ক্যাটেগরিঃ ধর্ম বিষয়ক

 

আজ দেশে সরস্বতী পূজা। দেখতে দেখতে বছর ঘুরে আবার চলে এলো মাঘ মাসের শুক্লা পঞ্চমী। প্রবাস জীবনে সারাটাক্ষণ গতির সাথে তাল মিলিয়ে চলতে গিয়ে প্রায়ই হাঁপিয়ে উঠি। দিনের প্রতিটি মুহূর্ত কাজ করেতো অভ্যস্ত ছিলামনা আমরা। দেশে থাকতে কাজের ফাঁকে ফাঁকে কতরকম আনন্দ উৎসবে মেতে থাকতাম আমরা। আমাদের বাংলা সংস্কৃতিতে কত রকমের পালা পার্বণ, কত ধরনের যে উৎসব আছে, তাতো আর বলার অপেক্ষা রাখেনা। হিন্দুদের বারোমাসে তেরো পার্বণের কথা প্রবাদের মত হয়ে গেছে। তেত্রিশ কোটি দেব দেবী নিয়ে হিন্দুদের জীবন। তেত্রিশ কোটি না হোক, তেত্রিশ দেবতাকে পূজা দিতে গেলেও প্রতি মাসে গড়ে তিনটি করে পূজা পার্বণ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। হিন্দুদের জীবনের প্রতিটি পর্বে একজন করে নিয়ন্ত্রক (দেব দেবী) থাকেন, যিনি স্বর্গ থেকেই সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করে থাকেন (হিন্দুদের বিশ্বাস)। মানুষের জীবনে পুরুষরা নিয়ন্ত্রকের ভূমিকায় থাকলেও ঐশ্বরিক ক্ষেত্রে দেবীরাই বেশী ক্ষমতা রাখেন। স্বয়ং শিবঠাকুরতো ভোলানাথ হয়ে সব ভুলে বসে থাকেন, দেবী দূর্গাকেই জাগতিক সবকিছুর দিকে খেয়াল রাখতে হয়। সব খেয়াল করতে গিয়ে নিশ্চয়ই দেবী দূর্গার মাথাটাই এলোমেলো হওয়ার যোগার হয়েছিল, তাই উনি উনার অধঃস্তনদের মধ্যে দপ্তর বন্টন করে দিয়েছেন। দপ্তর বন্টন পর্বে কন্যা সরস্বতীকে দিয়েছেন ‘শিক্ষা ও শিল্পকলা’ দপ্তর। কন্যাটিকে উনি জানিয়ে দিয়েছেন বাংলা বছরের মাঘমাসের শুক্ল পঞ্চমী তিথিতে যেনো বাংলার মাটিতে একবার করে ঘুরে যান এবং সকল শিক্ষার্থীদের উপর উনার করুণা বর্ষন করে যান। তবে অন্যান্য অধঃস্তনদের কাজের পরিধি কতটুকু নির্ধারন করে দেন তা অজানা থাকলেও দেবী সরস্বতীর কাজের পরিধি একটু বিস্তৃত আকারেই নির্ধারণ করে দেয়া আছে। দেবী সরস্বতীকে হিন্দু মুসলিম বৌদ্ধ খৃষ্টান নির্বিশেষে সকলেই সম্মান করে থাকে। কারন জ্ঞান অর্জনের ক্ষেত্রে জ্ঞান অর্জনটাই বড় কথা, এখানে ধর্ম বিবেচ্য নয়। সেইজন্যই একমাত্র সরস্বতী পূজা হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের ঘর ছাড়িয়ে বাংলাদেশ, ভারতের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে যুগ যুগ ধরে।

তা মাঘমাসের পঞ্চমী তিথিটা হচ্ছে এই শনিবার, ১৫ই মাঘ, (২৮শে জানুয়ারী ) সরস্বতী পূজা। প্রবাসে শনিবার সাপ্তাহিক ছুটির দিন হওয়াতে অনেকের জন্যই সুবিধা হয়েছে, ঠিক লগ্নেই পূজা করতে পারবে। আবার অনেকে ভ্যেনু না পেয়ে পরের শনিবারে পূজা করবে। এভাবেই সবকিছু হয়ে থাকে। প্রবাসে নিয়ম নাস্তি। দেশের মত করেই এখানেও আমরা দুই বাংলার বাঙ্গালীরা (সকল ধর্ম নির্বিশেষে) সরস্বতী পূজা করে থাকি। আমাদের ছেলেমেয়েরাতো আর কোন কিছু আলাদা করতে পারেনা, কোন উৎসবের কি বৈশিষ্ট, তাও তারা ভাল করে জানেনা। অথচ আমরা এখানে সব প্রতিকূলতার মাঝেও চিরন্তন বাংলার উৎসবগুলো আয়োজন করে থাকি (যে কোন আকারে), যাতে করে পরবর্তী প্রজন্ম তাদের শেকড় হারিয়ে না ফেলে।

