ক্যাটেগরিঃ প্রবাস কথন

 

রয় শেফার্ড নামে আমার এক বন্ধু ও সহকর্মী আছে। সে জার্মান বংশোদ্ভুত। শিশুকালেই বাবা মায়ের সাথে চলে এসেছে আমেরিকাতে। তবে যতদিন তার মায়ের দেহে শক্তি সামর্থ্য ছিল, মায়ের সাথে মাঝে মাঝেই তারও জার্মানীতে যাওয়া আসা ছিল। এখন আর যাওয়া হয়না জার্মানীতে। তবে তার চেহারা থেকে জার্মান ছাপ এতটুকুও মিলিয়ে যায়নি। ওর বয়স ৩৫, খুব ভালো ফ্যামিলির ছেলে, তার বাবা আমেরিকান, সেনাবাহিনীতে চাকুরী করতো, সেই সুবাদেই জার্মাণীতে পোস্টেড হয়েছিল, সেখানেই তার জার্মান মায়ের সাথে পরিচয়, ও পরিনয়, ওখানেই ওদের সব ভাই বোনের জন্ম হয়েছে। ফলে মাতৃভূমির সূত্র ধরে রয় নিজেকে জার্মান বলে পরিচয় দেয়। রয়ের সাথে কথা বলতে আমার ভালো লাগে, সে অনেক বেশী শোনে, জানার কৌতুহল অপরিসীম। আমেরিকার অন্য কোথায় কি হয় আমি জানিনা, তবে আমি যে দুই স্টেটে থেকেছি, সেখানের জনগন পুরোপুরি আমেরিকান, অর্থাৎ আমেরিকার বাইরেও যে বিরাট পৃথিবী রয়ে গেছে, নানা ভাষার, নানা সংস্কৃতির মানুষ রয়ে গেছে, যারা প্রতিদিন একজন আমেরিকানের মতই রাতে ঘুমাতে যায়, সকালে ঘুম থেকে উঠে, এই খবরটা ওরা জানার প্রয়োজন অনুভব করেনা। এমন একটা পরিবেশে আমার মত ‘কাঠ বাঙ্গাল’ কে থাকতে হচ্ছে বছরের পর বছর, এ যে কি কষ্টের তা আর কেউ না বুঝলেও আমার এই জার্মান বন্ধুটি কিছুটা হলেও অনুমান করতে পারে। আর সেই কারণেই রয়কে আমার খুব আপন মনে হয়।

রয় অবসরে নাটক লিখে, মিউজিকের উপর ওর খুব টান, ও এখানে একটি ব্যান্ড দলের সদস্য। আমি যেখানে থাকি, সেখানে কালো জনগোষ্ঠীই মেজরিটি। কালোদের মধ্যে একটা ব্যাপার লক্ষ্যণীয়, তা হলো, তারা সব সময় শরীরে নাচের ঢেউ তুলে চলা ফেরা করে থাকে। তাদের চলনে বলনে র‌্যাপ মিউজিক এর তাল থাকেই। আমি গান পাগল মানুষ ঠিকই, তার চেয়েও বেশী আমি বাংলা পাগল। কালোদের যখন দেখি র‌্যাপ গুনগুন করে আর হাত পা নাচিয়ে চলে, আমার কন্ঠে অটোমেটিকভাবেই বাংলা গানের সুর গুনগুনিয়ে বাজতে থাকে। আমি আপনমনে কাজ করি আর রবীন্দ্রসঙ্গীতের সুর ভাঁজতে থাকি। আমার মত এমন সুরে কেউ কোনদিন গুনগুন করেনি, তাই আমার সহকর্মীদের কানে চট করেই পৌঁছে যায় আমার আপনমনের গুনগুনানি। আগে তারা অবাক হয়ে আমাকে জিজ্ঞেস করতো, কোন কারনে আমার মন খারাপ নাকি! কারন আমার গুনগুনানিটা নাকি ভেতর থেকে উঠে আসা কান্নার মত শোনা যায়। আমি হেসে ফেলতাম, স্বীকার করে নিতাম, আসলেই আমার ভেতরে অনেক কান্না জমে থাকে। আমার নিজের অজান্তে গানের সুরগুলো কান্নার সুর হয়ে বের হয়ে আসে। ওরা এখন অভ্যস্ত হয়ে গেছে আমার গুনগুনানির সাথে। ওরা জেনে গেছে, বাংলাদেশ নামের একটি ছোট্ট দেশ আছে, ইন্ডিয়ার পাশেই, একটি স্বাধীন দেশ, সেই স্বাধীন দেশের মেয়েটা তার দেশের কথা ভেবে, তার আপনজনের কথা ভেবে মনে মনে কাঁদে, সেই কান্নাটাই তারা শুনতে পায়।

