ক্যাটেগরিঃ দিনলিপি

আমরা গত তিন বছর ধরে ক্রিসমাসের ছুটি একসাথে পাঁচজনে মিলে কাটাতে পারছিনা, আর কোনদিন পারবো কিনা তাও জানিনা। পাঁচজন বলতে আমরা দুইজন ও আমাদের তিন মেয়ে মৌটুসী, মিশা ও মিথীলা। মৌটুসী সেই যে ১৭ বছর বয়স থেকেই আমাদেরকে ছেড়ে থাকতে শুরু করলো, একা একা চার বছর থেকেছে আমাদের থেকে সেই কতদূরে ভার্জিনিয়াতে, চার বছরের আন্ডারগ্র্যাড ডিগ্রী কমপ্লীট করার জন্য। আন্ডারগ্র্যাড কমপ্লীট করে সে মিসিসিপিতেই এসেছে , মিসিসিপি মেডিক্যাল স্কুলে ভর্তি হয়ে, কিনতু থাকছে আমাদের বাড়ী থেকে তিন ঘন্টা ড্রাইভিং দুরত্বে ভাড়া করা এপার্টমেন্টে। মিশা ১৫ বছর বয়সেই চলে গেলো ( স্কুল ডর্মে) মিসিসিপি গিফটেড স্কুলে চান্স পেয়ে, এরপর চার বছরের আনডারগ্র্যাড ডিগ্রী করতে চলে গেলো যে শহরে মৌটুসী আছে সেই একই শহরে, থাকছে কলেজ ডর্মে।

মৌটুসী এর মধ্যেই ওর ডাক্তারী পড়া প্রায় শেষ করে এনেছে, এটা ওর ফাইনাল ইয়ার, এরপর শুরু হবে ওর তিন বছরের রেসিডেন্সী। মিশাও ওর আন্ডারগ্র্যাড ডিগ্রী শেষ করে এনেছে, ও আছে ফাইনাল ইয়ারে। এরপরেই ও যাবে গ্র্যাজুয়েট স্কুলে মাস্টার্স ও পি এইচ ডি করার জন্য (ওর মুডের উপর নির্ভর করছে পি এইচ ডি করবে কিনা)। মৌটুসী বেশ কিছু কলেজে রেসিডেন্সীর জন্য ইন্টারভিউ দিয়ে এসেছে, ওর ইচ্ছে মিসিসিপির বাইরে গিয়ে আরও বড় কোন প্রতিষ্ঠান থেকে রেসিডেন্সী করা, মিশা মিসিসিপির বাইরে বড় বড় ইউনিভার্সিটিতে এপ্লাই করছে, চান্স পেলে ওখান থেকেই মাস্টার্স/পি এইচ ডি করবে।

আমরা দুজনেই চেয়েছি আমাদের মেয়েরা যেনো জীবনে খুব ভালো রেজাল্ট করতে পারে, আমরা শুধু চেয়েইছি, ওদের উপর কোন মতামত চাপিয়ে দেইনি, ওদেরকে স্বাধীনভাবে ভাবতে দিয়েছি, নিজের ক্যারিয়ার যেনো নিজের পছন্দমতই সাজাতে পারে, তার জন্য শুধু অনুপ্রেরনা দিয়ে গেছি। বাকীটুকু ওরা নিজেরাই করেছে। ওরা দুজনেই ফুল স্কলারশীপ নিয়ে পড়াশুনা করছে। মৌটুসীর ঘুরে বেড়ানোর তেমন সুযোগ আসেনি, কিনতু মিশা কলেজ জীবনের শুরুতেই ‘বিল গেটস’ স্কলারশীপ পেয়ে বসে আছে, এই স্কলারশীপ ও পাবে একেবারে পি এইচ ডি পর্যন্ত। এই স্কলারশীপের অধীনেই ও স্টাডি এব্রড প্রোগ্রামে চলে যায় প্রতি বছর নানা জায়গায়। গত তিন বছর ধরে প্রতি ডিসেম্বারেই ও চলে যাচ্ছে বাংলাদেশ, ইনডিয়াতে, স্টাডি এব্রড প্রোগ্রামে (আসলে যায় ও ঘুরতে), এভাবেই ওর সিভি বা রেসিউমে খুবই সমৃদ্ধ হয়ে যাচ্ছে।

