ক্যাটেগরিঃ চারপাশে

 

প্রতিবারই ইংরেজী নববর্ষের পরেরদিন পত্রিকার পাতা খুলতে আমার খুব ভয় লাগে! নতুন বছর উদযাপনের আনন্দ সংবাদের ভীড়ে একটা দুটো করে মৃত্যু সংবাদ আমার সমস্ত আনন্দকে ম্লান করে দেয়। সেই মৃত্যুসংবাদগুলো থাকে নববর্ষকে ঘিরে, বেশীরভাগই অভিমানী কিশোর-কিশোরীদের আত্মহত্যা সংক্রান্ত। নিজে মা বলেই কি অন্যের সন্তানের খবরেও মন এমন বিচলিত হয়! নতুন বছরের দ্বিতীয় দিনেই খবরে পড়লাম ‘নীলা’ নামের ১৮ বছর বয়সী তরুণীর আত্মহত্যার সংবাদ! নিউ ইয়ার্স উদযাপন আনন্দে অংশ নিতে চেয়েছিলো নীলা। বাবা অনুমতি দেননি, তাই জীবনটাই বিস্বাদ হয়ে গেলো নীলার কাছে!

যদিও আগে ইংরেজী নববর্ষ উদযাপন ঢাকা শহরেই সীমাবদ্ধ ছিল, ইদানীং সারাদেশেই এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। আমার ভালো লাগে জেনে যে, যে কোন আনন্দ উৎসব সকলকেই কোন না কোনভাবে একটু হলেও প্রভাবিত করে। প্রবাসে তুলনামূলক নিরাপদ জীবনে অভ্যস্ত হয়ে গেছি বলেই বোধ হয় দেশের মানুষের সার্বক্ষনিক ঝুঁকিপূর্ণ জীবনের ব্যাপারটা নিজের মনে একধরনের অপরাধবোধ তৈরী করে। কেবলই মনে হয়, আহারে কবে আমার দেশের মানুষগুলোও এমনি এক নিরাপদ জীবনের আশ্বাস পাবে! নীলার আত্মহত্যার খবরটা এই জন্যই আমাকে বেশী কষ্ট দিচ্ছে।

নীলার বাবা মেয়েকে নিউ ইয়ার্স পার্টিতে যেতে বারন করেছিলেন, মেয়ের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে। এত বছরেও কি আমাদের সমাজে মেয়েদের জন্য একটু স্বাধীনভাবে চলার পরিবেশ তৈরী হয়নি, নাকি মেয়েদের বাবা মায়েদের মনে সেই বোধটাই তৈরী হয়নি যে ছেলে সন্তানের মত মেয়েরাও বাবা-মায়েরই সন্তান, তারাও এ যুগের মানুষ, তাদেরও কৈশোর-যৌবনের বিকাশ দেহে ও মনে প্রকৃতির নিয়মেই ঘটে থাকে! একটা ছেলে যতখানি স্বাধীনতা পায়, একটা মেয়ে কেনো তা পায়না, এই প্রশ্ন যখনই সামনে আসে, তখনই সোজা সাপ্টা জবাব আসে, দেশের পরিবেশ মেয়েদের অনুকূলে থাকেনা বলেই মেয়েদেরকে আগলে আগলে রাখতে হয়!

কাদের কাছ থেকে আগলে রাখতে হয় মেয়েদেরকে! ছেলেদের কাছ থেকে!! আমরা কখনও ভেবেও দেখিনা বাবা-মায়েদের এই চিন্তা-ভাবনা সমস্ত ছেলে সমাজের জন্য ভীষন অপমানজনক ও বিব্রতকর। দোষারোপ করার সময় কারো মাথায়ও আসেনা যে এই ছেলেরা আমাদেরই সন্তান, দুই চারটা বিকৃতরুচীর পুরুষের কারনে সমস্ত পুরুষজাতিকে এমন ঢালাওভাবে দোষারোপ না করে, নিজের ছেলে ও মেয়েকে ছোটবেলা থেকেই নিজেকে নির্মল রাখার শিক্ষা দেওয়াটাকেই আমি বেশী সঠিক মনে করি। বাল্যকাল থেকেই বাইরের কাজের জন্য ছেলেরা আর ঘরের কাজের জন্য মেয়েরা, এই বোধ দিয়ে ছেলেমেয়ে মানুষ করার দিন শেষ হয়ে গেছে! যার কোন পুত্র সন্তান নেই অথবা যার কোন কন্যা সন্তান নেই, তাদের তাহলে কি হবে! আমি যে পরিবারে বড় হয়েছি, সেখানে ছেলেদেরকেও প্রয়োজনে ঘরে বাসন মাজার মত কাজ করতে হয়েছে, আবার একমাত্র মেয়ে হওয়া সত্বেও আমাকেও বাইরে গিয়ে রেশন তোলার মত কাজও করতে হয়েছে।

