ক্যাটেগরিঃ চারপাশে

 

সেদিন কোন এক দৈনিকের ছোট্ট একটা খবরের হেডলাইনের উপর চোখদুটো আটকে গেলো। এক এমপি সাহেবের ছেলের বিয়ের বৌভাত অনুষ্ঠানের বিশাল আয়োজনের উপর আলোকপাত করা হয়েছে। সংবাদটি যেভাবে ছাপা হয়েছে, তা যে কোন সংবাদপত্র পাঠককে অন্ততঃ সংবাদের শিরোনাম পড়তে উৎসাহিত করার কথা। কারন অনুষ্ঠানে আগত অতিথির সংখ্যাটিই ছিল সংবাদটির শিরোনাম। বৌভাত অনুষ্ঠানের আমন্ত্রিত অতিথির সংখ্যা ছিল দুই লাখের কাছাকাছি। অল্প কথায় পুরো চিত্রটি তুলে ধরা হয়েছে যেভাবে,

“নোয়াখালীর হাতিয়ার স্বতন্ত্র এমপি, বিশিষ্ট ব্যবসায়ী প্রকৌশলী মো. ফজলুল আজিমের পুত্র ফারহান মো. আজিমের বউভাত ছিল গতকাল। এক উৎসবমুখর পরিবেশে সকাল থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত প্রায় দুই লাখ লোক ভোজে অংশ নেয়। হাতিয়া দ্বীপ কলেজ মাঠসহ ১০ ইউনিয়নে এ মেজবানির আয়োজন করা হয়। গরুর মাংস, ডিম, সবজি, সাদা ভাত খাওয়ানো হয়। চারশর ওপর গরু জবাই করা হয়। প্রতি ইউনিয়নে বাবুর্চিসহ এক হাজার স্বেচ্ছাসেবী ছিল। নোয়াখালী তথা দেশের ইতিহাসে এত বড় বউভাত অনুষ্ঠান হয়নি বলে প্রত্যক্ষদর্শী অনেকে জানান। এদিকে বউভাত অনুষ্ঠানকে ঘিরে স্থানীয় শিল্পীদের পরিবেশনায় চলছে নানা সাংস্কৃতিক আয়োজন। সব মিলিয়ে হাতিয়া এক উৎসবের জনপদে পরিণত হয়েছে। বউভাত অনুষ্ঠানে আসা কৃষক হাবিবুল্লাহ (৫০) জানান, এত বড় আয়োজন জীবনে দেখিনি। বিকালে নবদম্পতিকে হাতিয়ার বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বরণ করে নেওয়া হয়।”

খবরটি পড়ে আমার ভালই লেগেছে। একদিনের জন্য হলেও হাতিয়ার সকল মানুষ একসাথে একটি শুভ অনুষ্ঠান উপলক্ষে একত্রিত হতে পেরেছে। খাবারের তালিকা দেখেও এক ধরনের স্বস্তি অনুভব করেছি, সাধারন আইটেম, পোলাও কোর্মা নয়, তার উপর গরুর মাংসের সাথে বিকল্পও ছিল, কারন যারা গরুর মাংস খায়না (বিশেষ করে হিন্দু সম্প্রদায়), তাদের জন্য ডিম রান্না হয়েছিল। অনেকটা কাছাকাছি কিনতু আরও বেশী উল্লেখ করার মত ঘটাপটা হয়েছিল সাবেক প্রেসিডেন্ট এরশাদের ব্যক্তিগত এক অনুষ্ঠানে। তৎকালীন প্রেসিডেন্ট এরশাদের মা অথবা বাবার মৃত্যু (আমি দুঃখিত নির্দিষ্ট করে বলতে পারছিনা বলে) উপলক্ষ্যে যে চল্লিশার আয়োজন করা হয়েছিল, সেখানেও রংপুরের ঐ এলাকার ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সবাইকেই নিমন্ত্রণ করা হয়েছিল। এরশাদ সাহেব আয়োজনে ত্রুটি রাখেননি, মুসলিমদের জন্য মুসলিম কায়দায় এবং হিন্দুসহ অন্য ধর্মাবলম্বীদের জন্য আলাদা করে রান্নার আয়োজন করা হয়েছিল। এরশাদ সাহেবের বিরূদ্ধে তখন জনমনে রোষ ধূমায়িত হচ্ছিল, আমিও ছিলাম সেই জনগনের একজন, তারপরেও এরশাদ সাহেবের সেদিনের এই অংশটা আমার মনে গেঁথে আছে। যদিও তখন সকলেই বলেছিল, এসবই অভিনয়, তারপরেও আমি বলবো, সবাই যদি মাঝে মাঝে এমন মহামিলনের অভিনয় করে, লাভ ছাড়া ক্ষতিতো কিছু নেই।