এই শনিবার আমরাও এখানে সীমিত আকারেই পূজা করবো। সব বাঙ্গালী ছেলেমেয়েরাই থাকবে। এখানে বাংলাদেশ থেকে যে সকল ছেলেমেয়েরা এসেছে উচ্চশিক্ষার্থে, তাদের স্মৃতিতে গেঁথে আছে দেশে থাকাকালীন স্কুলে, কলেজে, বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত সরস্বতী পূজার মধুময় স্মৃতি। শুধু ওরা কেন, স্মৃতিতে আক্রান্ত হই আমি নিজেও। মেয়েদের কাছেই গল্প করি আমার ছাত্রজীবনের কথা। ছাত্রজীবনে স্কুল কলেজের প্রতিটি অধ্যায়ের গল্প করতে গিয়ে মনটা কেমন এক ধরনের ভালোলাগায় মাখামাখি হয়ে যায়।

মনে পড়ে, স্কুলে যখন নীচের ক্লাসে পড়তাম, সরস্বতী পূজা আসলেই মন আমার আনন্দে নেচে উঠতো। মনে পড়লে এখন হাসি পায়, আমি ছিলাম আমার ফর্সা মায়ের কালো মেয়ে। বাবার গায়ের রংটাই যে কেনো পেয়েছিলাম তা নিয়ে অনেক আক্ষেপ ছিল আমার মনে। আশেপাশের বাড়ীর সব মেয়েদের দেখতাম রূপচর্চা করতে, কাঁচা হলুদ বাটা, দুধের সর বাটা, কমলার খোসা বাটা গায়ে মাখতো, গায়ের ফর্সা রঙ আরও উজ্জ্বল করার জন্য। আমি এক বুক তৃষ্ণা নিয়ে তাদের রূপ চর্চা দেখে যেতাম। আমার বাবা মনে করতেন, দেহের সৌন্দর্য্যের চেয়ে মনের সৌন্দর্য্য অনেক বেশী ইম্পর্ট্যান্ট। তাই এইসব রূপচর্চা নিয়ে ভাবার অবকাশ দিতেননা। তা সরস্বতী পূজার দিনে গায়ে কাঁচা হলুদ আর নিমপাতা বাটা মেখে স্নান করাটা এই পূজার একটি আচারের মধ্যে পড়ে। এই সুযোগটা আমি হাতছাড়া করতামনা। খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠেই চলে যেতাম প্রতিবেশীদের ঘরে।

প্রতিবেশীদের ঘরে একটা নির্দিষ্ট পাটা-পুতা ছিলই শুধু কাঁচা হলুদ নিমপাতা বাটার জন্য। আমি নিমপাতার মত এমন বিশ্রী জিনিস জীবনে আর দুইটা দেখিনি। এমন যমতিতা জিনিস আমার কালো চামড়াতে মাখলে আমি আরও কালো হয়ে যাব, এই ভেবে শুধু হলুদ বাটা নিতাম , আবার নিমপাতা না মাখলে যদি পূজার নিয়ম না মানা হয়, সেই ভয়ে একটু নিমপাতা মিশাতাম হলুদের সাথে। তারপর জবজবে করে হলুদ সারা মুখে, হাতে, পায়ে মেখে বসে থাকতাম। সহজে স্নানঘরে ঢুকতে চাইতামনা, কারন স্নানের জলের সাথে সব হলুদ ধুয়ে চলে যাবে এই ভয়ে। মায়ের বকুনি খেয়ে স্নান করতেই হতো, কিনতু মুখে সাবান মাখতামনা। সারাদিন হলুদ বর্ণের মুখ নিয়ে ঘুরে বেড়াতাম, কালো হয়ে জন্মানোর যে দুঃখ, তা ঐ একদিনে পুষিয়ে নিতাম। বন্ধুরা অবশ্য আমাকে টিপ্পণী কাটতে ছাড়তোনা, ফর্সা দেখানোর জন্য যে আমি হলুদ মেখে বসে আছি, তা তারা কিভাবে জানি বুঝে ফেলতো। স্নান শেষে শুরু হতো দেবীর পায়ের কাছে বই খাতা কলম রেখে দেয়ার হিড়িক। এটা একটা রীতি যে সরস্বতী পূজার দিনে পড়তে নেই, বই খাতা দেবীর পায়ের নীচে দিয়ে রাখলে দেবী খুশী হয়ে বিদ্যা বুদ্ধি দিয়ে থাকেন ঐ বইয়ের ভেতর। দেবীর পূজার ফুল বেলপাতা বইয়ের ভেতর গুঁজে রাখলেই পরীক্ষায় ভালো ফল করা যাবে। আমার পরিবারে নিয়ম ছিল উলটো। আমার বাবা সরস্বতী পূজার দিন সকালে পড়তে বসাতেন। উনার কথা ছিলো, আজকেই সুযোগ, কেউ পড়েনা, তোমরা যদি পড়ো দেবী তোমাদের উপর সন্তুষ্ট হবেন। আমাদের এক ঘন্টার জন্য হলেও বই পড়তেই হতো। বন্ধুরা জানালার কাছে এসে হাত ইশারা করতো আর আমরা বাবার ভয়ে পড়তাম। এটা অবশ্য আমার বাবা ঠিকই বুঝতে পারতেন, তারপরেও কেনো জানি উনি এই ‘শাস্তি’টুকু আমাদের জন্য বরাদ্দ রাখতেন!

