ক্যাটেগরিঃ সেলুলয়েড

গত ২৬শে ফেব্রুয়ারী আমেরিকার ‘হলিউড এন্ড হাইল্যান্ড সেন্টার থিয়েটারে’ অনুষ্ঠিত হয়ে গেল ৮৪তম একাডেমী এওয়ার্ড ‘দ্য অস্কার’ ট্রফি প্রদানের চোখ ঝলসানো অনুষ্ঠান। ‘দ্য আমেরিকান একাডেমী অব মোশান পিকচার আর্টস এন্ড সায়েন্স’ প্রতি বছর ‘একাডেমী এওয়ার্ড ‘দ্য অস্কার’ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে থাকে, যেখানে হলিউডসহ বিশ্বের অন্যান্য দেশের চিত্রতারকাদের উপস্থিতিতে সম্পূর্ণ অনুষ্ঠানটি ঝলমল করতে থাকে। আমেরিকাতে সারা বছরে কমপক্ষে নয়টি বিভিন্ন ধরনের একাডেমী এওয়ার্ডের আয়োজন হয়ে থাকে। তবে অস্কার এওয়ার্ড হচ্ছে সবচেয়ে প্রাচীন ও বিশ্বের ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে সবচেয়ে বিখ্যাত পুরস্কারগুলির অন্যতম। সাধারনতঃ ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির চিত্র পরিচালক, অভিনেতা/অভিনেত্রী, রাইটার, কলাকুশলী এই পুরস্কারে ভূষিত হয়ে থাকেন। একাডেমী এওয়ার্ড ‘অস্কার’ প্রদান অনুষ্ঠানটি বিশ্বের ১০০টিরও বেশী দেশে টিভিতে সরাসরি সম্প্রচারিত হয়ে থাকে। একমাত্র প্রথম একাডেমী এওয়ার্ড অনুষ্ঠানটি টিভিতে বা রেডিওতে সম্প্রচারিত হয়নি।

প্রথম একাডেমী এওয়ার্ড অনুষ্ঠানঃ

১৯২৯ সালের ১৬ই মে প্রথম বারের মত একাডেমী এওয়ার্ড প্রদানের আয়োজন হয়েছিল হলিউডের (লস এঞ্জেলেস, ক্যালিফোর্নিয়া) ‘হোটেল রুজভেল্ট’-এ। অনুষ্ঠানে আগত অতিথি সংখ্যা ছিল ২৭০ জন। ঐ সন্ধ্যায় টিকেটের দাম ছিল ৫ ডলার। অনুষ্ঠানের স্থায়িত্বকাল ছিল মাত্র ১৫ মিনিট। এই অনুষ্ঠানে ১৯২৭/২৮ বর্ষের ফিল্মগুলোর নানা ক্যাটাগরীতে যাঁদের পারফরম্যান্স আউটস্ট্যা্নডিং ছিল, তাঁদেরকেই পুরস্কৃত করা হয়। অবশ্য প্রথমবার মাত্র ১৫টি পুরস্কার দেয়া হয়েছিল।

‘অস্কার’ নামকরনঃ

১৯২৯ সালে প্রথম একাডেমী এওয়ার্ড প্রদান চালু হয়। একাডেমী এওয়ার্ড প্রবর্তন করেন তৎকালীন ‘লুইস বি মায়ার পিকচার্স কর্পোরেশানের ( বর্তমানের মেট্রো-গোল্ডুইন-মায়ার) প্রতিষ্ঠাতা লুইস বি মায়ার। প্রথম বছর এওয়ার্ডটি একাডেমী এওয়ার্ড নামেই প্রদান করা হয়েছিল। পরবর্তীতে পুরস্কারটির নামকরণ করা হয় ‘অস্কার’। কিনতু অস্কার নামের প্রস্তাবকারী ব্যক্তিটি কে, সেই সম্পর্কে নির্দিষ্ট কোন তথ্য পাওয়া যায়নি। দুইবারের একাডেমী এওয়ার্ড বিজয়ী অভিনেত্রী বেটি ডেভিস তাঁর জীবনীগ্রন্থে দাবী করেছেন যে ‘অস্কার’ নামটি তাঁর দেওয়া। বেটির প্রথম স্বামী ব্যান্ড লীডার হারমন অস্কার নেলসনের নামানুসারেই ‘একাদেমী পুরস্কারের নাম ‘অস্কার’ রাখা হয়।

