ক্যাটেগরিঃ দিনলিপি

 

তরুদিদিমনি ও যামিনী দাদু। আমার মায়ের ছোট মাসীমা ও ছোট মেসোমসাই। থাকতেন পুরানো কলকাতার শোভাবাজারে। আমি উনাদেরকে প্রথম দেখি ১৯৭০ সালে। আমি তখন অনেক ছোট। তখন আমরা থাকতাম নারায়নগঞ্জ শহরে। ১৯৬৪ সালের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় পড়ে আমাদের বাড়ীর অনেক ক্ষতি হয়েছিল শুনেছি, বেশকিছু প্রাণহানি হয়েছিল। ফলে আমাদের একান্নবর্তী সংসারটা ভেঙ্গে যায়, আমার বাবা আর আমার দাদু শুধু থেকে যায় পূর্ব পাকিস্তানে নিজেদের জন্মভূমির মায়া কাটাতে না পেরে। আমার কাকারা ও দুই মামা চলে যায় ইন্ডিয়াতে। সংসার ভেঙ্গে গেলেই কি আর মনের টান ছুটে যায় কখনও! মনের টানেই আমার মা, আমরা চার ভাইবোন ও দাদু- দিদিমা, দুই মাসীসহ সকলে মিলে ’৭০ সালে গিয়েছিলাম ভারতে, সবার সাথে দেখা করতে। আমার মনে আছে, আমরা গিয়েছিলাম এক মাসের জন্য। আমার বাবা যেতে পারেননি, চাকুরীর ব্যস্ততার কারনে। আমরা ওখানে গিয়ে শুধু বেড়ানোর মধ্যেই ছিলাম। এভাবেই একদিন প্ল্যান করে আমার মায়ের ছোট মাসীমার বাড়ী যাওয়া হলো।

প্রথমবারের স্মৃতি হিসেবে যতটুকু মনে পড়ে, আমার কাছে মনে হয়েছিল বিরাট বড় লাল ইঁটের দালান, যার কোন নির্দিষ্ট অলিগলি বা দিক নিশানা ছিলনা। কোথা দিয়ে ঢুকলাম, এক বারান্দা দিয়ে পার হয়ে আরেক গলির সিঁড়ি বেয়ে কতখানি উঠে, কিভাবে কিভাবে যেনো ‘তরু দিদিমনিদের ঘরে পৌঁছে গেছিলাম। প্রথমবারেই আমার খুব ভালো লেগে গেলো দিদিমনির মেয়ে ‘মনু মাসী’কে । এখন হিসেব করে দেখি, মনুমাসীর বয়স তখন বোধ হয় বড় জোর ১৭/১৮ বছর হবে। আমাকে কি যে আদর সোহাগে ভরিয়ে রেখেছিল তা আমার এখনও মনে পড়ে। আর মনে আছে, দিদিমনির অসাধারন রান্নার কথা, তবে একটা জিনিস আমার ভালো লাগেনি, কাঁচা আম দিয়ে ডাল রেঁধেছিল, সেই ডাল ছিল খুব মিষ্টি খেতে, ডাল এমন মিষ্টি এই প্রথম খেয়েছি। পরেতো জেনেছি, কলকাতার মানুষেরা রান্নাতে অনেক চিনি দেয়। এর বেশী কিছু বোধ হয় মনে করতে পারছিনা, কারন ১৯৭১ সালের স্মৃতির সাথে মিশে যেতে চাইছে।