এমনিতে সাধারন নিয়ম অনুযায়ী সব পূজার আচারেই একেকটা নির্দিষ্ট নিয়ম থাকে। যেমন সরস্বতী পূজাতে ‘খাগের কলম ও দুধজলে ভরা কালির দোয়াত’ লাগেই লাগে। আরও লাগে পলাশ ফুল, কুল বড়ই, নিমপাতা কাঁচা হলুদ দিয়ে স্নান করতেই হয়। ছেলেমেয়েদের মধ্যে একটা নিয়ম চালু আছে, সরস্বতী পূজার আগে ‘বড়ই’ খেতে হয়না, পূজাতে ‘কুল বড়ই’ লাগে, তাই পূজার পরে যত ইচ্ছা বড়ই খাও, কেউ মানা করবেনা( আসলে মাঘের এই সময়টাতে কুল পাকে, অন্য সময়ে কাঁচা কুল খেয়ে অসুখ করার সম্ভাবনা থাকে)। সরস্বতী পূজার দিনে কেনো জানি সবাই হলুদ শাড়ি পড়ে। আরও আছে, একমাত্র সরস্বতী পূজার দিনই রাতের বেলা ইলিশ মাছ এবং কলাই শাক খাওয়া হয়। প্রচলিত রীতি অনুযায়ী বছরের কোন এক সময়ের পরে ইলিশ মাছ খাওয়া যায়না সরস্বতী পূজার আগে পর্যন্ত ( আমার ধারণা, বছরের এই সময়টাতে ইলিশ মাছ আসলে বড় হয়, এর আগে ‘জাটকা’ অবস্থায় থাকে ইলিশ মাছ)।, তাছাড়া পরবের খাবার দই মুড়ি, চিড়া, নাড়ু, সন্দেশ, পায়েস , মিষ্টিতো আছেই।

