ক্যাটেগরিঃ নাগরিক আলাপ

 

হে পরমকরুণাময়! আমি আজও বেঁচে আছি, শুধু এর জন্যই তোমার প্রতি আমার কৃতজ্ঞতার শেষ নেই! জন্ম-মৃত্যুতে কারো কোন হাত নেই বলেই সবাই একরকমভাবে বাঁচেনা। আমার পরিবারেই কেউ দীর্ঘায়ু হয়েছে, আবার আমার চেয়ে বয়সে ছোট হয়েও কেউ কেউ অকালে ঝরে গেছে। আমি জীবনের এই পর্যায়ে এসে উপলব্ধি করতে শুরু করেছি, জীবনে প্রতিষ্ঠা না পেলেও এখন পর্যন্ত সজ্ঞানে বেঁচে আছি, এটাই পরম পাওয়া। আমাদের এই আলুনীমার্কা জীবনেও কত অভূতপূর্ব ঘটনা ঘটছে, তার কিছুটা দেখার সৌভাগ্যতো হয়েছে! সেই কিছুর মধ্যে দুই একটির কথা স্বীকার করে তোমাকে জানাতে চাই, আমাদের প্রতি তোমার অপার করুনা বৃথা যায়নি, আনন্দের সাথে প্রতিদিন তা স্মরন করি।

গোলাম আযম গ্রেফতার হবে, স্বপ্নেও কি ভেবেছিলাম!!!!!!! আজ কয়টাদিন ধরে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে আছি, এই বুঝি গোলাম আজম গ্রেফতার হয়, এই বুঝি গোলাম গ্রেফতার হয়! হায়! গোলাম আজম আর গ্রেফতার হয়না, এই গোলামের বিরূদ্ধে যাঁরা সোচ্চার হয়েছিলেন, তাঁরাই বরং দেশদ্রোহী আখ্যা পেয়েছিলেন, তাঁদের কেউ কেউ নানা উছিলায় গ্রেফতার হয়েছিলেন, অথচ এই বৃদ্ধর কি এমন ক্ষমতা ছিল যে তার টিকিটাও কেউ স্পর্শ করতে পারছিলোনা! শহীদ জননী কত কম বয়সে দেশদ্রোহী হিসেবেই এই পৃথিবী ছাড়লেন, ওয়াহিদুল হক, শামসুর রাহমান, কবীর চৌধুরী চলে গেলেন! চলে গেলেন বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের বীর নেতা আবদুর রাজ্জাক! বাকী যে কয়জন রয়ে গেছেন, তাঁরা অসহায়ভাবে দেখছিলেন, এই বৃদ্ধ এক পা কবরে রেখেও দাপটের সাথে সাক্ষাতকার দিয়ে যাচ্ছে এই বলে যে কারো নাকি ক্ষমতা নাই, তাকে গ্রেফতার করার! আর ইন্টারনেটের সহায়তায় আমরা দেখে যাচ্ছিলাম, এই পাপী বৃদ্ধের অনুসারীদের দম্ভোক্তির প্রতিযোগীতা।

হে ঈশ্বর! তুমি আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছো বলেই মুক্তিযুদ্ধ দেখেছিলাম, একেবারেই শিশু ছিলাম, তারপরেও যুদ্ধের ভয়াবহতা এতই তীব্র ছিল, জীবন বাঁচানোর তাগিদ এতবেশী জরূরী ছিল যে ঐ সময়ের মূল ঘটনাগুলি চিরদিনের মত স্মৃতিতে গেঁথে গেছে। এটাও তোমার কৃপা, নাহলে ত্রিশ লাখ শহীদের সাথে আমরাও শহীদ হতে পারতাম, তা হয়নি বলেই দেশকে স্বাধীন হতে দেখলাম।