১৯৭০ সালে গেছিলাম বেড়াতে, বাবাকে বাদ দিয়ে, ১৯৭১ সালে আমরা আবার ভারতেই গেছিলাম, এবার সবাই মিলে, ‘জয়বাংলা’র লোক হিসেবে। মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে ৭/৮ মাস ছিলাম কলিকাতাতে। সেবার আর ঘুরে বেড়ানোর মত পরিস্থিতি না থাকলেও মাসীর বাড়ী যেতেতো কোন বাহানার দরকার হয়না। তাই খুব মাঝে মধ্যে আমরা শোভাবাজার যেতাম, আমরা চার ভাই-বোন, দুই মাসী, আর আমার মা ও দিদিমা। একবার দুইবার আমার বাবাও যেতেন। এই বাড়িতে যেতে দিতে আমার বাবার কখনও কোন আপত্তি ছিলনা। কারন হলো, মায়ের এই মাসী-মেসোকে আমার বাবা খুবই শ্রদ্ধা করতেন। উনারা খুব সাধারন মধ্যবিত্ত ছিলেন, দাদু ছিলেন খুব সৎ এবং নিষ্ঠাবান মানুষ, অতি বিখ্যাত শাড়ীর দোকান ‘দি ছায়া স্টোরস’ এ চাকুরী করতেন, দিদিমনি সেলাই করতেন, অনেক জায়গা থেকে অর্ডার নিয়ে কাজ করতেন। কিনতু তাঁদের ছেলেমেয়েগুলোকে এত সুন্দর করে বড় করছিলেন যা দেখে আমার বাবা অনুপ্রানিত হতেন। তরু দিদিমনি ও যামিনী দাদুর তিন ছেলে, এক মেয়ে। বড় ছেলে খুবই মার্জিত, ভদ্র, মেয়ে খুবই স্নিগ্ধ স্বভাবের, ছোটছেলে খুব শান্ত, লাজুক স্বভাবের, আর এই তিনজনই পড়ালেখায় দূর্দান্ত রকমের ভালো। বাদ রইলো একজন, সে হলো মেজো জন, সেও দূর্দান্ত তবে পড়ালেখায় নয়, নকশাল রাজনীতিতে ছিল শোভাবাজারের রত্ন। কতবার যে জেলে গেছে, সি আর পির মাইর খেয়ে খেয়ে মনে হয় ভোঁতা হয়ে গেছিল সারা দেহ। একমাত্র উনাকে নিয়েই ছিল দাদু-দিদার যন্ত্রনা। দাদু তেমন প্রশ্রয় দিতেননা, কিনতু দিদা একে ধরে তাকে ধরে প্রায়ই চেষ্টা করতেন ছেলেকে পুলিশের হাত থেকে ছাড়িয়ে আনতে।

এখন মূল কথায় আসি, ৭০ সালেই দেখে এসেছিলাম ‘ইলেকট্রিক ট্রেনের’ বিস্ময়। ট্রেন স্টেশানে ঢুকার আগেই আমার মা আমাদেরকে হাত ধরে টেনে একেবারে স্টেশানের মাঝখানে থাম ধরে দাঁড় করিয়ে রাখতেন। নাহলে ট্রেনের গতির যে বাতাস, সেই বাতাসের তোড়ে আমাদের মত রোগা দূবলা বাচ্চারা নাকি ট্রেন লাইনের নীচে পড়ে গিয়ে ট্রেনের চাকার তলায় পিষে যাব। যেহেতু আমাদের এভাবে আটকে রাখা হতো সেজন্য অন্য যাত্রীরা আমাদের আগে উঠে গিয়ে ট্রেনের জানালার পাশের সীট দখল করে ফেলতো। আমরা পরে উঠে এর কোলে তার কোলে বসতাম। বাচ্চারা জানালার কাছেই যদি না বসতে পারলো, তাহলে আর বেড়িয়ে আনন্দ কোথায়! একদিন তরুদিদিমনিদের বাড়ি যাচ্ছিলাম আমরা সেই একই মানুষ, ‘মা-মেয়ে, আর তাদের আন্ডা বাচ্চারা’। ট্রেনে উঠেই আমি দেখলাম একটা সাইড পুরোটাই ফাঁকা, কোন লোকই নেই সীটে। অথচ অন্য সীটগুলো যাত্রীতে ভর্তি। আমি আমার মায়ের হাত ছেড়ে এক দৌড় দিয়ে চলে গেলাম ঐ ফাঁকা জায়গায়। সাথে সাথে পা পিছলে পড়ে গেলাম, চারিদিকে হাসির রোল উঠে গেছে ততক্ষনে। আমার চোখ ফেটে জল চলে এসেছে, অপমানে মুখ কালো হয়ে গেছে ঐ ছোট্ট বয়সেই, কারন আমি যে জিনিসের উপর পা পিছল খেয়েছি, মনে হলে এখন হাসি পায়। কোন বাচ্চার ডাইরিয়া হয়েছিল, সেই বাচ্চা ঐ পুরোটা জায়গা জুড়েই পটি করেছিল, গাড়ী গিয়ে শেষ গন্তব্যে পৌঁছায়নি বলে সেই নোংরা পরিষ্কার করা হয়নি। আমার ভাইগুলি ও মাসী দুইজন বেশী করে হাসছিলো। আমার মা শুধু চোখ পাকিয়ে বলেছিল, ‘ঠিক হইছে, বেশী তরবড়ানি করলে এমনই হয়, থাকো এখন জানালার পাশে বসে, স্টেশানে নেমে পা ধুইয়ে দেয়া হবে। আমি কিনতু একা দুই জানালা জুড়েই বসে ছিলাম, কেউ ভাগ বসাতে আসেনি। এভাবেই আমরা ‘শিয়ালদহ’ অথবা ‘উল্টোডাঙ্গা’ স্টেশানে নেমে পড়েছিলাম।