আরেকটু যখন বড় হলাম, স্কুলের নবম- দশম শ্রেণীতে পড়ি, তখনতো মাতব্বরী করার অধিকার অর্জন করে ফেলেছি। না, আমি এমনিতে তেমন ডাকাবুকো ছিলামনা, নেতাগিরি আমার রক্তে নেই, তারপরেও নেতা হয়ে গেছিলাম। আসলে তখন ক্লাসের ফার্স্ট গার্ল বা ফার্স্ট বয়দের মেঘ না চাইতে জলের মত করেই হাতে ক্ষমতা চলে আসতো। সরস্বতী পূজা বা বার্ষিক মিলাদ মাহফিলের মত অনুষ্ঠান আয়োজনের দায়িত্ব পেয়ে যেতাম। আমাকে কিছুই করতে হতোনা, আমাকে শিখন্ডী হিসেবে রেখে যারা মাতব্বরী করতে অভ্যস্ত ছিল, তারাই সব ব্যবস্থা করে ফেলতো। সেই ব্যবস্থার মধ্যে নিজেদের জন্য অতিরিক্ত মিষ্টির প্যাকেট বরাদ্দ করা হতো। আমাকে জানিয়েই করা হতো, আমি ডাকাবুকো ছিলামনা ঠিক, কিনতু অতিরিক্ত মিষ্টির প্যাকেটের লোভ ঠিকই ছিলো। এই বয়সে গায়ে হলুদ মাখার পাশাপাশি আরেকটি উপসর্গ যোগ হলো। শাড়ী পড়ে বড় সাজার হাস্যকর চেষ্টা। শাড়ি পড়তাম, বড়দের মতো করে চুল বাঁধতাম, মনে পড়ে অনুভা, ফরিদা, সেলিনা, সীমার কথা। একটা গ্রুপ ছিলাম আমরা, টিচারদের গুড বুকে আমাদের নাম ছিলো, আমি আর সেলিনা যেখানে থাকতাম, টিচাররা নিশ্চিন্ত বোধ করতেন। তাছাড়া এইসব অনুষ্ঠানে বয়েজ স্কুল থেকে ছাত্ররাও আসতো, প্রতিমা দর্শনের পাশাপাশি আমাদের চোখেও চোখ রেখে যেতো। এটাইতো কৈশোরের এক দুরন্ত মজার জিনিস। তবে বয়েজদের স্কুলেতো আর যেতে পারতামনা আমরা, পরিবার থেকেই নিষিদ্ধ ছিল, ফলে এই চোখাচোখির ব্যাপারটা অনেকটাই একতরফা ছিল।

কলেজের জীবনটা আমার জন্য একটুও সুখকর ছিলোনা। স্কুলটা ছিল আমার রাজত্ব। কলেজে গিয়ে নিজের অস্তিত্বকে টের পেতামনা। একেতো কলেজের পড়া ভালো লাগেনি, কলেজের পরিবেশটাও ছিলো খাপছাড়া, আমাদের প্রিন্সিপ্যাল ম্যাডাম ব্যস্ত ছিলেন উনার রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ চরিতার্থ করার কাজে। তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সাথে উনার খুব ভালো কানেকশান ছিল। উনি আমাদের কলেজের কোন কিছুতেই আর খেয়াল রাখতেননা, কলেজের সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড নিয়েও উনার কোন আগ্রহ ছিলোনা। উনি ঠিকই উনার আখের গুছিয়ে নিয়েছিলেন, প্রেসিডেন্টের সাথে হট কানেকশান ছিলো বলেই ঢাকার নামকরা এক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রিন্সিপ্যাল হয়ে চলে গেলেন আমাদেরকে ফেলে।ফলে কলেজে গিয়ে কেমন খেই হারিয়ে ফেলে দুই বছর মুষড়ে পড়েছিলাম। সরস্বতী পূজা হয়েছিল নিশ্চয়ই, তবে আমার স্মৃতিতে তেমন কোন উল্লেখযোগ্য ঘটনা নেই।

চলে গেলাম জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে। আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ সময় কাটিয়েছি, প্রথম তিন বছরে। জাহাঙ্গীর নগরে এসে আবার ফিরে পেয়েছিলাম রাজত্ব করার সুখ। আহ! কি মধুর স্মৃতি! এখানে প্রতিটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এমন জাঁকজমকপূর্ণ হতো যে বাড়ী ঘরে ফেরার কথাও ভুলে যেতাম। সরস্বতী পূজার কথা বলতে বসে অন্য প্রসঙ্গ বাদ দিয়ে সরস্বতী পূজার কথাই বলি। জাহাঙ্গীরনগরে এসেই মনে হয়েছে, সরস্বতী পূজা শুধু হিন্দু ধর্মাবল্মবীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এই পূজা আসলে এক ধরনের আরাধনা। আরাধনা ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে যে কেউ করতে পারে, এবং সকলে তাই করতো। পূজা মন্ডপে শুধুই ছাত্রছাত্রীরা থাকতাম, মন্ডপ সাজাতাম ছাত্রছাত্রীরা, শুধুমাত্র অভ্যাস নেই বলেই পূজার আয়োজনে মুসলিম মেয়েরা অংশ গ্রহন করতোনা, আর বাকী সব কিছুতেই আমরা ছিলাম শুধুমাত্র শিক্ষার্থী। দিনে পূজার আনন্দ, সন্ধ্যায় আরতি, আরতি করতো শুধুই ছেলে শিক্ষার্থীরা, মেয়েরা থাকতো দর্শক ও হাততালি গ্রুপে। স্কুল জীবনের চোখাচোখি পর্বটি এখানেও চলতো, অবশ্যই একতরফা নয়, বিশ্ববিদ্যালয়ে বাবা মায়েরাতো আর পাহারা দিতে আসতোনা। তবে ঐ পর্যন্তই, আমাদের জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়টির কোন বদনাম ছিলনা, দেবী সরস্বতীর কৃপা আমরা সবাই পেয়েছিলাম। আশির দশকের শেষ দিকে এসেও জাহাঙ্গীর নগরের শিক্ষার্থীরা ছিল সকলের জন্য অনুকরণীয়। তারপরে কি থেকে কি হয়ে গেলো, আমরাও চলে এলাম, আমাদের সাথে সাথে কি দেবী সরস্বতীও চলে এলেন কিনা কে জানে! এখন কেন আর আগের মত পড়াশুনা হয়না বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে, জানিনা। ঢাকা জগন্নাথ হলের সরস্বতী পূজা ছিল অতি বিখ্যাত, একবার মাত্র গিয়েছিলাম পূজা দেখতে, জাঁকজমক দেখে আমি মুগ্ধ হয়ে গেছিলাম। এখন কি আগের মত করেই পূজা হয় জগন্নাথ হলে, খুব জানতে ইচ্ছে করে।

