই বাংলার নাক উঁচু মানুষের নাকগুলো ভোঁতা হয়ে যেতে দেখেছি। সুনন্দা’দিকে অনুষ্ঠান শেষে আমরা শুধু ফুলের তোড়া দিয়ে অভিনন্দন জানিয়েছিলাম, সুনন্দা’দির মুখটা এখনও মনে পড়ে, আমাদের ভালোবাসার কাছে সেদিনই উনি ধরা পড়ে গিয়েছিলো, একটু ভালোবাসা পেয়েই উনি লজ্জায় মরে যাচ্ছিলেন, যেনো আমরা উনাকে অতিরিক্ত সম্মান দিয়ে ফেলছি, যেনো আমরা উনাকে অতিরিক্ত ভালোবাসা জানাচ্ছি। গুণী মানুষেরা বুঝি এমনই হয়। আর আমাদের সবার মুখে ধরা পড়েছিল সাফল্যের হাসি, বিজয়ের আনন্দ-উল্লাস।