ক্যাটেগরিঃ খেলাধূলা

ছাত্রজীবনে বই মুখস্ত করা আমার ধাতে সইতোনা। ফলে বিপদে পড়তাম বাংলা রচনা বা ইংলিশ essay লিখতে গিয়ে। পরীক্ষার আগে টিচারদের কাছে সাজেশান চাইলেই বাংলা টিচার সাত আটটি রচনার লিস্ট হাতে ধরিয়ে দিতেন। তার মধ্যে একটি ছিল ‘অধ্যবসায়’। এই রচনাটি আমি কোনদিন মুখস্থ করার চেষ্টা করিনি। কারন আমার মধ্যে অধ্যবসায় বলতে কিছু ছিলনা বলেই রচনাটি পড়তে আমার ভালো লাগতোনা। কিনতু বেশীর ভাগ সময়ই অধ্যবসায় রচনাটিই পরীক্ষায় আসতো। মুখস্থ ছিলো না বলে পরীক্ষার হলে বসে মাথা চাপড়াতাম।

অধ্যবসায় শব্দটির কথা আজ হঠাৎ করেই মনে পড়ে গেলো। আর তা মনে করিয়ে দিলো শচীন টেন্ডুলকারের শততম শতকটি। ২০১২ সালের ১৬ই মার্চ শচীন টেন্ডুলকার বাংলাদেশের বিপক্ষে শততম শতকটি করে ‘অধ্যবসায়ে কি না হয়’ কথাটির পূর্নাঙ্গ দিলেন। ‘সেঞ্চুরির সেঞ্চুরি’ করা শুনতেই কেমন যেনো রূপকথার কল্পকাহিনীর মতো মনে হয়, অথচ এখন এটা আর কোন কল্পকাহিনী নয়। বাস্তব এবং এটাই বাস্তব।

‘বিস্ময় বালক’ হিসেবে যে কিশোরটি ক্রিকেট জগতে পা রেখেছিলো মাত্র ষোল বছর বয়সে, প্রথম সেঞ্চুরী করেছিল ১৯৯০ সালে মাত্র ১৭ বছর বয়সে, সেই কিশোর একটানা তেইশ বছর ধরে একভাবে খেলে তার ৩৯তম জন্মদিনের আগ মুহূর্তে শততম সেঞ্চুরিটি করে ফেললো। রূপকথাতো এমনই হয়। বাস্তবের সাথে মিলেনা। যেখানে একটি সেঞ্চুরী পেতে একজন ব্যাটসম্যানকে দিনের পর দিন অপেক্ষা করতে হয়, সেখানে ২১ বছরে একশোটি সেঞ্চুরি। আর এ কারনেই শচীনের নামের পাশেই ‘অধ্যবসায়’ শব্দটি মানায়। শচীনের সাথে একই সময়ে এসে, শচীনের পরে এসেও কত রথী মহারথী খেলোয়ার সময়ের আবর্তে হারিয়ে গেলো, থেকে গেলো শচীন। এতো বছরের ক্রিকেট জীবনে সে ক্রিকেটকেই তার ধ্যান-জ্ঞান মনে করেছে। জনপ্রিয়তার এমন শীর্ষে থেকে নিজেকে এমন নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারা সহজ কাজ নয়, কোন সেলিব্রেটির পক্ষেই তা সম্ভব নয়। কিনতু শচীন তা পেরেছে। তার এমন জ্বলজ্বলে জীবনের কোথাও কোন কালিমা নেই, আছে শুধুই নিষ্ঠা, একাগ্রতা, বিনয়, ভদ্রতার এক স্নিগ্ধ মহিমা।

শচীন আর তার বাল্যবন্ধু বিনোদ কাম্বলী, একই সময়ে ক্রিকেট জগতে পা রেখেছিলো। বিনোদ কাম্বলী ক্যারিয়ারের শুরুতেই তার মারকুটে ব্যাটিং দিয়ে সকলের নজর কেড়েছিলো। বরং শচীনের চেয়েও বিনোদ কাম্বলীর প্রতিই যেনো সকলের মন বেশী আর্দ্র ছিল। কারন শচীন এসেছিলো মোটামুটি স্বচ্ছল পরিবার থেকে, বিনোদ এসেছিলো একেবারেই এঁদোগলি থেকে, অনেকটাই বস্তি এলাকা থেকে। দুই বন্ধুর সামাজিক অবস্থানে ছিলো বিস্তর ফারাক, অথচ দুইজনই ছিলো একই শিক্ষকের ছাত্র। দুজনেই ব্যাটিং জিনিয়াস। কিনতু বিনোদ কাম্বলী খুব তাড়াতাড়ি নিজেকে হারিয়ে ফেলেছিলো বাইরের চাকচিক্যের মাঝে, যেখানে শচীন ছিলো নির্বিকার। সে ক্রিকেটের বাইরে নিজেকে জড়ায়নি, ক্রিকেটকেই করে নিয়েছে তার ধ্যান-জ্ঞান। যদিও আরও পরে শচীনকে নিয়েও আড়ালে আবডালে কত উপহাস, কত ঈর্ষা, কত নিন্দা, সমালোচনা হয়েছে তার কোন ইয়ত্বা নেই। কিনতু শচীন কোথা থেকে এমন ধৈর্য্য, এমন নমনীয়তা আয়ত্ব করেছিলো কে জানে, কারো বিরূদ্ধে কোন নালিশ না করে নিজের কাজটুকু শুধু করে গেছে।