রয় যেহেতু মিউজিক নিয়ে কাজ করে তাই সে আমার গুনগুনানি শুনেই ধরতে পারে সুরের ভাষা। সে যে সত্যি সত্যি বাংলার সুরগুলো বুঝতে পারে, ব্যাপারটা আমি ধরতে পেরেছি ফেসবুক থেকে। আমার ফেসবুকে আমার আমেরিকান সহকর্মীদের মধ্যে অনেকেই বন্ধু লিস্টে ছিল, একেবারে প্রথম দিকে আমার বাংলা কী-বোর্ড ছিলনা, ফলে ইংলিশ ব্যবহার করতাম। আমার ছোট মেয়েটা, সেও জানে আমার বাংলা প্রীতির কথা। ইংলিশ ব্যবহার করতে হতো বলে আমি ফেসবুক তেমন ইউজ করতামনা, তাই দেখে একদিন আমার মেয়েটাই আমাকে ‘বাংলা কী-বোর্ড অভ্র’ ব্যবহার করা শিখিয়ে দিল (ও জানতো কোন এক সময় ওর বাবা ‘অভ্র’ ডাউনলোড করেছিলো)। আর যায় কোথা! আমার চোখের সামনে নতুন দিগন্তের উন্মোচন হলো, শুরু করে দিলাম বাংলার ব্যবহার! বাংলায় স্ট্যাটাস দেই প্রতিদিন, বাংলা গানের লিঙ্ক ফেসবুকে শেয়ার করি, মানে বাংলাকে জাপটে ধরেছি ফেসবুকে। আস্তে আস্তে দেখি আমার আমেরিকান বন্ধুরা নীরব হতে শুরু করেছে আমার ফেসবুক থেকে, একমাত্র যে টিকে আছে সে হচ্ছে রয়। রয় বুঝে না বুঝে আমার বাংলা স্ট্যাটাসে ‘লাইক’ দিয়ে যেতো, এরপর থেকে গানের লিঙ্কগুলোতে ‘লাইক’ দেওয়া শুরু করলো। আমি ভাবতাম আমাকে খুশী করার জন্য রয় এগুলো করে। পরে সে আমাকে বললো যে আমার শেয়ার করা গানের লিঙ্ক ও শুনে, শুনে ভালো লাগলেই ও লাইক দেয়।

রয় আমার দেশের ইতিহাস শুনতে চায়, সে যেহেতু নাটক লিখে, তাই ও বলিউড মুভি দেখে অনলাইনে গিয়ে। আমি তাকে বাংলা মুভির লিঙ্ক দেই, যে সমস্ত ছবিতে সাবটাইটেল আছে, সেগুলো রেফার করে দেই। রয়কে বলেছি বাংলাদেশ সৃষ্টির ইতিহাস, ও জানে ২৬শে মার্চ, ১৬ই ডিসেম্বারের কথা। ও জানে পহেলা বৈশাখ, দূর্গা পূজা, ঈদের কথা। ও জানে হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধদের কথা। ও শুনেছে আমাদের তিন বেলা ভাত খাওয়ার কথা, জানে আমাদের নদী-সাগরের কথা। জানতোনা, আমার কাছে শুনে শুনে জানার চেষ্টা করে, হয়তো ওর নাটকের পান্ডুলিপিতে সাহায্য করবে। অথবা নিছক কৌতুহল, আমাদের মতোই নিজের জানাকে আরেকটু এগিয়ে দেশের বাইরে ছড়িয়ে দেয়া। রয়কে ভাষা দিবসের কথাও বলেছিলাম, কিনতু সব কিছু মনে রাখতে পারেনা। হয়তো ভুলে গেছে।