এবার আসি অতিথি নিয়ন্ত্রণ আইনের কথায়। আমার মনে আছে, আমার বিয়ের সময় ৪০০ জনের মত নিমন্ত্রিত অতিথি ছিল। শুধু এটুকু মনে পড়েনা, আমার বিয়ের সময় ‘অতিথি নিয়ন্ত্রণ আইন’ চালু ছিল কিনা। কারন অতিথি নিয়ন্ত্রন আইন চালু থাকলে আমার বাবা ৪০০ জনকে কিভাবে নিমন্ত্রণ করেছিলেন তা বুঝতে পারছিনা। কারন আমার বাবা আইনের প্রতি সব সময় শ্রদ্ধাশীল ছিলেন। হয়তো তখনও আইনটি চালু হয়নি অথবা চালু হলেও আইনের প্রয়োগ শুরু হয়নি। আসলে অতিথি নিয়ন্ত্রণ আইনটি কবে থেকে চালু হয়েছে বা এখনও চালু আছে কিনা এ ব্যাপারটি নিয়ে আমি খুব একটা ওয়াকীবহাল নই। তবে এটুকু মনে আছে, অতিথি নিয়ন্ত্রণ আইন চালু হয়েছিলো এবং এই আইনে খুব সম্ভব ১০০ জনকে নিমন্ত্রণ করার বিধান রাখা হয়েছে।

মাত্রই ১০০ জন! এখানেই একটা প্রশ্ন থেকে যায়, মানুষ সামাজিক জীব। জীবনের পথে চলতে চলতে কত জনের সাথে হৃদ্যতা গড়ে উঠে। বাঙ্গালী জাতি হিসেবে অতিথিপরায়ন। হিন্দুরা বিশ্বাস করে, ‘অতিথি নারায়ণ’। যে কেউ দ্বারে এলে খালিমুখে ফেরাতে নেই। গরীব যে গরীব, তার বাড়ীতে গিয়েও যদি এক গ্লাস জল চাওয়া হয়, সেও ঘরে কিছু না থাক হাতে করে দুইটা বাতাসা নিয়ে আসে এক গ্লাস জলের সাথে। বাঙ্গালী এমনই অতিথিপরায়ণ জাতি। সেই জাতিকে কি ‘অতিথি নিয়ন্ত্রণ’ আইনে আটকে রাখা যায়! সন্তান জন্মের পরে বড় হয়ে বিয়ের যুগ্যি হতে হতে সমাজের কত মানুষের সাথে পরিচিতি হয়, বাবা মায়ের দিক থেকে যেমন, সন্তানের দিক থেকেও তেমন। মন চায় সবাইকে একসাথে নিয়ে একটু আমোদ আহ্লাদ করতে। ধনীদের কথা বাদ দিলাম, তারা পুতুলের বিয়ে উপলক্ষেও জাঁকজমক করে থাকে। কিন্তু সাধারন মধ্যবিত্তেরতো আর তেমন রেস্তর জোর থাকেনা। তাই এমনিতেতো আর সবাইকে খাওয়ানো সম্ভব হয়না, তাদের জন্য ছেলেমেয়ের বিয়ে-বৌভাত হচ্ছে একটা উপলক্ষ্য, যেটাকে শিখন্ডী হিসেবে দাঁড় করিয়ে সবাইকে একত্র করা যায়।