আমরা দুইজনে শুরু করেছিলাম সংসার, সংসার বড় হতে শুরু করলো, প্রথমে দুই থেকে তিন, তিন থেকে চার, চার থেকে পাঁচ। পাঁচজনে এসেই আমরা পরিপূর্ণতার আনন্দ পেলাম। যা করি, যেখানে যাই এই পাঁচজন। দুই মেয়ে যত দূরেই থাকুক অন্ততঃ ক্রীসমাসের ছুটিতে আবার পাঁচে ঘরটা পূর্ণ থাকতো। যেই মিশা স্টাডি এব্রড প্রোগ্রামে যেতে শুরু করলো, সেইমাত্র পাঁচ থেকে নেমে হয়ে গেলাম চার, চারজনেই ক্রীসমাসের ছুটি কাটিয়েছি, মিশাকে বাদ দিয়ে গত তিন বছর। এবার মিশা যায়নি কোথাও, কিনতু তবুও আমরা চারজনেই কাটিয়েছি ক্রীসমাস, মৌটুসী ছিলনা এবার আমাদের সাথে। আমেরিকার বিভিন্ন মেডিক্যাল স্কুলে সে ইন্টারভিউ দিতে ব্যস্ত ছিল, ইন্টারভিউ শেষ করে সে একটু বেড়াতে বের হয়েছে, চার বছর মেডিক্যাল স্কুলের চাপে ও জর্জড়িত ছিল, ওর চোখের সামনে দিয়ে মিশা ঢ্যাং ঢ্যাং করে হিল্লী দিল্লী ঘুরে বেরিয়েছে, তাই এবারের সুযোগটা ও ছাড়েনি, মৌটুসীও নানা শহর ঘুরে বেড়িয়েছে।

এর মধ্যেই আরেকটি ঘটনা ঘটে গেছে, মৌটুসী তার জীবনসঙ্গী খুঁজে পেয়েছে, কাজেই রেসিডেন্সী যেখানেই করতে যাক, ওর ফার্স্ট প্রায়োরিটি হবে মনীশ, আমরা নই( আমাদের কাজ শেষ), মিশা হয়ত আরও নানা সুযোগ খুঁজে বের করবে যাতে করে সারা দুনিয়া চষে বেড়াতে পারে, তারওপর সেও তার জীবনসঙ্গী খুঁজে পাবে, তখন থেকে সেই সঙ্গীটিই হবে মিশার ফার্স্ট প্রায়োরিটি, আমরা নই (আমাদের কাজ শেষ হয়ে যাবে), আমাদের থাকবে মিথীলা, আরও কিছুদিন।

এবারের ক্রীসমাসে মৌটুসী ছিলনা, মিশা ছিল। নতুন বছরের দ্বিতীয় শনিবারে মৌটুসী এসেছে বাবা-মা, ছোটবোন মিশা- মিথীলার কাছে। অনেক অনেকদিন পর আমরা আবার পাঁচজন একসাথে হলাম। মৌটুসী আসলে পরে আমরা সবাই একসাথে ফ্রীজে রাখা একটামাত্র ইলিশমাছ খাব, তেলাপিয়া মাছ, রুই মাছ খাব ভেবে আমি আগে থাকতেই সব মাছ কেটেকুটে হলুদ লবন মাখিয়ে রেখেছি। এই সময়টাতেই আমি হঠাৎ করে খুব অসুস্থ হয়ে পড়লাম! কি দূর্বল যে লাগে, আমি রান্না করতে কি যে ভালোবাসি, অথচ সেই আমি শুধু ইলিশ মাছের ঝোল ছাড়া আর কিছুই রাঁধিনি! মৌটুসী এলো, মিশা পিৎজা বানিয়েছিল (আমার এই মেয়ে পাকা রাঁধুনী), আমি কাজ থেকে ফিরে এলাম, সবাই পিৎজা খেলাম। ডাক্তার আমাকে চা কফি খেতে মানা করেছে, কিনতু একটু চা না খেলে একসাথে আড্ডা জমবেনা, তাই মৌটুসীকে বললাম চা বানাতে। মৌটুসী ঘাবড়ে গেলো চা বানানোর কথা শুনে (আমার এই মেয়ে রান্নার কৌশলগুলো জানেইনা), আমি বললাম মিথীলার কাছে জেনে নিতে, আরও বললাম যে যদি সাধারন কয়েকটা জিনিস রান্না না করতে পারে তাহলে ওর মায়ের নিন্দা হবে ওর শ্বশুরবাড়ীতে ( এই মেয়েকে এগুলো বলা অবশ্য বৃথা, সে কিছুটা নারীবাদী)। কিনতু মৌটুসী আমাকে অবাক করে দিয়ে মিথীলার সাহায্য নিয়ে চা বানিয়ে খাওয়াল। রাতে ভাত রান্না করলো, অবশ্যই ছোট্ট মিথীলাকে জিজ্ঞেস করে নিয়েছে (মিথীলার পর্যবেক্ষনশক্তি খুব ভালো, ও খুব শান্ত, কিনতু আমাকে বা মিশাকে রান্না করতে দেখে ও সব শিখে নিচ্ছে)। মৌটুসী মিশা ও মিথীলার জন্য ওর যত শখের জামাকাপড় ছিল, সব নিয়ে এসেছে। দিদির কাছ থেকে জামা কাপড় পেয়ে মিথীলার আনন্দ আর ধরেনা! আর আমার বুকটা কি এক ব্যথায় টনটন করে! আমার মেয়েগুলো কখন কোন ফাঁকে বড় হয়ে গেলো! চোখ ফেটে জল আসে, বুকে বাজে বিসর্জনের ঢাক!

