ক্যাটেগরিঃ মতামত-বিশ্লেষণ

৩১শে ডিসেম্বার রাত ১১ টা ৫৯ মিনিটে শুরু হবে নিউইয়র্কের দ্য টাইমস্কোয়ার বলড্রপ, ২০১১ কে পেছনে ফেলে রাত ১২টায় শুরু হবে ২০১২ সাল! দ্য টাইমস্কোয়ার বল হচ্ছে একটি সময় গোলক, যা কিনা ৭৭ ফিট উঁচু ফ্ল্যাগপোল থেকে ১১ঃ৫৯ মিনিটে ধীরে ধীরে নীচে নেমে আসতে থাকে এবং ঘড়ির কাঁটায় ঠিক ১২টা বাজার সাথে সাথে গোলকের আলো নিভে যায় এবং একই সময়ে ‘নিউ ইয়ার’ এর ডিজিট সহ নতুন আলো ঝলমলে সাইন ভেসে উঠে। সাথে সাথে শুরু হয়ে যায় আতস বাজির খেলা! আমেরিকার মানুষ নব উদ্দীপনায় নতুন বছরকে স্বাগত জানায়, ঝেড়ে ফেলে দেয় গত হয়ে যাওয়া বছরের যত জীর্ন পুরাতন স্মৃতি। নতুন আশা নিয়ে আবার নতুন বছর শুরু করে। প্রতি বছর এক মিলিয়ন লোক এসে জড়ো হয় টাইম স্কোয়ারে। এবং এই রীতি চলে আসছে ১৯০৭ সালের ৩১শে ডিসেম্বার থেকে।
আমাদের দেশেও উদযাপন করা হয় ইংরেজী নব বর্ষ, অবশ্য শহর কেন্দ্রিকভাবেই করা হয়ে থাকে ইংরেজী নববর্ষ উদযাপন। নতুনকে কে না চায়, সকলেই পুরানো খোলস ছেড়ে বেড়িয়ে আসতে চায়! এবারও নিশ্চয়ই থার্টি ফার্স্ট নাইট পালিত হবে, সকলেই চাইবে গত বছরের যত গ্লানি সব মুছে ফেলে নতুন আশায় বুক বাঁধতে! কিনতু চাইলেই কি আর সব সময় তা পারা যায়! যতই দেশে আতস বাজী পোড়ানো হোক বা সারারাত জেগে হৈ হৈ করা হোক, কেউ কি পারবে খুব সহজেই গত একমাসে ঘটে যাওয়া যত ঘটনা, তার সব ভুলে যেতে! তা পারবেনা, কি করে পারবে গত সপ্তাহেই ঘটে যাওয়া অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ আবদুর রাজ্জাকের মৃত্যুর কথা!

কিছু কিছু ক্ষতি আছে যা বছরের পর বছর পার হয়ে গেলেও তার প্রভাব থেকে বেরিয়ে আসা যায়না! যেমন কোনভাবেই ক্ষতিপূরন হয়নি একজন বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতির বা জাতীয় চারনেতার অনুপস্থিতির! এঁদেরকে হত্যা করে বাংলাদেশের মানচিত্রটাকেই মলিন করে ফেলা হয়েছে। সেনাশাসনে দেশের গনতন্ত্রের যে ক্ষতি হয়েছে সেটাই বা কম কি! একজন জাহানারা ইমাম বা একজন কবি শামসুর রাহমানের মৃত্যুতে যে ক্ষতি হয়েছে, অতি সম্প্রতি একজন তারেক মাসুদ বা একজন কবীর চৌধুরীর মৃত্যুতে দেশের যতটুকু ক্ষতি হয়েছে, আমরা কি পারি তা ভুলে থাকতে! অথচ আমরা ভুলে যাই বা ভুলে থাকতেই বেশী পছন্দ করছি। নাহলে দিনে দিনে আমাদের দেশের উন্নতির বদলে এত অসহিষ্ণুতা বাড়ছেইবা কেনো। কেনোইবা একজন আবদুর রাজ্জাককে নিয়ে এত কথা লেখা হচ্ছে তাঁর মৃত্যুর পরে!