আমার বাংলা প্রীতি দেখে আমার স্বজাতিদের মধ্যে অনেকেই এটাকে আদিখ্যেতা মনে করে, কিনতু এই ভিনদেশী আমাকে সেল্যুট করে যখন সে জানতে পেরেছে আমি আমার ঘরে বাংলাকে খুব পাকাপোক্তভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছি। সে আরও জানে, আমার মেয়েরা বাংলা পড়তে পারে, লিখতে পারে। সেও নাকি জার্মান ভাষা পড়তে পারতো, কিনতু এখন আর পারেনা, ভুলে গেছে। আমার মত করে সেও বিশ্বাস করে, মাতৃভাষাকে ঠিক রেখে আরও যে কোন ভাষা আয়ত্ব করা যায়, এতে করে ভাষাজ্ঞান অনেক বেশী সমৃদ্ধ হয়। সে নতুন করে জার্মান ভাষা চর্চ্চা শুরু করেছে, আমাকে খুশী করার জন্য দুই চারটা বাংলা শব্দ শিখে আমার ফেসবুকে সে লিখে ফেলে। আমি খুশী হই এবং সেটা তাকে জানাই। আমি সেদিন রয়কে বললাম ‘গুগল’ সার্চ করে ‘গেরিলা’ ছবিটা দেখতে এবং তার মতামত জানাতে। সে ঠিকই গেরিলা দেখেছে এবং তার মতামত জানিয়েছে। আমি দুইদিন আগে ইন্দ্রানী সেনের কন্ঠে গাওয়া ‘তুই ফেলে এসেছিস কারে মন মনরে আমার’ গানের লিঙ্কটি ফেসবুকে শেয়ার করার দশ মিনিটের মধ্যেই ্রয় ‘লাইক’ দিয়েছে, পরে কাজে গিয়ে তাকে জিজ্ঞেস করেছি, গানটা সে শুনেছে কিনা! আমাকে অবাক করে দিয়েছে রয়, সে গানের সুর বুঝেছে, বলেছে যে এই গানের সুরে নাকি আছে আমার ভেতরের কান্না, আমার আক্ষেপ! আমি তাকে গানের কথা সবটুকু অনুবাদ করে দিলাম। সে এই সুরটা নাকি তার বাঁশীতে তুলবে, যে বাঁশীটা আমি দেশ থেকে নিয়ে এসেছিলাম ওর জন্য। হঠাৎ করেই রয় আমাকে জিজ্ঞেস করলো যে খুব কাছাকাছি আমাদের কোন জাতীয় দিবস আছে কিনা। বললাম, আমাদের ষাটতম ভাষা দিবসের কথা।

রয় জানতে চাইলো, ভাষা দিবসে আমরা কি করি! আমি আমাদের শহীদ দিবসের ইতিহাস সংক্ষেপে রয়কে বললাম, বললাম আমাদের ‘শহীদ মিনারের’ কথা। নাম ধরে ধরে বললাম ভাষা শহীদদের কথা, বললাম আমাদের সেই বাংলা পাগল তরুনদের কথা, যারা ভাষা দিবসকে ‘আন্তর্জাতিক ভাষা দিবসের’ মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করেছে। এবার রয়ের অবাক হওয়ার পালা, যখন সে শুনলো, ভাষা দিবস এখন শুধু বাংলাদেশের সীমানায় আটকে নেই, ২১শে ফেব্রুয়ারী দিনটি সারা পৃথিবীর সব দেশের ভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। আমার সাথে সাথে সেও দিনটি সেলিব্রেট করতে পারে, এটা জেনেই সে খুব খুশী হলো। আমার কাছে জানতে চাইলো, সে কি করবে ঐদিন! বললাম, “ সারাদিন তুমি জার্মান ভাষায় কথা বলবে, ভুলেও ইংলিশ বলবেনা( দুষ্টামী করেছি), সকালে মা’কে ফোন করবে, কাজের শেষে মায়ের বাড়ীতে যাবে, মা’কে জড়িয়ে ধরে থাকবে বেশ কিছু সময়, এই একটা দিন অন্ততঃ তোমাদের দেশী খাবার খেয়ো, স্বজাতিদের সাথে সময় কাটিয়ো, দেখবে অন্যরকম এক অনুভূতি আসবে সারা মন জুড়ে, সারা দেহ জুড়ে! তুমি আরও বেশী করে অনুভব করতে পারবে আমার কান্না, প্রবাসে থাকার যন্ত্রণা, দেশের জন্য, আমার মায়ের জন্য আমার ভেতরের হাহাকার, বাবা ভাইয়ের জন্য আমার পাগলা ভালোবাসা! তুমি নিজের জীবনে, নিজের পরিবারে তোমার মাতৃভাষার চর্চ্চা চালু করবে, দেহে মনে দেশপ্রেম লালন করবে। অন্যের কথা ভেবে লাভ নেই, আগে নিজেকে যাচাই করতে হয়, আমি আমার দায়িত্ব কতটুকু পালন করেছি এক জীবনে, যদি বুঝতে পারো তুমি তোমার করণীয় কাজ করে গেছো, সেটাই এক জীবনের বড় প্রাপ্তি, এটাই ভাষা দিবসের মূল চেতনা।” কথাগুলো শুনে আমার তরুন নাট্যকার, মিউজিক কম্পোজার বন্ধু রয়ের চেহারাতে এক ধরনের অনিন্দ্য সুন্দর আলো ফুটে উঠলো! দেখেই আমার মনটা ভরে উঠলো, এক ধরনের পরিতৃপ্তি আমার চেহারাতেও ফুটে উঠলো।