ক্যাটেগরিঃ দিবস প্রসঙ্গ

 

পৃথিবীজুড়ে মহা উৎসাহ-উদ্দীপনা নিয়ে যে দিবসটি পালিত হয় তার নাম ভ্যালেন্টাইনস ডে অথবা ভালোবাসা দিবস। ভালোবাসা এমন এক অনুভূতি, যা কিনা সবার সঙ্গে বিনিময় করা যায়। প্রেমিক তার প্রেমিকাকে ভালোবাসবে, স্বামী তার স্ত্রীকে, বাবা-মা ভালোবাসবে সন্তানকে, গৃহস্বামী ভালোবাসবে তার পোষা কুকুর বা বিড়ালকে, খুকী ভালোবাসবে তার আদরের ময়না পাখিটাকে, মিত্র ভালোবাসবে শত্রুকে, সবাই ভালোবাসবে সবাইকে_ এমনটা ভাবতেই ভালো লাগে। আমাদের কবিগুরু সেই কবে কোনকালে গেয়েছিলেন_ ‘ভালোবাসি, ভালোবাসি, এই সুরে কাছে-দূরে, জলে-স্থলে বাজাই বাঁশি।’ ঠিক এই ভালোবাসার সুরটি পৃথিবীজুড়েই বাজে বছরের একটি দিনে, ১৪ ফেব্রুয়ারিতে।

ফুল তো বিক্রি হয় সারা বছরই, কিন্তু ফেব্রুয়ারির ১৪ তারিখে আমেরিকাসহ বিশ্বের প্রায় প্রতিটি দেশে যত গোলাপ বিক্রি হয়, সারা বছরের বিক্রীত গোলাপের চেয়েও তা বেশি। শুধু গোলাপই নয়, গোলাপের সঙ্গে কার্ড, ক্যান্ডি, নানা রকম গিফট দেদার বিক্রি হয়। সবাই কেনে। কারণ একটাই, এ উপলক্ষে ছোট-বড়, বন্ধু-বান্ধবী সবাই আবেগতাড়িত হয়ে একে-অপরকে শুভেচ্ছা-সম্ভাষণে দিনটিকে ভরে রাখে। স্বাভাবিকভাবেই কৌতূহল জাগে কবে থেকে এই ভ্যালেন্টাইনস ডে শুরু হয় অথবা কেনইবা দিনটিকে ‘ভ্যালেন্টাইনস ডে’ বলা হয়ে থাকে।

ভ্যালেন্টাইনস ডে’র শুরু

ফেব্রুয়ারি মাস রোম্যান্সের মাস, এটা নাকি প্রচলিত কথা। আর তাই ভালোবাসা দিবসটি এ মাসেই নির্ধারিত হয়েছে। তবে যার নামে দিনটিকে অলঙ্কৃত করা হয়েছে, সেই ভ্যালেন্টাইনকে জানতে হলে আমাদের ইতিহাসের চাকা ঘুরিয়ে অনেক পেছনে যেতে হবে। এ আজকের কথা নয়, এই ভ্যালেন্টাইন ডে খ্রিশ্চিয়ান ও প্রাচীন রোমান ট্র্যাডিশন থেকে পালিত হয়ে পৃথিবীতে আজকে ‘ভালোবাসা দিবসের’ মর্যাদা পেয়েছে।