আমি যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ি, ছেলে বা মেয়ে সবার সাথেই আমার বন্ধুত্ব ছিল, আমার ছেলেবন্ধু যারা ছিল, তাদের সকলেই ছিল ভীষন ভাল, মার্জিত, ভদ্র ও রুচিশীল। তাদের দেখেই আমি আমার বহির্জগত সম্পর্কে ধ্যান-ধারনা তৈরী করেছি। তাদেরকে দেখেই শিখেছি, সমাজে শুধু আমার বাপ-ভাইয়েরাই নয়, আমার বন্ধুরাও আছে আমার বিপদের সাথী হয়ে। ছেলেমেয়েরা একসাথে কত জায়গা ঘুরেছি, কখনও নিজেকে অরক্ষিততো মনে হয়নি! তারা ছিল বন্ধু, পথ চলার সাথী, তাদেরকে যেমন সম্মান দিয়েছি বন্ধু হিসেবে, তারাও সেই সম্মানের মর্যাদা আজ অবধি রেখে যাচ্ছে!

হ্যাঁ, যেই দুই চার পার্সেন্ট ভয়ংকর বা বিকৃত রুচীর মানুষ আছে আমাদের আশেপাশে (সে ছেলে বা মেয়ে দুইই হতে পারে, তবে আমরা ভয় পাই গুটি কয়েক ছেলেদেরকেই যারা ভীড়ের মাঝে মেয়েদেরকে শারীরিকভাবে এবিউজ করতে পারলে এক ধরনের বিশ্ব জয়ের আনন্দ পায়), তাদের ভয়েতো আর নিজের মেয়েটাকে কষ্ট দিতে পারিনা! বরং এই ধরনের মানুষ আছে সমাজে, এটা জানাতে হবে ছেলে মেয়েকে, তাদের কিভাবে চিনতে পারা যাবে অথবা তাদেরকে কিভাবে এড়িয়ে চলতে হবে সেই শিক্ষাটা দেয়াই বেশী জরুরী। নাহলে ছেলেমেয়েদের শিক্ষা অপূর্ণ থেকে যায়। এই বর্তমান ডিজিটাল যুগে কি ছেলে মেয়ে আলাদা গ্রুপে কাজ করে পোষায়!

কথা শুরু করেছিলাম নীলা মামনিকে নিয়ে, এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে আমার কথাগুলো, মেয়েটা সবার সাথে মিলে একটু আনন্দ করতে চেয়েছিল! এটাইতো ১৮ বছর বয়সের সহজাত ধর্ম। নীলার বাবা মেয়েটাকে আনন্দ মিছিলে যেতে বারন করেই থেমে থাকেননি, মেয়ের মা-কে বলে গেছিলেন মেয়েকে পাহারা দিয়ে রাখতে! নীলা ঐ আনন্দ মিছিলে না যেতে পেরে যতটুকু না আহত হয়েছে, তার চেয়েও বেশী অপমানিত বোধ করেছে তাকে পাহারা দিয়ে রাখার কথা শুনে! হ্যাঁ, নীলা আমাকে বলে যায়নি এই কথা, আমি নিজেকে ওর জায়গাতে দাঁড় করিয়েছি এক মুহূর্তের জন্য, আমি খুব অপমানিত বোধ করেছি। এই বয়সটা খুবই মারাত্মক! মনটা থাকে কত বৈচিত্র্যে পরিপূর্ণ। জীবনের ভাল-মন্দ বোধগুলো তৈরী হতে শুরু করে। সেই সময় বাবা-মায়েদের উচিত ছেলেমেয়েদের পাশে বন্ধুর মত ব্যবহার করা। পুরানো ধ্যান-ধারনা বদলেছে, এখন মনস্তাত্বিকেরাই বার বার বলেন, ছেলেমেয়েদেরকে পিটিয়ে মানুষ করার দিন চলে গেছে। আমরা পাশাচাত্যের সবকিছুকে খারাপ ভাবি, কিনতু পাশাচাত্যে ছেলেমেদেরকে মানুষ করার রীতির যে আধুনিকতা, তার ভাল দিকটা নিয়ে কখনও চিন্তা করিনা। পাশ্চাত্যে যে কোন সমাবেশে হাজার হাজার ছেলেমেয়ে একসাথে থাকলেও বাবা মায়েদের কখনওই মেয়েদের শারীরিক নিরাপত্তা নিয়ে কখনও চিন্তা করতে হয়না। কারন ছেলে মেয়েরা এখানে সমান সুযোগ সুবিধা পেয়েই বড় হয়। এখানে মেয়েদেরকে কখনও হাটে বাজারে বা সভা সমাবেশে যেতে গেলে দশ হাত কাপড়ে নিজেকে প্যাঁচানোর প্রয়োজন হয়না, আবার কেউ যদি ধর্মীয় বিধি মেনে মাথা শরীর পেঁচিয়েও আসে, তা নিয়েও কেউ কোন কৌতুহল দেখায়না। প্রত্যেকেই নিজের ও অন্যের ব্যক্তিস্বাধীনতায় বিশ্বাস করে। তাই শৃংখল ভাঙ্গার কোন ব্যাপার নেই। আমার বাবা-মা খুব আধুনিক মনের মানুষ ছিলেন বলেই জানি, তারপরেও মেয়ে বলেই কখনও কখনও আমার উপর কিছু বিধি নিষেধ জারি করতেন, যা কিনা আমাকে আরও বেশী জেদী করে তুলতো নিয়ম ভাঙ্গার জন্য!

