ক্যাটেগরিঃ অর্থনীতি-বাণিজ্য

উনার মৃত্যুসংবাদ পেয়ে চমকে উঠিনি। তবে মনটা অবশ হয়ে গেছে। কারন আমরা মাত্রই উনার জন্য ‘গেট ওয়েল সুন’ কার্ড রেডি করছিলাম, সিঙ্গাপুর হাসপাতালের ঠিকানায় পাঠাব বলে। বেশ কয়েকমাস ধরেই উনি খুব অসুস্থ ছিলেন। বয়সও হয়েছিল যথেষ্ট, প্রথমে দেশে উনার নিজের প্রতিষ্ঠিত হাসপাতালে এবং পরে সিঙ্গাপুরের হাসপাতালে উনার চিকিৎসা চলছিল। আধুনিক চিকিৎসা দেওয়ার পরেও উনাকে আর বাঁচিয়ে রাখা গেলোনা। মৃত্যুর কাছেই হার মানতে হলো কর্মজীবনে হার না মানা এই কৃতী পুরুষটিকে। উনি হলেন সর্বজন শ্রদ্ধেয় ‘কাকাবাবু’ স্যামসন এইচ চৌধুরী।

সদ্য প্রয়াত স্যামসন চৌধুরীকে অনেকেই ‘কাকাবাবু’ বলে সম্বোধন করতো। আমার স্বামী একমাত্র উনাকেই ‘কাকাবাবু’ ডাকার সুযোগ পেয়েছিল। আমার স্বামীর নিজের কোন কাকা ছিলনা, বাবা মা গ্রামের বাড়ীতে থাকতেন বলে বাল্যকাল থেকেই সে পড়ালেখার সুবিধার্থে শহরের আত্মীয়ের বাড়ীতে থেকেছে। এভাবেই যখন নটরডেম কলেজে পড়ার সুযোগ হলো, ঢাকা শহরে আত্মীয় না থাকায় কারো সহযোগীতায় সদরঘাটের ব্যাপ্টিস্ট হোস্টেলে সীট পেয়েছিল। সেখানেই তার জীবনের শ্রেষ্ঠ কিছু বন্ধু বা শুভার্থী পেয়ে যায়। সেই সকল বন্ধুদের মধ্যে ছিল ‘কাকাবাবু’র ছেলে ‘তপন’দা। সেই তপনদা’র সাথে করেই সে অনেকবার যাওয়া-আসা করেছে তপন’দাদের বাড়ীতে। তখন থেকেই তপনদা’র বাবা হয়ে গেলেন আমার স্বামীর ‘কাকাবাবু’ এবং মা হলেন ‘কাকীমা’। সেই কাকাবাবু ও কাকীমা তাঁদের ছেলের এই বন্ধুটিকে অনেক আদর ভালোবাসা দিয়েছিলেন। সেই ভালোবাসা আজ অবধি অমলিন আছে আমার স্বামীর মনে।

আমার স্বামী দেখেছিলেন তার ‘কাকাবাবু’কে ’৬৮-৬৯ এর সময় থেকে, তখন উনারা থাকতেন ধানমন্ডির সাত মসজিদ রোডে, ভাড়া বাড়ীতে (এপার্টমেন্ট), আর উনার ওষুধ কোম্পানী ‘স্কয়ার’ এর হেড অফিস ছিল হাটখোলাতে, ফ্যাক্টরী ছিল পাবনাতে। ১৯৫৮ সালে চারবন্ধু মিলে এই ওষুধ তৈরীর ব্যবসা শুরু করেন, আর তাই ফার্মাসিউটিক্যালটির নামকরন করা হয় ‘স্কয়ার’। তখন এই ব্যবসা ছিল ছোট আকারে। স্বাধীনতার পরে আস্তে আস্তে উনার ছোট ব্যবসাটিকে নিজ মেধা, পরিশ্রম ও অধ্যবসায়ের জোরে এগিয়ে নিয়ে যেতে থাকেন। সৎ ও পরিশ্রমী মানুষের ঘরেই লক্ষ্মী বসত করে। এই বুদ্ধিমান ও পরিশ্রমী মানুষটির কপালে স্বয়ং লক্ষ্মী এসে ঠাঁই নিয়েছিলেন বলেই উনার ছোটখাট ওষুধ কোম্পানীটি আর ছোট না থেকে ওষুধ শিল্প প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। পাশে পেয়েছেন বুদ্ধিমান ছেলেদেরকে, ফলে ‘স্কয়ার’ নামটি শুধু ওষুধ শিল্প প্রতিষ্ঠানে সীমাবদ্ধ না থেকে, টয়লেট্রিজ, ফুড, টেক্সটাইলসহ আরও নানা শিল্প প্রতিষ্ঠানের সাথে যুক্ত হয়েছে। এরপরে একই মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের থেকেই দেশের সবচেয়ে আধুনিক হাসপাতাল স্থাপন করা হয়েছে, চালু হয়েছে মাছরাঙ্গা নামে বেসরকারী টিভি চ্যানেল।

