ক্যাটেগরিঃ ব্লগ

 

মিথীলার বয়স বারো। আর একটি মাত্র বছর শেষের অপেক্ষায় আছে সে। পেয়ে যাবে ‘টিন এজের’ মর্যাদা। জীবনের কত পাওনা বাকী আছে ওর, যা কিনা টিন এজ হলেই দাবী করতে পারবে! এগুলো সবই মিথীলার হিসেব। তবে তার সব হিসেব ঠিক আছে, কিনতু সমস্যায় পড়েছে আমাকে নিয়ে। আমি এখনও ওকে আমার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রেখেছি। এখন পর্যন্ত ওকে ওর আসল নাম ধরে না ডেকে ‘বাবলু’, টুকলী, বাচ্চা, সোনা পাখী, কলিজার টুকরা সহ যাবতীয় হাবিজাবি নামে ডাকি। ওর ধারণাতেও নেই যে আমার কাছে মিথীলা সেই ছোট্টটি হয়েই আছে। আমি ভুলেই গেছি আমার বারো বছর বয়সে আমার মানসিক গঠন কেমন ছিল। কারন আমিতো আর মিথীলার মত মায়ের কোলপোছা ছিলামনা। কি আর করা! মিথীলার দুই দিদি মাঝে মাঝেই মিথীলার ভাগ্য বিড়ম্বনায় দুঃখ করে, মাঝে মাঝে সমব্যথীও হয়।

হঠাৎ করেই আমার মনে হচ্ছে মিথীলা বড় হতে চাচ্ছে! গত বছর থেকে মিথীলা ফেইস বুক একাউন্ট খুলতে চাচ্ছে। পারছেনা কিছুতেই আমাকে রাজী করাতে। আমি সোজা বলে দেই, ” আমি নিজে ফেইস বুকে আছি, আমি জানি ফেইস বুক কি জিনিস, কাজেই এখনই কোন ফেইস বুক হবেনা”! মিথীলার কন্ঠে ঝরে পড়ে আকুতি, ” মা, আমাদের ক্লাসের সবার আছে ফেইসবুক, টিচারও বলে ফেইসবুক খুলতে, সেখানে পড়া লেখা নিয়ে আলোচনা হবে, আমার বন্ধুদের সবার আছে , শুধু আমারই নেই”। আমি উত্তরে বলি, “সারাদিন স্কুলে কাটিয়ে আসো, বন্ধুদের সাথেই থাকো, টিচার পড়ালেখা নিয়ে আলোচনা করতে চাইলে ফেইসবুকে কেনো, তোমাকে ই-মেইল করতে বলো (দুই বছর আগে ওকে ই-মেইল একাউন্ট খুলে দিয়েছে।)। তাছাড়া বন্ধুরা তোমাকে যদি টিজ করে তাদেরকে বলবে যে ফেইস বুকে লগ ইন করতে গেলে মিনিমাম বয়স হতে হয় ১৮। ওরা ১০/১১ বছর বয়সেই নিজেদের বয়স বাড়িয়ে দিয়ে ফেইস বুক খুলে খুব ভুল কাজ করেছে। তুমি এমন ভুল কাজ করতে এলাউড নও। দেখবে ওরা আর কিছু বলবেনা”। মিথীলার যে দিদিটা পাজী, সে মিথীলাকে শিখিয়ে দেয় ভুলেও যেনো ‘আমি এটা করতে এলাউড না’ কথা না বলে। তাহলে নাকি বন্ধুরা ওকে নিয়ে আরও বেশী হাসাহাসি করবে। শেষ পর্যন্ত আমি একটু নরম হলাম, বলে দিলাম যে ১৮ বছর না, ১৫ বছর বয়সেই ফেইস বুক খুলতে পারবে।

