ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস

 

ঈষিকা আমার ফেসবুক ফ্রেন্ড। ২৩/২৪ বছর বয়সী মেয়েটি সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা। ২১শে ফেব্রুয়ারীর সকাল ৮টায় (বাংলাদেশ সময়) ঈষিকা ফেসবুকে আমাকে মহান একুশের শুভেচ্ছা জানিয়েছে। আমিও ঈষিকাকে পালটা শুভেচ্ছা জানিয়ে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ২১শের প্রভাত ফেরীতে গিয়েছিলো কিনা। জবাবে ঈষিকা জানালো, তাদের বাড়ীর কাছাকাছি কোথাও কোন শহীদ মিনার নেই, তাই প্রভাত ফেরীতে যেতে পারেনি। আমি একটু অবাক হলাম যে সবাইতো ঢাকা কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে গিয়েছে, সবার সাথে সে কেনো গেলোনা! পরে মেয়েটি জানালো যে সে থাকে নীলফামারীর ডোমারে। আসলে আমি বা আমার মতো অনেকেই বাংলাদেশ বলতে ঢাকাকেই কল্পনা করি। ঢাকার বাইরে যে আরও জেলা আছে, তার কথা মনে পড়েনা!

ঈষিকা নীলফামারী থাকে শুনে একটু অবাক হয়েছি বৈকি! কারন, আমরা শুধু দেশের সমস্যা নিয়ে কথা বলি, দেশের উন্নতিগুলো নিয়ে কথা বলি কম। যেমন দেশের প্রযুক্তিগত উন্নতির কথাই ধরিনা কেনো। অতি অল্প সময়ের মধ্যেই বাংলাদেশের যে কোন প্রান্ত থেকে বিশ্বের যে কোন প্রান্তে খুব সহজেই যোগাযোগ করা যাচ্ছে, এটা যে কতবড় পাওয়া আমাদের জন্য, এই কথাটি আমরা খুব কমই বলে থাকি। ইন্টারনেট প্রযুক্তি কতটা এগোলে পরে ফেসবুক ব্যবহার করে সুদূর লীলফামারী থেকে ঈষিকা অথবা সুদূর সুসং দূর্গাপুর থেকে জাহাঙ্গীর আমার সাথে রেগুলার অনলাইনে চ্যাটিং করে থাকে। অথচ আমার ধারনাতেই ছিলোনা যে ওরা দেশের বিভিন্ন প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে আমার সাথে যোগাযোগ রাখে। যাই হোক, কথা বলছিলাম ঈষিকাকে নিয়ে। ঈষিকা খুবই সাহিত্যানুরাগী, তার কবিতা লিখার হাত আছে, ফেসবুকে সে প্রায় প্রতিদিন ছোট ছোট কবিতা লিখে পোস্ট করে থাকে। আমি নিজে কবিতা লিখতে জানিনা, আমার কোনভাবেই কবিদের আসরে ঠাঁই পাওয়ার কথা নয়, তারপরেও এই ফেসবুকেই আমার অসংখ্য তরুন কবি বন্ধু আছে, ওরা আমাকে ওদের দলের সদস্য করে নিয়েছে।

ঈষিকা মাঝে মাঝেই আমাকে ‘হাই হ্যালো’ জানায়, তাই মহান একুশের সকালে ওর শুভেচ্ছা বার্তা পেয়ে আমি অবাক হইনি, তবে শুভেচ্ছা বার্তা জানিয়েই ও আমার কাছে একটি আশ্চর্য্যজনক অনুরোধ করেছে। সেই অনুরোধ পড়ে আমি যারপর নেই বিস্মিত হয়েছি। আমার কাছে ওর একটা অনুরোধ আছে শুনেই আমি আন্দাজ করছিলাম মেয়েটি হয়তো আমার লেখার মান নিয়ে কিছু বলতে চায়। নিজের মনকে প্রস্তুত করছিলাম সমালোচনা শোনার জন্য। কারন আমি হচ্ছি শখের লেখিকা, লেখালেখি আমার পেশা নয়, তাই আমার লেখার মান নিয়ে আমার মনেই সন্দেহ থাকে, তারপরেও দৈনিক পত্রিকা বাংলাদেশ প্রতিদিনের সম্পাদকের অশেষ উদারতায় প্রতি মাসে আমার লেখা দুই একটি ফিচার উল্লিখিত পত্রিকাতে প্রকাশিত হয়। ঈষিকা তা রেগুলার পাঠ করে থাকে। এভাবেই ঈশিকা আমাকে চেনে।