আমার মা সবার আগে রাস্তার ধারে জলের কল খুঁজে বের করলেন। এখন বাকী সবাই আমার প্রতি তাদের ভালোবাসা ও সহানুভূতি আবার ফিরে পেয়েছে। সবাই তখন চেষ্টা করছে কিভাবে আমাকে এই নিদারুন কষ্ট থেকে বের করে আনতে পারে। আমার মনে তখন একটাই ভয়, আমার মেজদাটা এই ব্যাপারটা নোট করে ফেলেছে, সে যখনই শয়তানী করবে, আমি যদি নালিশ করার চেষ্টা চালাই, তাহলেই সে এই ঘটনা নিয়ে আমাকে ক্ষেপাবে! পরে অবশ্য আমাকে আর কেউ ক্ষেপায়নি এই ব্যাপার নিয়ে, অনেকে ভুলেও গেছে, কিনতু আমার এই সর্বনাশা স্মৃতিশক্তি আমাকে আজ অবধি ভুলতে দেয়নি সেদিনের সেই দূর্ঘটনা। আমার পা ধুইয়ে, নতুন জামা কাপড় পড়িয়ে নিয়ে গেল দিদিমনিদের বাড়ীতে।

এই বাড়ীটার কথা মনে হলেই আমার মনে পড়ে যায়, ঔপন্যাসিক শঙ্করের লেখা বই, ‘ঘরের মধ্যে ঘর’ এর কথা। আগে বুঝতামনা, কিনতু পরে বড় হয়ে বুঝেছি, ঐ বাড়ীটা ছিল একটি বনেদী বাড়ী। এক সময় হাতীশালে হাতী, ঘোড়াশালে ঘোড়া রাখার মতই বড়লোক ছিল বাড়ীর মালিক। এরপরে হাজার শরীকে ভাগাভাগি হয়ে গিয়ে সেটা হয়ে গেছে এক বারোয়ারী বাড়ী। শরীকদের অনেকেই যার যার ভাগের ঘর ভাড়া দিয়েছিল। তারই একটি ঘরে দাদু-দিদিমিনিরা ভাড়াটিয়া হিসেবে থাকতেন। চারিদিকে ঘরের পরে ঘর, মাঝে বিরাট বড় চাতাল। সব ঘরের উপরের দিকে নানা রঙের কাঁচ বসানো ছিল। সূর্য্যের আলো যাদের দরজায় এসে পড়তো, সেই কাঁচ থেকে নানা রঙের আলো বের হতো। দালানের বিস্তৃতি ছিল আমার দৃষ্টি সীমার বাইরে পর্যন্ত ছড়ানো। কোথায় প্রবেশ, কোথায় বাহির তা আমি বুঝিনি। আমি আমার মাসীদের হাত ধরে থাকতাম, নাহলে হারিয়ে যাওয়ার ভয় ছিল। আমার মাসীরা এসে মাঝে মাঝে থাকতো এখানে, তাই তারা অনেক কিছু জানত, তাছাড়া ঐ বাড়ির অনেকের সাথে আমার মাসীদের বন্ধুত্ব হয়ে গেছিল।

