ক্যাটেগরিঃ দিনলিপি

আমার হঠাৎ করেই মনে পড়লো যে আমারও একটি ছোটবেলা ছিল। সেই ছোটবেলাতে আমিও আর সবার সাথে যখন তখন ছড়া কাটতাম। জানিনা সেই ছড়াগুলো এখনও কেউ কাটে কিনা! সময় পাল্টেছে, মানুষের চাহিদা পাল্টেছে, মানুষের স্বপ্নগুলো পাল্টেছে। আমি আর আমার সন্তান, মাত্র এক প্রজন্মের ফারাক, অথচ চিন্তা চেতনা, ধ্যান ধারণায় ফারাক বিস্তর!!

যাই হোক, আগে কখনও মনে হয়নি ছড়াগুলো লিখে রাখার কথা, তাই অনেকগুলো ভুলে গেছি, আজকেই হঠাৎ করে মনে হলো, এমনওতো হতে পারে কোন না কোনদিন আমার পরবর্তী প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা তাদের মা/দিদিমাদের ছোটবেলা নিয়ে আগ্রহ দেখাবে! এলোমেলোভাবে এবং শব্দগুলোর উচ্চারণ অপরিবর্তিত রেখেই লিখছিঃ

‘৬৯-‘৭০ এর দিকে প্রাইমারী স্কুলে ভর্তি হয়েছিলাম পাঁচ বছর বয়সে, স্কুল ছুটি হলেই ছেলেমেয়েরা ছড়া কাটতোঃ
“দিদিমনি ছুট্টি, বাড়ীত গিয়া পিট্টি, গরম গরম রুটি”।

খুব আনন্দের সাথে এই ছড়াটা কাটতাম আর হেঁটে বাড়ী ফিরতাম। রবিবার ছিল সরকারী ছুটির দিন। কাজেই আগের দিন শনিবারে স্কুল থেকে ফেরার পথে ছড়াটা ছিলঃ
“কাইলকা ইস্কুল বন্দ, গোলাপ ফুলের গন্দ। পকেটে নাই টাকা, কেমনে যামু ডাকা (ঢাকা)। ডাকাতে নাই গাড়ী, কেমনে ফিরমু বাড়ী। রাস্তায় গাড়ী চলেনা, আমরা ডাকায় যামুনা।” ( ‘৬৯-৭০ এর ঐ সময়টা ছিল এমনই, হরতালে গাড়ী্র চাকা, কলকারখানা সবই বন্ধ থাকতো)

একেবারে শিশুবেলাতে ঘরে বসে ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা আরেকটি খেলা খেলতামঃ সবাই দুই হাতের দশ আঙ্গুল বিছিয়ে দিতাম বিছানার উপর, তারপর আঙ্গুল গুনে গুনে ছড়া কাটতাম, যার আঙ্গুলে গিয়ে ছড়াটি শেষ হতো, তার আঙ্গুল ভাঁজ করে লুকিয়ে ফেলতে হতো (পরাজয়ের চিহ্ন)।

“ইচকি মিচকি সাবুদানা
কাইল কে আইলো বৈঠকখানা
মামা আইলো গামাইয়া
ছাতি দরো টানাইয়া
ছাতির উপরে গামছা
দেখ মামী তামসা!
বড়মামী রান্দে বাড়ে, মেজ মামী খায়
ছোট মামী গাল ফুলাইয়া বাপের বাড়ী যায়।
বাপের বাড়ী তেল-সিন্দুর, মালির হাতে ফুল
এমন খোপা বাইন্দা দিমু, হাজার টাকা মূল”।

যখন ক্লাস থ্রী-ফোরে পড়ি, তখন খেলতাম (এটা এখনও বাচ্চা মেয়েরা খেলে থাকে), দুইজন নিজেদের হাত উঁচু করে ধরে গেইটের মত বানাতো, বাকীরা সবাই লাইন ধরে একজন একজন করে ঐ গেইটের ভেতর দিয়ে চক্রাকারে ঘুরতো আর ছড়া কাটতো, ছড়াটা যেখানে শেষ হতো, ঐ মুহূর্তে যে ঐ গেইটের ভেতর থাকতো, সে তখনকার মত সরে যেতো। একেবারে শেষের খেলোয়াড়টি হতো ‘চোর’। ‘চোর’ হয়ে তাকে দুইচোখ বন্ধ করতে হতো আর বাকীরা দৌড়ে লুকিয়ে পড়তো। তারপরেই ‘রেডি’ বললেই চোরের কাজ ছিল সবাইকে খুঁজে বের করে তাদেরকে ছুঁয়ে দেওয়া। যতক্ষণ সবাইকে না ছুঁতে পারছে, ততক্ষণ তার মুক্তি ছিলনা। সবাইকে ছুঁইয়ে দিলেই আবার নতুন করে শুরু হতো ‘ওপেন টু বাইস্কোপ’ এর ছড়া। (আসলে এভাবেই দৌঁড় ঝাঁপের ভেতর দিয়েই আমাদের শারীরিক ব্যায়াম চর্চ্চা হয়ে যেতো)।

ছড়াটা এভাবেই কাটতামঃ
“ওপেন টু বাইস্কোপ
নাইন টেন টেইস্কোপ
সুলতানা বিবিয়ানা
লাড্ডুবাবুর বৈঠকখানা
লাড্ডুবাবু বসেছে, পানসুপারী খেয়েছে।
পানের আগায় মরিচবাটা
ইস্কাপনের ছবি আঁকা
যার নাম রেনুবালা
গলায় দিলাম মুক্তার মালা”।

(আজকে এই পর্যন্ত থাক)।