রবিবার খুব সকালে আমাকে কাজে যেতে হয়েছে, কাজ থেকেই ফোন করে বললাম যে আমি নান রুটি নিয়ে আসছি, মৌটুসী বা মিশা যেনো ডিম রান্না করে রাখে (কারন চিকেন রান্না করা মৌটুসীর কর্ম নয়)। লাঞ্চব্রেকে বাড়ী ফিরে দেখি মৌটুসী ডিম রান্না করে ফেলেছে, সবাই খাওয়া শুরু করেছে, মেয়েটা একটু টেনশানে ছিল, রান্না কেমন হয়েছে কে জানে এই ভেবে, মেয়েদের রান্নার টেস্টার হচ্ছে তাদের ‘পরান প্রিয়’ বাবা। বাবা খেয়ে বলেছে যে বেশী ভাল লাগেনি, মেয়ে ঘাবড়ে গিয়ে বললো যে লবন আন্দাজ করতে পারেনি বলে লবন কম হয়েছে। আমি এগিয়ে আসলাম, বললাম যে প্রথমবার রেঁধেছো, সেই হিসেবে খুবই ভালো হয়েছে, লবন কম হয়ে ভালো হয়েছে, তুমি বুঝে গেলে, পরেরবার ঠিক কতটা লবন দিতে হবে। যত ভুলত্রুটি আমাদের উপর দিয়ে করে শুদ্ধটা শিখে নেয়া ভালো, ভবিষ্যতের জন্য। বিকেলে ও আবার ওর শহরে চলে গেলো, যাওয়ার আগে আবার আমাদের সবাইকে চা বানিয়ে খাইয়ে গেল।

এই মৌটুসী রান্নাবান্নার ধারে কাছে দিয়েও যেতোনা, সেই মৌটুসী রান্না করলো, মিশা পড়ালেখার ধারে কাছে দিয়েও যেতোনা, সেই মিশার টার্গেট এখন আমেরিকার প্রথম সারির যে কোন একটি ইউনিভার্সিটিতে চান্স পাওয়া, গত পরশুদিনই মিশা আরেকটি ন্যাশনাল স্কলারশীপ পেয়েছে, হাতে এসেছে ১০০০ ডলারের চেক, আর ওর সিভি বা রেসিউমেতে যোগ হলো আরেকটি সাফল্যের পালক। মৌটুসির আনুষ্ঠানিক বিয়েটা না হওয়া পর্যন্ত মনীশকে নিয়ে লিখাটা উচিৎ নয় বলেই লিখলাম না। তাছাড়া এটা ছিল একান্তই আমাদের পাঁচজনের কাহিণী।

আমরা চেয়েছিলাম আমাদের মেয়েগুলো আমাদের ছায়ায় থেকে যেনো মানুষের মত মানুষ হতে পারে। তারজন্য কতকাল অপেক্ষা করতে হবে, তার কোন হিসেব-নিকেশ ছিলনা আমাদের কাছে। হঠাৎ করেই খেয়াল হলো, আমাদের বাচ্চা পাখীগুলোর ডানা গজিয়েছে, ওরা কি সুন্দর উড়তে শিখেছে। আমরা শুধু উড়ার কায়দাগুলোই শিখিয়ে গেছি, খেয়াল করিনি ওরা কখন উড়তে শিখে গেছে! একবার উড়তে শিখেছে, আর কি ওদের খাঁচায় আটকে রাখা যাবে নাকি আটকে রাখা উচিৎ! দিলাম খাঁচার দরজা খুলে, যা উড়ে যা, মুক্ত আকাশে ডানা মেলে দে, বাবা মায়ের কাছে উড়তে পারার কায়দা শিখেছিস, আকাশের কাছ থেকে উদার হওয়ার মন্ত্রটুকু শিখে নিতে ভুলিসনা তোরা!