এরপর কয়েকমাস পার হতেই মিথীলার নতুন বায়না একটা ‘সেল ফোন’ চাই। সেল ফোন দিয়ে কি করবে জানতে চাইতেই বললো যে স্কুলে সবাই সেলফোন নিয়ে আসে, গেইম খেলে, টেকস্ট পাঠায় বন্ধুদেরকে। আমি বললাম, ” আমি জানি স্কুলে সেলফোন এলাউড না, তারপরেও সবাই সেল ফোন নিয়ে আসে মানেই ওরা স্কুলের নিয়ম মানছেনা, তুমিও ওদের মতই হতে চাইছো, এটা ভেবেই আমার কান্না পাচ্ছে (কান্নার কথাটা বলেছি দুষ্টামী করে)।” সাথে সাথে বন্ধুদের পক্ষে সাফাই গেয়ে ফেললো, ” ওরা টিফিন টাইমে সেলফোন বের করে। অন্য সময় ব্যাগেই থাকে”। আমার উত্তর, ” তাহলে থাক, টিফিন টাইমে সেল ফোন নিয়ে না খেলে অন্য খেলা করো, একটু দৌড়ঝাঁপ জাতীয় খেলা। তাছাড়া বন্ধুদের পাশে থেকেই বন্ধুদের টেক্সট করার কি দরকার!” মিথীলা বললো, ” তাহলে টাইপিং স্পীড বাড়বে”। বলে দিলাম, ঘরে এসে কম্পিউটারে বসে Essay লিখবে , টাইপিং স্পীড বেড়ে যাবে। তাছাড়া শোন, তোমার ফেইস বুক নেই, তোমার সেল ফোন নেই বলেই তুমি অবসর সময়ে গল্পের বই পড়তে পারছো, যদি সেলফোন হাতে থাকতো তাহলে সারাক্ষন টেক্সট করতে করতে কোন এক ছেলের সাথে প্রেম হয়ে যাবে”। (আমি আমার মেয়েদের সাথে খুব সহজেই প্রেম প্রীতি নিয়ে কথা বলি। এটা একান্তই আমার স্টাইল মেয়েদের সাথে কথা বলার সময় বন্ধুর মত কথা বলা)। সাথে সাথে তার পাজী দিদির উসকানি, ‘ কনি, শোন, প্রেম খুবই ভালো জিনিস, দেখিসনা এখানে কত ছোট বয়স থেকেই সবার বয়ফ্রেন্ড, গার্ল ফ্রেন্ড হয়ে যায়’ বলেই হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ে, মিথীলা পড়ে যায় আরও বেশী ফাঁপড়ে। ওর ধারনা হয়, ওর দিদির কথা শুনে বুঝি মা আরও বেশী ঘাবড়ে যাবে, বুঝি ওকে আর সেল ফোন দিবেইনা। ওর মুখ দেখে মায়া লাগে, বললাম, ‘ আচ্ছা যাও, তোমার ১৪ বছর বয়স হলে ফোন পাবে’। দিদি ফোঁড়ন কাটে, ‘ ততদিনে আর কেউ বসে থাকবেনা তোর জন্য, তোর আর বয়ফ্রেন্ড হবেনা’।

মিথীলা অবশ্য দিদিদের ঠাট্টাগুলো খুব এনজয় করে। কারন, ওর দুই দিদি সময় পেলেই যখন বাড়ি আসে, ওকে সিনেমা দেখাতে নিয়ে যায়, নাহলে ওকে জামা কাপড় কিনে দেয়, বা যে সমস্ত খাবার আমি কিনে দেইনা, সেই সমস্ত আপাত লোভনীয় খাবার কিনে খাওয়ায়। আমি মিথীলাকে তেমন সময় দিতে পারিনা অথচ সব কিছুতে নজরদারি করি, এটা ওর জন্য আমেরিকার পরিবেশে একটু অস্বস্তির বইকি! এখানে ওর বন্ধুদের মা-বাবারা ছেলেমেয়েদের নিয়ে কত যে আহ্লাদ করে তা বলে শেষ করা যাবেনা। আমার ধারণা ১৮ বছর বয়স হলে পরেই ছেলেমেয়েরা বাবা মায়ের কাছ থেকে আলাদা হয়ে নিজের মত করে জীবন শুরু করে বলেই হয়তো বাবা মা এই কয়টা বছর ছেলেমেয়েদের আদরের চূড়ান্ত করে ফেলে।

এবার মিথীলা আবদার করলো বন্ধুদের সাথে একটা মুভী দেখবে বলে। এতোদিন সে তার বাবার সাথেই মুভী দেখেছে। কিনতু এখন পারসোন্যালিটি তৈরী হওয়ার সময়, নিজস্ব একটা মতামত দেবার ইচ্ছে করবে এখন থেকেই, আমি তা জানি বলেই এইবেলা পারমিশান দিলাম। এই প্রথম মিথীলা স্কুলের বন্ধুদের সাথে মুভী দেখতে যাওয়ার পারমিশান পেলো। কালকেই মিথীলা সন্ধ্যা ৬টা-৯টা শো দেখতে গেলো, তার বাবা সিনেমা হলে পৌঁছে দিয়ে এসেছে। বাড়ী থেকে বের হওয়ার আগে মিথীলা বার বার তার দিদিসোনা কে ডেকে বলছিলো, ” তোমার গাড়ীটা সরাও, বড় গাড়ীটা বের করতে হবে’। ওর দিদি মাত্রই ঘন্টা দুই আগে ইন্টারভিউ শেষ করে বাড়ী এসেছে, ও বুঝতে পারছিলোনা কেনো বড় গাড়ীটাই বের করতে হবে মিথীলাকে সিনেমা হলে পৌঁছে দিতে। তার বাবা ব্যাপারটা পরিষ্কার করে দিলো, ” বড় গাড়ী বের করতে না পারলে আমাদের পুরাণো গাড়ী নিয়ে যেতে হবে, সেটা ওর প্রেস্টিজে লাগে”।

