ক্যাটেগরিঃ প্রযুক্তি কথা

 

স্বাভাবিক নিয়মে সাত দিনে এক সপ্তাহ, ত্রিশ দিনে একমাস ও ৩৬৫ দিনে হয় এক বছর। তবে সব মাসই ত্রিশ দিনে হয়না, কিছু কিছু মাস হয় একত্রিশ দিনে এবং একমাত্র ফেব্রুয়ারী মাস হয় আটাশ দিনে। কিনতু আধুনিক গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারের হিসেব অনুযায়ী প্রতি চার বছরে একবার একটি ফেব্রুয়ারী মাসে অতিরিক্ত একটি দিন যোগ হয় এবং আটাশ দিনের পরিবর্তে সেই ফেব্রুয়ারী মাসটি হয় ঊনত্রিশ দিনে, বছরটি হয় ৩৬৬ দিনে। এই ঊনত্রিশতম দিনটিকে বলা হয় ‘লীপ ডে’ এবং ঐ বছরটিকে বলা হয় লীপ ইয়ার।

২০০০ হাজার বছর আগে জুলিয়াস সীজার সর্ব প্রথম লীপ ইয়ারের ধারনা দেন সবাইকে। তাঁর হিসেব অনুযায়ী যে কোন বছর যদি চার দিয়ে সম্পূর্ণ বিভাজ্য হতো, সেই বছরটিই লীপ ইয়ার হিসেবে গন্য হতো। এতে করে লীপ ইয়ারের সংখ্যা অনেক বেশী হতো। পরবর্তীতে জুলিয়াস সীজারের সময় থেকে আরও ১৫০০ বছর পরে গ্রেগরীয়ান ক্যালেন্ডারে শুদ্ধভাবে লীপ ইয়ার অন্তর্ভুক্ত হয়। গ্রেগরীয়ান ক্যালেন্ডারেও লীপ ইয়ারের হিসেব হয় তিনটি সূত্র অনুযায়ী।

১)। যে বছরটি ৪ দ্বারা বিভাজ্য হবে

২)। যে বছরটি ১০০ দ্বারা বিভাজ্য হবে তাকে ৪০০ দিয়েও বিভাজ্য হতে হবে। তাহলেই ঐ বছরটি লীপ ইয়ার হিসেবে গন্য হবে।
সেই হিসেবেই ২০০০ বা ২৪০০ সাল লীপ ইয়ার হলেও ১৮০০ সাল, ১৯০০, ২১০০, ২২০০, ২৩০০ বা ২৫০০ সাল লীপ ইয়ার নয়।

ক্যালেন্ডারে লীপ ইয়ারের অন্তর্ভুক্তি হয়েছে সূর্য্যকে পৃথিবীর প্রদক্ষিনকালের সময়কে হিসেবে ধরে। যেমন খুব সুক্ষ্মভাবে হিসেব করলে সূর্য্যকে একবার বৃত্তাকারে প্রদক্ষিন করতে পৃথিবীর মোট সময় লাগে ৩৬৫.২৪২১৯৯ দিন। গ্রেগরীয় ক্যালেন্ডারে ৩৬৫ দিনে বছর হয়, ফলে প্রতি চার বছরে একটি অতিরিক্ত দিন না যোগ করলে আমরা প্রতি বছর থেকে ছয় ঘন্টা সময় হারাতাম এবং প্রতি চার বছরে আমাদের ২৪ ঘন্টা সময় হারিয়ে যেতো। সে কারনেই প্রতি চার বছরে একটি লীপ ডে যোগ করে অতিরিক্ত ২৪ ঘন্টার হিসেব মিলানো হয়েছে।

২০১২ সালটি লিপ ইয়ার, তা কম বেশী সকলেই জানি। তবে লিপ ইয়ার নিয়েও যে পশ্চিমা দেশগুলোতে কিছু প্রাচীন সংস্কার আছে তা হয়তো সবার না জানাও থাকতে পারে।