যেদিন সকালে এই ঘটনা ঘটেছিল, সেদিন বিকেলে আমার জন্য এক চমক ছিল। আমার মাসীরা জানত যে ঐদিন ‘নট্ট কোম্পাণীর’ যাত্রার রিহার্সেল হবে ঐ বাড়ীতে। পাঠকের সুবিধার জন্য বলি, ‘নট্ট কোম্পাণী’ ছিল খুবই নামকরা যাত্রা কোম্পাণী। মান্না দে’র একটা গান ‘না না না আজ রাতে আর যাত্রা শুনতে যাবনা—এসেছে কলকাতারই নামকরা সেই নট্ট কোম্পানী’ এর মধ্যে আছে এই নট্ট কোম্পানীর নাম। নট্ট কোম্পানীর মালিকও এই বনেদী বাড়ীর এক শরিক ছিল। এই শরীকের একজন নট্ট কোম্পানীতেই খুব ভাল তবলা বাজাতো। পড়ালেখা খুব বেশীদূর আগায়নি, তবলা বাদন ও নিজেদের যাত্রা কোম্পানী নিয়েই মজে ছিল মানুষটা। সেদিন বিকেলে রিহার্সেল দেখাতে নিয়ে গেল আমার মনুমাসী। জানালা দিয়ে ঘরের ভেতরটা দেখা যায়, সবাই গোল হয়ে বসেছে, বাদ্য বাজনা বাজছে, অভিনয়ের রিহার্স্যাল চলছে, আমার মত ছোট্ট মেয়ের ভালো লাগার কথা না, এই একঘেয়ে ব্যাপার। কিনতু আমার ভালো লেগেছিলো, আমার মনে আছে, যখন আরও ছোট ছিলাম, চার বছর বয়স হবে, আমার দিদিমার সাথে কীর্তন শুনতে যেতাম (তখন মহিলাদের বিনোদনের আর কিছু ছিলনা), ‘খুকুমনি’ (পুরুষ) নামের একজন নামকরা কীর্তনীয়া গান করতো, তাঁর মাথার চুল মেয়েদের মত করে বেনী করে ঝুঁটি বাঁধা থাকতো, নেচে নেচে গান করতো, আমি তাঁর প্রতি ও তার গানের প্রতি কি যে মোহাবিষ্ট হয়েছিলাম, কিশোরী বয়স হলে এটাকে নির্ঘাত প্রেম বলা যেতো। ঐদিন নট্ট কোম্পানীর রিহার্স্যালের আসল আকর্ষন ছিল নায়িকা ‘জোছনা’ রানী। যখন উনার পালা আসলো, দেখি খুব ফর্সা, একটু মোটাসোটা ধরনের মহিলা, সাদা জমিনের উপর লাল ছাপা শাড়ী, টকটকে লাল ব্লাউজ পরনে, উঠে দাঁড়িয়ে কি সুন্দর কন্ঠে গান ধরেছিলো, গানের প্রথম লাইনটাই শুধু মনে আছে, ‘ঘুম আয়, ঘুম আয়, আমার যাদুর চোখে ঘুম আয়’।

ঐ বাড়ীতেই একটা পুতুল তৈরীর কারখানাও ছিল। কি সুন্দর সুন্দর ছোট্ট ছোট্ট পুতুল বানাতো, আমার ছোটমাসী(১১ বছর) খুব সুন্দর ছিল দেখতে আর খুবই মিশুকে, সে কিভাবে কিভাবে যেনো সবার সাথে খুব খাতির করে ফেলত, ঐ খাতিরের সুবাদেই আমরা অনেক পুতুল পেয়েছিলাম ঐ কারখানা থেকে, যেগুলো আমরা ‘ঝুলন যাত্রাতে’ কাজে লাগিয়েছিলাম। আমার ছোটমাসী আমাদের একদিন বললো যে আমাদেরকে একটা দারুন জিনিস দেখাবে। কি জিনিস, একজন মহিলার মাথার চুল, সে মেপে দেখেছে, চুল মহিলার পায়ের গোড়ালী পর্যন্ত পৌঁছেছে। আমরাতো অপার বিস্ময়ে অপেক্ষা করে রইলাম, হঠাৎ করেই আমার মাসী দৌড়ে এসে আমাদের নিয়ে কোথা দিয়ে যেন একটা ঘুলঘুলি বের করে, সেখানে বসিয়ে দিল। তারপর নীচে তাকাতে বললো, নীচে তাকাতেই দেখি, সত্যি সত্যি এক মহিলা হেঁটে রাস্তার দিকে যাচ্ছিলো, তার চুলগুলো খোলা ছিল এবং তা অবশ্যই তার পায়ের গোড়ালী ছুঁইয়েছিল।