বেঁচে আছি বলেই স্বাধীন দেশে স্বাধীনতার রূপকারকে হত্যা করতে দেখলাম, মুক্তিযুদ্ধের চারনেতাকে বন্দী করা হলো, সুরক্ষিত জেলে তাঁদের হত্যা করা হলো, দেখলাম স্বাধীন দেশেই আবার সামরিক শাসন, যে বন্ধু নিজের জীবন বিপন্ন করে বন্ধুকে রাষ্ট্র ক্ষমতায় বসালো, রাষ্ট্রক্ষমতায় বসেই বন্ধু আসল রূপ ধারন করে প্রথমেই উপকারী বন্ধুকে ফাঁসীর দড়িতে ঝুলালো, শারীরিক ত্রুটি থাকলে কাউকে ফাঁসী দেয়া যায়না, তবুও মুক্তিযুদ্ধে এক পা হারানো বীর মুক্তিযোদ্ধাকে ফাঁসীতে ঝোলানো হলো। হাজার হাজার মুক্তিযোদ্ধাকে বিচারের প্রহসনে মৃত্যুদন্ড দেয়া হলো।

বেঁচে আছি বলেই দেখলাম, দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়া গোলাম আযম আবার দেশে ফিরে আসলো, দেশের নাগরিকত্ব পেলো, রাজনৈতিক দলের আমীর হলো, ‘মুক্তিযোদ্ধা প্রেসিডেন্টের’ দলের সাথে গলাগলি দোস্তি হলো, অবাক হয়ে এটাও দেখলাম মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের দলের সমর্থিত প্রার্থী একসময় এই গোলামের দোয়া নিতে গিয়েছিলো! ভোটের নির্বাচনে যার দল জামানত বাজেয়াপ্ত হয়, কৌশলগত কারনে সেই গোলামের দলকে সমান্তরালে রেখে মুক্তিযুদ্ধের দলটিকে সংগ্রামও করতে দেখলাম! দেশের প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবিদের এই ঘাতকের বিরূদ্ধে সোচ্চার হতে দেখলাম, ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি হতে দেখলাম, প্রতীকী বিচার হতেও দেখলাম, বিচারে এই ঘাতকের ফাঁসীর রায় হলো, তারপরেই ভানুমতীর খেল দেখলাম। যাঁরা এই ঘাতকের বিরূদ্ধে সোচ্চার হয়েছিলেন, তাঁদের মধ্যে ২৪ জনের বিরূদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা হতে দেখলাম। এই মামলা মাথায় নিয়েই শহীদ জননী পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে তাঁর অসম সাহসী গেরিলা যোদ্ধা ছেলে রুমীর কাছেই চলে গেলেন!

আরও দেখালাম, নির্বাচনে গোলামের দলের প্রার্থীর জামানত বাজেয়াপ্ত হতে, দেশের জনগনের কাছে ধিকৃত দলটির সদস্যদেরকে মন্ত্রী হতে দেখলাম, যাঁরা মুক্তিযুদ্ধ করেছিলো তাদের রিকশা চালাতে দেখলাম, আর মুক্তিযুদ্ধবিরোধীদের গাড়ীতে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা দেখলাম। সবই দেখলাম, এসব দেখতে দেখতেই একসময় এই গোলামের হুমকী ধামকীতেই অভ্যস্ত হতে শুরু করলাম, এভাবেই ৪০ বছর পার করে দিলাম। ক্ষমতার পালা বদলে আবার মুক্তিযুদ্ধের দলটি ক্ষমতায় এলো, সবাই আশার আলো দেখতে শুরু করলো। কিনতু হায়! অভাগা যেদিকে তাকায় সাগর শুকায়ে যায়! দলটি ক্ষমতায় আসার সাথে সাথেই বিডিয়ার ক্যাম্পে ঘটে গেলো স্মরনকালের ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞ! বেঁচে আছি বলে এটাও দেখতেই হলো। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করবে এটা ক্ষমতাসীন দলের নির্বাচনী ইশতেহারে ছিল, তাই বিচারের আশায় ছিলাম। নানা কারনে বিচার শুরু হতে বিলম্ব হতে দেখে আমরা আশাহত হচ্ছিলাম, আর আসামীরা মুখ টিপে হাসছিলো।