দিদিরা সবাই এমন পরিস্থিতির ভেতর দিয়ে গেছে, তাই সাথে সাথে দিদি একেবারে ছোটবোনের প্রেস্টিজের কথা চিন্তা করে নিজের গাড়ী সরাতে যেতেই আমি বাধা দিলাম। আমি মিথীলাকে বললাম যে তোমার যা আছে তা লুকানোর কিছু নেই। তোমার বাবার পুরানো গাড়ী, তাতে কি হয়েছে, যার যেমন ক্ষমতা তার তেমন জিনিস থাকবে। আরও কিছু ‘উপদেশ বাণী’ দিয়ে ওকে বলে দিলাম যেনো বাবার ফোনটা সাথে নিয়ে যায়, ফেরার সময় হলে একটা ফোন করে দেয় বাড়ীতে। আর কোন কথা না বাড়িয়ে মিথীলা মুভী দেখতে চলে গেলো।

রাত প্রায় ৯টা, ওর বাবা সময় দেখে নিয়ে সিনেমা হলে রওনা হয়ে গেছে ওকে নিয়ে আসবে বলে। আমি একটু পত্রিকা পড়ছিলাম, আমার বড় মেয়ে আমার সাথে কথা শেষ করে ওর নিজের কাজ করছিল, হঠাৎ দেখি আমার ফোনে মেসেজ টোন বেজে উঠেছে। কলার আইডিতে বড়মেয়ের নাম। কি ব্যাপার, মামনি কেনো নীচে থেকে আমাকে মেসেজ পাঠালো! মেসেজে লেখা, ‘ মা, পাপাকে আসতে বলো, মুভী শেষ হয়ে যাবে এখনই’। আমার একটু সময় লাগলো বুঝতে, মিথীলা বাবার পুরানো ফোন না নিয়ে দিদির ‘আইফোন’ নিয়ে গেছে। এক মিনিট পরেই আরেকটি মেসেজ, ‘ মা, ডিনার রেডী রাখো, আমার খুব ক্ষিদে পেয়েছে। এসেই খেতে হবে”। আমার হাসি পেয়ে গেলো, মিথীলা টেক্সট করার সুযোগ পেয়েছে, আর তাইতেই আমাকে টেক্সট করে যাচ্ছে সমানে। মিথীলা কখনও খিদে পাওয়ার কথা বলেনা, আবার এমন নাটকীয় ভঙ্গীতে বলার সময়ই বা কই!

আমি একটা বাচ্চার ব্যক্তিত্বে পরিবর্তনের শুরুটা আঁচ করতে পারছিলাম। আমার এমন মায়া লাগলো মিথীলার জন্য, পালটা উত্তর পাঠালাম, ‘ডিনার রেডী, তুমি আসলেই খাবার পাবে”, সাথে সাথে উত্তর ‘ওকে’। বড় মেয়েকে বললাম, তোমাদের যেভাবে বড় করেছি, ওকেও সেভাবেই বড় করতে চাই। একটা ফোন দেয়ার ক্ষমতা আমার আছে, দেইনা কারন আমি জানি সেল ফোনের কুপ্রভাব। আমার কাছে বাবা মায়েরা আসে মিথীলার চেয়েও ছোট বাচ্চাদের নিয়ে, স্মার্টফোন কিনতে, আনলিমিটেড টেক্সট ফিচার নিতেই হয়, নাহলে বাচ্চাদের মুখ অভিমানে অন্ধকার হয়ে থাকে। বিশেষ করে এখানের কালো জনগোষ্ঠীর অধিকাংশই লেখাপড়ার ধার ধারেনা, কিনতু জন্মের পরেই হাতে একটা ফোন ধরে থাকে। ও এখন অনেকটাই একা থাকে, ফোন পেলে টেক্সট পাঠানোর খেলাতে মেতে উঠবে, ও ছোট মানুষ, ভালো-মন্দ এখনও বুঝেনা, এখনও ওর পড়ার নেশা আছে, অন্য মজাদার জিনিস পেয়ে গেলে পড়াশোনা আর ভালো লাগবেনা, তখন ওর কি হবে! আজকেই ও বাবার ফোন পুরানো বলে নিলোনা, তোমার ফোন নিয়ে গেলো বন্ধুদের কাছে নিজের দামটা বাড়ানোর জন্য, এটা আজ করেছে, আর যেনো না করে, তোমরা ভালোবাসো কিনতু খেয়াল রাখবে যেনো ভালোবাসা আবার বোঝা না হয়ে যায় ওর জন্য।