শচীন যখন হাতে ব্যাটটি নিয়ে মাঠে ঢুকে, গ্যালারীতে বসা হাজার হাজার দর্শকের কাছেই মনে হয়, একেই বলে খেলোয়ার, এর খেলা দেখতেই সকলের এখানে আসা। আমারও এমন মনে হয়েছিলো। ’৯৮ সালে আইসিসি ট্রফির কোয়ার্টার ফাইনাল খেলা(মনে হয় ভুল বলছিনা) দেখতে গিয়েছিলাম ঢাকা স্টেডিয়ামে। ভারত বনাম অস্ট্রেলিয়া ম্যাচটি স্টেডিয়ামের সাধারন দর্শক গ্যালারীতে বসে দেখেছিলাম, ১০/১২ জনের পারিবারিক এক দল নিয়ে সেদিন গেছিলাম সেখানে, শুধুই শচীনের খেলা সামনাসামনি দেখতে। কারন শচীন নাকি দলকে জেতাতে পারেনা, শচীন নাকি ব্রায়ান লারার নখের যুগ্যিও না—এমন ধরনের কথা পত্রিকাতেও পড়তাম, মানুষের মুখেও শুনতাম। শচীনের একনিষ্ঠ ভক্ত হিসেবে এমন ধরনের কথা আমার আগেও মানতে কষ্ট হতো, এখনও কষ্ট হয়। তা সেদিন স্টেডিয়ামে বসে থেকে শচীনের এক দূর্দান্ত সেঞ্চুরী দেখেছিলাম, আরও একটি ব্যাপার খেয়াল করেছিলাম, ব্যাটহাতে নামার আগে মাঠে বেশ কিছুক্ষন অনুশীলন করতে। আমার ভালো লেগেছিলো, স্মৃতিতে গাঁথা হয়ে গেছিলো একাগ্রচিত্তে অনুশীলনরত এক খেলোয়ারের শৈল্পিক ছবি।

২০০১ সালে চলে আসি আমেরিকাতে, এখানে ক্রিকেট কেউ চিনেনা, ক্রিকেট কেউ বুঝেওনা, তাই সবার সাথে থাকতে থাকতে আমিও একসময় ক্রিকেট সম্পর্কে উদাসীন হতে শুরু করেছি। পত্রিকার পাতা পড়ে যতটুকু জানার জেনে নেই। প্রথমদিকে তবুও কম্পিউটারে বসে বসে ইউটিউবে অথবা অন্য খেলার ওয়েবসাইটে গিয়ে রেকর্ডকৃত খেলা দেখতাম অথবা স্পীড কম থাকার কারনে অনেক স্লো দেখতে পেতাম খেলা। আমি আগেই বলেছি, অধ্যবসায় ব্যাপারটি আমার মধ্যে খুব কম, তাই অত কষ্ট করে আমি আর ক্রিকেট খেলা দেখতে রাজী ছিলামনা। আরও পরে ভুলে যেতেই শুরু করলাম, ক্রিকেট নামের একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় খেলা আছে আমাদের উপমহাদেশে, যার জন্য আমিও একসময় পাগল ছিলাম। তবুও যতই ভুলে ্থাকিনা কেনো, শচীনের নামটি ঠিকই খুঁজতাম পত্রিকার পাতায়। শচীনের নামটি দেখে খুশী হতাম। সেই শচীন এখনও টিকে আছে ক্রিকেট অংগনে, যখন বিনোদ কাম্বলী, সৌরভ গাঙ্গুলী, অনিল কুম্বলে, রাহুল দ্রাবিড়েরা অবসর নিয়েছে খেলার এই ভুবন থেকে। বিশ্বের কোন ক্রিকেট খেলোয়ারই মনে হয়না এতো দীর্ঘ সময় ধরে এক ছন্দে, এক গতিতে খেলা চালিয়ে যেতে পেরেছে, এমন রেকর্ড কারো আছে বলে আমি শুনিনি, বিশ্বাসও করিনা।

মার্চ মাসটি বাংলাদেশের অহঙ্কারের নাম, মার্চ মানেই স্বাধীনতা। ২০১২ সালের মার্চেই বাংলাদেশ সমুদ্রসীমা মামলায় জয়ী হলো, অমীমাংসিত মামলা মীমাংসিত হলো, আমরা জয়ী হলাম। এই মার্চেই বাংলাদেশ ক্রিকেট দল ভারতের বিরুদ্ধে এক দূর্দান্ত জয় পেলো, আমরা বাঙালিরা স্বাভাবিকভাবেই খুশী, আনন্দিত। এ শুধু আমাদের অহংকার, বাংলার অহংকার।

আর শততম শতক করে শচীন টেন্ডুলকার যে বিস্ময়ের জন্ম দিলো, তা শুধু ভারতবাসীর অহংকার নয়, এ অহংকার সমগ্র বিশ্ববাসীর। এ অহংকার মানুষের একাগ্রতার, ধৈর্য্যের, নিয়মানুবর্তিতার। এমন ঘটনা রূপকথাকে হার মানায়। বাংলার মাটিতেই এমন ইতিহাস সৃষ্টি হয়েছে, একই সাথে বাংলাদেশ ক্রিকেট যেমন জয়ী হয়েছে, তেমনি ক্রিকেটের বরপুত্রের এমন ইতিহাস সৃষ্টিতে বাংলার মার্চ আরেকবার অলংকৃত হয়েছে।