এই মানুষটির নাম আমার মনে ‘নির্মানের প্রতীক’ হিসেবে সব সময় জ্বলজ্বল করে। স্যামসন চৌধুরী নামের মানুষটির সাথে আরেকজন মানুষের হুবহু মিল আছে। এই মানুষটির নামটিও উনার নামের কাছাকাছি, স্যা্মুয়েল ওয়ালটন বা স্যাম ওয়ালটন। আমেরিকার সর্বকালের সর্বসেরা বিজনেসম্যান, বিখ্যাত ‘ওয়ালমার্টের’ প্রতিষ্ঠাতা। ১৯১৮ সালে জন্ম, ছোট ছোট স্টোরের বিজনেস দিয়ে কর্মজীবন শুরু করেছিলেন, অসম্ভব ব্যবসায়িক মেধা, পরিশ্রম ও অধ্যবসায়ের জোরে একসময় আমেরিকার ব্যবসা জগতের একচ্ছত্র অধিপতি হয়ে যান। ১৯৬২ সালে আমেরিকার আরকানসাতে যখন প্রথম ওয়ালমার্ট রিটেল স্টোরটি ওপেন করা হয়, তখন কেউ কল্পনাও করেনি, মাত্র এক প্রজন্মের মধ্যেই এই ওয়ালমার্ট লক্ষ লক্ষ আমেরিকানের দৈনন্দিন জীবনে এতটা প্রভাব বিস্তার করবে।

ওয়ালমার্ট হচ্ছে রিটেল স্টোর। খুব সংক্ষেপে বললে বলতে হয়, একছাদের নীচেই মানুষের দৈনন্দিন জীবনের ব্যবহারিক চাহিদার প্রতিটি জিনিস যেখানে পাওয়া যায়। সুঁই সূতা থেকে শুরু করে একজন মানুষের যা যা লাগে, সবকিছু পাওয়া যায় একমাত্র ওয়ালমার্টে। ১৯৬২ সালে একটিমাত্র স্টোর দিয়ে যে যাত্রা শুরু হয়েছিল, বর্তমানে সেই ওয়ালমার্ট ডিসকাউন্ট স্টোরের সংখ্যা উত্তর আমেরিকাতে ৬৩৫টি, যার প্রতিটি স্টোরে কাজ করে ২৫০ জন করে এসোসিয়েট। আর ১৯৮৮ সালে ওপেন করা হয় ওয়ালমার্ট সুপার সেন্টার, যা কিনা দিবা রাত্রি খোলা থাকে। বর্তমানে এর সংখ্যা সারা আমেরিকাতে ৩০১৪টি, যার প্রতিটি স্টোরে গড়ে ৩৫০ জন এসোসিয়েট কর্মরত আছে।

বাংলাদেশের স্যামসন চৌধুরী যেমন তাঁর প্রতিষ্ঠানের প্রতিটি এসোসিয়েটের জন্য নানারকম সুযোগ সুবিধা পাওয়ার ব্যবস্থা রেখেছেন, আমেরিকার স্যামুয়েল ওয়ালটনও তাঁর প্রতিষ্ঠানের প্রতিটি এসোসিয়েটের জন্য নানা সুযোগ সুবিধা রেখেছেন। ‘ওপেন ডোর পলিসি’ হচ্ছে ওয়ালমার্টের এসোসিয়েটদের জন্য প্রথম ও একমাত্র শ্লোগান। এসোসিয়েটদেরও বলার অধিকার আছে, উর্ধ্বতনের বিরূদ্ধে অভিযোগ করার এখতিয়ার আছে বলে সকলেই দ্বিধাহীনভাবেই কাজ করে যাচ্ছে। আর এভাবেই প্রতিষ্ঠার মাত্র ১৫-২০ বছরের মধ্যেই স্যামসন চৌধুরী বা স্যাম ওয়ালটন নিজ প্রতিষ্ঠানে প্রত্যেকের কাছেই ‘আদর্শের প্রতীক’ রূপে সম্মানিত হতে থাকেন। আরও কিছু বছর পার হলে তাঁদের সাফল্য এমন পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছায় যে তাঁরা নিজ দেশের ব্যবসা জগতের ‘সৎ ও সফল’ ব্যবসায়ী আইকনে্র মর্যাদায় ভূষিত হন।