১৯৩৪ সালে টাইম ম্যাগাজিন ষষ্ঠ একাডেমী এওয়ার্ডে অস্কারের নামোল্লেখ করে। ওয়াল্ট ডিজনী ১৯৩২ সালে অস্কার পেয়ে একাদেমীকে ধন্যবাদ জানান। ১৯৩১ সালে একাডেমীর একজিকিউটিভ সেক্রেটারি মার্গারেট হেরিক প্রথমবার ট্রফিটিকে দেখেই বলে দেন যে মূর্তিটি দেখতে হুবহু তাঁর আঙ্কেল অস্কারের মত। এবং সেই থেকেই তিনি ট্রফিটিকে অস্কার ডাকতে শুরু করেন। কলামিস্ট সিডনী স্কোলস্কি উপস্থিত ছিলেন হেরিকের এই নামকরনের সময়, এমনটা দাবী করা হয়।

তবে অফিসিয়ালী ১৯৩৯ সালে একাডেমী কর্তৃক ‘অস্কার’ নামটি স্বীকৃত হয়।

ডিজাইনঃ
অস্কার স্ট্যাচু হচ্ছে কালো মেটালিক বেইসের উপর বসানো, গোল্ড প্লেটেড ব্রিটানিয়ামের তৈরী ৩৪ সেমি দীর্ঘ ‘আর্ট ডেকো’ স্টাইলের শিল্পকর্ম, যার হাতে ধরা আছে তরবারী। স্ট্যাচুটি ফিল্ম রীলের উপর দাঁড়ানো পাঁচটি ছোট দন্ডের উপর ভর করে। পাঁচটি শলাকার প্রতিটি আলাদা আলাদা করে একাডেমীর একেক শাখাকে রিপ্রেজেন্ট করে। যেমন ঃ অভিনেতা/অভিনেত্রী, লেখক, পরিচালক, প্রযোজক এবং কলাকুশলী।

অস্কার ট্রফিটির মূল ডিজাইন করেছিলেন সেডরিক গিবসন (মূল একাডেমী সদস্য), ১৯২৮ সালে। তাঁর ডিজাইনটি ট্রফিতে রূপদানের জন্য মডেলের প্রয়োজন হয়। সেডরিকের হবু স্ত্রী ডলোরেস ডেল রিও’র মাধ্যমে পরিচয় হয় মেক্সিকান চিত্র পরিচালক ও অভিনেতা ফার্নান্দেজের সাথে। শেষ পর্যন্ত ফার্নান্দেজ রাজী হয়েছিলেন ‘ন্যুড’ পোজটি দিতে, যা কিনা আজকের অস্কার ট্রফি হিসেবে সমাদৃত। পরবর্তীতে একটু আধটু পরিবর্তন এসেছে অস্কার ট্রফিটির নির্মান উপাদানে, কিনতু মূল ডিজাইনে কোন পরিবর্তন আসেনি।

প্রথম অস্কার বিজয়ীঃ

এমিল জেনিংস, সর্বপ্রথম অস্কার বিজয়ী শ্রেষ্ঠ অভিনেতা, পুরস্কারটি পেয়েছিলেন ‘দ্য লাস্ট কমান্ড’ এবং ‘দ্য ওয়ে অফ অল ফ্লেশ’ ছবিতে শ্রেষ্ঠ অভিনয়ের জন্য। এমিল জেনিংস মূল অনুষ্ঠানে থাকতে পারেননি, তার আগেই তাঁকে ইউরোপে ফিরে যেতে হয়েছিল বলে দ্য একাডেমী অনেক আগেই তাঁর হাতে পুরস্কারটি তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। এভাবেই প্রথম অস্কার বিজয়ী হিসেবে এমিল জেনিংসের নাম ইতিহাসের পাতায় লেখা হয়ে যায়।

আরও কিছু টুকিটাকিঃ

প্রথম যে ছবিটি অস্কার পুরস্কার পায় ১৯২৯ সালের ১৬ইমে, তার নাম ছিল ‘উইংস’।

২০১২ তে ৮৪তম একাডেমী এওয়ার্ডে ‘দ্য আর্টিস্ট’ পায় শ্রেষ্ঠ ছবির পুরস্কার।

১৯৩৯ সালের ্ফিল্ম Beau Geste একমাত্র মুভি যেখানে চারজন শ্রেষ্ঠ অভিনেতার পুরস্কার পেয়েছেন একই ছবিতে একসাথে। তাঁরা হলেন গ্রে কুপার, রে মিলান্ড, সুজান হেওয়ার্ড, ব্রডরিক ক্রফোর্ড।