কে এই ভ্যালেন্টাইন

কথিত আছে, তৃতীয় শতকে রোমের প্রধান পুরোহিত ছিলেন ভ্যালেন্টাইন নামের এক সাধু পুরুষ। ওই সময় সম্রাট ক্লডিয়াসের (দ্বিতীয়) ধারণা জন্মায় যে, বিবাহিত পুরুষের চেয়ে অবিবাহিত পুরুষই তার সেনাবাহিনীর জন্য বেশি উপযুক্ত। কোনো পিছুটান থাকবে না তরুণ সেনাদের মনে। ফলে তারা অনেক বেশি দক্ষতা অর্জন করতে পারবে নিজেদের পেশায়। তার সেনাবাহিনীও হয়ে উঠবে অনেক চৌকস। তাই তিনি তার সেনাবাহিনীতে তরুণদের জন্য বিবাহ নিষিদ্ধ ঘোষণা করে আইন জারি করে দিয়েছিলেন। প্রধান পুরোহিত ভ্যালেন্টাইন এই আইনটিকে খুবই অনৈতিক ও অযৌক্তিক মনে করেছিলেন। তিনি গোপনে অনেক তরুণ-তরুণীর বিয়ে নিজে উপস্থিত থেকে সম্পন্ন করেছিলেন। একসময় সম্রাটের কানে পৌঁছে যায় ভ্যালেন্টাইনের এমন গোপন কাজের খবর। সম্রাট ভ্যালেন্টাইনকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করেন।

ভ্যালেন্টাইন সম্পর্কে আরও কথিত আছে, জেলখানায় বন্দী থাকাবস্থায় ভ্যালেন্টাইন ওই জেলের জেলারের তরুণী মেয়ের প্রেমে পড়েছিলেন। বন্দী থাকাকালীন মেয়েটি তাকে প্রায়ই দেখতে আসত। মৃত্যুর আগে ভ্যালেন্টাইন তার সেই তরুণী প্রেমিকাকে উদ্দেশ করে একটি চিঠি লিখেছিলেন। যার নিচে দস্তখত করেছিলেন ‘তোমার ভ্যালেন্টাইন’ বলে। এই একটি সম্বোধন, যা আজও সব তরুণ হৃদয়ে ঝঙ্কার তোলে। যদিও ভ্যালেন্টাইন সম্পর্কে এই গল্পগুলো ধোঁয়াশাচ্ছন্ন। তারপরেও এই গল্পগুলো থেকে ধারণা করা যায় যে, ভ্যালেন্টাইন ছিলেন অপরের প্রতি সহানুভূতিশীল, সাহসী এবং রোমান্টিক। তাছাড়া ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সের সবচেয়ে জনপ্রিয় সেইন্টদের (মহৎপ্রাণ সাধুদের মৃত্যুর পরে চার্চ থেকে ‘সেইন্ট’ ঘোষণা করা হয়) মধ্যে ভ্যালেন্টাইন ছিলেন অন্যতম।

ফেব্রুয়ারির ১৪ তারিখটি কীভাবে ভ্যালেন্টাইনস ডে হিসেবে নির্বাচিত হলো, তার বেশ কয়েকটি কারণের মধ্যে অন্যতম কারণ হচ্ছে, ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি সময় ভ্যালেন্টাইনের মৃত্যু হয়েছিল। এই দিনটিকে স্মরণীয় করে রাখতেই ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি সময় ভ্যালেন্টাইনস ডে উদযাপন করা শুরু হয় (সময়টা ছিল ২৭০ এ.ডি) তারও অনেক পরে। যেহেতু ফ্রান্স ও ইংলান্ডে সাধারণ বিশ্বাস ছিল যে, ফেব্রুয়ারির ১৪ তারিখ পাখিকুলের ‘মেটিং সিজন’এর শুরু হয়। সেহেতু ফেব্রুয়ারি মাসের ১৪ তারিখটিকে ‘ডে ফর রোমান্স’ হিসেবে ভ্যালেন্টাইনস ডে নির্বাচন করা হয়।