আবদুর রাজ্জাক অসুস্থ ছিলেন সেই কবে থেকেই। গত আগস্ট মাস থেকেই উনি চিকিৎসাধীন ছিলেন লন্ডনের হাসপাতালে। অথচ তখন উনাকে দেখতে যাওয়ার মত মানুষের সংখ্যা ছিল আঙ্গুলে গোনার মত! হাই কমিশানার সাহেব দেখতে যেতে পারলেননা, পররাষ্ট্রমন্ত্রী গেলেননা, শিক্ষামন্ত্রী গেলেনতো না-ই, উপরন্তু অত্যন্ত আপত্তিকর মন্তব্য করে এসেছিলেন বিদেশের মাটিতে বসেই। আবদুর রাজ্জাকের মৃত্যুর পরে এখন পর্যন্ত যত আর্টিক্যাল বা কলাম লেখা হয়েছে উনাকে নিয়ে, তার অর্ধেকও যদি লেখা হতো উনার জীবিতাবস্থায়, তাহলেও হয়তো চিত্রটা একটু অন্যরকম হতো। উনার যা অসুখ হয়েছিল সে অবস্থায় মানুষের বাঁচার চান্স থাকে খুবই কম, কিনতু তারপরেও উনি নিজেতো মনে এত আক্ষেপ নিয়ে মারা যেতেননা! উনিতো জেনে যেতে পারতেন যে উনার সারাজীবনের পরিশ্রম বা ত্যাগ একেবারে মূল্যহীন হয়ে যায়নি! আমরা বাঙ্গালীরা শুধুই অন্যের সমালোচনা করতেই পছন্দ করি, নিজের মুখটাও যে আয়নায় দেখতে হয়, তা বেমালুম ভুলে যাই! পত্র পত্রিকাতে বিখ্যাত কলামিষ্টদের কলাম পড়ি, শেখ হাসিনার সমালোচনায় মুখর থাকে সবাই, শেখ হাসিনা অবহেলা দেখিয়েছেন রাজ্জাক সাহেবের প্রতি, উনি সংস্কারপন্থী হওয়াতে, কেউ কেউ আবার একটু এগিয়ে বলেছেন যে এই অবহেলাই তার মৃত্যুর কারন ছিল। অভিযোগের মধ্যে কিছুটা সত্যতাতো আছেই, তবে তা অনেকটাই একপাক্ষিক। যাঁরা সমালোচনা করে চলেছেন প্রধানমন্ত্রীর, উনারা নিজেরাওতো লেখাগুলো আগে লিখেন নাই। বাংলাদেশে কত যে ধনী আছেন, তারপরেও কেনো একজন রাজ্জাক সাহেবের সম্পত্তি বিক্রী করতে হলো অথবা তারই সহযোদ্ধাদেরকে এগিয়ে আসতে হলো ব্যাংক লোন নিয়ে, তা-ই বা কে জানে! ঐ সময়টাতে মনেই হয়নি যে দেশে এত লক্ষ লক্ষ শুভাকাংক্ষী রয়ে গেছে, যারা উনার মৃত্যুর পরে চোখের জল ফেলবে বলে অপেক্ষা করছিলো!

মাননীয়া প্রধানমন্ত্রী অথবা অন্যান্য সচেতন মানুষ যারা আছেন, আবদুর রাজ্জাকের মৃত্যু আমাদের সকলের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়ে গেলো, সময় কারো জন্য বসে থাকেনা। দেখিনা কি হয়, দেখা যাক কি করতে পারি টাইপ চিন্তা করতে করতেই সময় বয়ে যায়, কাজের কাজ কিছুই হয়না। সকলেই জানি যে মানুষ মরনশীল, আর তা পরম সত্যি বলেই একদিন না একদিন সকলকেই মরিতে হইবে। আমাকেও মরিতে হবে, তোমাকেও মরিতে হবে। তাহলে তুমি বেঁচে থাকতেই তোমার প্রতি আমার কর্তব্যটুকু করা উচিৎ এবং আমিও বেঁচে থাকতেই আমার যা প্রাপ্য তা পেলে মৃত্যুর আগে আর কোন আক্ষেপ থাকবেনা। খুবই খারাপ লেগেছে যখন পত্রিকান্তরেই জেনেছি যে আবদুর রাজ্জাক তাঁর সুহৃদ তোফায়েল আহমেদ বা সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের কাছে উনার মনোবেদনার কথা বলে গেছেন। কি অসম্ভব রুচিশীল ব্যাক্তিত্বের অধিকারী হলে পরে নিজের দুঃখ বা হতাশার কথা ঢেঁড়া পিটিয়ে বলে যাননি, বলে গেছেন এমন মানুষদের কাছেই, যাঁরা তাঁর মতই একই আদর্শে দিক্ষীত। তাঁরা কেউই ব্যক্তিলোভে পড়ে রাজনীতি করতে আসেন নাই। নিজেদের কত ত্যাগের বিনিময়ে তবে এই অবস্থানে এসে পৌঁছেছেন। সামরিক শাসনামলেই সুরঞ্জিত সেন বাবুর বাড়ীতে আর্মী প্রবেশ করেছিল, কি তান্ডব তারা সেদিন করেছিল যার দায় মিটাতে হচ্ছে উনার ছেলেকে। উনার এক সাক্ষাৎকার পড়েই জেনেছিলাম যে উনার ছেলেটা ঐদিনের মানসিক চাপ সইতে পারেনি, মানসিকভাবে কিছুটা প্রতিবন্ধী হয়ে গেছে।