আর দুইটা ঘটনা বলি। ঐ বাড়ি ছিল আদি গঙ্গার তীরে। বাড়ির কোনদিক দিয়ে যেন একটা বারান্দায় পৌঁছানো যেত। আমার দিক নিশানা কখনওই ভালো নয়, তাই ঠিক মত নিশানা বলতে পারিনা। তো ঐ বারান্দায় দাঁড়ালেই গঙ্গা দেখা যেত। ঐ বাড়ীতে কোন ট্যাপ কল ছিলনা। এত বড় বাড়ীতে ‘ভাড়ী’ এসে জল দিয়ে যেত। সবার মাস মাইনে বাঁধা ‘ভাড়ী’ ছিল। গঙ্গার জল খাওয়া হতো, সেই মাপা জলেই স্নান বা বাথরুম ব্যবহার করা হতো। অবশ্য স্নান সবাই নদীতে গিয়েই করে আসতো, পূন্য সঞ্চয় (?) হতো ও মাপা জলে টান পরোতোনা। যে বারান্দায় দাঁড়িয়ে গঙ্গা দেখা যেত, সে বারান্দার এককোনে মল মূত্র ত্যাগ করার জন্য দুইটি মাত্র পাকা বাথরুম ছিল।আমার মাসী আমাদের ঐ বারান্দায় নিয়ে এসেছে গঙ্গায় নাকি বান ডাকে, তা দেখানোর জন্য। বান তো তিথি ধরে ডাকে, আমাদেরতো তা জানার কথা নয়। আসলে আমার মাসী আমাদের অন্য একটা ব্যাপার দেখানোর জন্য নিয়ে গেছে ঐখানে। আমি একটু বোকা ছিলাম বলেই আমাকে আগে পাঠালো ঐ বাথরুমটা দেখতে। আমি এমন ডানপিটে মাসীকে খুশী করার জন্য ঢুকে গেছি বাথরুমে। ঢুকে বাথরুমের প্যানের দিকে তাকিয়েই মাথাটা ঘুরে গেছিল আমার। আমার মাসী সাথে সাথে আমার হাত ধরে টেনে বাইরে বের করে এনে ফেলেছে আমাকে।

শরিকী বাড়ীর বাসিন্দারা কেউ বাথরুম পরিষ্কার করাতোনা। ঐ বাড়ীটাতে মানুষ নিশ্চয়ই একশ’র উপরে ছিল, তারা এক ঘটি জল নিয়ে প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে যেতো, সাড়া দিয়ে টুপ করে যে যার মত বেরিয়ে আসতো। যা কিছু রেখে দিয়ে আসলো ঐ দুঃখী প্যানের মধ্যে, দিনের পর দিন জমে জমে এটা যে পাহাড়সম হয়ে যেতো, তা নিয়ে কারো কোন মাথা ব্যথা ছিলনা। মাসে একবার ধাঙ্গর এসে সব পরিষ্কার করে দিয়ে যেত। এই মানুষগুলোই কোচানো ধুতি, গিলে করা আদ্দির পাঞ্জাবী গায়ে দিয়ে, মুখে বেনারসী পান পুরে যখন গঙ্গার খোলা হাওয়ায় গা জুড়াত, বাইরের থেকে দেখে কারো বুঝার সাধ্যই ছিলনা, এই বাড়ির ভেতরে কত নোংরা জমেছিল।

১৯৭৭ সালের দিকে আমার তরুদিদিমনিরা ঐ বাড়ী ছেড়ে চলে আসে। তাঁদের জীবনে ঘটে গেছিল এক নিদারুন কষ্টের ঘটনা। আমার সেই স্নিগ্ধ, মিষ্টি স্বভাব, অর্থনীতিতে অনার্স মাস্টার্সে ফার্স্টক্লাস পাওয়া মনুমাসী বাবা মা কে না জানিয়ে ‘নট্ট কোম্পানীর’ সেই তবলা বাদককে বিয়ে করেছিল। আমার দাদু সাধারন মধ্যবিত্ত হলেও খুবই নীতিবান মানুষ ছিলেন। মেয়ের এই বোকামী দেখে কষ্ট পেয়েছিলেন, মেয়ের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে অন্য জায়গায় চলে যান। আমরা গিয়েছিলাম সেই আধুনিক ফ্ল্যাটে (তাদের বড়ছেলে খুব ভালো চাকুরী করতেন বলেই ফ্ল্যাট কিনতে পেরেছিলেন), কিনতু আমার ভালো লাগেনি। আমার চোখে, আমার স্মৃতিতে তরু দিদিমনির নামের সাথে সেই শোভাবাজারের স্মৃতিটাই গেঁথে গেছিলো।