ঈষিকা আমাকে অনুরোধ করেছে এভাবে, “ আন্টি, আপনার কাছে আমার একটি অনুরোধ আছে। আমাদের এখানে ধারে কাছে কোথাও কোন শহীদ মিনার নেই। সকলের মত আমারও খুব ইচ্ছে করে শহীদ দিবসে শহীদ মিনারে গিয়ে শহীদ বেদীতে ফুল দিয়ে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে। আপনি কি এই বিষয়ে কিছু লিখবেন?” এমন অনুরোধ শুনে আমি থ’ বনে গেছি। স্বাভাবিকভাবেই আমার কৌতুহল জাগে, এমন অনুরোধ সে আমার কাছে করলো কেনো! প্রশ্ন করে যা উত্তর পেলাম “ আপনার লেখাগুলো আমি নিয়মিত পড়ি। আমার মনে হয়েছে আমার মনের আকুতি আপনিই ভালো বুঝতে পারবেন এবং খুব সহজ ভাষায় তা লিখতে পারবেন। এখানেও কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার আছে, শহরের স্কুলগুলোতেও শহীদ মিনার আছে, কিনতু প্রাইমারী স্কুলে শহীদ মিনার নেই। তাই প্রাইমারী স্কুলের বাচ্চারা শহীদ মিনার কি তাও জানেনা, ২১শে ফেব্রুয়ারী দিনটি তারা প্রতিদিনের মতই খেলাধূলা করে কাটায়।“। এরপর আমি ওকে বললাম যে আমি অবশ্যই আমার মতো করে লিখতে চেষ্টা করবো। চেষ্টা করবো, আমার পত্রিকা সম্পাদক যেনো আমার এই লেখাটা অনুগ্রহ করে উনার পত্রিকাতে ছাপান, আর নাহলে ব্লগে পোস্ট করে দেবো। ব্লগেও অনেক ভালো ভালো দয়ালু ও দেশপ্রেমিক পাঠক আছেন, যাঁরা ইচ্ছে করলেই ঈষিকার এমন সহজ কিন্তু মহৎ চাওয়াটি পূরণ করতে এগিয়ে আসবেন।

আমার মুখ থেকে এমন আশ্বাসবাণী পেয়ে মেয়েটি আরও যোগ করলো, “ আমাদের এখানের একমাত্র প্রাথমিক বিদ্যালয়টির নাম ‘ভোগডাবুরী আহমেদুল হক শহীদস্মৃতি সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়’। মুক্তিযুদ্ধে শহীদ আহমেদুল হক সাহেবের নামে উনার সহযোদ্ধা সাথীদের মধ্যে কয়েকজনের মিলিত প্রচেষ্টায় এই স্কুলটি নির্মিত হয়েছিল। যাঁরা স্কুলটি নির্মান করেছিলেন, তাঁদের মধ্যে একজন এখনও এই স্কুলে কর্মরত আছেন। তবে আমার একটাই দুঃখ, স্কুলটিতে একটি শহীদ মিনার নেই। আপনি যদি এই বিষয়ে লিখেন, আমার বিশ্বাস, এতে কাজ হবে”।