সর্বোচ্চ সংখ্যকবার অস্কার প্রাপ্তিঃ
ওয়াল্ট ডিজনী (বিখ্যাত ডিজনী ওয়ার্ল্ডের প্রতিষ্ঠাতা) অস্কার পেয়েছেন সর্বোচ্চ ২৬ বার।
‘অস্কার’ ট্রফিটির ডিজাইনার সেডেরিক গিবসন ১১বার অস্কার জিতে দ্বিতীয় স্থানে আছেন।

১৯৫৭ সালের ২৭শে মার্চ, ২৯তম একাডেমী এওয়ার্ড অনুষ্ঠানে প্রথমবারের মত ‘বেস্ট ফরেন ল্যাঙ্গুয়েজ ফিল্ম’ ক্যাটাগরী চালু হয়। এর আগের বছরগুলোতে বিদেশী ভাষার ছবি বিশেষ সম্মাননা পুরস্কার পেতো।
২০০২ সালের ২৪শে মার্চ, ৭৪তম একাডেমী এওয়ার্ডে শ্রেষ্ঠ ছবি ‘দ্য বিউটিফুল মাইন্ড’, ছবিটির স্থায়ীত্বকাল ৪ ঘন্টা ২৩ মিনিট। সবচেয়ে দীর্ঘ ছবি।
১৯৯৮ সালের ৭০তম একাডেমী এওয়ার্ড, বেস্ট ফিল্ম ‘দ্য টাইটানিক,’ বক্স অফিস হিট, ৬০০ মিলিয়ন ইউএস ডলার আয় করেছে এই ছবি।
২৯শে ফেব্রুয়ারী, ২০০৪ ৭৬তম একাডেমী এওয়ার্ড, দ্য বেস্ট মুভী ‘দ্য লর্ড অব দ্য রিংসঃদ্য রিটার্ণ অব দ্য কিং শ্রেষ্ঠছবির পুরস্কারসহ মোট ১১টি পুরস্কা জিতে নেয়। এটিও বক্স অফিস হিট ছবি ৩৬৮মিলিয়ন ইউএস ডলার আয় করেছে।
ব্যবসা অসফল ছবি, লো বাজেটের ‘ক্র্যাশ’ ৭৮তম একাডেমী এওয়ার্ড জিতে নেয় শ্রেষ্ঠ ছবি হিসেবে, ২০০৬ সালের ৫ই মার্চ।‘নো কান্ট্রি ফর ওল্ড মেন’ শ্রেষ্ঠ ছবি ৮০তম একাডেমী এওয়ার্ড, ২৪শে ফেব্রুয়ারী ২০০৮, সবচেয়ে কম দর্শক অথবা দর্শকশূণ্য ছবি ছিল এটি।
বাঙ্গালী চলচ্চিত্র পরিচালক সত্যজিত রায় অনারারী অস্কার পুরস্কার পেয়েছিলেন ১৯৯২ সালে, তাঁর মৃত্যুর কয়েক সপ্তাহ আগে। হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে থেকেই এই মহামূল্যবান পুরস্কারটি উনি গ্রহন করেছিলেন।ভানু আথাইয়া, ১৯৮২ সালে পেয়েছিলেন ভারতের হয়ে প্রথম অস্কার পুরস্কার, ড্রেস ডিজাইনার হিসেবে, রিচার্ড এটেনবরো’র ‘গান্ধী’ চলচ্চিত্রের ড্রেস ডিজাইনার ছিলেন এই ভানু আথাইয়া।
এ আর রেহমান, বিখ্যাত সুরকার, জিতে নিয়েছেন ‘অস্কারের’ মুকুট ৭ই ফেব্রুয়ারী, ২০০৯, ‘স্লামডগ মিলিয়নিয়ার’ ছবিতে সুরারোপ করে। স্লামডগ মিলিয়নিয়ার পেয়েছিল শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র, শ্রেষ্ঠ পরিচালক, শ্রেষ্ঠ সুরকারসহ মোট আটটি পুরস্কার।
ক্রিস্টোফার প্লামার ২০১২ সালে ৮২ বছর বয়সে অস্কার জিতেছেন, এখন পর্যন্ত ক্রিস্টোফারই সর্বজ্যেষ্ঠ অস্কার বিজয়ী( যদিও তিনি মনে করেন চার্লি চ্যাপলিন ‘অনারারী অস্কার পেয়েছিলেন ৮৩ বছর বয়সে)।
নরম্যান টরোগ ১৯৩১ সালে ৩২ বয়সে অস্কার জিতেছিলেন, এখন পর্যন্ত নরম্যান সর্ব কনিষ্ঠ অস্কার বিজয়ী।

[এই ফিচারটি ৩রা মার্চ ২০১২ এর বাংলাদেশ প্রতিদিন-এ ছাপা হয়েছে]