গত কয়েকদিন ধরে লাশান নামের এক ক্লাস ফ্রেন্ড ওকে ফোন করে। লাশান কালো, মিথীলার বয়সী, আমি লাশানকে চিনি, খুব ভালো একটা বাচ্চা, একমাত্র এই ছেলেটাই একটু পড়াশুনা করে, বাকী কালো ছেলেমেয়েরা পড়াশুনার ধার দিয়েও যায়না। এখানে স্কুল ফ্রী, স্কুলের ব্রেকফাস্ট, লাঞ্চ ফ্রী (গরীব ছাত্রছাত্রীদের জন্য, কালোদের অধিকাংশই ছেলেমেয়েকে স্কুলে পাঠায় স্কুলের এই সুবিধাটা ভোগ করার জন্য। কালোদের কথা বলছি কারন এখানে কালো জনগোষ্ঠী মেজরিটি।) আমি আজকে মিথীলাকে হাসতে হাসতে জিজ্ঞেস করেছি,’ এই প্রতিদিন লাশান তোকে ফোন করে কেনো, লাশান আবার তোর সাথে প্রেম’ করতে চায়নাতো?” মিথীলা হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ে বললো, ‘ শুধু লাশান ফোন করবে কেনো, জোয়ি, ম্যাকেইলা, টাইরোনও ফোন করে, আমরা আমাদের প্রোজেক্ট নিয়ে কথা বলি”। আমি বললাম, ‘ কি জানি, এখানেতো ক্লাস ফাইভ সিক্সে থাকতেই প্রেম শুরু হয়ে যায়, কোনদিন শুনবো তোরও বয়ফ্রেন্ড হয়ে গেছে”। মিথীলার উত্তর, ” মা ক্লাস ফাইভ না তো, ক্লাস টু থেকে প্রেম হয়।” আমি বললাম, ‘কি???’ ক্লাস টু থেকে প্রেম তা তুই জানলি কিভাবে’। ও বললো, ‘কেনো, ক্লাসে সবাই বলাবলি করে, সেটা থেকেই জানি।’ কপট অবাক হওয়ার ভঙ্গী করে জিজ্ঞেস করি, ‘তুই প্রেমের কি বুঝস?’ আমার সেই বাচ্চা মেয়ে দেখি উত্তরে বলে, ‘ সবাই যেরকম বুঝে, আমিও সেরকম বুঝি’।

ওর এমন চটপটে উত্তর শুনে আমিতো অবাক হয়ে গেছি। আমি জানতেও পারিনি আমার সেই ছোট্ট গুটগুটি কখন এমন বড় হয়ে গেলো! তার মানে ওকে আর আগের মত গুটগুটি, কুটকুটি ডাকা যাবেনা! এবার হতাশ আমি বলি, ‘ তার মানে, তুই আর ছোট নাই’? আমার হতাশা দেখে আবার মিথীলা ছোট হওয়ার চেষ্টায় বলে, ‘আরে! আমি নিজেতো কিছু বলিনা, সবাই বলে, সেটাতো শুনি। আমি এগুলো নিয়ে কারো সাথে কথাও বলিনা।’ এবার আমিও মওকা পেয়ে গেলাম, এই সুযোগেই বলে দিলাম, ‘এইবার বুঝে দেখো, আমি কেনো ফেইসবুক, সেলফোন তোমাকে দেইনা! আশা করি আমার উপর তোমার আর কোন রাগ বা দুঃখ থাকবেনা’। বুদ্ধিমতী আর কথা বাড়ালোনা, শুধু বললো, “না, তোমার উপর রাগ করি নাই, তোমার যখন ইচ্ছা তখন দিও ফোন।’