ঈষিকার কথা যা ছিল বলে ফেললাম। এবার আমার নিজের কথা। রাসেল নামের আরেক তরুন ইঞ্জিনীয়ার সিঙ্গাপুর থেকে আমাকে একটি ভিডিও ক্লিপ পাঠিয়েছে এবং লিখেছে , “ আন্টি (আমাকে ফেসবুকে অনেকেই আন্টি সম্বোধণ করে থাকে), এই ভিডিও ক্লিপটা আপনাকে পাঠালাম, দেখুন, আপনার লেখার কাজে আসতে পারে”। আবার অবাক হওয়ার পালা। আমার এই তরুন বন্ধুরা আমাকে লেখকের ভূমিকায় দেখতে চাইছে, আমার উপর কিছু দায়িত্ব অর্পন করতে শুরু করেছে। আমি ভিডিও ক্লিপটি দেখলাম। কোন এক টিভি রিপোর্টার বইমেলাতে গিয়ে বইমেলায় আগত নানা বয়সের ছেলে মেয়েদের কাছে জানতে চেয়েছিলেন, ২১শে ফেব্রুয়ারী সম্পর্কে তাদের মতামত। অংশগ্রহনকারীদের মধ্যে সাত বছরের শিশু থেকে শুরু করে ৩০/৩২ বছর বয়সীও ছিল। কেউ বলতেই পারলোনা শহীদ দিবস কাকে বলে, কেনো ২১শে ফেব্রুয়ারীকে শহীদ দিবস বলা হয়ে থাকে। দুই চারটা শিশু তা-ও বলেছে, এই দিনে মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল, আর বড়রা শুধু বলেছে, তারা অত কিছু জানেনা। সবচেয়ে অবাক ব্যাপার হলো, এদের কেউই কোন এলেবেলে টাইপ ছিলোনা, মার্জিত শিক্ষিত চেহারার মানুষগুলো বইমেলাতে এসেছিল। এই একটি দেড় মিনিটের ভিডিও চিত্রে সবার কাছে উন্মুক্ত হয়ে পড়েছে বাংলাদেশের এক শ্রেণীর মানুষের জ্ঞানের দৈন্যতা।

স্কুল শেষ করেছি সেই অনেক আগে, স্কুলের বর্তমান সিলেবাস সমন্ধে আমার কোন ধারণা নেই। তবে আমাদের দেশে সরকার পরিবর্তনের সাথে সাথে স্কুলের পাঠ্য বইগুলোতে দেশের ইতিহাসও পালটে যায়। যতবার সরকার বদল হয়, ততবারই ইতিহাসও বদলায়। অথচ ইতিহাস বদলানোর ক্ষমতা নেই কারোরই। কোমলমতি শিশুরা বারবার পালাবদলের ইতিহাস পড়তে পড়তে আসল ইতিহাস কোনদিন জানার সুযোগ পায়নি। তাই শিশুরা জানেনা দেশের সঠিক ইতিহাস। কিনতু বড়রা!!! ২১শে ফেব্রুয়ারী যেখানে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের মর্যাদা পেয়েছে, সেখানে দেশের কিছু মানুষ এখনও জানেইনা ২১শে ফেব্রুয়ারীর মাহাত্ম্য।

২১শে ফেব্রুয়ারীর সাথে আমাদের ভাষার প্রশ্ন জড়িয়ে আছে, ২১শে ফেব্রুয়ারী আমাদের বাঙ্গালী চেতনা বহন করে চলেছে সেই ভাষা আন্দোলনের পর থেকে, এই একুশের ধারাবাহিকতায় এসেছে আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম, আর আমরা পেয়েছি স্বাধীন একটি রাষ্ট্র। বাংলাদেশের প্রতিটি স্কুলে যেখানে শহীদ মিনার থাকার কথা, বাস্তবতা হচ্ছে প্রতিটি স্কুলে শহীদ মিনার নেই। একটি শিশু যখন প্রথম মাতৃভাষাতে কথা বলতে শিখবে, যে বিদ্যালয়টি থেকে তার জীবনের প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হবে, তাকেতো জানতে দিতে হবে, তার মাতৃভাষার ইতিহাস। তাকে জানতে দিতে হবে, এই পৃথিবীতে বাঙ্গালীই একমাত্র জাতি, যারা মাতৃভাষাকে সরকারীভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে গিয়ে ‘৫২র ভাষা আন্দোলন চলাকালীন সময়ে, তৎকালীন পাকিস্তানী শাসক গোষ্ঠীর বন্দুকের গুলীতে বুকের তাজা রক্ত ঝরিয়েছিল, কত তাজা প্রাণ উৎসর্গ করেছিল। শিশুটিকে জানতে দিতে হবে সেই বীর শহীদদের রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃতিদানের কথা, যাতে করে সেই শিশু বয়স থেকেই তার মনে দেশপ্রেমবোধ তৈরী হয়। আর তা করতে গেলে প্রতিটি স্কুলে একটি করে শহীদ মিনার গড়া রাষ্ট্রীয়ভাবেই নির্দেশিত হওয়া উচিত।