হে ঈশ্বর! সবই তোমার লীলা, সবাই যখন ধরেই নিয়েছিলাম বাংলার মাটিতে নিজামী, সাইদী বা গোলাম আযমদের বিচার হবেনা, ঠিক তখনই একজন একজন করে লালঘরে ঢুকতে শুরু করলো! এই কয়দিন আগেও গোলাম আযম দম্ভোক্তি করেছিল, তাকে গ্রেফতার করা এত সহজ নয়, তার অনুসারী বুদ্ধিজীবিরা টিভিসহ নানা মিডিয়াতে বিচারের অযৌক্তিকতা, অসারতা প্রমান করার জন্য উঠে পড়ে লেগেছিল। অনলাইনে, ব্লগে নানা জায়গায় একশ্রেনীর পাঠকের মন্তব্য পড়ে যেই মুহূর্তে হতাশ হতে শুরু করেছিলাম, সেই মূহূর্তেই পেয়ে গেলাম এমন কঠিন সংবাদ! যা শোনার জন্য কোটি কোটি মানুষ অপেক্ষা করেছিল।

হে ঈশ্বর, জন্ম-মৃত্যু তোমার হাতে। এমন দেশে জন্মেছি যে নামেই সোনার বাংলা, আসলে দেশ আমার হয়ে আছে আগুন বাংলা। এতকাল ধরে আমরা সবাই আগুনে দগ্ধ হচ্ছি, তারপরেও মাঝে মাঝেই যদি একটু ভাল কোন সংবাদ পাই, তা দেশের হোক বা ব্যক্তির হোক, তাতেই আমরা আনন্দে আত্মহারা হই। কে কবে চাঁদে পৌঁছেছিল, তা দেখে আমরা খুশী হয়েছি, কে কবে এভারেস্ট জয় করেছে, তা দেখে আমরা খুশী হয়েছি, আমরা অন্যের সুখেও সুখী হতে জানি। আমরা খুবই আবেগপ্রবন জাতি, আমরা আমাদের দেশটাকে খুব বেশী ভালোবাসি, তাই আমরাই পেরেছি দেশ থেকে ইংরেজ তাড়াতে, আমরাই পেরেছি মাতৃভাষাকে রাষ্ট্রীয় ভাষার স্বীকৃতি দিতে, আমরাই পেরেছি পাকিস্তানীদের কবল থেকে নিজের দেশকে স্বাধীন করতে।

হে করুনাময়! কর্ম করি আমরা, আর দোহাই দেই তোমার নামের। যাদের নিয়ে এত কথা বললাম, এরাও তোমার নামের দোহাই দিয়ে আমাদেরকে এমন ভাজা ভাজা করেছে এতটাকাল। তুমি নিশ্চয়ই সব দেখে যাচ্ছো, আমরাও বোকামী করেছি, শুরুতেই ডান্ডা মেরে ঠান্ডা করি নাই এদের, তার কুফলতো ভোগ করতেই হবে। আমরা জাতির পিতাকে সপরিবারে হত্যা করেছি আর এইসকল ঘাতকদের জামাই আদর করেছি, তার কুফলতো ভোগ করতেই হবে আমাদের। তবে অনেক শাস্তি পেয়েছি এতটাকাল, এবার আমাদের প্রতি তোমার করুনা বর্ষন করো। দেরীতে হলেও আমরা আমাদের কাজ শুরু করতে পেরেছি, আমাদেরকে সঠিক পথের দিশা দাও। ভালো মন্দ অনেক দেখলাম, বেঁচে থেকে আনন্দ যেমন পাচ্ছি, কষ্টও কম করি নাই।

আজ মনটা খুব ভালো লাগছে। গোলাম আযম গ্রেফতার হয়েছে, তোমার প্রতি আগেও পূর্ণ আস্থা ছিলো, এখনও পূর্ণ আস্থা আছে। আমাদের অনেক ভোগান্তি গেছে, এখন থেকে আমাদের শুধু আলো দেখাও। তোমার কৃপায় যখন বেঁচে আছি, আরও কিছুদিন বাঁচিয়ে রাখো, দেখে যেতে দাও তোমার মহিমা, জেনে যেতে দাও, মৃত্যুর আগে যাদেরকে রেখে যাচ্ছি, তারা যেনো ভালো থাকে, তাদের যেনো আমাদের মত আর দূর্ভোগ পোহাতে না হয়। সবার সুমতি দাও, এই প্রার্থনা করেই আমার আজকের প্রার্থনা শেষ করছি।