লীপ ডে-তে প্রেয়সীর কাছ থেকে বিয়ের প্রস্তাবঃ
সাধারণ নিয়মানুযায়ী বিয়ের প্রস্তাব আসে ছেলের কাছ থেকে এবং একটি ছেলে যে কোন সময় তার প্রেয়সীকে বিয়ের প্রস্তাব দিতে পারে। কিনতু একটি মেয়ে শুধুমাত্র লীপ ডে-তে তার প্রিয়তমকে বিয়ের প্রস্তাব দিতে পারে। আইরিশ লোকগাঁথাতে আছে সেইন্ট ব্রিজেট ও সেইন্ট প্যাট্রিক নামের দুই ধর্মযাজক বিয়ের ব্যাপারে ছেলেদের অগ্রণী ভুমিকার পাশাপাশি মেয়েদের পক্ষ থেকেও যেনো তদ্রূপ কোন রীতি থাকে, সেই বিবেচনায় দুজনে একমত হয়েছিলেন এবং দুজনে মিলে ক্যালেন্ডারে ২৯শে ফেব্রুয়ারীকেই সেই দিন নির্বাচন করেছিলেন। ফলে চার বছরে একবার মাত্র বিয়ের প্রস্তাব প্রদানে আগ্রহী মেয়েরা এই সুযোগ পায়।

ব্যাচেলর’স ডে
২৯শে ফেব্রুয়ারীকে কোন কোন স্থানে ‘ব্যাচেলর’স ডে’ বলা হয়ে থাকে। একটি মেয়ে বিয়ের প্রস্তাব দিলে পাত্র সেই প্রস্তাব সানন্দে যেমন গ্রহণ করতে পারে, আবার তা প্রত্যাখ্যানও করতে পারে। তবে মজার ব্যাপার হলো, ছেলেটি যদি মেয়েটির প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে, তাহলে তাকে কখনও ‘গাউন’, কখনওবা অর্থদন্ডী দিতে হয়। অনেক ইউরোপিয়ান দেশেই বিশেষ করে সমাজের উঁচুশ্রেণীতে প্রত্যাখ্যাত মেয়েটিকে ১২ জোড়া গ্লাভস দিতে হয় যেনো মেয়েটি গ্লাভস পড়ে তার আংটিশূণ্য রিক্ত অনামিকা ঢেকে রেখে প্রত্যাখ্যানের গ্লানিকে আড়াল করতে পারে।

ব্যাড লাক!
স্কটল্যান্ডে ২৯শে ফেব্রুয়ারীতে জন্ম গ্রহণকারী যে কোন শিশুকে ‘আনলাকী’ বলা হতো, অনেকটাই যেমন করে যে কোন ১৩ তারিখ শুক্রবারকে আনলাকী মনে করা হয়। আবার গ্রীসে লীপ ইয়ারে বিয়ে করাটাকে দম্পতির জন্য অশুভ মনে করা হয়।

‘দ্য অনার সোসাইটি অব লীপ ইয়ার বেবিজ’
২৯শে ফেব্রুয়ারীতে যাদের জন্ম, তাদেরকে নিয়ে গঠিত হয়েছে ‘দ্য অনার সোসাইটি অব লীপ ইয়ার বেবিজ’। গিনেস বুকে তথ্য অনুযায়ী, একটি পরিবারের বংশানুক্রমিক ভাবেই তিন প্রজন্ম ধরে লীপ ডে বা ২৯শে ফেব্রুয়ারীতে বাচ্চা জন্মানোর তথ্য এবং একই পরিবারের লীপ ডে বেবির সংখ্যা লিপিবদ্ধ করা আছে।

লীপ ইয়ার যেহেতু সূর্য্যের চতুর্দিকে পৃথিবীর পথপরিক্রমার হিসেব ধরে নির্ধারণ করা হয়ে থাকে, তাই ইংরেজী হিসাব ছাড়াও অন্যান্য ধর্মীয় গোষ্ঠিগত বা জাতিগতভাবেও য়ালাদা আলাদা লীপ ইয়ার আছে। যেমন , চাইনীজ লীপ ইয়ার, ইহুদী লীপ ইয়ার, ইরানিয়ান, ইথিওপিয়ান লীপ ইয়ার আছে, আবার ইসলাম, হিন্দু, বাহাই ধর্মেও লীপ ইয়ারের হিসেব আছে।

আগামীর লিপ ডে
সবশেষে, আগামী কয়েকটি লিপ ইয়ারের ২৯শে ফেব্রুয়ারী সপ্তাহের কোনদিন হবে তার একটি হিসাবঃ
২০১২ এ বুধবার
২০১৬ এ সোমবার
২০২০ এ শনিবার
২০২৪ এ বৃহস্পতিবার
২০২৮ এ মঙ্গলবার
২০৩২ এ রবিবার।

২০৩২ সাল পর্যন্ত বেঁচে থাকবো কিনা কে জানে, কিনতু অগ্রীম জেনে গেলাম ২০৩২ সালের ২৯শে ফেব্রুয়ারী দিনটি হবে রবিবার!