আইন প্রনয়ন করার সময় আইনপ্রণেতারা নিশ্চয়ই অনেকদিক ভেবে চিন্তেই আইন তৈরী করে থাকেন। সেই আইনে জনগনের মঙ্গল নিহিত থাকার কথা। অতিথি নিয়ন্ত্রণ আইনেও অবশ্যই জনগনের সামর্থ্যের কথা মাথায় রেখেই আইন করা হয়েছে। তবে আইন খালি করলেইতো হয়না, আইনের সঠিক প্রয়োগ হচ্ছে কিনা অথবা যাদের জন্য এই আইন তারা খুশী হলো কিনা, সেটাও মনে হয় একটু পর্যবেক্ষণ করা উচিত। নাহলে এইসকল আইনের মূল্য থাকেনা, এমনকি মানুষ ভুলেও যায় এমন একটি আইন যে এখনও বহাল আছে। যারা এই আইনটি তৈরী করেছিলেন, তাঁদের নিজের ছেলে মেয়ের বিয়েতে কি করেছিলেন! আরে সাধারন হিসেবে আত্মীয়-স্বজনইতো ১০০ জনের বেশী হয়ে যায়, তার উপর আছে পাড়া-প্রতিবেশী, আছে নিজের বন্ধু-বান্ধব, ছেলে মেয়ের বন্ধু বান্ধব, নতুন কুটুমবাড়ীর নতুন আত্মীয়-স্বজন, যোগ করলেতো এমনিতেই শ’পাঁচেক লোক হয়ে যাওয়ার কথা। আইন মানতে গেলে আত্মীয়দের সাথে মন কষাকষি হয়, বন্ধু-বান্ধবদের সাথে মন কষাকষি হয়, আবার আইন অমান্য করা হচ্ছে আইনের অবমাননা, যা কিনা গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয়। আমরা সামাজিক মানুষেরা পড়ে যাই মহাফাঁপড়ে।

আইনের প্রতি যাঁরা শ্রদ্ধাশীল, সেইসব মানুষের বিপদ সবচেয়ে বেশী। আইন উপেক্ষা করতে পারেননা বলে পরবর্তীতে পরিবারের কাছে এবং সমাজের চোখে দোষী হতে হয়। তাই কি মানুষ অনেকটা বাধ্য হয়েই আইন উপেক্ষা করে? তবে আমি আগেই বলেছি, অতিথি নিয়ন্ত্রণ আইনটি এখনও বহাল আছে কিনা আমার জানা নেই। থাকলে পরে একটি অনুষ্ঠানে এক হাজার নয়, দুই হাজারও নয়, একেবারে দুই লাখ মানুষকে নিমন্ত্রন করা হয়েছে? তাও আবার যাঁদের হাতে আইন প্রনয়নের ক্ষমতা, সেই রকম একজনের হাতেই আইন উপেক্ষিত হয়েছে! তাহলে আর এই আইনের তাৎপর্য্যই বা কি? আমার পরিসংখ্যানে হয়তো একটু ভুল হতে পারে (১০০ জন না হয়ে ২০০ জনই নাহয় হলো), কিনতু দেশের কোন বিয়েতেই ৫০০র কম অতিথিতো দেখা যায়না। তাহলে কি সবাই জেনে শুনেই আইন অমান্য করছে এবং আইন প্রণেতারা তা দেখেও না দেখার ভান করে থাকেন! তাহলেতো বলতেই হয়, আইন যদি ভাংগতেই হয়, তা এমন কঠিন আইন না করাই ভালো। অন্ততঃ এই সামাজিক ব্যাপারের বিষয়টি যার যার সামর্থ্যের উপর ছেড়ে দেওয়াই ভালো।

পরিশেষেঃ যে সংবাদটি নিয়ে এত কথা বললাম, সেখানে লেখা আছে, এই উৎসবে ৪০০ গরু কোরবাণী দেয়া হয়েছে। এই পরিসংখ্যানটি কি ‘গরু চোরাকারবারী’দের আরেকটু উৎসাহিত করবে! সীমান্তে কি আরও হতাহতের ঘটনা বাড়বে!সবাইতো মুখে মুখে দেশকে ভালোবাসি বলে গলা শুকাই। কিনতু দেশকে ভালোবাসতে গেলে কিছু কিছু বিলাস ত্যাগ করতে হয়। নিজেকে কৃচ্ছ্রসাধন করতে হয়। এমনি এমনি দেশের উন্নতি হয়না। একদিনের অনুষ্ঠানে ৪০০টি গরু কোরবানী হতে দেখে মনে হচ্ছে, আহারে! আমাদের দেশে হাল চাষে গরু পাওয়া যায়না, মাননীয় এমপি সাহেব গরুগুলো যদি গরীব কৃষকদের মধ্যে দান করে দিতেন, ছেলের বিয়ের আনন্দ উপলক্ষ্যে, তাহলে দুই লক্ষ মানুষকে নিমন্ত্রন করে খাওয়ানোর ব্যাপারটা সত্যি সত্যি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকতো। উনার মত জনদরদী মানুষের পক্ষে কলম ধরার মানুষের হিড়িক পড়ে যেতো।

নতুন দম্পতিকে শুভেচ্ছা।