এমন ত্যাগী রাজনীতিবিদের সংখ্যা যেখানে কমে আসছে, সেখানে আর কেনোই বা এত মান-অভিমান, কেনোইবা এত পারস্পরিক দোষারোপ। মৃত্যুর পরে হলেও আবদুর রাজ্জাক যেভাবে মানুষের ভালোবাসা, আবেগ-শ্রদ্ধায় পরিপূর্ণতা পেয়েছেন, তা যেনো এখানেই থেমে না যায়! সকলেই একটা কথা বলছে যে এমন ত্যাগী নেতা সহসা তৈরী হয়না, সেই সত্যি মেনে নিয়েও বলতে ইচ্ছে করে, নেতা অল্পই তৈরী হয়, বেশী নেতা হলে, নেতাদের মত ও পথেও পার্থক্য বেশী দেখা দেয়। কি দরকার অত নেতা দিয়ে, তার চেয়ে বরং এই সমস্ত দূর্লভ নেতাদের নির্দেশিত পথে চললেইতো লক্ষ্যে পৌঁছানো যায়! শহীদ জননী জাহানারা ইমাম বেঁচে থাকতেই যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চেয়ে যে আলোড়ন তুলেছিলেন, উনার মৃত্যুর সাথে সাথেই সব কেমন মিইয়ে গেছে। অথচ উনার মৃত্যুতেও দেশের মানুষ অঝোরে কেঁদেছিল এবং সেই কান্নাতেই সব কিছুর সমাপ্তিও ঘটে গেলো! নাহলে এটাও কিভাবে সম্ভব হয় যে আওয়ামীলীগ সরকার ক্ষমতায় থাকাকালীন সময়েই ‘গো আযম’ টেলিভিশনে সাক্ষাতকার দেয়, সরকারের প্রতি, জনগনের প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিতে পারে অথবা কি নির্দ্বিধায় এখন অনেকেই অনলাইনে গো আযমের পক্ষে সাফাই গায়! সবই সম্ভব হচ্ছে বাঙ্গালীর অতিরিক্ত আবেগের কারনে। বাঙ্গালীর এমনই আবেগ যে এক কথায় পিপীলিকার মত জীবন উৎসর্গ করে দেশ স্বাধীন করে আবার এই বাঙ্গালীই বাংলাদেশ-পাকিস্তান ক্রিকেট খেলার সময় দুই গালে পাকিস্তানের পতাকা ট্যাটু করে গ্যালারীতে বসে থাকে!

২০১১ তো চলেই গেলো, আবদুর রাজ্জাক, কবীর চৌধুরী, মিশুক মুনীর, তারেক মাসুদ এঁরাও সবাই চলে গেলো। যারা রয়ে গেলো, আরও যারা রয়ে যাবে, আরও যারা নতুন আসবে, আমরা কি পারিনা সব খারাপকে পেছনে ফেলে, পারস্পরিক ঈর্ষা, সন্দেহ, পারস্পরিক দোষারোপ বাদ দিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে! অনেকতো দেখা হলো, অনেক সুযোগও এসেছে সবার জীবনে, আবার সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে পারিনি বলে অনেক সম্ভাবনার অপমৃত্যুও হয়েছে। যা হয়ে গেছে তা হয়েই গেছে, যে চলে গেছে সে চলেই গেছে, তার জন্য আক্ষেপ না করে, শুধুই শোক না করে বরং সমস্ত শোক বা সকল অপ্রাপ্তিকে শক্তিতে রূপান্তর করেই শুরু হোক আমাদের নতুন বছর ২০১২ এর পথচলা!