স্যামসন চৌধুরী ও স্যামুয়েল ওয়ালটন—বানিজ্যলক্ষীর দুই বরপুত্র। উনাদের নামে মিল আছে, উনাদের চারিত্রিক বৈশিষ্টে মিল আছে, দু’জনের প্রোফাইল ছবি পাশাপাশি রাখলে ছবিতেও অনেক মিল দেখা যায়, আশচর্য্যজনকভাবে উনাদের ব্যক্তিগত জীবনেও মিল আছে। দু’জনেরই তিনটি পুত্র সন্তান এবং একটিমাত্র কন্যা সন্তান। দুজনেরই পুত্রেরাও পিতার প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানের হাল ধরে আছেন, কন্যারাও কোন না কোনভাবে পিতার পাশেই ছিলেন। দুজনেই জীবনে নানা পুরস্কার পেয়েছেন দেশের সফল ব্যবসায়ী হিসেবে। দুজনের কেউই করফাঁকি দেননি, দুজনের কারোর গায়েই কোন কলংক লাগেনি। স্যামসন চৌধুরী জাতীয় কোন পুরস্কার পেয়েছিলেন কিনা জানিনা, তবে স্যাম ওয়ালটন মৃত্যুর কয়েক সপ্তাহ আগে ১৯৯২ সালে আমেরিকার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট সিনিয়র জর্জ বুশের হাত থেকে আমেরিকার জাতীয়ভাবে সবচেয়ে সম্মাননা পুরস্কার হিসেবে পেয়েছেন, ‘মেডাল অব ফ্রীডম এওয়ার্ড’। দুজনেই পেয়েছেন তাঁদের প্রতিষ্ঠানের প্রতিটি কর্মীর অগাধ ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা। ছোট্ট একটি কথা দিয়ে বুঝাই শ্রদ্ধার নমুনা, আমার এক অতি ঘনিষ্ঠ আত্মীয়, সম্পর্কে ছোট ভাই, ‘স্কয়ার’ প্রতিষ্ঠানে ১২ বছর যাবত কর্মরত। যেদিন সকালে কাকাবাবু সবাইকে ছেড়ে চলে গেলেন, সেদিনই আমার ভাই আমাকে ফোন করে মেসেজ রেখেছে এভাবে, “ দিদি, মাত্র গতকালকেই তোমাকে ফোনে জানিয়েছিলাম, আমাদের কাকাবাবুর অসুস্থতার কথা, আজ সকালে উনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন”। কতখানি শ্রদ্ধা থাকলেই আমরা ‘মারা গেছেন’ না বলে ‘শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন’ বলতে পারি! আর স্যামুয়েল ওয়ালটনকে প্রতিমুহূর্তেই যাতে মনে পড়ে, তার জন্যই ওয়ালমার্টের সর্বত্র ‘ওপেন ডোর পলিসি’ শ্লোগানের পাশেই হাস্যোজ্বল স্যামের ছবি শোভা পায়। এসবই তাঁদের সারা জীবনের অর্জন।

দু’জনের কেউ আজ আর আমাদের মাঝে নেই। ১৯৯২ সালে মারা গেলেন স্যামুয়েল ওয়ালটন আর ২০১২ সালে চলে গেলেন স্যামসন চৌধুরী। কিনতু এরপরেও দুজনের নামই বেঁচে থাকবে আরও অনেক অনেককাল, অনেক অনেক যুগব্যাপী। ‘বিন্দু থেকে সিন্ধু’ তৈরী হয়, এমন একটি প্রবচন চালু আছে, কিন্তু বিন্দু বিন্দু থেকে সিন্ধু সৃষ্টি করতে গেলে কতখানি অধ্যবসায়, কতখানি ধৈর্য্য, কতখানি নিষ্ঠা থাকতে হয়, তা একজন স্যামসন চৌধুরী বা একজন স্যাম ওয়াল্টনের জীবননামা পড়লেই জানতে পারবে পরবর্তী প্রজন্মের ‘স্যাম’এরা ।