নিজের জীবনে তিনটি মেয়ে আছে আমার, নিজের জীবন থেকেই শিক্ষা নিয়ে মেয়েদেরকে বড় করেছি, আমার মনে হয়েছে, ছেলে থাকলেও আমি যে নীতি শিক্ষা দিতাম ছেলেকে( যেনো মেয়েদেরকে নিজের সহযোদ্ধা, বন্ধু মনে করতে পারে, পায়ে পা মিলিয়ে চলতে পারে), মেয়েদেরকেও একই শিক্ষা দিয়ে বড় করেছি। যে বয়সের যে ধর্ম, তা পালন করতে দিতে হয়, তবে সাথে সাবধান বাণীও দেয়া আবশ্যক মনে করি।

আগেই বলেছি, প্রবাসে জীবন অনেক নিরাপদ, তুলনামূলক কম ঝুঁকীপূর্ণ। তাই হয়তোবা মেয়েদেরকে স্বাধীনভাবে চলতে দিতে পারছি। ধরেই নিলাম দেশে মেয়েদের জন্য এখনও সমাজ নিরাপদ নয়, কিনতু এভাবেই কি চলবে! বদল আনা উচিত, একদিনে সব বদলে যাবেনা, তবুও বদল আনতে হবে। এই যুগের ছেলেমেয়েরা অনেক বেশী আধুনিক, তারা পাশ্চাত্যের স্টাইলই শুধু করেনা, পাশ্চাত্যের আধুনিক ধ্যান ধারনাও কিছু কিছু আয়ত্ব করছে। এখন আর সেই পুরানো দিনের মত ছেলেরা হাটে বাজারে মেয়েদের ভীড়ে ছোঁক ছোঁক করেনা মেয়েদেরকে একটু স্পর্শ করার জন্য। আমাদের নিজেদের মনেও সমস্যা আছে, ছেলেমেয়েদেরকে বিশ্বাস করতে চাইনা, খুব সহজেই ধরে নেই সবখানে বুঝি বাঘ –ভাল্লুকেরা ওঁত পেতে আছে। মিশতে দিতে হবে ছেলেমেয়েদের, ঘরে আটকে রেখে খুব একটা লাভ নেই, যত বজ্র আঁটুনী দেয়া হবে গিঁট ততই আলগা হয়ে যাবে। একেবারে কিছু না পারুক, গলার ওড়নাতো আছেই, সিলিং ফ্যানের সাথে ঝুলে পড়লেই হলো, বাবা-মাকেতো শিক্ষা দেয়া যাবে!

আমার খুব আক্ষেপ হচ্ছে, কেবলই মনে হচ্ছে, নীলার বাবা যদি মেয়েকে পাহারা না দিয়ে সাথে করে নিয়ে যেতো, দেখিয়ে আনতো নতুন বছরের নতুন সূর্যোদয় অথবা যদি মেয়েকে মাথায় হাত দিয়ে বুঝিয়ে বলতো, কেনো মেয়ের জন্য তার এই দুঃশ্চিন্তা, তাহলে নীলা নামের মেয়েটা ঘরে থেকেই বাবা-মায়ের সাথে আজকের এই সুন্দর সকালটা দেখতে পেত। বাবা মায়েরও বাকী জীবন কষ্টের আগুনে, অনুতাপের আগুনে দগ্ধে মরতে হতোনা।