আমি অনার্স দ্বিতীয় বর্ষের শেষের দিকে বিয়ে করে ফেলেছিলাম বলেই বন্ধুদের সাথে আর নিরবচ্ছিন্ন সময় কাটাতে পারিনি। কিনতু যে সময় আমি কাটিয়ে এসেছি বন্ধুদের সাথে, মেয়েদের সাথে সে সমস্ত দিনের গল্প করার সময় আমার চোখে মুখে নিশ্চয়ই আলো ফুটে উঠে! মাত্র পঁচিশ বছর আগেও আমরা কত আধুনিক মনের ছিলাম, আমাদের মধ্যে প্রেম ছিল, কিনতু কোন শঠতা ছিলনা, চরিত্রে নির্মলতা ছিলো, কোন কলুষতা ছিলোনা, আচরণে স্থিরতা ছিলো, কোন রকম অধৈর্য্যতা বা অস্থিরতা ছিলনা, অভিমান ছিল কিনতু আক্রোশ ছিলনা। পঁচিশ বছর সময় কি খুব বেশী আগের কথা! একমাত্র মোবাইল ফোন ছিলনা তখন, কম্পিউটারও ছিলনা, এটুকুই তফাৎ। তাহলে কি প্রযুক্তির উন্নয়নের সাথে মানুষের আচরনের বৈরীতা আছে! মনে হয় আছে, তাই কালির দোয়াতে খাগের কলম ডুবিয়ে লিখতেন রবীন্দ্রনাথ, তাই তিনি হয়েছিলেন বিশ্বকবি, প্রযুক্তির উন্নয়নের সাথে সাথে আমাদের খাগের কলমের বদলে ‘ফাউন্টেন পেন’, তারপরে এলো ‘বলপেন’ , এরওপরে এলো কম্পিউটার, ল্যাপ্টপ আর কীবোর্ড। এখন আর আমাদের কলম না হলেও চলে, আমরা ল্যাপ্টপ, আইপ্যাড, কিনডেল, নুক নামের ইলেকট্রনিক বই ব্যাবহার করি। যুগের উন্নতির সাথে সাথে ভাষাও বদলে যাচ্ছে, আমরা এখন আর রাবিন্দ্রীক ভাষায় লিখিনা, কবিতার ভাষাও বদলে গেছে। এখন রবীন্দ্র সঙ্গীতকে বলা হয় প্যানপ্যানানি সঙ্গীত, গানের ধরনও পালটে গেছে, এখন রবীন্দ্র সঙ্গীতকে রিমেক করা হচ্ছে ব্যান্ডের সাথে সিনকোনাইজ করে, আরও এসেছে বাজারে র‌্যাপ, রক, হেভী মেটাল সহ আরও ভারী ভারী নামে। এখন কেউ আর রবীন্দ্র নজরুল হতে চায়না, এমনকি আইন্সটাইনও হতে চায়না। কি যে হতে চায় আমাদের সন্তানেরা, সেটাও বুঝতে পারিনা। শিক্ষাঙ্গনগুলোতে এত অস্থিরতা দেখেই কি সরস্বতী দেবীও ভয় পেয়ে গেছেন কিনা কে জানে। নাহলে এখনকার ছেলেমেয়েরা কেনো দেবীর কৃপা লাভে বঞ্চিত হচ্ছে!