ক্যাটেগরিঃ দিনলিপি

আগে সব সময় গান শুনতাম, এখন আর তা করতে পারিনা। শুধুমাত্র গাড়ীতে ক্যাসেট বা সিডি প্লেয়ারে যতটুকু শুনতে পাই, তাতেই আমি খুশী। আমার একটা স্বভাব হচ্ছে যে আমি ক্যাসেট বা সিডি সহজে পাল্টাইনা, একই গান শুনে যাই, খারাপ লাগেনা। কারন গানের কথাগুলো নিয়ে মনে মনে অনেক খেলা করি, নানাভাবে সাজিয়ে দেখি কথা গুলোকে। কখনও কখনও নিজের মনেই হাসতে থাকি, মনে মনে কাঁদিও।একটা ব্যাপার লক্ষ্য করেছি, প্রেম বা বিরহের গানে বাঁশীর কথা খুব বেশী করে আসে। কেনো আসে বাঁশীর কথা তা কম বেশী সকলেই জানে। প্রেমের বাঁশী বাজিয়েছিলেন স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণ, আর বিরহে কেঁদে আকুল হয়েছিল শ্রীমতি রাধারানী। তবে বাস্তবেও যদি কোন শ্রীকৃষ্ণ এমনি করে বাঁশী বাজায় আর রাধিকারা সংসার ফেলে অভিসারে বের হয়, সমাজের অবস্থাটা কি হতে পারে!

একটা গান ইদানীং আমার মাথায় সারাক্ষন গুনগুন করে বেজেই চলেছে, গানটার কথাগুলো হচ্ছেঃ

“যাকে ভালোবাসিরে, শুনে তার বাঁশীরে
মুখ টিপে হাসিরে, ছুটে যেই আসিরে
ভুল করে চলতে গিয়ে, ঝম করে বেজে উঠে
চাবিগুলো আঁচলে, থেমে থাকি না চলে”

কি সর্বনাশা গান!!!! পুরোপুরি পরকীয়া প্রেম! হায় হায়! সব গেল সব গেল! এই আধুনিক রাধিকাকে নিয়ে কি হবে! তার চাবির গোছা বেজে উঠে, দরজা খুলতে গিয়ে শেকল নড়ে উঠে, রাধিকার রাগে শরীর জ্বলে যায়, অথচ তার কৃষ্ণের সেদিকে ভ্রূক্ষেপও নেই! সে বাঁশী বাজিয়েই চলে। রাধিকা আবার ভাবতে বসে, কিভাবে অভিসারে যাওয়া যায়! দিনের বেলাও যাওয়ার কোন উপায় নেই, পাড়ার ছেলেদের হাতে মার খেয়ে ঠ্যাং ভাঙ্গার সম্ভাবনা আছে বাঁশীওয়ালার, তাই রাধা ঠিক করেছে, আর শুনবেনা সেই বাঁশী, তাই সে বলছে,

“বাঁশী শুনে আর কাজ নাই, সে যে ডাকাতিয়া বাঁশী
সে যে দিন দুপুরে চুরী করে, রাত্তিরেতো কথা নাই”

রাধার সাড়া না পেয়ে কৃষ্ণ যে চলে যাবে তাতেও বিড়ম্বনার শেষ নেই, পা ছড়িয়ে কাঁদতে বসবে রাধা, আর বলবে,

“বাঁশী কেনো গায়, আমারে কাঁদায়, কি গেছে হারায়ে
স্মরনের বেদনায়, কেনো মনে এনে দেয়!”

সখীরা এসে যদি সান্ত্বনা দেয়, রাধা আবার গেয়ে উঠে,
“প্রান সখীলো, ঐ শোন কদম্বতলে বংশী বাজায় কে!”

শুধু কি রাধারানীই ছটফট করে মরে! শ্রীকৃষ্ণের কি কোনই কষ্ট নেই! তাও আছে, তাই কৃষ্ণ বাজায়,

“বাঁশী আমার বেজে বেজে হলো সারা, সে-তো এলোনা”!

দিনের আলোয় যদিওবা জল আনার ছল করে রাধা নদীর কিনারে গেলো, অমনি কৃষ্ণের বাঁশী বেজে উঠলো, আর রাধা গেয়ে উঠে,

“ওপারে তোমার বাঁশী বাজে, এপারে আমি মরি যে লাজে’

কৃষ্ণ সাথে সাথে বাঁশীতেই উত্তর দিলো,
ওপারে তোমার নুপূর বাজে, এপারে আমার নাই মন কাজে”!

দেখা যাচ্ছে যত দোষ আসলে ঐ একটা বাঁশের বাঁশীর। ঐ বাঁশী বাজিয়েই হ্যামিলনের এক বাঁশীওয়ালা হ্যামিলনের সকল শিশুদের নিয়ে কোথায় যে চলে গেলো, আর এলোনা ফিরে! বাঁশী বাজিয়ে শ্রীকৃষ্ণ রাধিকা্র মনে কি যে ঝড় তুলল কে জানে, রাধিকা সংসার ধর্ম সব জলাঞ্জলী দিয়ে চিরবিরহীনি হয়ে গেল! আর সেইজন্যই শচীন দেব বর্মনকে গাইতেই হলো,

“বাঁশেতে ঘুন ধরে, তবু পোড়া বাঁশীতে ঘুণ ধরেনা
কতজনা মরে, তবু পোড়া বাঁশী কেনো মরেনা”