ঈষিকা একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ায়, বিদ্যালয়টি মুক্তিযুদ্ধে এক শহীদের নামে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, যাঁরা বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠায় এগিয়ে এসেছিলেন, তাঁদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাই, সরকারের অপেক্ষায় না থেকেই নিজ উদ্যোগে তাঁরা বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা করেছেন, মুক্তিযুদ্ধে শহীদ মুক্তিযোদ্ধার নামে বিদ্যালয়টির নামকরন করেছেন, হয়ত উনাদের সামর্থ্যে কুলায়নি একটি শহীদ মিনার গড়া। ঈষিকা এই প্রজন্মের তরুনী, তার পূর্বসূরীদের অসমাপ্ত কাজ সমাপ্ত করার কথা তার মনে এসেছে। আমরা অনেক বেশী খুশী হতে পারি তরুন প্রজন্মের মধ্যে এমন সচেতনতা দেখে। আমরা কি ঈষিকাকে সাহায্য করতে পারিনা? মেয়েটি জানেনা কার কাছে আবেদন করবে, হয়তো অনেকবার আবেদন করেওছে, কোন সাড়া পায়নি কোথাও থেকে, তাই মরিয়া হয়ে আমাকে অনুরোধ করেছে।

ঈশিকার চাওয়াতে কোন ব্যক্তিগত স্বার্থ নেই, আছে শুধু দেশপ্রেম। সে জানিয়েছে গ্রামের দিকে প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে শহীদ মিনার নেই। আজকের শিশু আগামীর ভবিষ্যত। তরুণী ঈষিকারা আজকের শিশুদের মনে স্বাধীনতার চেতনা, স্বাধিকারবোধ জাগিয়ে তুলতে চায়, আমাদের সকলের উচিত ঈষিকার মত শিক্ষিকাদের সহযোগীতা করা। একটি শহীদ মিনার গড়তে খুব বেশী অর্থ খরচ হয়? শিক্ষা মন্ত্রনালয় থেকে কি এই ব্যাপারে সাহায্য পাওয়া যেতে পারে! অথবা সরকা্রের অন্য কোন মন্ত্রণালয় থেকে! আর সরকার থেকে যদি আশানুরূপ ফলাফল না পাওয়া যায়, আপনি বা আমরা কি ব্যক্তি পর্যায়ে এগিয়ে আসতে পারিনা? পারিনা নিজের এলাকার স্কুলগুলোতে শহীদ মিনার প্রতিষ্ঠা নিশ্চিত করতে? দেশটাতো আমার আর আপনার। অনেক ধনী মানুষ আছেন আমাদের দেশে, যাঁরা নীরবে সমাজসেবা করে থাকেন, তাঁরাও কি একটু এগিয়ে আসবেন এই মহৎ কাজটি সম্পন্ন করতে। শিশুরা স্কুলে ঢুকেই শহিদ মিনারের দিকে তাকাবে, মনের মধ্যে তৈরী হতে থাকবে দেশপ্রেমের চেতনা। তাহলে আগামীতে আমাদেরকে আর এমন বিড়ম্বনার শিকার হতে হবেনা, ভিডিওতে দেখতে হবেনা সুবেশ তরুন তরুনীরা টিভি ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে বলছে “ আসলে এত কথা বলতে পারিনা, শহীদ দিবস হইল মুক্তি যুদ্ধ এর বেশী কিছু জানিনা”।