সপ্তদশ শতাব্দীতে গ্রেট ব্রিটেনে ভ্যালেন্টাইনস ডে স্বতঃস্ফূর্তভাবে পালিত হতে থাকে। অষ্টাদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময় বন্ধু বা সমাজের সর্বস্তরের ভালোবাসার জনদের মধ্যে ছোটখাটো উপহার, হাতে লিখা ছোট ছোট নোটস আদান প্রদান শুরু হয়। এই শতাব্দীর শেষের দিকে প্রিন্টেড কার্ডের প্রচলন শুরু হয়। সরাসরি ভালোবাসার কথা জানানো যেখানে সামাজিকভাবে নিরুৎসাহিত করা হতো, সেখানে এই প্রিন্টেড কার্ডের প্রচলন হওয়াতে সেই সব ভালোবাসানুরাগীদের জন্য আবেগ প্রকাশ অনেক সহজ হয়ে যায়। আমেরিকায়ও ১৭০০ সাল পর্যন্ত হাতে লেখা ভ্যালেন্টাইন নোটের প্রচলন ছিল। ১৮৪০ সালের দিকে এস্থার এ হাউল্যান্ড নামের ভদ্রলোক সর্বপ্রথম আমেরিকায় ব্যাপক আকারে ভ্যালেন্টাইন কার্ড (প্রিন্টেড) বাজারজাত করে। গ্রিটিং কার্ড এসোসিয়েশনের হিসাব অনুসারে আনুমানিক এক বিলিয়ন ভ্যালেন্টাইন কার্ড প্রতি বছর বিক্রি হয়ে থাকে। শতকরা ৮৫ ভাগ ভ্যালেন্টাইন কার্ডের ক্রেতা হচ্ছে মেয়েরা। আমেরিকা ছাড়াও ভ্যালেন্টাইনস ডে বিপুল সমারোহে উদযাপিত হয় কানাডা, মেঙ্েিকা, ইংল্যান্ড, ফ্রান্স ও অস্ট্রেলিয়ায়।

আমাদের বংাংলাদেশেও ইদানীং ভ্যালেন্টাইনস ডে উদযাপিত হয়, তবে শহরের দিকে। যদিও অনেকেই এই কালচারের বিপক্ষে। তারপরও ব্যক্তিগতভাবে আমার কাছে ভালো লাগে। আমাদের দেশে এমনিতেই মারামারি, হানাহানি লেগেই আছে। আরও আছে ব্যক্তিতে ব্যক্তিতে সংঘাত, বাদ-বিসম্বাদ, অভাব অনটনতো আছেই। আছে রাজনৈতিক অস্থিরতা। এত বেশি অস্থিরতার মাঝে এই একটা দিন যদি একজন আরেকজনের সঙ্গে ভালোবাসার ছোট্ট দুটি কথা সংবলিত কার্ড বিনিময় করে, অথবা ছোট্ট একটি গোলাপ বিনিময় করে, ক্ষতি কি! তাছাড়া ভ্যালেন্টাইনস ডে যেখানে ভালোবাসা দিবস হিসেবেই উদযাপিত হয়ে থাকে, ভালো তো সবাইকে বাসা যায়। মা-বাবা ভালোবাসে সন্তানকে, সন্তান ভালোবাসে মা-বাবাকে, ভাই বোনকে, বন্ধু বন্ধুকে, এক দলের রাজনৈতিক নেতা আরেক দলের রাজনৈতিক নেতাকে একটা দিন অন্তত সাড়ম্বরে পারস্পরিক ভালোবাসা বিনিময় করলে ক্ষতি কি! এভাবেই একদিন আমাদের দুই নেত্রীও হয়তো এই কালচারে অভ্যস্ত হয়ে যাবেন। বছরের এই একটি দিন তারা অন্তরে ভালোবাসা নিয়ে পরস্পর মতবিনিময় করবেন! হয়তো সেদিন বেশি দূরে নেই! সেই কবে কোনকালে অতুল প্রসাদ লিখেছিলেন, ‘সবারে বাসরে ভালো নইলে মনের কালো ঘুচবে নারে’। সেই কবে কোনকালে রবি ঠাকুর ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হিসেবে ‘রাখী’ বেঁধেছিলেন সবার হাতে। আমরাও কিন্তু ইচ্ছা করলেই পারি সবাই সবাইকে ভালোবাসার বন্ধনে বাঁধতে। আর শত্রুতা নয়, ভালোবাসাই যেন হয় শেষ কথা।

[এই লেখাটি আজকের ‘বাংলাদেশ প্রতিদিনের রকমারী’ তে ছাপা হয়েছে]